পুলিশ কি রাষ্ট্রের, নাকি ক্ষমতার?

0
7
খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের বদলি ঘিরে শত প্রশ্ন, চাই নিরপেক্ষ তদন্ত ও সত্যের প্রকাশ
মো. কামাল উদ্দিন
পুলিশ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তার রক্ষক এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান শক্তি। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের যদি রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতাবানদের অসন্তোষ কিংবা প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, পুলিশ কি স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারছে, নাকি ক্ষমতার ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত আইনের গতিপথ নির্ধারণ করছে?
চট্টগ্রামের খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুর রহিমের বদলিকে কেন্দ্র করে এমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জনপরিসরে আলোচনার দাবি রাখে।
অভিযান কার নির্দেশে, আর দায় কার?
অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র কার্যালয়ে বগাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে পুলিশের একটি দল গিয়েছিল। কিন্তু ওই অভিযানে খুলশী থানার তৎকালীন ওসি আবদুর রহিম উপস্থিত ছিলেন না বলে দাবি করা হচ্ছে। তিনি তখন ছুটিতে নিজ গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে ছিলেন বলেও জানা গেছে।
যদি তিনি অভিযানে উপস্থিত না থেকে থাকেন, তাহলে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
ওই পুলিশ দলে কারা ছিলেন? তাঁদের নেতৃত্বে কে ছিলেন? বগাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে মেয়র কার্যালয়ে যাওয়ার নির্দেশ কে দিয়েছিলেন? পুলিশ কমিশনারের অনুমতি নিয়ে কিংবা তাঁকে অবহিত করে অভিযান পরিচালিত হয়েছিল কি না? যদি হয়ে থাকে, তাহলে অভিযানের দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি কীভাবে নির্ধারিত হয়েছিল?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, বগাকে গ্রেপ্তারের জন্য মেয়র কার্যালয়েই কেন যেতে হয়েছিল? তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য অন্য কোনো স্থান বা আইনসম্মত বিকল্প ছিল কি না? অভিযান পরিচালনার সময় কোনো আইনি বাধা সৃষ্টি হয়েছিল কি না? আর পুলিশ সেখানে গিয়ে থাকলে, শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি কেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান করে দেওয়া যায় না। প্রয়োজন অভিযানের নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধানের আলোকে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান।
ছুটিতে থেকেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বদলি কেন?
এই ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ওসি আবদুর রহিমের বদলি। প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, খুলশী থানায় যোগদানের প্রায় এক মাস দশ দিনের মাথায় এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে বদলি করা হয়েছে বলে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, বদলিটি জনস্বার্থে রুটিন বদলি হয়ে থাকলে সেটিও প্রশাসনিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কারণ, পুলিশের বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
কিন্তু জনস্বার্থে বদলি আর কোনো অভিযোগ বা চাপের কারণে বদলি এক বিষয় নয়। এ দুটির মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন তথ্য, প্রমাণ ও স্বচ্ছতা।
যদি ওসি আবদুর রহিম অভিযানে উপস্থিত না থাকেন, তাহলে ওই অভিযানের সঙ্গে তাঁর বদলির সম্পর্ক কী? বদলির সিদ্ধান্ত কি আগে থেকেই প্রক্রিয়াধীন ছিল? নাকি মেয়র কার্যালয়ের ঘটনাটির পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল কি না? থাকলে তা কী এবং তার তদন্ত হয়েছে কি না?
একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার বদলিকে কেন্দ্র করে এমন প্রশ্ন উঠলে কর্তৃপক্ষের উচিত তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া। এতে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় না; বরং স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ে।
ওসি আবদুর রহিম পেশাদার পুলিশ, নাকি রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগের মুখে?
চট্টগ্রামের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের পক্ষ থেকে ওসি আবদুর রহিমের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়ে থাকলে, সেগুলোও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাকলিয়া থানার ওসি থাকাকালে আবদুর রহিম রাজনৈতিক আয়োজনের জন্য প্রস্তুত করা মেজবানির মাংসের ডেক নিয়ে গিয়েছিলেন। অভিযোগটি সত্য হলে সেটি নিছক রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার বা অন্য কোনো অনিয়ম জড়িত ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
কিন্তু অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী কিংবা কোনো দলের নিবেদিত কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ কী? ঘটনার সময়কার প্রত্যক্ষদর্শী আছেন কি? কোনো ভিডিও, লিখিত নথি, সংবাদ প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট অভিযোগের রেকর্ড রয়েছে কি? এসব যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অভিযোগটি সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর অভিযোগটি অসত্য বা প্রমাণহীন হলে একজন পুলিশ কর্মকর্তার পেশাগত মর্যাদা ও সুনাম রক্ষার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।
একইভাবে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তাঁকে শুধু বদলি করে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণই হওয়া উচিত প্রশাসনের মূল দায়িত্ব।
পুলিশ কমিশনারের কাছে জনস্বার্থের প্রশ্ন
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের কাছে তাই কয়েকটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করা যায়।
প্রথমত, মেয়র কার্যালয়ে বগাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত অভিযানের নির্দেশদাতা কে ছিলেন এবং কোন আইনি ভিত্তিতে অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল?
দ্বিতীয়ত, অভিযানে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা কারা ছিলেন এবং অভিযানটি কেন সফল হয়নি?
তৃতীয়ত, ওসি আবদুর রহিম ওই অভিযানে উপস্থিত না থেকেও কেন ঘটনার পরপরই বদলির মুখে পড়লেন? তাঁর বদলির সিদ্ধান্ত কি পূর্বনির্ধারিত ছিল, নাকি ঘটনাটির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে?
চতুর্থত, মেয়র কর্তৃক উত্থাপিত অতীতের অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি না? হয়ে থাকলে তার ফলাফল কী?
পঞ্চমত, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাত, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা যাচাইয়ের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথি, আদেশ, তদন্তের ফলাফল এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হলে জনমনে সৃষ্ট সংশয় অনেকটাই দূর হতে পারে।
সরকার পরিবর্তন হবে, পুলিশ থাকবে রাষ্ট্রের দায়িত্বে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ বাহিনীকে প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন করে রাজনৈতিক পরিচয়ের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলে পেশাদারিত্বের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
কোনো পুলিশ সদস্য অতীতে কোনো রাজনৈতিক সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করেছেন, এটুকু দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা অপরাধ নির্ধারণ করা যায় না। আবার রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ দায়িত্বের অপব্যবহার করলে তাঁকেও ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
পুলিশের কাজ সরকারের বৈধ ও আইনসম্মত নির্দেশ বাস্তবায়ন করা, জনগণের অধিকার রক্ষা করা এবং অপরাধ দমন করা। বেআইনি নির্দেশ পালন করা পুলিশের দায়িত্ব নয়। একইভাবে, রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে কাউকে বেআইনিভাবে হয়রানি করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
পুলিশের পেশাগত স্বাধীনতা মানে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকা নয়। বরং আইনের অধীনে থেকে ভয়ভীতি ও অযাচিত হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা। যে পুলিশ সদস্য অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করবেন, তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার ভয় থেকে মুক্ত রাখতে হবে। আবার যিনি অপরাধে জড়িত হবেন, তাঁর পদমর্যাদা বা রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
শেষ কথা: পুলিশ ক্ষমতার নয়, জনগণের সেবক
খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের বদলি নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি কোনো ব্যক্তিকে নির্দোষ প্রমাণ করা কিংবা কারও বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিষয় নয়। এটি পুলিশের পেশাগত স্বাধীনতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যদিকে, কোনো অনিয়ম ছাড়াই তিনি যদি রাজনৈতিক চাপ কিংবা অযাচিত প্রভাবের কারণে বদলির শিকার হয়ে থাকেন, সেটিও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হোক।
একই সঙ্গে মেয়র কার্যালয়ে পরিচালিত অভিযানের নির্দেশ, আইনি ভিত্তি, অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তা এবং অভিযানের ফলাফল সম্পর্কে জনগণকে যথাসম্ভব স্বচ্ছ তথ্য দেওয়া প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, কোনো মেয়র বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির ব্যক্তিগত বাহিনীও নয়। পুলিশ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আর রাষ্ট্রের মালিক জনগণ।
তাই প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক: পুলিশ কি স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগ করবে, নাকি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সদস্যদেরও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা হবে?
আমরা কোনো কর্মকর্তার পক্ষপাতিত্ব চাই না, চাই না কাউকে অন্যায়ভাবে বলির পাঁঠা বানানো হোক। আমরা চাই সত্য প্রকাশিত হোক, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।
কারণ, পুলিশ দুর্বল হলে অপরাধী শক্তিশালী হয়; পুলিশ দলীয় প্রভাবে পরিচালিত হলে ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আর পুলিশ যখন নিরপেক্ষ, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলকভাবে দায়িত্ব পালন করে, তখনই জনগণের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের আইনের শাসন সুদৃঢ় হয়।
পুলিশকে ক্ষমতার নয়, আইনের শক্তিতে বলীয়ান হতে হবে। আর সেই আইনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে হবে জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here