জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করতে গিয়ে নানা ধরনের জটিলতা ও ভোগান্তির মুখে পড়ছেন নাগরিকরা। কারও নিজের জন্মনিবন্ধন না থাকায় সন্তানের নিবন্ধন আটকে যাচ্ছে, আবার কারও নামের সঙ্গে দ্বিতীয় নাম না থাকায় অনলাইন আবেদনে তৈরি হচ্ছে জটিলতা। কোথাও আবার জন্মস্থান ও ভোটার এলাকার ভিন্নতার কারণে এক অফিস থেকে অন্য অফিসে ঘুরতে হচ্ছে। এসব সমস্যার পাশাপাশি দালালদের বাড়তি অর্থ দাবির অভিযোগও রয়েছে।
কুমিল্লার মুরাদনগরের আলীচর এলাকার সালমা বর্তমানে ঢাকার মিরপুরের ঝিলপাড় বস্তিতে থাকেন। জাতীয় পরিচয়পত্রে শুধু ‘সালমা’ নামেই পাসপোর্ট করেছেন তিনি। কিন্তু সন্তানের জন্মনিবন্ধনের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। আবেদনে নিজের জন্মনিবন্ধন নম্বর দিতে বলা হলেও এক শব্দের নাম দিয়ে তার জন্মনিবন্ধন করা সম্ভব হচ্ছে না। নামের সঙ্গে ‘বেগম’, ‘আক্তার’ কিংবা অন্য কোনো দ্বিতীয় নাম যুক্ত করার প্রয়োজন হচ্ছে।
নিজের পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য সংশোধন করতে সালমাকে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে স্থানীয় কার্যালয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এতে হয়রানির আশঙ্কায় এবং জীবিকার তাগিদে কাজ ফেলে সেই প্রক্রিয়ায় যেতে পারছেন না তিনি। ফলে তার নিজের জন্মনিবন্ধন যেমন হচ্ছে না, তেমনি আটকে আছে সন্তানের জন্মনিবন্ধনও।
জন্মনিবন্ধন না থাকায় সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করাতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ভবিষ্যতে সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরের ঝিলপাড়, ট-ব্লক, চলন্তিকা ও আরামবাগ বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একই ধরনের সমস্যায় রয়েছেন আরও অনেকে।
ঝিলপাড় বস্তির বাসিন্দা নুসরাতের তিন সন্তানের বয়স যথাক্রমে পাঁচ, তিন ও এক বছর। এখনো কারও জন্মনিবন্ধন হয়নি। কারণ, নুসরাতের নিজেরই জন্মনিবন্ধন নেই।
অন্যদিকে চার বছর বয়সী আব্দুল্লাহ আল বাসিতের বাবার নাম আ. মান্নান এবং মায়ের নাম ময়না। অভিভাবকদের নামের অসম্পূর্ণতার কারণে তারও জন্মনিবন্ধন করা যায়নি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নিবন্ধন করিয়ে দেওয়ার জন্য একজন দালাল তাদের কাছে ১ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বাড়তি এই অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় নিবন্ধন করাতে পারেননি তারা।
জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে ভোগান্তির এমন অভিজ্ঞতার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তুলে ধরেছেন অনেকে। সাবরিনা জান্নাত আরা নামে এক গৃহবধূ জানিয়েছেন, মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাতে জন্মনিবন্ধন প্রয়োজন হওয়ায় তিনি নিবন্ধন করতে যান। সেখানে তাকে জানানো হয়, নতুন নিয়ম অনুযায়ী বাবা-মা দুজনেরই জন্মনিবন্ধন থাকতে হবে। তার নিজের জন্মনিবন্ধন থাকলেও স্বামীর জন্মনিবন্ধন না থাকায় নতুন করে সেটি করতে উদ্যোগ নিতে হয়।
কিন্তু স্বামীর জন্মস্থান ও বর্তমান ভোটার এলাকার ভিন্নতার কারণে একাধিক দপ্তরে যোগাযোগ করেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, একটি সাধারণ সরকারি সেবা নিতে গিয়েও নাগরিকদের বারবার ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস-২০২৬। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা এবং বিশেষ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ক্যাম্পেইন।
তবে এরই মধ্যে গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার কমে গেছে। বিষয়টি নিয়ে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে জন্মের এক বছরের মধ্যে জন্মনিবন্ধনের হার ছিল ৬৩ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৫৯ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই হার কমে যথাক্রমে ৪৩ শতাংশ ও ৫৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জন্ম ও মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে নিবন্ধনের হার ছিল যথাক্রমে ৪৯ ও ৪৭ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে জন্মনিবন্ধনে ৬৩ এবং মৃত্যু নিবন্ধনে ৫৯ শতাংশে পৌঁছায়। তবে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে জন্মনিবন্ধনের হার ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সিআরভিএস আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে জন্ম ও মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধন সম্পন্ন করার আন্তর্জাতিক লক্ষ্য গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন আবেদনের জটিলতা, তথ্যের অসঙ্গতি, দালালদের বাড়তি অর্থ দাবি এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে অনেক মানুষ নিবন্ধনের বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের কার্যক্রম সহজ করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা রয়ে গেছে। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে এলাকাভিত্তিক ক্যাম্পেইন এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শিশু জন্মের পরপরই স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করে জন্মনিবন্ধনের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেন।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জেনারেল আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এক বছরের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের লক্ষ্য রয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের পথে ভুয়া নিবন্ধন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুয়া নিবন্ধন বন্ধে অভিযান ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে চলতি বছর নিবন্ধনের হার কিছুটা কম দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, বাস্তব ও নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নিবন্ধন নিশ্চিত করতে গিয়ে সংখ্যাগতভাবে নিবন্ধনের হার কমেছে। আগে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে কিছু এলাকায় ভুয়া জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ঘটনা ঘটেছিল বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মুর্শিদা শারমিন বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বদলি হয়ে যাওয়া এবং নতুন কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে জড়িত হতে পারে। তবে প্রকৃত কারণগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন, নাগরিকদের নির্ভুল ও সর্বজনীন তথ্য সংরক্ষণ সুশাসনের অন্যতম ভিত্তি। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কার করে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়া হলে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধনের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।




