লেখক: মো. কামাল উদ্দিন
নারী কি কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক, নাকি মানবসভ্যতার সমান অংশীদার?
“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই অমর পঙ্ক্তি নারী ও পুরুষের পারস্পরিক অবদান এবং মানবসভ্যতা নির্মাণে উভয়ের সমান গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সভ্যতার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নারী ও পুরুষের সম্মিলিত শ্রম, মেধা, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর অগ্রযাত্রা। তাই নারীকে কেবল রূপের মাপকাঠিতে বিচার করা কিংবা তাঁর সামগ্রিক পরিচয়কে বাহ্যিক সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা কোনোভাবেই সুবিচার হতে পারে না।
নারী আমাদের মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা, সহকর্মী এবং সমাজের সমান মর্যাদাসম্পন্ন একজন মানুষ। তাঁর পরিচয় কোনো একটি সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি নিজস্ব চিন্তা, স্বপ্ন, প্রতিভা, অধিকার ও আত্মমর্যাদার অধিকারী একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ। অথচ যুগে যুগে সমাজের নানা স্তরে নারীকে কখনো অবহেলা, কখনো বৈষম্য, কখনো নির্যাতন, আবার কখনো সৌন্দর্য ও ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ছাড়া প্রকৃত অর্থে সভ্য সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা, নাকি যোগ্যতার মূল্যায়ন?
বর্তমান বিশ্বে সুন্দরী প্রতিযোগিতা, ফ্যাশন শো ও মডেলিং বিনোদন এবং বাণিজ্যিক সংস্কৃতির পরিচিত অংশ। এসব আয়োজনের সমর্থকেরা বলেন, এর মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব, প্রতিভা ও পেশাগত সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, অনেক ক্ষেত্রে নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্বকে আড়াল করা হয়।
আমার প্রশ্ন এখানেই। একজন নারীর মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি যদি তাঁর শারীরিক সৌন্দর্য, দেহের গড়ন কিংবা ক্যামেরার সামনে নিজেকে উপস্থাপনের ক্ষমতা হয়ে ওঠে, তাহলে তাঁর শিক্ষা, মনন, কর্মদক্ষতা, মানবিকতা ও সামাজিক অবদান কোথায় স্থান পাবে?
একজন নারী বিজ্ঞানী গবেষণার মাধ্যমে মানবকল্যাণে অবদান রাখতে পারেন। একজন চিকিৎসক অসুস্থ মানুষের জীবন রক্ষায় নিয়োজিত থাকতে পারেন। একজন শিক্ষক প্রজন্মকে আলোকিত করতে পারেন। একজন সাংবাদিক সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে সমাজের বিবেককে জাগ্রত রাখতে পারেন। একজন ক্রীড়াবিদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা উজ্জ্বল করতে পারেন। একজন উদ্যোক্তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারেন। তাঁদের প্রত্যেকের সাফল্যই সৌন্দর্যের প্রচলিত মাপকাঠির চেয়ে অনেক বিস্তৃত ও অর্থবহ।
তাহলে একজন নারীর সাফল্যকে কেবল তাঁর বাহ্যিক রূপের সঙ্গে যুক্ত করে দেখব কেন? কেন তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা, কর্মদক্ষতা ও মানবিক গুণাবলিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে না?
আমি মনে করি, প্রতিযোগিতা হোক মানুষের জ্ঞান, যোগ্যতা, সৃজনশীলতা, সততা ও কর্মদক্ষতার। সৌন্দর্য থাকুক ব্যক্তির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে, কিন্তু সেটি যেন মানুষের সামগ্রিক মূল্য নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে না ওঠে।
নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদা: সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার?
একজন নারী কী পোশাক পরবেন, কোন পেশায় যুক্ত হবেন, কীভাবে নিজের প্রতিভা প্রকাশ করবেন এবং কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন, এসব বিষয়ে তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতার গুরুত্ব রয়েছে। কোনো নারী সুন্দরী প্রতিযোগিতা বা মডেলিংয়ে অংশ নিলেই তাঁকে হেয় করা কিংবা তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা ন্যায়সংগত নয়।
একই সঙ্গে যেকোনো আয়োজনের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য, উপস্থাপনার ধরন, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, অংশগ্রহণকারীর সম্মতি এবং ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার বিষয়গুলোও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সৌন্দর্যকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে যদি কোনো নারীকে কেবল দর্শকের বিনোদনের উপকরণে পরিণত করা হয়, তাহলে সেই প্রবণতার সমালোচনা অবশ্যই করা যেতে পারে।
আমার আপত্তি নারীর সৌন্দর্য, পোশাক কিংবা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নয়। আমার প্রশ্ন হলো, নারীর স্বাধীনতার নামে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতাকে যদি কেবল বাহ্যিক উপস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে সেটিকে কতটা অগ্রগতি বলা যায়?
স্বাধীনতা মানে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। আর মর্যাদা মানে সেই সিদ্ধান্তের কারণে অপমান, বৈষম্য কিংবা শোষণের শিকার না হওয়া। এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই।
নারী নির্যাতনের দায় নারীর নয়
পৃথিবীর ইতিহাসে নারীর প্রতি বৈষম্য, নির্যাতন ও অধিকার হরণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। কোনো কোনো সমাজে নারীকে সম্পত্তির মতো বিবেচনা করা হয়েছে। কোথাও তাঁকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, কোথাও উত্তরাধিকার ও সম্পদের অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে, আবার কোথাও সামাজিক প্রথার নামে তাঁর জীবন ও স্বাধীনতার ওপর নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।
ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে নারীর প্রতি অমানবিক আচরণের উদাহরণ মানবসভ্যতার বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সতীদাহ প্রথার মতো নিষ্ঠুর প্রথায় বিধবাদের জীবন বিপন্ন করা হয়েছে। আধুনিক যুগেও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন, মানব পাচার এবং বৈষম্যের ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে।
তবে নারী নির্যাতনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নারীর পোশাক, সৌন্দর্য কিংবা স্বাধীনতাকে দায়ী করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো নারী যে পোশাকই পরুন, যে পেশাতেই যুক্ত থাকুন কিংবা যে জীবনধারাই অনুসরণ করুন, তাঁর সম্মতি ছাড়া তাঁকে স্পর্শ করা, হয়রানি করা বা নির্যাতন করার অধিকার কারও নেই। যৌন সহিংসতার দায় অপরাধীর, ভুক্তভোগীর নয়।
সমাজে অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন অপরাধীর জবাবদিহি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতি সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি। নারীর স্বাধীনতা সীমিত করে নয়, বরং তাঁর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করেই একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক দায়িত্ব
ধর্মীয় মূল্যবোধ মানুষের মধ্যে সংযম, ন্যায়বোধ, দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। ইসলামের শিক্ষায় মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক দায়িত্ব এবং নারীর অধিকার গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষায় নারীর প্রতি সদাচরণ এবং তাঁদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করতে হলে শুধু কথায় নয়, আচরণেও তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। একজন নারীকে মা, বোন কিংবা স্ত্রী হিসেবে সম্মান করার পাশাপাশি একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবেও তাঁর অধিকারকে মর্যাদা দিতে হবে। কারণ নারীর সম্মান কেবল তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়; তাঁর মানবিক মর্যাদা জন্মগত।
একইভাবে কোনো ধর্মীয় বক্তব্য উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রেও তার সঠিক অর্থ ও প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি। ধর্মকে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর হাতিয়ার না বানিয়ে ন্যায়, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা গ্রহণ করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
ইতিহাসে নারী: সৌন্দর্যের চেয়ে বড় পরিচয়
বিশ্ব ইতিহাসে এমন অসংখ্য নারী রয়েছেন, যাঁরা তাঁদের প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব, সাহস ও কর্মের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথে প্রভাব ফেলেছেন। প্রাচীন মিশরের ক্লিওপেট্রা রাজনৈতিক ক্ষমতা ও কূটনীতির ইতিহাসে আলোচিত একটি চরিত্র। তাঁর জীবন নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তাঁকে কেবল সৌন্দর্য কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের আলোকে বিচার করলে তাঁর সময়ের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়।
আবার অসংখ্য নারী তাঁদের জ্ঞান, গবেষণা, সাহিত্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, রাজনীতি ও সমাজসেবার মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের সাফল্য প্রমাণ করে, নারীর পরিচয় কোনো একটি সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা কিংবা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
আমাদের দেশেও নারীরা শিক্ষা, প্রশাসন, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, শিল্প, চিকিৎসা, ব্যবসা, ক্রীড়া ও প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁদের পথচলার প্রধান শক্তি মেধা, পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়। এসব অর্জনকে সামনে এনে নতুন প্রজন্মের মেয়েদের উৎসাহিত করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
সৌন্দর্যের নামে বাণিজ্যিকীকরণ: প্রশ্ন তোলা কি অন্যায়?
সম্প্রতি চট্টগ্রামে লিলি কসমেটিকসের সৌজন্যে একটি ফ্যাশন শো আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানতে পেরেছি। এ ধরনের আয়োজন নিয়ে আলোচনা বা প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। তবে কোনো আয়োজন সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করার আগে তার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, নিয়মকানুন এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রতি আয়োজকদের দায়িত্ব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা প্রয়োজন।
আমি মনে করি, যেকোনো ফ্যাশন শো কিংবা সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা, সম্মতি, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নারী যেন প্রতারণা, চাপ, শোষণ কিংবা অসম্মানজনক আচরণের শিকার না হন, সে বিষয়ে আয়োজকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদেরও নিজেদের অধিকার, শর্তাবলি ও পেশাগত সুযোগ সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত। কোনো আয়োজনের সমালোচনা করতে হলে তার নির্দিষ্ট দিক নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন, অংশগ্রহণকারী নারীদের অপমান করে নয়।
চট্টগ্রামের যেসব নারী এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের প্রতি আমার বক্তব্য হলো, নিজের প্রতিভা, যোগ্যতা ও আত্মমর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। যে ক্ষেত্রেই কাজ করুন, নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সচেতন থাকুন এবং এমন পরিবেশ প্রত্যাশা করুন, যেখানে আপনাকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে সম্মান করা হবে।
তরুণ প্রজন্মের জন্য আমার আহ্বান
আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের সামনে আজ শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, সাহিত্য, শিল্প, ক্রীড়া ও উদ্যোক্তা হওয়ার অসংখ্য সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে নিজেদের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগও আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত।
তাই সৌন্দর্যকে সাফল্যের একমাত্র সিঁড়ি হিসেবে বিবেচনা না করে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একজন নারী চাইলে মডেল হতে পারেন, অভিনেত্রী হতে পারেন, বিজ্ঞানী হতে পারেন, উদ্যোক্তা হতে পারেন কিংবা অন্য যেকোনো পেশায় নিজের যোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। তাঁর পেশা দিয়ে নয়, কাজের মান, সততা ও মানবিকতা দিয়ে তাঁর অবদান বিচার করা উচিত।
একই সঙ্গে পুরুষদেরও নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। নারীকে কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা, তাঁর স্বাধীনতা নিয়ে অযাচিত মন্তব্য করা কিংবা তাঁর পোশাকের ভিত্তিতে চরিত্র নির্ধারণ করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নারী-পুরুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে উঠতে পারে।
শেষ কথা: সুন্দরী প্রতিযোগিতা নয়, মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা হোক
আমি সুন্দরী প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি নারীর স্বাধীনতাকে অস্বীকার করার জন্য নয়, বরং নারীর সামগ্রিক পরিচয়, মর্যাদা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের দাবি জানাতে। আমার বক্তব্যের সঙ্গে কেউ একমত নাও হতে পারেন। মতভেদ থাকতেই পারে, আলোচনা ও সমালোচনাও চলতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনা যেন যুক্তি, তথ্য ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে হয়।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো নারীকে তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্যের কারণে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হবে না, আবার সৌন্দর্যের প্রচলিত মাপকাঠিতে পিছিয়ে থাকায় তাঁকে অবহেলাও করা হবে না। যেখানে নারীর সাফল্য নির্ধারিত হবে তাঁর যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, প্রজ্ঞা, সততা ও মানবিক অবদানের ভিত্তিতে।
একজন নারী সুন্দর হতে পারেন, একজন পুরুষও সুদর্শন হতে পারেন। কিন্তু মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল চেহারায় নয়; তার চিন্তায়, আচরণে, বিবেকে, সৃষ্টিশীলতায় এবং অন্য মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতায়।
তাই আসুন, বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি মানুষের অন্তর্গত সৌন্দর্য, জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও মানবিকতার মূল্যায়নকে প্রাধান্য দিই। নারীকে পণ্য নয়, মানুষ হিসেবে দেখি। তাঁর স্বাধীনতাকে সম্মান করি, তাঁর অধিকার রক্ষা করি এবং তাঁর সাফল্যের পথে সহযাত্রী হই।
আমার প্রত্যাশা, সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিতর্ক অতিক্রম করে আমরা এমন এক মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করব, যেখানে নারী-পুরুষের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হবে তাঁর কর্মে, গুণে, জ্ঞানে ও আদর্শে।
কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য কোনো মুখের অবয়বে নয়, মানুষের বিবেক ও মানবিকতায়।
উদ্দেশ্যহীন বাঁকা কথা সুন্দরী প্রতিযোগিতা বনাম নারীর মর্যাদা
প্রাচীন গ্রিস থেকে আধুনিক মানুষের হৃদয়ে নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের অনন্য সাহিত্যযাত্রা-
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
সাহিত্যের পৃথিবীতে কিছু মানুষ থাকেন, যারা শুধু কবিতা লেখেন না, বরং কবিতার ভাষাকেই নতুন করে আবিষ্কার করেন। কেউ শব্দের ভেতর থেকে ইতিহাস খুঁজে আনেন, কেউ ইতিহাসের ভেতর থেকে মানুষের হৃদয় আবিষ্কার করেন। আবার কেউ এমন এক সেতু নির্মাণ করেন, যার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতা, আর অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে আজকের একাকী, প্রেমাসক্ত, প্রশ্নমুখর মানুষ।
কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদী সাহিত্যের অধ্যাপক অ্যান কারসন সেই বিরল সাহিত্যিকদের একজন।
২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে অ্যান কারসনের দীর্ঘ সাহিত্যসাধনা বিশ্বব্যাপী নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি তার সাহিত্যকর্মের যে মূল্যায়ন করেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে তার সাহসী ও উদ্ভাবনী সৃষ্টিশীলতা এবং ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে তার গভীর ও সজীব সংলাপ। তিনি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যকে কেবল অতীতের কোনো মৃত অধ্যায় হিসেবে দেখেননি; বরং সেই প্রাচীন শব্দ, পুরাণ, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদ ও মানবিক সংকটকে আধুনিক মানুষের জীবনের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করেছেন।
এই কারণেই অ্যান কারসনের সাহিত্য যেন একই সঙ্গে অতীত ও বর্তমানের সাহিত্য। তার কবিতায় প্রাচীন গ্রিসের ছায়া আছে, কিন্তু সেই ছায়ার ভেতরে দেখা যায় আধুনিক মানুষের মুখ।
টরন্টো থেকে সাহিত্যের বিশ্বমঞ্চে
অ্যান কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে। পরবর্তী জীবনে ধ্রুপদী গ্রিক সাহিত্য ও ভাষা তার চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে।
শৈশব ও কৈশোর থেকেই ভাষার প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ভাষাকে তিনি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। শব্দের জন্ম কোথায়, তার প্রাচীন অর্থ কী, সময়ের সঙ্গে তার অর্থ কীভাবে বদলে যায় এবং একটি শব্দ মানুষের অনুভূতিতে কীভাবে নতুন প্রতিধ্বনি তৈরি করে, এসব প্রশ্ন তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে।
পরবর্তীকালে গ্রিক ভাষা ও ধ্রুপদী সাহিত্য নিয়ে তার একাডেমিক অধ্যয়ন তার সাহিত্যিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
তার কাছে গ্রিক সাহিত্য ছিল না কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবিষয়। ছিল এক জীবন্ত জগৎ, যেখানে হাজার বছর আগের মানুষও প্রেমে পড়েছে, বিচ্ছেদে কেঁদেছে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, মৃত্যুকে ভয় করেছে এবং নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজেছে।
এই মানবিক মিলটিই অ্যান কারসনকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে প্রাচীন গ্রিসের কাছে।
শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস
অ্যান কারসনের সাহিত্যচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো শব্দের ব্যুৎপত্তির প্রতি তার গভীর আগ্রহ।
একটি শব্দ আজ যে অর্থ বহন করে, তার পেছনে হয়তো রয়েছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস। সেই ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে কারসন শব্দের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও অনুসন্ধান করেছেন।
তার সাহিত্য তাই কখনো কখনো একটি শব্দ থেকেই শুরু হয়। সেই শব্দ তাকে নিয়ে যায় প্রাচীন গ্রিসে, সেখান থেকে কোনো কবির কাছে, তারপর কোনো পুরাণে, তারপর প্রেমের কাছে, তারপর মানুষের ব্যক্তিগত যন্ত্রণার কাছে।
এইভাবে একটি ছোট শব্দ তার কাছে হয়ে ওঠে এক বিশাল সাহিত্যিক দরজা।
‘Eros the Bittersweet’: প্রেমের মধ্যে আনন্দ ও বেদনা
অ্যান কারসনের সাহিত্যজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘Eros the Bittersweet’, প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে।
এই গ্রন্থের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘Eros’ বা প্রেম।
কিন্তু কারসনের কাছে প্রেম শুধু আনন্দের বিষয় নয়। প্রেমের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা আছে, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দূরত্ব। কাছে পাওয়ার ইচ্ছার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হারানোর ভয়। আনন্দের সঙ্গে থাকে বেদনা। পাওয়া ও না পাওয়ার মধ্যবর্তী যে অস্থিরতা, সেখানেই প্রেমের গভীরতম রহস্য।
প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতায় প্রেমের যে জটিল অনুভূতি পাওয়া যায়, কারসন সেই সূত্র ধরে প্রেমের নন্দনতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে গভীর অনুসন্ধান করেছেন।
এই বই থেকেই তার সাহিত্যিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি মানুষের অনুভূতিকে সরল রেখায় দেখেন না। মানুষের প্রেম যেমন আলো, তেমনি তার ভেতরে অন্ধকারও আছে। আকাঙ্ক্ষা যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেয়।
এই দ্বৈততাই কারসনের সাহিত্যকে স্বতন্ত্র করেছে।
‘Autobiography of Red’: পুরাণের নতুন জন্ম
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘Autobiography of Red’ অ্যান কারসনের বহুল আলোচিত সাহিত্যকর্মগুলোর একটি।
প্রাচীন গ্রিক পুরাণের গেরিয়ন নামের এক চরিত্রকে কেন্দ্র করে কারসন এই অসাধারণ কাব্যিক জগৎ নির্মাণ করেছেন।
কিন্তু তিনি পুরাণকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করেননি। বরং একটি প্রাচীন পৌরাণিক চরিত্রকে আধুনিক মানুষের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, পরিচয়, একাকিত্ব ও মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
এখানেই তার সৃষ্টিশীলতার বিস্ময়।
হাজার বছরের পুরোনো একটি চরিত্র তার কলমে এসে যেন আধুনিক পৃথিবীর মানুষ হয়ে ওঠে। পুরাণের চরিত্রের চোখ দিয়ে পাঠক দেখতে পায় নিজের পৃথিবীকে।
কারসনের সাহিত্য আমাদের শেখায়, পুরাণ আসলে মৃত নয়। মানুষের মৌলিক অনুভূতিগুলো যতদিন বেঁচে থাকবে, পুরাণও ততদিন নতুন অর্থে ফিরে আসবে।
স্যাফোর হারিয়ে যাওয়া কবিতার কাছে ফিরে যাওয়া
অ্যান কারসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘If Not, Winter: Fragments of Sappho’, প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে।
প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার অধিকাংশই সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। রয়ে গেছে নানা খণ্ডাংশ, ভগ্ন পঙ্ক্তি, অসম্পূর্ণ স্মৃতি।
কারসন সেই ভগ্নাংশের কাছে ফিরে গেছেন।
কিন্তু তার কাজ শুধু অনুবাদ নয়। তিনি সেই ভগ্ন কবিতাগুলোর নীরবতাকেও সাহিত্যের অংশ করে তুলেছেন।
যেখানে একটি কবিতার কোনো অংশ নেই, সেখানে সেই অনুপস্থিতিও পাঠকের কাছে অর্থ বহন করে। একটি অসম্পূর্ণ বাক্য কখনো কখনো সম্পূর্ণ বাক্যের চেয়েও বেশি অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
কারসনের সৃষ্টিশীলতা এখানেই বিশেষভাবে উজ্জ্বল। তিনি শুধু যা আছে তা অনুবাদ করেননি; যা হারিয়ে গেছে, তার উপস্থিতিও অনুভব করিয়েছেন।
সফোক্লিস ও ইউরিপিদিসের সঙ্গে সাহিত্যিক সংলাপ
গ্রিক ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রতি অ্যান কারসনের আকর্ষণ তার অনুবাদকর্মেও স্পষ্ট।
সফোক্লিসের ‘Electra’ এবং ‘Antigone’, ইউরিপিদিসের ‘Bakkhai’ প্রভৃতি ধ্রুপদী নাটক নিয়ে তার কাজ প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যকে আধুনিক পাঠকের কাছে নতুনভাবে হাজির করেছে।
তার অনুবাদে কেবল ভাষার পরিবর্তন ঘটে না, ঘটে সময়ের সঙ্গে একটি নতুন সংলাপ।
প্রাচীন গ্রিক নাটকের চরিত্রগুলো যে প্রশ্ন করেছিল, আজকের মানুষও অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি।
ক্ষমতা কী?
ন্যায় কী?
পরিবারের প্রতি দায়িত্ব কোথায় শেষ হয়?
ব্যক্তির স্বাধীনতা কোথা থেকে শুরু হয়?
প্রেম মানুষকে মুক্ত করে, নাকি আরও গভীর বন্ধনে আবদ্ধ করে?
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের জীবনকে কীভাবে বিচার করে?
হাজার বছর পেরিয়েও এই প্রশ্নগুলো বদলায়নি।
অ্যান কারসনের সাহিত্য সেই চিরন্তন প্রশ্নগুলোকে আধুনিক ভাষায় আবার আমাদের সামনে দাঁড় করায়।
কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদের সীমানা ভেঙে দেওয়া
অ্যান কারসনের সাহিত্যিক পরিচয়কে একটি মাত্র শব্দে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন।
তিনি কবি, কিন্তু তার কবিতায় প্রবন্ধের চিন্তা আছে।
তিনি প্রাবন্ধিক, কিন্তু তার গদ্যের ভেতরে কবিতার সুর আছে।
তিনি অনুবাদক, কিন্তু তার অনুবাদ অনেক সময় নিজেই একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যিক সৃষ্টি হয়ে ওঠে।
এই সীমা ভাঙার প্রবণতাই তার সাহিত্যকে আধুনিক করে তুলেছে।
তিনি প্রচলিত সাহিত্যিক কাঠামোর কাছে নিজেকে বন্দি রাখেননি। বরং কবিতা, গদ্য, পুরাণ, দর্শন, অনুবাদ, ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে অবাধ যাতায়াত করেছেন।
শিল্পের অন্য ভুবনেও অ্যান কারসন
অ্যান কারসনের শিল্পীসত্তা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়।
চিত্রশিল্পী, কোরিওগ্রাফার, অপেরা ও থিয়েটারের পরিচালকদের সঙ্গেও তার সৃজনশীল যোগাযোগ রয়েছে।
এর ফলে তার সাহিত্য আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে।
তার কাছে শিল্প কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। কবিতা যেমন দৃশ্য তৈরি করতে পারে, তেমনি একটি দৃশ্য কবিতার জন্ম দিতে পারে। শব্দ যেমন শরীরকে স্পর্শ করে, তেমনি মঞ্চের নীরবতাও শব্দের মতো কথা বলতে পারে।
এই আন্তঃশিল্প সম্পর্ক তার সাহিত্যকে প্রচলিত পাঠের বাইরে নিয়ে গেছে।
প্রেম, বিচ্ছেদ ও মানুষের একাকিত্ব
অ্যান কারসনের সাহিত্যজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো মানুষের অন্তর্গত একাকিত্ব।
প্রেমের কথা বলতে গিয়ে তিনি শুধু প্রেমিক ও প্রেমিকার কথা বলেন না। তিনি বলেন দূরত্বের কথা। আকাঙ্ক্ষার কথা। অপেক্ষার কথা। হারানোর কথা।
তার কাছে ভালোবাসা কখনো সম্পূর্ণ পাওয়া নয়। ভালোবাসার মধ্যে না পাওয়ার একটি দীর্ঘ ছায়া থাকে।
এই কারণেই তার সাহিত্য একই সঙ্গে কোমল এবং কঠিন।
তার শব্দ কখনো পাঠকের হৃদয়ে হাত রাখে, আবার কখনো পাঠককে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।
ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন
অ্যান কারসনের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই।
তিনি প্রাচীন গ্রিসকে আধুনিকতার বিপরীতে দাঁড় করাননি।
বরং দেখিয়েছেন, আধুনিকতার অনেক প্রশ্নের শিকড় প্রাচীন মানুষের জীবনেই ছিল।
প্রাচীন মানুষও প্রেম করেছে।
প্রাচীন মানুষও ঈর্ষা করেছে।
প্রাচীন মানুষও ক্ষমতা চেয়েছে।
প্রাচীন মানুষও মৃত্যুকে ভয় করেছে।
প্রাচীন মানুষও নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করেছে।
অতএব, সময় বদলালেও মানুষের অন্তর্গত পৃথিবী পুরোপুরি বদলায় না।
কারসনের সাহিত্য সেই অদৃশ্য ধারাবাহিকতাকেই আবিষ্কার করে।
২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল
২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অ্যান কারসনের হাতে আসা তাই তার দীর্ঘ সাহিত্যিক যাত্রার একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
এই পুরস্কারের মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্য যেন আবারও স্বীকার করল যে সাহিত্য কেবল নতুন গল্প বলার নাম নয়। পুরোনো গল্পকে নতুন চোখে দেখা, পুরোনো শব্দের ভেতর নতুন অর্থ খুঁজে পাওয়া এবং অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে নতুন সংলাপে বসানোও সাহিত্যের এক গভীর সৃজনশীল কাজ।
অ্যান কারসনের সাহিত্য সেই কাজটিই করেছে।
তিনি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের দরজা খুলে আধুনিক মানুষের ঘরে নিয়ে এসেছেন বহু পুরোনো কণ্ঠস্বর।
স্যাফোর প্রেম।
সফোক্লিসের ট্র্যাজেডি।
ইউরিপিদিসের নাটক।
গ্রিক পুরাণের চরিত্র।
আর তাদের পাশে দাঁড় করিয়েছেন আজকের মানুষের নিঃসঙ্গতা, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বেদনা ও প্রশ্নকে।
অ্যান কারসনের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
অ্যান কারসনের সাহিত্যজীবনের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
‘Eros the Bittersweet’ (১৯৮৬)
প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, দূরত্ব ও বেদনার সম্পর্ক নিয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধগ্রন্থ।
‘Autobiography of Red’ (১৯৯৮)
গ্রিক পুরাণের গেরিয়ন চরিত্রকে আধুনিক কাব্যিক কাহিনির ভুবনে পুনর্নির্মাণ করা তার অন্যতম বিখ্যাত সৃষ্টি।
‘Electra’ (২০০১)
সফোক্লিসের ধ্রুপদী ট্র্যাজেডির আধুনিক ভাষান্তর ও পুনর্পাঠ।
‘If Not, Winter: Fragments of Sappho’ (২০০২)
প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর হারিয়ে যাওয়া ও খণ্ডিত কবিতার অসাধারণ অনুবাদ ও পুনর্নির্মাণ।
‘Antigonick’ (২০১২)
সফোক্লিসের ‘Antigone’-এর সৃজনশীল পুনর্নির্মাণ, যেখানে ধ্রুপদী নাট্যকাঠামোকে আধুনিক শিল্পভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
‘Bakkhai’ (২০১৫)
ইউরিপিদিসের বিখ্যাত গ্রিক ট্র্যাজেডির আধুনিক সৃজনশীল রূপান্তর।
একজন সাহিত্যিকের চেয়ে আরও বেশি কিছু
অ্যান কারসনকে শুধু নোবেলজয়ী কবি বললে তার সাহিত্যিক পরিচয়ের সম্পূর্ণতা ধরা পড়ে না।
তিনি একই সঙ্গে একজন গবেষক, চিন্তক, অনুবাদক, কবি এবং শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে সেতুবন্ধনকারী স্রষ্টা।
তার সাহিত্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
অতীতকে ভুলে আধুনিক হওয়া যায় না।
আবার অতীতকে শুধু অনুকরণ করেও আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় না।
প্রয়োজন অতীতের সঙ্গে সংলাপ।
অ্যান কারসন সেই সংলাপেরই এক অনন্য শিল্পী।
শেষ কথা
অ্যান কারসনের নোবেলজয় যেন সাহিত্যের দীর্ঘ নদীতে নতুন একটি বাঁক।
সেই নদীর এক তীরে প্রাচীন গ্রিস। অন্য তীরে আধুনিক পৃথিবী।
মাঝখানে সময়ের অসংখ্য বছর।
কিন্তু কবিতার একটি শব্দ সেই দূরত্ব মুছে দিতে পারে।
একটি হারিয়ে যাওয়া পঙ্ক্তি আবার ফিরে আসতে পারে।
একটি প্রাচীন প্রেমের গল্প আজকের মানুষের চোখে জল এনে দিতে পারে।
একটি পৌরাণিক চরিত্র নিজের জীবনের আয়না হয়ে উঠতে পারে।
এই অসম্ভবকে সম্ভব করার নামই অ্যান কারসনের সাহিত্য।
তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, মানুষের হৃদয়ের বয়স হয় না। সভ্যতা বদলায়, ভাষা বদলায়, পোশাক বদলায়, শহর বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়; কিন্তু ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদের বেদনা, একাকিত্বের দীর্ঘশ্বাস এবং নিজের অস্তিত্বকে বোঝার চেষ্টা হাজার বছর পরও একই থাকে।
সেই চিরন্তন মানুষকেই অ্যান কারসন খুঁজেছেন ধ্রুপদী গ্রিসের ধ্বংসস্তূপে, প্রাচীন শব্দের ব্যুৎপত্তিতে, স্যাফোর অসম্পূর্ণ কবিতায়, গ্রিক পুরাণের চরিত্রে এবং আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গ হৃদয়ে।
আর সেই দীর্ঘ অনুসন্ধানেরই বিশ্বস্বীকৃতি হয়ে ২০২৬ সালে তার হাতে উঠেছে সাহিত্যের নোবেল।
অ্যান কারসন তাই শুধু নোবেলজয়ী একজন কানাডীয় কবি নন।
তিনি অতীত ও বর্তমানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাহিত্যিক সেতু।
যে সেতুর ওপর দিয়ে কয়েক হাজার বছরের পুরোনো গ্রিক কবিতা হেঁটে আসে আজকের পৃথিবীতে, আর আজকের মানুষ ফিরে তাকায় নিজেরই প্রাচীন মুখের দিকে।
“”আবু সুফিয়ান : ক্যামেরার আলোয় দেখা সেই রাজনীতিক, সময়ের স্রোতে এক দীর্ঘ অভিযাত্রা””
“২০১৭ সালের ‘চট্টগ্রাম সংলাপ’ থেকে রাজপথ, নির্বাচন ও মানুষের অধিকারের কথামালা—এক সাংবাদিকের স্মৃতির পাতায় আবু সুফিয়ানের রাজনৈতিক পথচলা-
মো. কামাল উদ্দিনঃ
সময় বড় অদ্ভুত এক আয়না। সেখানে অতীতের মুখগুলো কখনো ঝাপসা হয়ে যায়, আবার কখনো একটি পুরোনো ছবি, একটি কথোপকথন কিংবা একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের স্মৃতি হঠাৎ করেই বহু বছর আগের দিনগুলোকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে।
আজ তেমনই এক স্মৃতির দরজা খুলে বসেছি।
স্মৃতির পাতায় ফিরে যাচ্ছে ২০১৭ সাল। বাংলা টেলিভিশনের পর্দায় তখন আমার উপস্থাপনায় প্রচারিত হতো আলোচিত টকশো ‘চট্টগ্রাম সংলাপ’। চট্টগ্রামের রাজনীতি, অর্থনীতি, নাগরিক সংকট, উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং জাতীয় রাজনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সরাসরি কথা বলতেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সেই অনুষ্ঠানের একটি পরিচিত মুখ ছিলেন আবু সুফিয়ান।
আজ এত বছর পর যখন সেই সময়ের কথা মনে পড়ে, তখন শুধু একজন অতিথির কথা মনে পড়ে না; মনে পড়ে একজন রাজনৈতিক কর্মীর দীর্ঘ পথচলার একটি সময়কে। মনে পড়ে ক্যামেরার সামনে বসে থাকা একজন শান্ত, ধীরস্থির ও যুক্তিনির্ভর রাজনীতিককে। মনে পড়ে তাঁর রাজনৈতিক স্বপ্ন, ক্ষোভ, প্রত্যাশা, দলের প্রতি আনুগত্য এবং চট্টগ্রামের মানুষের বিভিন্ন দাবি নিয়ে তাঁর খোলামেলা কথাবার্তাকে।
২০১৭ সালের সেই দিনগুলো
তখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। সামনে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের রাজনীতিতে নির্বাচন, গণতন্ত্র, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল।
‘চট্টগ্রাম সংলাপ’-এর আলোচনাতেও স্বাভাবিকভাবেই এসব বিষয় উঠে আসত।
আবু সুফিয়ান তখন বিএনপির একজন সক্রিয় ও পরিচিত নেতা। তাঁর বক্তব্যে ছিল তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা। তিনি রাজনৈতিক পরিবেশ, গণতন্ত্রের চর্চা, বিরোধী দলের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরতেন।
আমার প্রশ্ন ছিল সরাসরি। তাঁর উত্তরও ছিল স্পষ্ট।
টেলিভিশন টকশোতে একজন উপস্থাপকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো প্রশ্নের জায়গায় কোনো আপস না করা। আর একজন রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েও নিজের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা।
সেই জায়গায় আবু সুফিয়ান ছিলেন স্বচ্ছন্দ।
রাজনীতির পথে ছাত্রদল থেকে বিএনপির নেতৃত্বে
একজন রাজনৈতিক নেতাকে বুঝতে হলে তাঁর বর্তমান পদ দিয়ে বিচার করলে চলে না। তাঁকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় তাঁর শুরুর দিনগুলোর কাছে।
আবু সুফিয়ানের রাজনৈতিক পথচলার সূচনা ছাত্রদলের রাজনীতির মধ্য দিয়ে। ছাত্ররাজনীতির মাঠ থেকে ধীরে ধীরে মূলধারার বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর উত্থান। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁকে আন্দোলন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
রাজনীতি কখনোই কেবল বক্তৃতার মঞ্চ নয়। রাজনীতি মানে কখনো রাজপথ, কখনো মামলা, কখনো কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো, কখনো সংগঠন ধরে রাখা, আবার কখনো প্রতিকূল সময়েও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান অটুট রাখা।
এই দীর্ঘ পথ পেরিয়েই তিনি বিএনপির একজন পরিণত নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
একসময় তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু একটি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বৃহত্তর দক্ষিণ চট্টগ্রামের দলীয় সংগঠন ও রাজনীতির সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
২০১৮—একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়
২০১৭ সালের সেই টকশোর পরের বছরই আসে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়—২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
চট্টগ্রাম বোয়ালখালী আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন আবু সুফিয়ান। তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য মঈনউদ্দীন খান বাদল।
নির্বাচনের ফলাফল রাজনীতির একটি অধ্যায় মাত্র; কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তও অনেক সময় একজন নেতার রাজনৈতিক সাহস ও প্রত্যয়ের পরিচয় বহন করে।
সেই নির্বাচনে আবু সুফিয়ানের প্রচারণা, মানুষের কাছে যাওয়া, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য—সবকিছুই তাঁকে বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করে তোলে।
কালুরঘাট সেতু—একটি সেতুর চেয়েও বড় দাবি
চট্টগ্রামের রাজনীতির সঙ্গে যাঁরা দীর্ঘদিন যুক্ত, তাঁরা জানেন—কালুরঘাট সেতু শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের নাম নয়। এটি বোয়ালখালী, পটিয়া, দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দুর্ভোগের প্রতীক।
পুরোনো কালুরঘাট সেতুর ওপর নির্ভর করে বছরের পর বছর মানুষের চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চলেছে। সেতুটির দুর্বলতা ও যোগাযোগ সংকট দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের কষ্টের কারণ হয়ে আছে।
এই সেতু নির্মাণের দাবি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনও হয়েছে বহুবার।
আবু সুফিয়ানও এই দাবিকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে কালুরঘাট সেতু ছিল শুধু বোয়ালখালীর মানুষের দাবি নয়; এটি ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জলাবদ্ধতার নগরী চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা—জলাবদ্ধতা।
বৃষ্টি নামলেই নগরের বহু এলাকা পানির নিচে চলে যাওয়া, রাস্তায় যানজট, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি, শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ এবং সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ভোগান্তি—এসব নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা হয়েছে।
‘চট্টগ্রাম সংলাপ’-এর আলোচনাতেও নগরের জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নাগরিক সেবা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয়েছে।
আবু সুফিয়ান তখন চট্টগ্রাম মহানগরের নাগরিক দুর্ভোগ নিয়েও তাঁর মতামত তুলে ধরতেন। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে বোয়ালখালীর পাশাপাশি বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকারও জায়গা পেত।
একজন শান্ত স্বভাবের রাজনীতিক
রাজনীতিতে উত্তাপ থাকে। বক্তব্যে উত্তেজনা থাকে। প্রতিপক্ষকে আক্রমণের প্রবণতাও থাকে।
কিন্তু আবু সুফিয়ানের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের যে দিকটি আমার কাছে বরাবর আলাদা করে চোখে পড়েছে, সেটি হলো তাঁর ঠান্ডা মেজাজ।
টকশোর আলোচনায় কঠিন প্রশ্ন করলেও তিনি সাধারণত উত্তেজিত না হয়ে যুক্তি দিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতেন। রাজনৈতিক বিরোধিতাকে তিনি রাজনৈতিক যুক্তির জায়গা থেকেই ব্যাখ্যা করতেন।
আমার সাংবাদিকতা জীবনে অনেক রাজনীতিকের সঙ্গে কথা বলেছি। কেউ কেউ খুব আক্রমণাত্মক, কেউ আবেগপ্রবণ, কেউ অত্যন্ত হিসাবি। কিন্তু আবু সুফিয়ানের মধ্যে আমি যে বৈশিষ্ট্যটি বেশি লক্ষ্য করেছি, তা হলো—তিনি অনেকটা নীরবে নিজের কথা বলতেন।
তাঁর রাজনীতিতে কর্মীবান্ধব একটি প্রবণতাও ছিল।
রাজনীতির বড় পরিচয় শুধু নেতা হওয়া নয়; কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন, সংকটের সময়ে তাঁদের পাশে থাকা যায় কি না, সেটিও একজন নেতার প্রকৃত পরীক্ষা।
জিয়াউর রহমানের আদর্শ থেকে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব
আবু সুফিয়ানের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে বিএনপি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা রয়েছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য রেখেও তিনি রাজনৈতিক পথচলা অব্যাহত রেখেছেন।
রাজনীতিতে সময়ের সঙ্গে অনেক হিসাব বদলায়। কিন্তু একজন কর্মীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আনুগত্য এবং সংগঠনের জন্য তাঁর ভূমিকা কখনোই উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়।
তারেক রহমানকে ঘিরে তখনকার আলোচনা
আরেকটি বিষয় আজ বিশেষভাবে মনে পড়ে।
সেই সময়ের টকশোগুলোতে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়েও আলোচনা হতো। আবু সুফিয়ানও এসব বিষয়ে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছিলেন।
তখন হয়তো অনেক কথাই ছিল রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুমান ও বিশ্লেষণ। কিন্তু সময়ের স্রোত এগিয়ে যায়। রাজনীতির চরিত্র বদলায়। নেতৃত্বের অবস্থানও বদলায়।
আজ পেছন ফিরে তাকালে সেই পুরোনো আলোচনাগুলো তাই নতুন অর্থ নিয়ে সামনে আসে।
২০২৪—রাজনীতির আরেকটি বাঁক
সময় কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না।
যে মানুষটি একসময় বোয়ালখালীর আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন, যিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আসে আরেকটি বড় পরিবর্তন।
২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম কোতোয়ালি আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবু সুফিয়ান—আপনার স্মৃতিতে সংরক্ষিত এই রাজনৈতিক যাত্রার এটি একটি উল্লেখযোগ্য বাঁক।
একজন রাজনৈতিক কর্মীর জীবনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়া নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু আমার কাছে এর চেয়েও বড় হলো তাঁর সেই পথচলা, যা তাঁকে সেই জায়গায় নিয়ে এসেছে।
কারণ রাজনীতির বৃক্ষের ফল আমরা দেখি; কিন্তু তার শিকড়ের গভীরতা সবসময় দেখি না।
রাজনীতির মানুষকে তাঁর অতীত দিয়েও বিচার করতে হয়
আজকের দিনে রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধিদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় শুধু বর্তমান পদটি দেখি।
কে এমপি, কে মন্ত্রী, কে দলের কোন পদে আছেন—এসব দিয়েই যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের হিসাব শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু একজন নেতার প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় তাঁর অতীতের সংগ্রাম দিয়ে।
কতদিন রাজপথে ছিলেন?
কতবার কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন?
কত প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছেন?
দলের জন্য কতটা সময় দিয়েছেন?
মানুষের দাবি নিয়ে কতবার কথা বলেছেন?
ক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের জন্য কতটা কাজ করেছেন?
এসব প্রশ্নের উত্তরেই একজন রাজনীতিকের প্রকৃত মূল্যায়ন নিহিত।
এই জায়গা থেকেই আমি মনে করি, রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ত্যাগ স্বীকার করা, রাজপথে ভূমিকা রাখা এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কাজ করা নেতাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া দরকার।
সেই স্টুডিওর আলো আজও নিভে যায়নি
কখনো কখনো সাংবাদিকতার পুরোনো দিনগুলো মনে পড়ে।
স্টুডিওর আলো জ্বলছে। ক্যামেরা চলছে। সামনে অতিথি। কানে প্রযোজকের নির্দেশনা। হাতে প্রশ্নের তালিকা। আর ক্যামেরার ওপাশে অপেক্ষা করছে দর্শক।
আমি প্রশ্ন করছি—
দেশ কোথায় যাচ্ছে?
নির্বাচন কেমন হবে?
বিএনপির ভবিষ্যৎ কী?
চট্টগ্রামের মানুষের সমস্যা কীভাবে সমাধান হবে?
কালুরঘাট সেতু কবে হবে?
জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী মুক্তি পাবে কীভাবে?
রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?
আর আবু সুফিয়ান তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে উত্তর দিচ্ছেন।
সেই সময় আমরা কেউই জানতাম না, কয়েক বছর পর ইতিহাস আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে।
আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয়, টেলিভিশনের সেই অনুষ্ঠানগুলো ছিল শুধু টকশো নয়; সেগুলো ছিল সময়ের সাক্ষ্য।
সাংবাদিকের স্মৃতিতে রাজনীতিক
একজন সাংবাদিকের কাছে মানুষ কখনো শুধু সংবাদ হয় না। কিছু মানুষ হয়ে ওঠেন স্মৃতির অংশ।
আবু সুফিয়ানও আমার সাংবাদিকতা জীবনের তেমনই একজন পরিচিত রাজনৈতিক মুখ।
তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে পেশাগত যোগাযোগ ও দীর্ঘদিনের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। বাংলা টেলিভিশনের ‘চট্টগ্রাম সংলাপ’-এ একাধিকবার তাঁর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে।
আজ যখন পুরোনো সেই অনুষ্ঠানগুলোর কথা মনে করি, তখন মনে হয়—একজন মানুষকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর আজকের অবস্থান দেখলে হবে না; দেখতে হবে তাঁর গতকালের পথও।
কারণ আজকের নেতা একদিনের তৈরি নন।
তার পেছনে থাকে ছাত্ররাজনীতির দিন, সংগঠনের দিন, রাজপথের দিন, আন্দোলনের দিন, নির্বাচনের দিন, পরাজয়ের দিন, অপেক্ষার দিন এবং স্বপ্ন দেখার দিন।
সময়ের কাছে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়
রাজনীতির মঞ্চে জয়-পরাজয় থাকবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণও বদলাবে।
কিন্তু একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় শেষ পর্যন্ত থেকে যায় তাঁর কর্মে, তাঁর আচরণে এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যে।
২০১৭ সালের সেই আবু সুফিয়ানকে আজও আমার মনে পড়ে—একজন শান্ত, ধীরস্থির, রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও কর্মীবান্ধব মানুষ হিসেবে।
সেই মানুষটির রাজনৈতিক যাত্রা আজ আরও দীর্ঘ হয়েছে। সময় তাঁকে নতুন পরিচয় দিয়েছে, নতুন দায়িত্ব দিয়েছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
কিন্তু আমার স্মৃতির অ্যালবামে তিনি আজও সেই মানুষটি
যিনি একদিন বাংলা টেলিভিশনের স্টুডিওতে বসে চট্টগ্রামের রাজনীতি, মানুষের অধিকার, কালুরঘাট সেতু, নগরের জলাবদ্ধতা, নির্বাচন এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছিলেন।
ক্যামেরা তখন তাঁকে ধারণ করেছিল কয়েকটি অনুষ্ঠানের জন্য।
কিন্তু সময় তাঁকে ধারণ করেছে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক গল্পের ভেতর।
আর আজ, বহু বছর পর, সাংবাদিকতার স্মৃতির পাতা উল্টাতে গিয়ে আমি শুধু একজন রাজনীতিককে দেখি না দেখি একটি সময়কে, একটি রাজনৈতিক প্রজন্মকে এবং রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিন পথ চলা একজন কর্মীর বিবর্তনকে।
সেই ২০১৭ সালের ‘চট্টগ্রাম সংলাপ’ তাই আমার কাছে আজও শুধুই একটি পুরোনো টকশোর স্মৃতি নয়। এটি সময়ের সাক্ষ্য, রাজনীতির দলিল এবং একজন মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার এক টুকরো জীবন্ত ইতিহাস।
“মেট্রোরেলে চলন্ত যাত্রা ও নামিয়ার সঙ্গে কিছু কথা-
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
সচিবালয় থেকে উত্তরা উত্তর, আবার উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল। চলন্ত ট্রেনে সাহিত্য, বন্ধুত্ব, হাসি, মুগ্ধতা এবং কিছু অমলিন রোমান্টিক স্মৃতি
কিছু যাত্রা কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য হয় না। কিছু যাত্রা মানুষের মনে গল্প হয়ে থাকে, কিছু যাত্রা হয়ে ওঠে স্মৃতির পাতায় লেখা এক একটি জীবন্ত অধ্যায়। আর কিছু যাত্রা আছে, যেগুলোর কোনো পূর্বপরিকল্পনা থাকে না, অথচ শেষ হওয়ার পর মনে হয়, আহা, এমন একটি যাত্রা জীবনে আরও কয়েকবার যদি ফিরে আসত। নামিয়ার সঙ্গে মেট্রোরেলের সেই যাত্রাটি আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি স্মৃতি।
সেদিন সচিবালয় মেট্রো স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি আর নামিয়া। চারপাশে অসংখ্য মানুষের ব্যস্ততা। কেউ অফিসে যাচ্ছেন, কেউ ফিরছেন, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ধরার তাড়া নিয়ে ছুটছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আধুনিক স্টেশনের শৃঙ্খলিত পরিবেশ, টিকিট সংগ্রহের সহজ ব্যবস্থা, কার্ড ব্যবহার, স্বয়ংক্রিয় প্রবেশপথ এবং সময়ের প্রতি মানুষের সচেতনতা দেখে মনে হচ্ছিল, ঢাকার নগরজীবন যেন ধীরে ধীরে নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
আমি বরাবরই মানুষের চলাফেরা, আচরণ এবং চারপাশের পরিবর্তন খুব মন দিয়ে দেখি। সাংবাদিকতা আমাকে মানুষের মুখ পড়তে শিখিয়েছে, লেখালেখি আমাকে মানুষের অনুভূতি বুঝতে শিখিয়েছে, আর টেলিভিশন উপস্থাপনা আমাকে মানুষের কথা ও অভিব্যক্তির ভেতরের গল্প খুঁজে নিতে শিখিয়েছে। তাই মেট্রো স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকেও আমার চোখ শুধু ট্রেনের দিকে ছিল না, আমি দেখছিলাম মানুষকে, তাদের ব্যস্ততাকে, তাদের গন্তব্যের তাড়াকে এবং আধুনিক নগরজীবনের এই নতুন ছন্দকে।
আর আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল নামিয়া।
নামিয়া একজন লেখিকা। একসময় সংবাদ পাঠ করতেন। সংবাদ পাঠের সেই পরিমিত ও গম্ভীর জগৎ পেরিয়ে তিনি নিজেকে খুঁজে নিয়েছেন কবিতা, গল্প এবং জীবনমুখী লেখালেখির মধ্যে। লেখার সূত্রেই তার সঙ্গে আমার পরিচয়। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছে। তারপর সেই বন্ধুত্বের ভেতর জমেছে কত কথা, কত হাসি, কত মজার ঘটনা এবং কত অপ্রকাশিত স্মৃতি।
মেট্রোরেল আসার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নামিয়ার সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা হচ্ছিল। কখনো সাহিত্য নিয়ে, কখনো সংবাদ নিয়ে, কখনো পুরোনো দিনের স্মৃতি নিয়ে। আবার কোনো কোনো সময় এমন সব তুচ্ছ বিষয় নিয়েও আমরা হাসছিলাম, যার কোনো গুরুত্ব নেই, কিন্তু সেই হাসির মুহূর্তটিই যেন সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠছিল।
আমি মজা করে নামিয়াকে বললাম, “আপনি একসময় সংবাদ পাঠ করতেন, এখন লেখালেখি করেন। তাহলে আজকের এই যাত্রার খবরটা কে লিখবে?”
নামিয়া হেসে বলল, “আপনি তো আছেন। আপনার মতো সাংবাদিক আর লেখক পাশে থাকলে আমার খবর লেখা নিয়ে চিন্তা কী?”
আমি বললাম, “খবর লিখব না, আজ গল্প লিখব।”
নামিয়া মুচকি হেসে বলল, “তাহলে সাবধানে লিখবেন, বেশি কিছু লিখে ফেলবেন না যেন।”
আমি হেসে বললাম, “লেখকের কাছ থেকে গল্প লুকিয়ে রাখা যায় না।”
তারপরই ট্রেন এসে গেল।
দরজা খুলল। যাত্রীরা উঠলেন, কেউ নামলেন। আমরা ট্রেনে উঠলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। মেট্রোরেল ধীরে ধীরে স্টেশন ছেড়ে দ্রুতগতিতে ছুটতে শুরু করল। মনে হলো, কয়েক মুহূর্ত আগেও যে শহরকে আমরা পায়ে হেঁটে, গাড়িতে বা রাস্তায় দেখে অভ্যস্ত ছিলাম, সেই শহরটিই এখন অন্য এক উচ্চতা থেকে অন্য এক গতিতে আমাদের সামনে দিয়ে ছুটে যাচ্ছে।
আমরা দুজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গল্প করতে লাগলাম। বসার জায়গা পাওয়া গেলেও আমাদের কথার মধ্যে এমন একটা প্রাণ ছিল যে দাঁড়িয়ে থাকাটাই যেন আরামদায়ক মনে হচ্ছিল। নামিয়ার মুখে তখন একের পর এক গল্প। তার কথার মধ্যে কখনো সাহিত্য, কখনো মানুষের জীবন, কখনো তার নিজের লেখালেখির অভিজ্ঞতা। আমি শুনছিলাম এবং মাঝেমধ্যে প্রশ্ন করছিলাম।
সাংবাদিকের স্বভাব তো আর যায় না। মানুষের কথার মধ্যেও আমি গল্প খুঁজি।
তবে সেদিন নামিয়াকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশ্ন করিনি। সেদিন আমি সাংবাদিক ছিলাম না, উপস্থাপকও ছিলাম না। সেদিন আমি ছিলাম একজন বন্ধু, যে একজন লেখিকা বন্ধুর সঙ্গে শহরের বুকের ওপর দিয়ে চলন্ত একটি ট্রেনে কিছু সুন্দর সময় কাটাচ্ছিল।
মেট্রোরেলের প্রতিটি স্টেশন যেন একটি করে নতুন দৃশ্যপট খুলে দিচ্ছিল। একটি স্টেশনে কেউ নামছে, অন্য স্টেশনে নতুন কেউ উঠছে। কেউ ফোনে ব্যস্ত, কেউ বই পড়ছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের হাসি, মজার কথা এবং বন্ধুত্বের স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস মেট্রোরেলের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছিল।
আমি নামিয়াকে বললাম, “দেখুন, এই ট্রেনটা আসলে শুধু মানুষ বহন করছে না। এটি হাজার মানুষের হাজার গল্প বহন করছে।”
নামিয়া বলল, “আপনি আবার লেখকের মতো কথা বলা শুরু করেছেন।”
আমি বললাম, “লেখকরা তো সব জায়গাতেই গল্প খুঁজে পান।”
নামিয়া বলল, “তাহলে আজকের গল্পের প্রধান চরিত্র কে?”
আমি একটু তাকিয়ে বললাম, “এটা এখনই বলা যাবে না। গল্প শেষ না হলে প্রধান চরিত্র ঠিক করা যায় না।”
সে হেসে উঠল।
তার সেই হাসি আজও আমার মনে আছে।
নামিয়ার হাসির মধ্যে এক ধরনের সরলতা আছে। খুব স্বাভাবিক, খুব প্রাণবন্ত। তার সৌন্দর্য শুধু মুখের অবয়বে নয়, তার হাসিতে, তার কথার ভঙ্গিতে এবং মানুষের প্রতি তার সহজ অনুভূতিতে। একজন নারীকে সুন্দর করে তোলে শুধু তার বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, তার ব্যক্তিত্ব, তার চিন্তা, তার মনের সৌন্দর্য এবং তার কথার ভেতরের উষ্ণতাও। নামিয়ার মধ্যে সেই সৌন্দর্যের একটি আলাদা উপস্থিতি আমি অনুভব করি।
মেট্রোরেল তখন ছুটে চলেছে। চারপাশে শহরের আলো, নিচে ব্যস্ত ঢাকা, আর আমাদের সামনে একের পর এক স্টেশন। অথচ সেই ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের দুজনের কথার মধ্যে যেন আলাদা একটি পৃথিবী তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
কখনো চোখাচোখি হচ্ছে, আবার দুজনেই হেসে ফেলছি। কখনো কোনো কথা বলতে গিয়ে নামিয়া থেমে যাচ্ছে, আমি তার কথার পরের অংশ অনুমান করার চেষ্টা করছি। কখনো আমি কোনো মজার কথা বলছি, আর সে হাসতে হাসতে বলছে, “আপনি আসলে সাংবাদিকের চেয়ে বেশি গল্পবাজ।”
আমি বললাম, “সাংবাদিকতা আর গল্পের মধ্যে পার্থক্য আছে। সাংবাদিক সত্য খোঁজে, আর লেখক সত্যের ভেতরের অনুভূতি খোঁজে।”
নামিয়া বলল, “তাহলে আপনি আজ কোন সত্য খুঁজছেন?”
আমি বললাম, “আজ কোনো সত্য খুঁজছি না। আজ শুধু সময়টাকে উপভোগ করছি।”
কথাটা বলার পর কিছুক্ষণ আমরা দুজনই চুপ হয়ে গেলাম।
কখনো কখনো নীরবতাও কথার মতো সুন্দর হয়।
মেট্রোরেলের গতি তখন আরও দ্রুত মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমাদের সময় যেন ধীরে চলছিল। মনে হচ্ছিল, এই যাত্রাটা আর একটু দীর্ঘ হলে ভালো হতো। গন্তব্য যেন একটু দেরিতে আসত। কারণ কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো মানুষ শেষ করতে চায় না।
অবশেষে উত্তরা উত্তর স্টেশন।
ট্রেন থামল। দরজা খুলল। মানুষের স্রোত নামল। কেউ দ্রুত এগিয়ে গেল, কেউ অপেক্ষা করল, কেউ পরবর্তী গন্তব্যের জন্য অন্যদিকে চলে গেল।
আমরা নেমে এলাম।
কিন্তু আমাদের গল্প থামল না।
কিছুক্ষণ পর আবার ফিরতি যাত্রা শুরু হলো। উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিলের পথে আমরা আবার মেট্রোরেলে উঠলাম। একই ট্রেন, একই শহর, একই স্টেশন, একই গতি। কিন্তু ফেরার যাত্রায় আমাদের কথাগুলো যেন আরও আপন হয়ে উঠেছিল।
যাওয়া এবং ফেরার মধ্যে কখন যে একটি সাধারণ যাত্রা স্মৃতিতে পরিণত হয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি।
আমরা আবার গল্প করলাম। হাসলাম। পুরোনো স্মৃতি মনে করলাম। লেখালেখি নিয়ে কথা বললাম। মানুষের জীবন নিয়ে কথা বললাম। কখনো নিজের নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলাম। কখনো আবার এমন কোনো প্রসঙ্গ উঠে এলো, যার সঙ্গে এই যাত্রার কোনো সম্পর্কই ছিল না, তবুও আমরা হাসতে হাসতে সেই প্রসঙ্গটিকে দীর্ঘ করলাম।
আমার মনে হচ্ছিল, মেট্রোরেলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য শুধু তার গতি নয়। তার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো সময়কে বাঁচিয়ে মানুষের হাতে কিছু অতিরিক্ত সময় তুলে দেওয়া। সেই সময় কেউ কাজে ব্যবহার করেন, কেউ বই পড়েন, কেউ মোবাইল দেখেন, কেউ ঘুমিয়ে নেন, আর কেউ হয়তো আমার মতো কোনো প্রিয় মানুষের সঙ্গে গল্প করেন।
আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে দ্রুত করেছে। কিন্তু মানুষের অনুভূতি এখনও আগের মতোই আছে। একটি আন্তরিক হাসি এখনও মানুষকে আনন্দ দেয়। একটি সুন্দর কথা এখনও মনে থাকে। একজন ভালো বন্ধুর সঙ্গে কাটানো সময় এখনও হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।
সেদিন নামিয়ার সঙ্গে আমার সেই যাত্রা তাই আমার কাছে শুধু মেট্রোরেলে ওঠা নামার ঘটনা ছিল না। এটি ছিল আধুনিক ঢাকার বুকে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক সুন্দর অভিজ্ঞতা।
সচিবালয় থেকে উত্তরা উত্তর।
আবার উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল।
দুটি গন্তব্যের মধ্যে ছুটে চলা একটি ট্রেন।
অসংখ্য মানুষের ভিড়ের মধ্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষ।
একজন সাংবাদিক, লেখক ও টেলিভিশন উপস্থাপক।
অন্যজন একজন লেখিকা, যিনি একসময় সংবাদ পাঠ করতেন এবং এখন শব্দের ভেতর দিয়ে জীবনকে খুঁজে বেড়ান।
আমাদের কথার মধ্যে ছিল সাহিত্য।
ছিল সাংবাদিকতা।
ছিল জীবন।
ছিল হাসি।
ছিল বন্ধুত্ব।
ছিল মুগ্ধতা।
আর ছিল এক ধরনের নরম রোমান্টিকতা, যার কোনো দাবি নেই, কোনো সংজ্ঞা নেই, কোনো নামও নেই। শুধু একটি সুন্দর সময়কে সুন্দরভাবে মনে রাখার আকাঙ্ক্ষা আছে।
মতিঝিলের দিকে ট্রেন যখন ছুটছিল, তখন মনে হচ্ছিল, মানুষের জীবনও আসলে একটি মেট্রোরেলের মতো। আমরা বিভিন্ন স্টেশনে থামি, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই, কেউ আমাদের জীবনে উঠে আসে, কেউ আবার কোনো এক স্টেশনে নেমে যায়। কেউ কয়েক মিনিটের সহযাত্রী, কেউ কয়েক বছরের। কিন্তু কিছু মানুষ এমনভাবে স্মৃতিতে জায়গা করে নেয় যে তারা ট্রেন থেকে নেমে গেলেও তাদের কথাগুলো আমাদের সঙ্গে চলতে থাকে।
নামিয়ার সঙ্গে সেই যাত্রাটিও হয়তো তেমন একটি গল্প।
হয়তো একদিন আমরা এই দিনের কথা মনে করে আবার হাসব।
হয়তো বলব, “মনে আছে, সেই দিন মেট্রোরেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কত কথা বলেছিলাম?”
হয়তো নামিয়া আবার বলবে, “আপনি তো তখনও আমার গল্প লিখে ফেলেছিলেন।”
আর আমি হয়তো বলব, “গল্প তখনও শেষ হয়নি। কারণ কিছু গল্প শেষ করার জন্য লেখা হয় না। কিছু গল্প শুধু মনে রাখার জন্য লেখা হয়।”
মেট্রোরেল আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে।
কিন্তু সেই যাত্রা আমার মনে যে স্মৃতি রেখে গেছে, তার কোনো গন্তব্য নেই।
সেটি এখনও চলছে।
সচিবালয়ের সেই স্টেশন থেকে উত্তরা উত্তরের পথে, উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিলের পথে, মেট্রোরেলের শব্দের সঙ্গে মিশে থাকা নামিয়ার হাসির ভেতর দিয়ে, কিছু মজার কথার ভেতর দিয়ে, কিছু রোমান্টিক মুহূর্তের ভেতর দিয়ে এবং বন্ধুত্বের এক সুন্দর অনুভূতির ভেতর দিয়ে।
কিছু যাত্রা শেষ হয় ট্রেন থামলে।
আর কিছু যাত্রা শুরু হয় ট্রেন থামার পর।
নামিয়ার সঙ্গে সেই মেট্রোরেল যাত্রাটি আমার কাছে ঠিক তেমনই।
একটি ট্রেনের যাত্রা শেষ হয়েছে অনেক আগেই।
কিন্তু গল্পটি এখনও চলছে।
স্মৃতির ভেতর।
মনের ভেতর।
আর হয়তো কোনো একদিন, আবার কোনো মেট্রো স্টেশনে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ নামিয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে সেই পুরোনো হাসিটা ফিরে আসবে।
তখন হয়তো আবার কোনো ট্রেন ছুটবে।
আবার কোনো স্টেশন পেছনে পড়ে থাকবে।
আবার গল্প শুরু হবে।
আর আমি মনে মনে লিখব,
“কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে গন্তব্য হয়ে নয়, সুন্দর একটি যাত্রা হয়ে। নামিয়া তেমনই এক সুন্দর যাত্রার নাম।”
চট্টগ্রামে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সংবাদ সম্মেলন : ৬ দফা দাবি আদায় না হলে ফুডপান্ডার অর্ডার বন্ধের হুমকি
স ম জিয়াউর রহমান, চট্টগ্রাম থেকে :
৬ দফা দাবি আদায়ে ব্যর্থ হলে এবং অতিরিক্ত কমিশন, নানা রকম চার্জ, অর্ডার বাতিলের দায়, অপেক্ষার মাশুল, একতরফা জরিমানা ও রিফান্ডের নামে টাকা কেটে নেওয়াসহ নানা হয়রানি বন্ধ না করলে অনলাইনে খাবার সরবরাহকারী বহুজাতিক কোম্পানি ফুডপান্ডার অর্ডার স্থগিত বা বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি।
তাদের দাবি, কমিশনসহ সব ধরনের চার্জ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। সেই সাথে আরও পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন তারা।
আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম মহানগরীর শুলকবহরের বারকোড ফুড জংশানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন রোস্তারাঁ মালিকেরা। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর শাখা এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে দাবিগুলো লিখিত বক্তব্যে উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক। এসময় সংগঠনের সভাপতি মো. ইমতিয়াজ উদ্দিন নওশাদসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন রেস্তোরাঁর মালিক ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, ফুডপান্ডা এক সময় ৮ শতাংশ কমিশন চুক্তিতে তাদের ব্যবসা শুরু করলেও পরবর্তীতে তা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। কমিশনের বাইরেও অনলাইন পেমেন্ট চার্জ, অপেক্ষার মাশুল, কমিশনের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), ট্যাব ফি ও ইন্টারনেট ফিসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে নানা খাতে টাকা কেটে নেওয়া হয়। যা সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশে পৌছায়।
এছাড়া বিক্রির টাকা পেতেও ১৩ দিন থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগে। এতে একদিকে বাড়ছে ব্যবসার খরচ, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে মুনাফা। এছাড়া ফুডপান্ডার পাঠানো হিসাব এতটাই জটিল যে কোন খাতে কত টাকা কাটা হয়েছে, তা বুঝতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিসাবের খাত ও কর্তনের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এতে নিজেদের বিক্রি, কমিশন ও প্রকৃত আয় যাচাই করাও একদম কঠিন হয়ে পড়ে।
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির নেতারা বলেন, তারা ডিজিটাল প্রযুক্তির বিরোধিতা করছেন না। বরং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়িক ব্যবস্থায় ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা চান। কিন্তু ফুডপান্ডার বর্তমান নীতিতে রেস্তোরাঁ মালিকদের ওপর একের পর এক আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে ব্যবসা পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে রেস্তোরাঁর কর্মচারী ও তাদের পরিবারের ওপরও।
এমন পরিস্থিতিতে ফুডপান্ডার একতরফা ও অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা। তাদের অভিযোগ, ফুডপান্ডার প্রযুক্তিগত সমস্যা কিংবা খাবার সরবরাহের ব্যবস্থাপনায় জটিলতার কারণে অর্ডার বাতিল হলেও এর আর্থিক দায় নিতে হয় রেস্তোরাঁ মালিকদের। একটি অর্ডার পাওয়ার পর খাবার তৈরিতে কাঁচামাল, শ্রম ও সময় ব্যয় হয়। কিন্তু খাবার তৈরি হয়ে যাওয়ার পর অর্ডার বাতিল হলে সেই খাবার অন্য গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা সব সময় সম্ভব হয় না। এতে খাবারের পুরো খরচই লোকসানে পরিণত হতে পারে।
তাদের অভিযোগ, সরবরাহকর্মী বা রাইডার দেরিতে খাবার সংগ্রহ করলে গ্রাহক অর্ডার বাতিল করেন। অথচ এ ধরনের পরিস্থিতিতেও রেস্তোরাঁকে জরিমানা বা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, গুনতে হয় মাশুল। যে বিলম্বের জন্য রেস্তোরাঁ দায়ী নয়, তার খেসারতও কেন রেস্তোরাঁ মালিকদের দিতে হবে, তারা জানতে চায়।
গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রেও একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন রেস্তোরাঁ মালিকরা। তাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে এবং রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না শুনেই পাওনা টাকা থেকে অর্থ কেটে নেওয়া হয়। এতে ব্যবসায়ীরা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
দেশীয় খাবার সরবরাহকারী প্লাটফর্ম ফুডির উদাহরণ টেনে রেস্তোরাঁ মালিকরা বলেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠান ১৫ শতাংশ সমন্বিত কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারলে ফুডপান্ডার ক্ষেত্রে কমিশনের বাইরে এত ধরনের চার্জ কেন থাকবে? তাদের দাবি, সব চার্জ কমিশনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সমন্বিত কমিশন নির্ধারণ করতে হবে।
রেস্তোরাঁ মালিকদের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে-কমিশনের বাইরে সব ধরনের অতিরিক্ত চার্জ বাতিল, সহজ ও স্বচ্ছ খাতওয়ারি হিসাব দেওয়া, রেস্তোরাঁর দোষ ছাড়া অর্ডার বাতিল হলে খাবারের সম্পূর্ণ খরচ বহন, রাইডারের বিলম্বের কারণে জরিমানা বন্ধ, অভিযোগ যাচাই ও রেস্তোরাঁর বক্তব্য না শুনে অর্থ কর্তন বন্ধ এবং সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে বিক্রির টাকা পরিশোধ।
রেস্তোরাঁ মালিকরা আরও জানান, ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষ তাদের দাবিগুলো মেনে না নিলে চট্টগ্রাম মহানগরের রেস্তোরাঁ মালিকরা সম্মিলিতভাবে ফুডপান্ডা প্লাটফর্মে অর্ডার গ্রহণ স্থগিত বা সম্পূর্ণ বন্ধ করার কর্মসূচিও দিতে বাধ্য হবেন। যা ঢাকাসহ দেশের সবকটি নগরে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে হুশিয়ার করেন। এতে ফুডপান্ডার পাশাপাশি অনলাইন অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল গ্রাহকরাও প্রভাবিত হতে পারেন। তবে এ সমস্যা নিরসনে চট্টগ্রাম রেন্তোরাঁ মালিক সমিতি নিজস্ব অনলাইন প্ল্যাটফরম খোলারও ঘোষণা দেন।
এ বিষয়ে অনলাইন খাবার সরবরাহ খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা। এ খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানিয়েছেন তারা, যাতে বহুজাতিক অনলাইন প্লাটফর্মের সঙ্গে ব্যবসা করতে গিয়ে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বৈষম্যের শিকার না হন।
গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্সের বিশ্ব ডিম দিবসের সভায় বক্তারা মানবদেহের পুষ্টির চাহিদা পূরণ, সুস্বাস্থ্য রক্ষায় ডিমের অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে
মেট্রোরেলে চলন্ত যাত্রা ও নামিয়ার সঙ্গে কিছু কথা-
চট্টগ্রামের প্রগতির প্রদীপ স্বপন সেন : চলে যাওয়ার এক বছর, স্মৃতিতে আজও অমলিন
পুলিশ কি রাষ্ট্রের, নাকি ক্ষমতার?
ঘুড়ি ধরতে গিয়ে সিএনজির ধাক্কায় শিশু আলীর মৃত্যু
চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদে ফ্লাইওভারের ওপর থেকে একটি ঘুড়ি ধরতে গিয়ে সিএনজির ধাক্কায় মোহাম্মদ আলী নামক এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। জানা গেছে আলীর বয়স ১৩ বছর।
পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে আলীকে খুজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তার পিতার নাম মোহাম্মদ বাবুল। আলী টাইগারপাস বটালী হিল রোড পিডাবলিউ কলোনীতে বসবাস করত।
গতকাল শুক্রবার ০৯ই অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায় শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে জরুরি বিভাগের মর্গে পাঠান।
হাসপাতালে শিশুটিকে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নগরের ডাবলমুরিং থানাধীন আগ্রাবাদের বারেক বিল্ডিং এলাকার ফ্লাইওভারের ওপর কাটা ঘুড়ি ধরতে গিয়ে শিশুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার সামনে পড়ে যায়। সিএনজির ধাক্কায় সে গুরুতর আহত হয়। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘােষণা করেন।