চট্টগ্রামের ইতিহাসে নূর আহমদ চেয়ারম্যান এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়

0
11

৬২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম ও চট্টগ্রাম ইতিহাসের পাঠশালার যৌথ উদ্যোগে শ্রদ্ধা নিবেদন
কবর জিয়ারত, পুষ্পস্তবক অর্পণ, স্মৃতিচারণ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রামের শিক্ষা, নাগরিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব মরহুম নূর আহমদ চেয়ারম্যানের ৬২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কবর জিয়ারত, স্মৃতিচারণ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেল ৫টায় নগরের আলকরণে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম ও চট্টগ্রাম ইতিহাসের পাঠশালা।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব, বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও সংগঠক মো. কামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও দোয়া মাহফিলে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা নূর আহমদ চেয়ারম্যানের কর্মময় জীবন, শিক্ষাবিস্তারে ঐতিহাসিক অবদান এবং চট্টগ্রাম নগরের উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লায়ন দুলাল কান্তি বড়ুয়া, লেখক আবদুর রহিম, ভাস্কর ডি কে দাশ মামুন, এম. নুরুল হুদা চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম নবী, মোহাম্মদ হোসাইন, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ-দীনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
এ সময় মরহুম নূর আহমদ চেয়ারম্যানের নাতনি কানিজ ফাতিমা জাহরা রুমা এবং নাতি মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ ইকবাল, মোহাম্মদ জিনাত আলী ও মোহাম্মদ লায়েক আলী উপস্থিত থেকে তাঁদের পূর্বপুরুষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
৩৩ বছরের পৌর নেতৃত্ব, শিক্ষা ও জনকল্যাণে অনন্য অবদান
বক্তারা বলেন, নূর আহমদ চেয়ারম্যান ছিলেন চট্টগ্রামের ইতিহাসে একজন দূরদর্শী জননেতা, শিক্ষানুরাগী ও মানবকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিত্ব। ১৯২১ সালে চট্টগ্রাম পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩ বছর তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে নগরের শিক্ষা বিস্তার ও নাগরিক সেবার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ গৃহীত হয়।
তাঁর জীবনের অন্যতম ঐতিহাসিক অবদান ছিল চট্টগ্রাম পৌর এলাকায় বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের উদ্যোগ। শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করা, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি শিক্ষার আলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সচেষ্ট ছিলেন।
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সড়কে বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপন, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা এবং নগরের নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকা চট্টগ্রামের সামাজিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বঙ্গীয় আইন পরিষদ ও পাকিস্তান গণপরিষদে তাঁর ভূমিকা তাঁকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরেও পরিচিত করে তোলে।
ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মকে জানার আহ্বান
আলোচনায় বক্তারা বলেন, একটি নগরের ইতিহাস শুধু তার স্থাপনা ও অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সেই ইতিহাসের প্রকৃত নির্মাতা হলেন দূরদর্শী মানুষ, যাঁদের চিন্তা ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথ দেখায়। নূর আহমদ চেয়ারম্যান তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন থেকে সততা, দায়িত্ববোধ, শিক্ষানুরাগ ও জনসেবার শিক্ষা গ্রহণ করা যায়।
তাঁর অবদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ, জীবনী ও ঐতিহাসিক দলিল সংগ্রহ এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর কর্মময় জীবন তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা মনে করেন, চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা, আলোচনা এবং স্মরণমূলক আয়োজন অব্যাহত থাকলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের নগরের গৌরবময় অতীত সম্পর্কে আরও সচেতন হবে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম ও চট্টগ্রাম ইতিহাসের পাঠশালার এ যৌথ উদ্যোগকে চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি স্মরণীয় প্রয়াস হিসেবে দেখা হয়।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে মরহুম নূর আহমদ চেয়ারম্যানের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
নূর আহমদ চেয়ারম্যানের জীবন ও কর্ম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর পদমর্যাদায় নয়, বরং মানুষের কল্যাণে রেখে যাওয়া অবদানে। চট্টগ্রামের ইতিহাসে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here