বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের স্মরণসভায় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান
মোঃ রাকিব, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও নাগরিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা দুই কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব নূর আহমদ চেয়ারম্যান ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম। তাঁদের জীবন, কর্ম, আদর্শ ও জনকল্যাণমূলক অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং চট্টগ্রামের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিকেল ৫টায় নগরীর মোমিন রোডস্থ চট্টগ্রাম একাডেমি হলে এ যৌথ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।
স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রথম মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে তিনি চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়ন, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, নাগরিক স্বার্থ রক্ষা এবং কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত শাহ আমানত সেতু টোলমুক্ত করার দাবিসহ গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য দেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী শাহ আমানত সেতুর টোল আদায়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি সেতু নির্মাণে কুয়েত সরকারের অনুদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, জনসাধারণের চলাচল ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে নির্মিত এই সেতুতে দীর্ঘদিন ধরে যানবাহন থেকে টোল আদায় করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এখন সময় এসেছে সেতুটিকে টোলমুক্ত করার দাবিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। তিনি বলেন, শাহ আমানত সেতু চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল, কর্ণফুলী নদীর দুই তীর এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। টোল আদায়ের কারণে পরিবহন খাত ও সাধারণ মানুষের ওপর যে আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়, তা বিবেচনায় নিয়ে সেতুটি টোলমুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে টোল আদায় অব্যাহত থাকায় এ বিষয়ে নতুন করে জনস্বার্থের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। শাহ আমানত সেতু টোলমুক্ত করার দাবিকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। প্রধান অতিথি বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনের আগ্রহও প্রকাশ করেন। তাঁর এ আগ্রহকে চট্টগ্রামের নাগরিক সমস্যা সমাধান, জনস্বার্থ রক্ষা ও আঞ্চলিক উন্নয়নের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্মরণসভায় চট্টগ্রাম পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে একনাগাড়ে ৩৩ বছর দায়িত্ব পালনকারী নূর আহমদ চেয়ারম্যানের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে পৌর প্রশাসনের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি চট্টগ্রামের নাগরিক জীবনের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছেন। বক্তারা বলেন, একটি নগরের উন্নয়ন কেবল রাস্তাঘাট, অবকাঠামো কিংবা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষা, জনকল্যাণ, নাগরিক সচেতনতা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্ন। নূর আহমদ চেয়ারম্যানের দীর্ঘ জনসেবামূলক জীবন ও শিক্ষানুরাগী ভূমিকা চট্টগ্রামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর কর্মময় জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী প্রজন্মকে জনসেবা, দায়িত্ববোধ ও মানবকল্যাণের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা। স্মরণসভায় বিশিষ্ট আলেম, রাজনীতিবিদ, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসংস্কারক মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর জীবন ও কর্ম নিয়েও আলোচনা করা হয়। শিক্ষা বিস্তার, নারীশিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সমাজসংস্কার এবং জনকল্যাণে তাঁর অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন আলোচকেরা। বক্তারা বলেন, একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার প্রসার, যুক্তিবোধ, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ অপরিহার্য। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর জীবন ও আদর্শ সেই বৃহত্তর সামাজিক অগ্রযাত্রার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
তাঁর মতো মনীষীদের অবদান ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়। বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে আয়োজিত এ স্মরণসভায় চট্টগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ, নাগরিক সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিগুলোকে সংগঠিতভাবে তুলে ধরার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন গবেষক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক দুলাল কান্তি বড়ুয়া। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি। বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ অঞ্চলের উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যার সমাধানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের ন্যায্য দাবি তুলে ধরা, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের অবদান সংরক্ষণ এবং জনস্বার্থে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নাগরিক ফোরামকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। স্মরণসভায় বক্তব্য দেন গবেষক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন, অধ্যক্ষ মুহাম্মদ সানাউল্লাহ, চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক দুলাল কান্তি বড়ুয়া, ভাস্কর ডি. কে. দাশ মামুন, মো. শওকত আলী, মোহাং মনছুর আলম, মো. লায়েক আলী, মো. আবদুল মান্নান, মো. নুরুল আলম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. গোলাম নবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, মো. মাহফুজুর রহমান, মো. কামাল উদ্দিন, রিজাউর রহমান, মো. ওসমান, ইমন সৈয়দ, মো. জামাল, অরূপ দাশ, মো. গোলাম মওলা চৌধুরী, এস এম সিকদার উদ্দিন, এম নুরুল হুদা চৌধুরী, মো. সেলিম উল্লাহ চৌধুরী, এস এম আবুল হাশেম, মো. আলমগীর চৌধুরী, সাইফ আজাদ, মার্জিনা আক্তার, মিলন বৈদ্য শুভ, মোহাম্মদ ইব্রাহিম, মো. কুতুব উদ্দিন, আলহাজ নেজাম, মো. নুরুল, মো. মহসীন, মো. ইকবাল, মো. নুর কাশেম, মোহাম্মদ হোছাইন, মুহাম্মদ আক্তার হোসাইন, দিল আফরোজ, এস এম নুর নবী জনি, একেএম ওসমান গনি, বাউল জুয়েল ও মোহাম্মদ উদ্দিনসহ অন্যরা। নূর আহমদ চেয়ারম্যান ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে আয়োজিত এ স্মরণসভা চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নাগরিক দায়িত্ববোধের বিষয়গুলো নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে শাহ আমানত সেতু টোলমুক্ত করার দাবির মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনায় স্থান পাওয়ায় সভাটি নাগরিক অধিকার ও আঞ্চলিক উন্নয়ন নিয়ে মতবিনিময়ের একটি উপলক্ষ হয়ে ওঠে। বক্তারা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, অতীতের কৃতী ব্যক্তিদের জীবন ও আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে চট্টগ্রামের উন্নয়ন, জনকল্যাণ এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করবেন। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষের কল্যাণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে আগামীর উন্নত, মানবিক ও সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম।

