“অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব নূর আহমদ চেয়ারম্যান: শিক্ষা, সততা ও জনসেবার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র-“”৬২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি”‘

0
27

মো. কামাল উদ্দিন
ইতিহাসের পাতায় অনেক মানুষের নাম লেখা থাকে, কিন্তু সবার নাম মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিতে পারে না। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি কিংবা ব্যক্তিগত সাফল্য দিয়ে নয়, মানুষের কল্যাণে নিবেদিত কর্মের মধ্য দিয়েই কেউ কেউ হয়ে ওঠেন কালজয়ী। তাঁদের জীবন নিছক ব্যক্তিগত অর্জনের ইতিহাস নয়; বরং একটি জনপদের জাগরণ, একটি সমাজের পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা। চট্টগ্রামের ইতিহাসে তেমনই এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব নূর আহমদ চেয়ারম্যান। সততা, শিক্ষানুরাগ, দূরদর্শিতা ও নিঃস্বার্থ জনসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে তিনি আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
আজ ২২ অক্টোবর ২০২৬, তাঁর ৬২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৬৪ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের আলকরণে নিজ বাসভবনে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর ছয় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর কর্মময় জীবন, শিক্ষাবিস্তারে অসামান্য অবদান এবং জনকল্যাণমুখী চিন্তাধারা চট্টগ্রামের ইতিহাসে অমলিন হয়ে রয়েছে।
জন্ম, শিক্ষাজীবন ও অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর
১৮৯০ সালের ২৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরের আলকরণ মহল্লার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নূর আহমদ। তাঁর পিতা হাজী আমজাদ আলী সওদাগর ছিলেন পরিচিত ব্যবসায়ী এবং মাতা পেয়ারজান বিবি। শৈশব থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। মেধা, অধ্যবসায় ও জ্ঞানপিপাসা তাঁকে ক্রমাগত সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল থেকে ১৯১০ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। ১৯১২ সালে এফএ এবং ১৯১৫ সালে আরবি ও ফারসি ভাষায় সম্মানসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৬ সালে ইতিহাসে এমএ পরীক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেন চ্যান্সেলর স্বর্ণপদক। ১৯১৭ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএল ডিগ্রিও অর্জন করেন।
তাঁর এই শিক্ষাজীবন কেবল ব্যক্তিগত মেধার পরিচয় বহন করে না; বরং প্রমাণ করে, জ্ঞান ও যোগ্যতাকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর প্রস্তুতি তিনি জীবনের প্রথম পর্ব থেকেই গ্রহণ করেছিলেন।
আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি চট্টগ্রাম জজ আদালতে আইন পেশায় যুক্ত হন। কিন্তু পেশাগত সাফল্য কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা তাঁকে জনসেবার বৃহত্তর ক্ষেত্র থেকে দূরে রাখতে পারেনি। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং নগরজীবনের মৌলিক সমস্যার সমাধান হয়ে ওঠে তাঁর কর্মজীবনের প্রধান লক্ষ্য।
৩৩ বছরের পৌর নেতৃত্ব: ক্ষমতা নয়, দায়িত্বের প্রতীক
১৯১৮ সালে চট্টগ্রাম পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে নূর আহমদ চেয়ারম্যানের জনপ্রতিনিধিত্বমূলক রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। তিন বছর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯২১ সালে তিনি চট্টগ্রাম পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এরপর দীর্ঘ ৩৩ বছর, ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত, তিনি এই দায়িত্বে বহাল ছিলেন। অবশেষে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ঐতিহাসিক তথ্যেও ১৯২১ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তাঁর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
এই দীর্ঘ সময়কাল শুধু একটি প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত থাকার ইতিহাস নয়; এটি ছিল একটি নগরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা, নাগরিক সেবার পরিধি বাড়ানো এবং শিক্ষার আলো সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার নিরলস প্রচেষ্টা।
তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে জনস্বার্থকে স্থান দেওয়া। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি পৌরসভা থেকে কোনো ভাতা গ্রহণ করতেন না। জনসেবাকে তিনি জীবিকার উপায় কিংবা ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন।
আজকের দিনে যখন জনপ্রতিনিধিদের কাছে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রত্যাশা ক্রমাগত বাড়ছে, তখন নূর আহমদ চেয়ারম্যানের জীবন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—জনগণের আস্থা অর্জন করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা: তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি
নূর আহমদ চেয়ারম্যানের জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় নিঃসন্দেহে চট্টগ্রামে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে তাঁর ঐতিহাসিক উদ্যোগ।
তৎকালীন চট্টগ্রাম নগরে শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। দরিদ্র পরিবারের বহু শিশু অর্থাভাবে বিদ্যালয়ে যেতে পারত না। মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও ছিল সামাজিক বাধা, অবহেলা ও অনীহা। এই বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। অশিক্ষা মানুষের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে, দারিদ্র্যের চক্রকে দীর্ঘায়িত করে এবং একটি জাতির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই নগর উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষাবিস্তারের প্রশ্নকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।
১৯২৭ সালে চট্টগ্রাম পৌর এলাকায় বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন তিনি। ১৯২৮ সালে মেয়েদের জন্যও এই শিক্ষাব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সে সময়ের সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় এটি ছিল সাহসী, দূরদর্শী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
তবে শুধু ঘোষণা দিয়ে তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি। শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর করতে প্রয়োজন ছিল বিদ্যালয়, শিক্ষক, অর্থ, জনসমর্থন এবং নিয়মিত তদারকি। পৌরসভার সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেই তিনি এসব বাধা অতিক্রম করার চেষ্টা করেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য বিত্তবান ও দানশীল ব্যক্তিদের সহযোগিতা কামনা করেন। বিদ্যালয়ের জন্য জায়গা সংগ্রহে উদ্যোগী হন। শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল করা, মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের পাঠদানের কার্যক্রম তদারকির জন্য পরিদর্শক নিয়োগের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
তাঁর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—শিক্ষা যেন কেবল ধনী ও সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের অধিকার হয়ে না থাকে; বরং নগরের প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষার দরজা উন্মুক্ত হয়।
নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর দূরদর্শিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো মানে কেবল একটি শিশুকে শিক্ষিত করা নয়; বরং একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং বৃহত্তর সমাজকে আলোকিত করার পথ তৈরি করা। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি মেয়েদের শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা বিভাগও তাঁর এই উদ্যোগকে নগরের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত তাঁর শিক্ষাবিপ্লব
নূর আহমদ চেয়ারম্যানের শিক্ষাবিস্তারের উদ্যোগ যে কেবল চট্টগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তৎকালীন আইন পরিষদ ও গণপরিষদের আলোচনাতেও তার স্বীকৃতি পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৪২ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বঙ্গীয় আইন পরিষদে চট্টগ্রাম পৌর এলাকায় শিক্ষার অগ্রগতির প্রশংসা করেন এবং এ ক্ষেত্রে নূর আহমদের অবদানের স্বীকৃতি দেন।
একইভাবে ১৯৫২ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের বক্তব্যেও চট্টগ্রাম পৌর এলাকার শিক্ষার অগ্রগতির বিষয়টি উঠে আসে। ওই সময়ের পরিষদীয় কার্যবিবরণী থেকে এসব বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ পাঠ যাচাই করে উদ্ধৃতি প্রকাশ করা সমীচীন।
এসব ঐতিহাসিক উল্লেখের মূল তাৎপর্য হলো, একজন পৌর চেয়ারম্যানের উদ্যোগ কীভাবে বৃহত্তর প্রশাসনিক ও জাতীয় পরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
তাঁর মেয়াদকালে চট্টগ্রাম পৌরসভার পরিচালনায় প্রায় ৬২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত বা পরিচালিত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার সুযোগ নগরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৬২ সালে আলকরণে পৌর প্রাথমিক বালক বিদ্যালয়কে নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে নূর আহমদের নাম যুক্ত করা হয় বলে প্রকাশিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর নামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের নামকরণই তাঁর অবদানের একমাত্র মাপকাঠি নয়। তাঁর প্রকৃত কৃতিত্ব হলো, তিনি এমন একটি চিন্তার বীজ বপন করেছিলেন, যার ফল পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষাজীবনে ছড়িয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও উচ্চশিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রসঙ্গেও নূর আহমদ চেয়ারম্যানের নাম বিশেষভাবে আলোচিত হয়। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপনের উদ্যোগ নেন। এ উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম পৌরসভার পক্ষ থেকে পাঁচশ টাকার একটি চেক শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কাছে হস্তান্তরের কথাও বিভিন্ন প্রকাশিত লেখায় উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর এই উদ্যোগের তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের যেন দূরবর্তী নগর কিংবা অন্য অঞ্চলের ওপর নির্ভর করতে না হয়, সে চিন্তার সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও আঞ্চলিক অগ্রগতির প্রশ্ন জড়িত ছিল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব এককভাবে কাউকে না দিয়ে, এর প্রাথমিক চিন্তা ও উদ্যোগের ইতিহাসে নূর আহমদের ভূমিকা যথাযথ দলিলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করার জন্য যেমন অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হয়, তেমনি প্রত্যেক অবদানের সঠিক সীমা ও প্রেক্ষাপটও নির্ধারণ করতে হয়। নূর আহমদ চেয়ারম্যানের স্মৃতির প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও এই নীতিই অনুসরণযোগ্য।
নাগরিক সেবায় আধুনিক চট্টগ্রাম গড়ার প্রয়াস
নূর আহমদ চেয়ারম্যানের চিন্তা শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি নগরকে বাসযোগ্য করতে হলে নাগরিকদের জন্য সুপেয় পানি, আলোকিত সড়ক, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পাঠাগারের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাঁর উদ্যোগে দামপাড়ায় পানি সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, নগরের বিভিন্ন স্থানে পানির কল স্থাপন এবং রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কথা ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। এসব উদ্যোগ তখনকার চট্টগ্রামের নাগরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিল।
লালদীঘি পাড়ের মিউনিসিপ্যাল পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে। একটি পাঠাগার শুধু বই রাখার স্থান নয়; এটি জ্ঞানচর্চা, মননশীলতা ও সামাজিক অগ্রগতির কেন্দ্র। শিক্ষাবিস্তারের পাশাপাশি পাঠাগার গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের চিন্তার জগৎ সমৃদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করেছিলেন।
নগরের দরিদ্র মানুষের দুর্দশা লাঘবেও তিনি সহানুভূতিশীল ছিলেন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে যেসব মানুষ পৌরকর দিতে সমস্যায় পড়তেন, তাঁদের কর মওকুফ বা করের বোঝা লাঘবের বিষয়ে তিনি উদার মনোভাব দেখাতেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাঁর জনসেবার একটি সামগ্রিক রূপ ফুটে ওঠে। তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষা যেমন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে, তেমনি সুপেয় পানি, আলো, পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সুবিধা মানুষের বর্তমান জীবনকে স্বস্তিদায়ক করে তোলে।
বঙ্গীয় আইন পরিষদ ও পাকিস্তান গণপরিষদে তাঁর ভূমিকা
জনগণের আস্থা ও রাজনৈতিক যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ নূর আহমদ ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদেও দায়িত্ব পালন করেন।
স্থানীয় সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁকে বৃহত্তর আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয়। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট আইন, সামাজিক সংস্কার এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
প্রজাস্বত্ব আইন, সূর্যাস্ত আইনের বিলোপ, যৌতুকপ্রথা প্রতিরোধ এবং ওয়াক্‌ফ ও দেবোত্তর সম্পত্তিসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের আলোচনায় তাঁর ভূমিকার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক লেখায় পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে তাঁর নির্দিষ্ট প্রস্তাব, সংশোধনী ও ভোটের বিবরণ মূল পরিষদীয় নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পাকিস্তান গণপরিষদে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসংক্রান্ত বিল উত্থাপনের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িত। ওই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠনের পথ সুগম হয় বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
চট্টগ্রামে মেরিন শিক্ষার প্রসারেও তাঁর অবদান স্মরণ করা হয়। মেরিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি সমুদ্রবন্দরনির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও পেশাগত সম্ভাবনার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন।
চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও কার্যকর ও উন্নত করার বিষয়ে তিনি পৌরসভার প্রতিনিধি হিসেবে পোর্ট কমিশনারের দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রস্তাব ও সংস্কারমূলক আলোচনায় অংশ নেন বলে প্রকাশিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এভাবেই স্থানীয় সরকারের অভিজ্ঞতা, জাতীয় পর্যায়ের আইন প্রণয়ন এবং শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নের চিন্তাকে তিনি একই সূত্রে যুক্ত করেছিলেন।
ভাষা, জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যসাধনা
নূর আহমদ চেয়ারম্যান কেবল জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত একজন লেখকও। পৌরসভা পরিচালনা, রাজনৈতিক দায়িত্ব ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি লেখালেখির চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন।
ইংরেজি ভাষায় তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ইসলাম, ইতিহাস, শিক্ষা, মুসলিম মনীষীদের জীবন এবং সমকালীন সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ছিল তাঁর লেখার আলোচ্য বিষয়। তাঁর পরিচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে Forty Great Men and Women in Islam, The Rising Islam, Education and Educational Problems এবং Glimpses of Islam।
তাঁর গ্রন্থসমূহের তালিকা ও প্রকাশকাল নিয়ে বিভিন্ন জীবনীতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে তাঁর জ্ঞানচর্চা ও লেখালেখির ব্যাপ্তি সম্পর্কে একটি বিষয় স্পষ্ট—জনজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি অধ্যয়ন, চিন্তা ও লেখাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরে রেখেছিলেন।
একজন জননেতার মধ্যে যখন প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সাহিত্যিক মনন একত্রিত হয়, তখন তাঁর চিন্তার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। নূর আহমদের জীবনেও এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।
ভাষার অধিকার ও গণপরিষদে বাংলার প্রশ্ন
নূর আহমদ চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁর ভূমিকার উল্লেখ।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে ১৯৫২ সালের ১০ এপ্রিল পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপনের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত রয়েছে। ভাষার প্রশ্নে তাঁর এই অবস্থানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হলে গণপরিষদের মূল কার্যবিবরণী ও সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল পাঠ করা প্রয়োজন।
বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক অধিকার ও রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সেই ঐতিহাসিক পর্বে একজন চট্টগ্রামের প্রতিনিধির ভূমিকা স্মরণ করা আমাদের আঞ্চলিক ইতিহাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে জনকল্যাণ
নূর আহমদ চেয়ারম্যানের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার। তিনি জানতেন, একটি পদ মানুষের কাছে সম্মান এনে দিতে পারে; কিন্তু সেই সম্মান স্থায়ী হয় কেবল দায়িত্বশীলতা, সততা ও জনকল্যাণের মাধ্যমে।
ব্রিটিশ সরকার তাঁর সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘খান সাহেব’ উপাধি দেওয়ার প্রস্তাব করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনা তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। রাষ্ট্রীয় সম্মান বা ব্যক্তিগত উপাধির চেয়ে তিনি জনসেবার আদর্শকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষা, পানি সরবরাহ, সড়কবাতি, পাঠাগার, বন্দর উন্নয়ন ও আইন প্রণয়নের মতো নানা ক্ষেত্রে কাজের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা প্রমাণ করে জনসেবাকে তিনি বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে নগর উন্নয়ন ছিল একটি সামগ্রিক দায়িত্ব।
মানুষের প্রয়োজন বোঝা, সীমিত সম্পদের মধ্যেও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরি করা—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক।
আজকের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসক, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীদের জন্য তাঁর জীবন তাই কেবল স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; বরং দায়িত্ব পালনের একটি মূল্যবান পাঠ।
প্রয়াণ: মানুষ চলে যান, কর্ম থেকে যায়
১৯৬৪ সালের ২২ অক্টোবর চট্টগ্রামের আলকরণে নিজ বাসভবনে নূর আহমদ চেয়ারম্যানের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি কর্মময় জীবনের অবসান হলেও তাঁর রেখে যাওয়া অবদান মুছে যায়নি।
চট্টগ্রাম নগরের শিক্ষা ও নাগরিক উন্নয়নের ইতিহাসে তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয়। তাঁর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি সময়ের সংগ্রাম, একটি শহরের অগ্রযাত্রা এবং শিক্ষার আলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
তিনি এমন এক সময়ে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন, যখন প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা ছিল সীমিত, নগর ব্যবস্থাপনা ছিল কঠিন এবং শিক্ষাবিস্তারের পথ ছিল নানা প্রতিবন্ধকতায় পূর্ণ। সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি যে উদ্যোগগুলো গ্রহণ করেছিলেন, সেগুলো তাঁর দূরদর্শিতা ও কর্মনিষ্ঠার পরিচয় বহন করে।
তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসে স্থায়ী আসন লাভের জন্য বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া কিংবা অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী হওয়া অপরিহার্য নয়। প্রয়োজন মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, সত্যনিষ্ঠা এবং বৃহত্তর কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার মানসিকতা।
৬২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার
আজ নূর আহমদ চেয়ারম্যানের ৬২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে শুধু অতীতের একজন মহান মানুষকে স্মরণ করা নয়; বরং তাঁর আদর্শকে বর্তমানের জীবনে ধারণ করার অঙ্গীকার করা।
আমরা কি আমাদের শিশুদের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারছি? দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ কতটা সহজ করতে পেরেছি? নগরবাসীর সুপেয় পানি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও নিরাপদ চলাচলের অধিকার কতটা নিশ্চিত হয়েছে? জনপ্রতিনিধিত্ব কি সত্যিকার অর্থেই জনসেবার সমার্থক হয়ে উঠেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই নূর আহমদ চেয়ারম্যানের স্মৃতির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা অর্থবহ হতে পারে।
তাঁর নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ কিংবা স্মরণসভা আয়োজন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষার প্রসার, সুশাসন, সততা, মানবিকতা এবং জনকল্যাণের যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন, সেগুলো বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা।
চট্টগ্রামের ইতিহাসে নূর আহমদ চেয়ারম্যান একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি ছিলেন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা, নাগরিক সেবার একনিষ্ঠ সংগঠক এবং জনস্বার্থে নিবেদিত একজন দূরদর্শী জনপ্রতিনিধি। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, সত্যিকারের নেতৃত্বের শক্তি পদমর্যাদায় নয়, মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সামর্থ্যে।
আজ তাঁর ৬২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই মহান ব্যক্তিত্বকে। তাঁর কর্মময় জীবন ও জনকল্যাণের আদর্শ নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করুক। চট্টগ্রামের মানুষ তাঁর অবদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করুক, গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করুক এবং তাঁর স্বপ্নের শিক্ষিত, মানবিক ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে সচেষ্ট হোক।
মহৎ মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু তাঁদের কর্মের মৃত্যু হয় না। নূর আহমদ চেয়ারম্যান সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁর জীবন ও কর্ম চট্টগ্রামের ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here