চট্টগ্রামের প্রগতির প্রদীপ স্বপন সেন : চলে যাওয়ার এক বছর, স্মৃতিতে আজও অমলিন

0
50
– মো. কামাল উদ্দিন
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের চলে যাওয়া কখনোই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তাঁরা বেঁচে থাকেন মানুষের হৃদয়ে, আন্দোলনের ইতিহাসে, আদর্শের দীপ্তিতে এবং স্মৃতির গভীরতম অলিন্দে। সময়ের স্রোত তাঁদের শরীরকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, কিন্তু তাঁদের কর্ম, চিন্তা ও সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে মুছে দিতে পারে না। চট্টগ্রামের প্রগতিশীল আন্দোলনের এক অকুতোভয় সহযোদ্ধা, মানবতাবাদী সমাজকর্মী ও প্রগতির আলোকবর্তিকা স্বপন সেনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে আজ আমার হৃদয়ে তেমনই এক গভীর শূন্যতা অনুভব করছি।
গত বছর তিনি আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে একটি বছর পেরিয়ে গেল। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, দিন ও রাতের আবর্তনে সময় এগিয়ে গেছে, নগরীর ব্যস্ততা বেড়েছে, রাজপথে আবারও মিছিল হয়েছে, সভা ও সমাবেশে উচ্চারিত হয়েছে মানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা। কিন্তু সেই পরিচিত মুখটি আর কোথাও দেখা যায় না। আন্দোলনের কোনো মঞ্চে, নাগরিক অধিকারের কোনো সভায় কিংবা প্রগতিশীল মানুষের কোনো আলোচনায় হঠাৎ মনে হয়, এই তো স্বপন সেন এসে দাঁড়াবেন, তাঁর স্বভাবসুলভ দৃঢ় কণ্ঠে যুক্তির কথা বলবেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবেন এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান তুলে ধরবেন।
কিন্তু না, তিনি আর ফিরে আসবেন না। ফিরে আসবে না তাঁর কণ্ঠস্বর, ফিরে আসবে না তাঁর সেই প্রাণবন্ত উপস্থিতি। রয়ে গেছে শুধু স্মৃতি, রেখে গেছেন আদর্শ, আর রেখে গেছেন মানুষের জন্য নিবেদিত এক সংগ্রামী জীবনের অমলিন দৃষ্টান্ত।
স্বপন সেন ছিলেন একটি নামের চেয়েও অনেক বেশি। তিনি ছিলেন একটি বিশ্বাসের নাম, একটি সংগ্রামের নাম, প্রগতিশীল চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
আশির দশকের সেই দিনগুলো, যখন আমরা ছিলাম সহযোদ্ধা
স্বপন সেনের সঙ্গে আমার পরিচয় আশির দশকের শেষ দিকে, আনুমানিক ১৯৮৮ সালের দিকে। তখন আমরা দুজনই তরুণ। চোখে ছিল নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন, মনে ছিল বৈষম্যহীন পৃথিবীর প্রত্যাশা, আর হৃদয়ে ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। চারপাশের নানা অসংগতি, সামাজিক বৈষম্য, অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে আমাদের ভেতরে কাজ করত এক ধরনের দায়বদ্ধতা। আমরা বিশ্বাস করতাম, মানুষের জীবনকে সুন্দর করার জন্য রাজনীতি, সমাজকর্ম ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হতে হবে।
সেই সময় থেকে স্বপন সেনের সঙ্গে আমার পথচলা। কত সভা, কত সমাবেশ, কত আন্দোলন, কত তর্ক-বিতর্ক, কত স্বপ্ন ও প্রত্যাশার দিন যে একসঙ্গে পার করেছি, তার সবকিছু আজ আর স্পষ্ট করে মনে করতে পারি না। তবে স্মৃতির দরজা খুললেই তাঁর মুখটি ভেসে ওঠে। মনে পড়ে তাঁর দৃঢ় অবস্থান, যুক্তিনির্ভর বক্তব্য এবং মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন মনোভাব।
আমরা হয়তো সব বিষয়ে একইভাবে ভাবিনি, সব প্রশ্নে একই মত পোষণ করিনি, কিন্তু মানুষের কল্যাণ এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা আমাদের একসূত্রে বেঁধেছিল। মতপার্থক্য ছিল আলোচনার বিষয়, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল আমাদের অভিন্ন অঙ্গীকার।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেই দিনগুলো শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনের স্মৃতি নয়; সেগুলো ছিল আমাদের জীবন গঠনের দিন, বিশ্বাসকে দৃঢ় করার দিন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা গ্রহণের দিন। সেই দীর্ঘ পথচলায় স্বপন সেন ছিলেন আমার একজন প্রিয় সহযোদ্ধা, যাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ছিলেন মানুষের রাজনীতির কর্মী
স্বপন সেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক পার্টির সক্রিয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কে কেবল দলীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাঁর জীবন ও কর্মের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা যাবে না।
তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল মানুষ। সমাজের বঞ্চিত, অবহেলিত ও অধিকারহীন মানুষের জীবনমান উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে তাড়িত করত। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতির প্রকৃত সার্থকতা ক্ষমতা অর্জনে নয়, মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারার মধ্যে। ব্যক্তিগত লাভ কিংবা আত্মপ্রতিষ্ঠার চেয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও আদর্শের প্রশ্নই ছিল তাঁর কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
প্রগতিশীল রাজনীতি তাঁর কাছে ছিল কেবল বক্তৃতার বিষয় নয়, ছিল জীবনযাপনের অঙ্গীকার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি এবং মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে কথা বলা ছিল তাঁর রাজনৈতিক চেতনার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
আজকের সময়ে যখন ব্যক্তিস্বার্থ, আত্মপ্রচার ও সুবিধাবাদ অনেক ক্ষেত্রেই আদর্শের জায়গা সংকুচিত করে ফেলে, তখন স্বপন সেনের মতো মানুষের জীবন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, মানুষের জন্য রাজনীতি করতে হলে নিজের চেয়ে মানুষকে বড় করে দেখতে হয়। আদর্শের কথা বলতে হলে নিজের জীবনেও সেই আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে হয়।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সংগঠক
চট্টগ্রামের নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন আন্দোলনের ইতিহাসে স্বপন সেনের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার মতো। বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির প্রতিষ্ঠালগ্নে তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক। চট্টগ্রামের উন্নয়ন, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, জনস্বার্থ এবং মানুষের ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
চট্টগ্রাম শুধু একটি বন্দরনগরী নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অথচ এই নগরীর মানুষের নাগরিক দুর্ভোগ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। এসব প্রশ্নে যাঁরা জনস্বার্থের পক্ষে কথা বলেছেন, যাঁরা নাগরিক আন্দোলনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকার যোগ্য।
স্বপন সেন সেই নাগরিক চেতনার একজন নিবেদিত কর্মী ছিলেন। তাঁর কাছে চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে কেবল রাস্তা, ভবন কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন, নাগরিক মর্যাদার প্রতিষ্ঠা এবং একটি মানবিক নগর গড়ে তোলা।
তিনি যে আদর্শ ও নাগরিক চেতনা ধারণ করতেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ একটি শহর তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়ে ওঠে, যখন সেই শহরের মানুষ ন্যায়সংগত অধিকার পায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করে এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ লাভ করে।
স্বপন সেনের মতো সংগঠকদের স্মরণ করা তাই শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; এটি বর্তমানের দায়িত্বকে উপলব্ধি করা এবং ভবিষ্যতের জন্য নাগরিক দায়বদ্ধতাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা।
যুক্তির দীপ্তি, সাহসী উচ্চারণ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা
স্বপন সেনের ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর যুক্তিনির্ভর বক্তব্য। তিনি কথা বলতেন স্পষ্টভাবে, নিজের অবস্থান তুলে ধরতেন দৃঢ়তার সঙ্গে। কোনো আলোচনা কিংবা সভায় তাঁর উপস্থিতি সহজেই মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করত। তাঁর বক্তব্যে ছিল চিন্তার গভীরতা, যুক্তির ধার এবং নিজের বিশ্বাসের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়।
তাঁর সঙ্গে আলোচনার স্মৃতি আজও আমার কাছে মূল্যবান। মতের অমিল থাকলেও যুক্তির মাধ্যমে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার যে সংস্কৃতি একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অপরিহার্য, তাঁর মধ্যে তার প্রতিফলন দেখেছি। তিনি শুধু নিজের কথা বলতেন না, বরং প্রশ্ন তুলতেন, আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতেন এবং মানুষকে ভাবতে উৎসাহিত করতেন।
সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি উপলব্ধি করতেন, সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না; মানুষের চিন্তা, মনন, বিবেক ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই কারণেই স্বপন সেনকে আমার কাছে শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে মনে হয় না। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর মধ্যে রাজনৈতিক বিশ্বাস, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
ব্যক্তিজীবনে সরল, আদর্শে দৃঢ়, মানুষের কাছে আপন
স্বপন সেনের জীবনযাপন ছিল ব্যক্তিগত জাঁকজমক কিংবা ভোগবিলাসের প্রদর্শন থেকে দূরে। তিনি ছিলেন নিঃস্বার্থ সমাজকর্মী, যাঁর জীবনের বড় অংশজুড়ে ছিল মানুষের জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষা। ব্যক্তিগত সংসারজীবনের প্রচলিত আয়োজনের বাইরে থেকেও তিনি অসংখ্য মানুষের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন।
মানুষের আপন হওয়ার জন্য রক্তের সম্পর্কই সব নয়। কখনো কখনো দীর্ঘদিনের সহমর্মিতা, বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানো, মানুষের দুঃখে ব্যথিত হওয়া এবং ন্যায়ের পক্ষে একসঙ্গে লড়াই করার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে আত্মার সম্পর্ক। স্বপন সেনের সঙ্গে আমার সম্পর্কের মধ্যেও সেই আত্মিক বন্ধনের ছাপ ছিল।
আজ তাঁর অনুপস্থিতি আমাকে সেই সত্যটিই নতুন করে উপলব্ধি করায়। একজন মানুষ চলে গেলে তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়গুলোও যেন অন্য এক অর্থ ধারণ করে। যে কথাগুলো একসময় স্বাভাবিক মনে হয়েছিল, সেগুলোই হয়ে ওঠে অমূল্য স্মৃতি। যে মানুষটিকে প্রতিদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পরিসরে দেখেছি, তাঁর অনুপস্থিতিই একদিন বুঝিয়ে দেয়, তিনি আমাদের জীবনে কতখানি জায়গা জুড়ে ছিলেন।
স্বপন সেনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কাটানো দিনগুলো এখন স্মৃতির সম্পদ। তাঁর উচ্চারিত যুক্তি, তাঁর প্রতিবাদী অবস্থান এবং মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ আজও আমাকে নাড়া দেয়।
এক বছর পরও কেন এত মনে পড়ে স্বপন সেনকে?
মৃত্যুর পর একটি বছর খুব বেশি সময় নয়, আবার শোকের ভার বহন করা মানুষের কাছে একটি বছর অনেক দীর্ঘও। এই সময়ের মধ্যে প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতিকে মেনে নিতে হয়, দৈনন্দিন জীবনে ফিরে যেতে হয়, নতুন কাজের দায়িত্ব নিতে হয়। কিন্তু কিছু শূন্যতা থাকে, যা কোনো সময়ের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না।
স্বপন সেনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছে, আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাইনি; হারিয়েছি আমাদের আন্দোলনের সময়কার একজন পরিচিত মুখ, একজন অভিজ্ঞ সহযোদ্ধা এবং প্রগতিশীল চেতনার একজন নিবেদিত কর্মীকে।
রাজপথের আন্দোলনে যাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছি, তাঁদের প্রত্যেকেরই জীবনে একটি বিশেষ স্থান থাকে। তাঁরা আমাদের সাহস জুগিয়েছেন, সংকটে মনোবল বাড়িয়েছেন, কখনো মতের অমিলের মধ্য দিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছেন। স্বপন সেন ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
তাঁর চলে যাওয়ার এক বছর পরও মনে হয়, প্রগতিশীল আন্দোলনের কোনো এক আলোচনায় তাঁকে খুব প্রয়োজন ছিল। নাগরিক অধিকারের কোনো প্রশ্নে তাঁর যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য শুনতে ইচ্ছে করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কোনো মুহূর্তে তাঁর সেই দৃঢ় কণ্ঠস্বর যেন আবার শুনতে চাই।
কিন্তু জীবন ও মৃত্যুর নির্মম সত্য আমাদের মেনে নিতেই হয়। মানুষ ফিরে আসে না, কিন্তু তার রেখে যাওয়া আদর্শকে ফিরিয়ে আনা যায়। তার অসমাপ্ত স্বপ্নকে এগিয়ে নেওয়া যায়। তার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্মকে মানবিক ও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রেরণা দেওয়া যায়।
স্বপন সেনকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ পথও বোধ হয় এটাই।
স্বপন সেনের স্মৃতি আমাদের দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়
আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমি শুধু শোক প্রকাশ করতে চাই না; তাঁর জীবন ও আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের নিজেদের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করতে চাই।
আমরা যাঁরা একসময় প্রগতিশীল আন্দোলনের স্বপ্ন দেখেছি, যাঁরা নাগরিক অধিকার ও মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে সোচ্চার থেকেছি, তাঁদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে সেই চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার। নতুন প্রজন্মের কাছে আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা, মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেতন থাকা এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া আজও জরুরি।
একজন মানুষের মৃত্যু তাঁর সংগ্রামের সমাপ্তি হতে পারে, কিন্তু তাঁর আদর্শের সমাপ্তি হওয়া উচিত নয়। স্বপন সেনের স্মৃতিকে সত্যিকার অর্থে সম্মান জানাতে হলে তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্রগতির পক্ষে, মানবতার পক্ষে, ন্যায় ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে আমাদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
আমি বিশ্বাস করি, চট্টগ্রামের প্রগতিশীল আন্দোলন, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং মানবিক সমাজ গঠনের প্রত্যাশার সঙ্গে স্বপন সেনের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তাঁর অবদান নিয়ে আলোচনা হোক, তাঁর কর্মময় জীবনের স্মৃতি সংরক্ষিত হোক এবং নতুন প্রজন্ম জানুক, এই নগরীতে এমন মানুষও ছিলেন, যাঁরা ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সমাজ ও মানুষের কল্যাণকে বড় করে দেখেছেন।
প্রিয় স্বপন সেন, আপনি নেই, কিন্তু আপনার স্মৃতি আছে
প্রিয় স্বপন সেন, আজ আপনার চলে যাওয়ার এক বছর। সময়ের হিসাবে বারোটি মাস পেরিয়ে গেছে, অথচ আপনাকে হারানোর বেদনা আজও মলিন হয়নি। আপনার সঙ্গে পরিচয়ের সেই আশির দশকের দিনগুলো থেকে শুরু করে দীর্ঘ পথচলার কত স্মৃতি আজ মনের ভেতর এসে ভিড় করছে।
মনে পড়ে, আমরা একসময় কত স্বপ্ন দেখতাম। কত কথা বলতাম সমাজ পরিবর্তনের, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার, একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়ে তোলার। সেই স্বপ্নের পথ সহজ ছিল না। ছিল মতপার্থক্য, ছিল প্রতিকূলতা, ছিল হতাশার মুহূর্ত। তবু আমরা বিশ্বাস হারাতে চাইনি। কারণ আমরা জানতাম, মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন কখনোই বৃথা যায় না।
আজ আপনি নেই। কিন্তু আপনার সঙ্গে কাটানো দিনগুলো আমার জীবনের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। আপনার স্মৃতি আমাকে মনে করিয়ে দেয়, জীবনের প্রকৃত সার্থকতা কতটা অর্জন করলাম, তার মধ্যে নয়; বরং কতটা মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারলাম, কতটা সত্যের পক্ষে কথা বলতে পারলাম এবং কতটা মানবিক হতে পারলাম, তার মধ্যেই নিহিত।
আপনার মতো সহযোদ্ধাকে হারানো আমার ব্যক্তিগত বেদনা। আবার আপনার মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষের অনুপস্থিতি চট্টগ্রামের প্রগতিশীল ও নাগরিক আন্দোলনেরও এক অপূরণীয় শূন্যতা।
আপনি যেখানে থাকুন, আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আপনার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে। আপনার জীবন, আপনার আদর্শ, আপনার সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেবে, মানুষ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের জন্য করা মহৎ কাজ সময়ের সীমা অতিক্রম করে বেঁচে থাকে।
স্বপন সেন, আপনি চলে গেছেন এক বছর আগে, কিন্তু আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাননি। আপনার অনুপস্থিতি আজও অনুভব করি, আপনার সঙ্গে কাটানো দিনগুলো আজও মনে পড়ে, আর আপনার আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজও বলতে চাই, মানুষের জন্য যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁরা কখনোই সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যান না।
চট্টগ্রামের প্রগতির ইতিহাসে, নাগরিক আন্দোলনের স্মৃতিতে এবং আমার ব্যক্তিগত জীবনপথের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আপনি থাকবেন চিরস্মরণীয় হয়ে।
প্রিয় সহযোদ্ধা স্বপন সেন, আপনার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা।
আপনি নেই, কিন্তু আপনার স্মৃতি আছে। আপনি নীরব, কিন্তু আপনার আদর্শের ভাষা আজও আমাদের হৃদয়ে উচ্চারিত হয়।
আপনার প্রতি লাল সালাম, প্রিয় সহযোদ্ধা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here