Home Blog Page 13

ঢাকা–কক্সবাজার আকাশপথে ভাড়ার নৈরাজ্য বন্ধ করুন | “পর্যটন রাজধানীকে জিম্মি করে বিমানভাড়া বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া যায় না” | সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডের

ঢাকা–কক্সবাজার আকাশপথে বিমানভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অস্বাভাবিক ওঠানামা ও যাত্রীভোগান্তি চলছে, তা কোনোভাবেই একটি পর্যটননির্ভর জেলার জন্য কাম্য হতে পারে না। আমরা মনে করি, বিমানভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজারব্যবস্থার পাশাপাশি কার্যকর সরকারি নজরদারি ও জবাবদিহিতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কক্সবাজার শুধু একটি জেলা শহর নয়—এটি বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের পর্যটক, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, সাংবাদিক, গবেষক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজার এখন আন্তর্জাতিক মানবিক কার্যক্রমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অতিথিরা এখানে আসেন। ফলে ঢাকা–কক্সবাজার বিমান যোগাযোগের ভাড়া, মান ও নির্ভরযোগ্যতা শুধু স্থানীয় যাত্রীদের বিষয় নয়—এটি বাংলাদেশের পর্যটন ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। প্রশ্ন হচ্ছে—ভাড়া নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণ কোথায়? একই রুটে কোনো কোনো সময়ে বিমানভাড়া এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। একজন যাত্রী যখন দেখেন, কয়েক দিন বা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একই রুটের টিকিটের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই ভাড়া নির্ধারণের স্বচ্ছ নীতিমালা কী? চাহিদা বাড়লে ভাড়া কিছুটা বাড়তে পারে—এটি ব্যবসায়িক বাস্তবতা। কিন্তু চাহিদার সুযোগ নিয়ে যদি যাত্রীদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে সেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি থাকা প্রয়োজন। আমরা জানতে চাই— বিমানভাড়া নির্ধারণে সর্বোচ্চ সীমা বা যৌক্তিক কাঠামো কী? কোন নীতিমালার ভিত্তিতে ভাড়া বাড়ানো হয়?
যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে তার জবাবদিহিতা কোথায়? পর্যটন মৌসুমে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের পর্যবেক্ষণ কী? কক্সবাজারকে কি শুধু পর্যটন মৌসুমের বাজার হিসেবে দেখা হবে? কক্সবাজারের অর্থনীতি পর্যটনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিমানভাড়া অস্বাভাবিক হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পর্যটন পরিবহন, ট্যুর অপারেটর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ অসংখ্য মানুষের জীবিকার ওপর। একজন পর্যটক যদি ঢাকা থেকে কক্সবাজার আসার বিমানভাড়াকেই অস্বাভাবিক মনে করেন, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই অন্য গন্তব্য বেছে নিতে পারেন। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসা এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতি। আর বিদেশি অতিথিদের কাছে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তারা যখন একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরীতে এসে দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগের উচ্চ ও অনিয়মিত ভাড়া দেখতে পান, তখন দেশের পর্যটন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমাদের দাবি—বিমানভাড়ায় স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা চাই কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডের পক্ষ থেকে আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি— 1. ঢাকা–কক্সবাজার রুটের বিমানভাড়া নির্ধারণে কার্যকর সরকারি নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। 2. বিমানভাড়া নির্ধারণের পদ্ধতি ও বিভিন্ন শ্রেণির ভাড়ার কাঠামো যাত্রীদের কাছে স্পষ্ট করতে হবে। 3. বিশেষ করে পর্যটন মৌসুম, ঈদ, সরকারি ছুটি ও বিশেষ সময়ে অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ  করতে হবে। 4. কক্সবাজারকে জাতীয় পর্যটন অগ্রাধিকার এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে সাশ্রয়ী ও স্থিতিশীল বিমান যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। 5. প্রয়োজন হলে ঢাকা–কক্সবাজার রুটে ন্যায্য ও যৌক্তিক ভাড়া নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
6. যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। আমরা সংঘাত চাই না—সমাধান চাই কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেড কোনো এয়ারলাইন্সের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বিরোধিতা করে না। আমরা চাই সুস্থ প্রতিযোগিতা, উন্নত সেবা এবং ন্যায্য ব্যবসায়িক পরিবেশ। কিন্তু ব্যবসার স্বাধীনতার নামে যাত্রীস্বার্থ উপেক্ষিত হতে পারে না।
কক্সবাজারের মানুষ এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এই দেশেরই মানুষ ও অতিথি। তাদের জন্য আকাশপথের যোগাযোগ সহজ, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী করা রাষ্ট্রের বৃহত্তর দায়িত্বের অংশ। আমরা সরকারের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের স্পষ্ট কথা— কক্সবাজারের আকাশপথ কোনো অনিয়ন্ত্রিত বাজার হতে পারে না। পর্যটনের নামে পর্যটককে অতিরিক্ত ভাড়ার বোঝা চাপানো চলবে না। আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ নিয়ে কোনো নেতিবাচক বার্তা যেতে দেওয়া উচিত নয়। ঢাকা–কক্সবাজার বিমানভাড়ায় নৈরাজ্য নয়—চাই স্বচ্ছতা। অযৌক্তিক ভাড়া নয়—চাই যৌক্তিকতা। ভোগান্তি নয়—চাই যাত্রীবান্ধব আকাশ যোগাযোগ। কক্সবাজারের পর্যটন, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির স্বার্থে সরকার এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মো. কামাল উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেড

দূরের দেশ, কাছের মানুষ—মুনা উইলসনের সঙ্গে শারজাহ বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টার মায়াবী সাক্ষাৎ দূরের দেশ, কাছের মানুষ-

একটি হাসি, দুই ঘণ্টা, একটি কলম—শারজাহ বিমানবন্দরে মুনা উইলসনের সঙ্গে সেই মায়াবী সাক্ষাৎ

কিছু মানুষকে আমরা খুঁজে পাই না—জীবনই তাদের হঠাৎ আমাদের সামনে এনে দাঁড় করায়। কিছু সাক্ষাৎ কয়েক মিনিটের, অথচ তার রেশ থেকে যায় বহু বছর। আর কিছু হাসি—কথা শুরুর আগেই একটি গল্পের জন্ম দেয়। জীবন আসলে কত বিচিত্র! আমরা প্রতিদিন কত মানুষের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই। বিমানবন্দরে, রেলস্টেশনে, রাস্তায়, হোটেলের লবিতে কিংবা কোনো কফিশপের এক কোণে—হাজারো মুখ আমাদের চোখের সামনে আসে, আবার হারিয়ে যায়। তাদের অধিকাংশের নাম আমরা জানি না, গল্প জানি না, স্বপ্ন জানি না। কিন্তু কখনো কখনো সেই অগণিত মুখের ভিড় থেকে একজন মানুষ হঠাৎ আলাদা হয়ে ওঠেন—কোনো পরিচয় ছাড়াই, কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই; শুধু একটি দৃষ্টি, একটি হাসি কিংবা কয়েকটি সহজ কথার মধ্য দিয়ে। মুনা উইলসনের সঙ্গে আমার পরিচয় ঠিক তেমনই একটি গল্প। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০—একটি তারিখ, একটি বিমানবন্দর, একটি অপ্রত্যাশিত গল্প। দুবাইয়ে আমার ১৫ দিনের সফর শেষ। বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি। গন্তব্য—শারজাহ বিমানবন্দর। ভ্রমণের শেষ প্রান্তে এসে মানুষের মনটাও যেন একটু অন্যরকম হয়ে যায়। কয়েক দিনের ব্যস্ততা, পরিচিত-অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা, নতুন শহর দেখা, নতুন অভিজ্ঞতা—সবকিছু ধীরে ধীরে স্মৃতির বাক্সে ঢুকে যেতে থাকে। বিমানবন্দর তখন স্বভাবসিদ্ধ ব্যস্ততায় পূর্ণ। কেউ লাগেজ টেনে ছুটছেন, কেউ বোর্ডিং পাস খুঁজছেন, কেউ ফোনে শেষ মুহূর্তের কথা বলছেন, কেউ প্রিয়জনকে বিদায় জানাচ্ছেন, আবার কেউ নতুন কোনো গন্তব্যের স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষা করছেন। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ যেন একই ছাদের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ একজন তরুণীর সঙ্গে আমার চোখাচোখি হলো। তিনি তাকালেন। আমি তাকালাম। তারপর একটি মিষ্টি হাসি। আমিও হাসলাম। আবার চোখাচোখি। সেই হাসির মধ্যে কী ছিল জানি না। তবে এতটুকু বুঝেছিলাম—অচেনা হয়েও মানুষটি যেন খুব সহজে পরিচিত হয়ে উঠছেন। একটি হাসি কখনো কখনো পরিচয়ের সবচেয়ে সুন্দর ভাষা। সেদিনও তাই হয়েছিল। অচেনা থেকে পরিচিত। কিছুক্ষণ পর কথার সূত্রপাত। জানলাম তাঁর নাম মুনা উইলসন। লন্ডনের তরুণী ব্যবসায়ী। শুধু ব্যবসায়ীই নন—তিনি একজন বিশ্বপরিব্রাজকও। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো তাঁর এক ধরনের নেশা। নতুন শহর, নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন মানুষ—সবকিছুর প্রতি তাঁর প্রবল কৌতূহল। আমি পেশায় লেখক, সাংবাদিক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক। মানুষের গল্প আমার কাছে সবসময়ই আকর্ষণীয়। তাই অচেনা মানুষটির সঙ্গে কয়েক মিনিটের আলাপের মধ্যেই আমার ভেতরের সাংবাদিকটি জেগে উঠল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এল—“আপনি এত ভ্রমণ করেন কেন?” মুনা হাসলেন। সেই হাসি ছিল খুব স্বাভাবিক, খুব নির্মল। তারপর বলতে শুরু করলেন। কথা বলার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া ছিল না, ছিল না নিজেকে বড় করে দেখানোর কোনো চেষ্টা। বরং ছিল নিজের জীবনকে নিজের চোখে দেখার এক স্বচ্ছতা। আমি প্রশ্ন করছিলাম, তিনি উত্তর দিচ্ছিলেন। আর প্রতিটি উত্তরের সঙ্গে যেন তাঁর জীবনের আরেকটি দরজা খুলে যাচ্ছিল। শিক্ষা থেকে স্বপ্ন—নিজের পথ নিজেই তৈরি করার গল্প। আমাদের আলাপের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল তাঁর শিক্ষাজীবন। কীভাবে পড়াশোনার সময় থেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন, কীভাবে শিক্ষা তাঁর চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করেছে, কীভাবে আত্মবিশ্বাস তাঁকে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে শিখিয়েছে—এসব নিয়েই কথা হলো। আমার কাছে তাঁর গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল—তিনি জীবনের জন্য অন্য কারও তৈরি পথ অনুসরণ করতে চাননি। নিজের পথ নিজেই তৈরি করতে চেয়েছেন। আর সেই পথের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ব্যবসা ও ভ্রমণ। একজন তরুণী হিসেবে ব্যবসার জগতে নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ নয়। নতুন বাজার, নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ—প্রতিটি জায়গাতেই আলাদা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মুনার কথায় মনে হলো, চ্যালেঞ্জ তাঁকে ভয় দেখায় না; বরং নতুন চ্যালেঞ্জই তাঁকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। ব্যবসা—শুধু অর্থ নয়, মানুষের সঙ্গে সম্পর্কেরও নাম। ব্যবসা নিয়ে আমাদের আলোচনা বেশ দীর্ঘ হলো। নতুন বাজারের সন্ধান, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িক সংস্কৃতি, নতুন সুযোগ তৈরি করা—সবকিছু নিয়েই তাঁর ভাবনা ছিল স্পষ্ট। আমি লক্ষ্য করছিলাম—মুনার কাছে ব্যবসা কেবল লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়। ব্যবসার সঙ্গে তিনি মানুষকে দেখেন, মানুষের প্রয়োজনকে বোঝেন, সংস্কৃতিকে বোঝেন এবং পৃথিবীর পরিবর্তনশীল বাজারকে বোঝার চেষ্টা করেন। একজন তরুণী কীভাবে নিজের আত্মবিশ্বাস দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে এগিয়ে যেতে চান—তাঁর কথায় সেই আকাঙ্ক্ষার ছাপ স্পষ্ট ছিল। তারপর ভ্রমণ—পৃথিবী যেন তাঁর খোলা বই। কথার মোড় ঘুরতেই আবার ফিরে এল ভ্রমণ। আমি জানতে চাইলাম—“এত দেশ ঘুরে কী পেয়েছেন?” এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে আজও মনে থাকার মতো। কারণ তাঁর কথার ভেতর দিয়ে আমি শুধু একজন পর্যটককে দেখিনি; দেখেছি একজন মানুষকে, যিনি পৃথিবীকে বইয়ের পাতার বাইরে গিয়ে পড়তে চান। একটি দেশকে শুধু তার বিখ্যাত স্থাপনা দিয়ে চেনা যায় না। একটি শহরকে শুধু তার রাস্তা দিয়ে বোঝা যায় না। একটি জাতিকে শুধু তার ইতিহাস দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষকে বুঝতে হলে মানুষের কাছে যেতে হয়। তাদের সঙ্গে বসতে হয়। তাদের গল্প শুনতে হয়। তাদের হাসি-কান্না দেখতে হয়। মুনার ভ্রমণ যেন সেই মানুষ-অন্বেষণেরই এক দীর্ঘ অধ্যায়। তাঁর কাছে পৃথিবী ছিল শুধু গন্তব্যের তালিকা নয়—পৃথিবী ছিল অভিজ্ঞতার এক বিশাল বিদ্যালয়। যেখানে সাক্ষাৎকার শেষ, সেখানে শুরু হলো আড্ডা। আমি জানি না কখন আমার সাংবাদিকতার প্রশ্নগুলো একটু একটু করে বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপে পরিণত হয়েছিল। প্রথমে ছিল—“আপনার কাজ কী?” “কোথায় পড়েছেন?” “কত দেশ ঘুরেছেন?” “ব্যবসায় কীভাবে এসেছেন?” তারপর প্রশ্নগুলো আর প্রশ্ন থাকল না। হয়ে গেল গল্প। আমরা হাসলাম। মজা করলাম। জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বললাম। কখনো তিনি আমার কোনো কথায় হেসে উঠলেন, কখনো আমি তাঁর কোনো গল্প শুনে মুগ্ধ হলাম। সাংবাদিক ও সাক্ষাৎকারদাতার আনুষ্ঠানিক দূরত্ব কখন যে কোথায় হারিয়ে গেল—তা আর বোঝা গেল না। অচেনা দুজন মানুষ যেন হঠাৎ দুজন গল্পের মানুষ হয়ে উঠলাম। প্রেম ও ভালোবাসা—কথার ভেতর এক নরম অধ্যায়। দীর্ঘ আলাপের একপর্যায়ে স্বাভাবিকভাবেই চলে এলো ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, প্রেম ও ভালোবাসার প্রসঙ্গ। সেখানে মুনার হাসি যেন একটু বদলে গেল—আরও কোমল, আরও মায়াময়। কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলেন সরাসরি, কিছু প্রশ্নের উত্তর এলো হাসিতে, কিছু কথা রয়ে গেল ইঙ্গিতে। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি প্রশ্ন করেছি। কিন্তু একজন লেখক হিসেবে আমি শুধু তাঁর কথাগুলো শুনিনি—কথার আড়ালে থাকা অনুভূতিগুলোও বোঝার চেষ্টা করেছি। কারণ মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো অনেক সময় মুখে বলা হয় না। চোখ বলে, হাসি বলে, নীরবতা বলে। মুনার ক্ষেত্রেও হয়তো তার ব্যতিক্রম ছিল না। দুই ঘণ্টা—কিন্তু মনে হলো সময় যেন থেমে আছে। বিমানবন্দরের ঘড়ি তার নিয়মে চলছিল। কিন্তু আমাদের আড্ডার মধ্যে সময় যেন অন্য কোনো নিয়ম মেনে চলছিল। এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। দেড় ঘণ্টা। তারপর প্রায় দুই ঘণ্টা। আমরা কেউই টের পেলাম না। চারপাশে মানুষ বদলে যাচ্ছে। কেউ বিমানে উঠছে, কেউ চলে যাচ্ছে, কেউ নতুন করে আসছে। কিন্তু আমাদের কথার জগতে যেন সময় স্থির। বিমানবন্দরের হাজারো মানুষের ভিড়ের মধ্যে আমরা যেন নিজেদের জন্য এক ছোট্ট পৃথিবী তৈরি করে নিয়েছিলাম। সেখানে ছিল—ভ্রমণ, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বপ্ন, জীবন, ভালোবাসা, হাসি আর অজস্র গল্প। বিদায়ের মুহূর্ত—একটি কলম, একটি কপি। শেষ পর্যন্ত বিদায়ের সময় এলো। প্রত্যেক সুন্দর সাক্ষাতের মতো এই সাক্ষাতেরও একসময় বিদায় নিতে হলো। বিদায়ের আগে মুনা আমাকে উপহার দিলেন—একটি কলম এবং একটি কপি। সাধারণ চোখে এগুলো হয়তো খুব সাধারণ উপহার। কিন্তু আমার মতো একজন লেখকের কাছে একটি কলম কখনো সাধারণ নয়। কলম আমার জীবনের সঙ্গী। কলম দিয়ে আমি মানুষের কথা লিখি। কলম দিয়ে স্মৃতি ধরে রাখি। কলম দিয়ে কখনো প্রতিবাদ করি, কখনো ভালোবাসার কথা বলি, কখনো ইতিহাসের কাছে সময়কে সাক্ষ্য দিই। তাই মুনার দেওয়া সেই কলম আমার কাছে শুধু একটি উপহার নয়। এটি হয়ে গেল একটি সাক্ষাতের স্মারক, একটি অপ্রত্যাশিত পরিচয়ের চিহ্ন এবং একটি বিমানবন্দরের দুই ঘণ্টাকে ধরে রাখার ছোট্ট অথচ মূল্যবান প্রতীক। বছর পেরিয়ে যায়, কিছু স্মৃতি পেরোয় না। ২০২০ থেকে ২০২৬। সময় অনেকটা এগিয়ে গেছে। জীবনে কত ঘটনা ঘটেছে। কত মানুষ এসেছেন, কত মানুষ চলে গেছেন। কত শহর দেখেছি। কত গল্প লিখেছি। কত মুখ ক্যামেরার সামনে এসেছে। কত মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। তবুও শারজাহ বিমানবন্দরের সেই দিনটির কথা মনে পড়লে আজও একটি মৃদু হাসি মুখে চলে আসে। মনে হয়—সেদিন যদি চোখাচোখি না হতো? যদি সেই হাসিটি না আসত? যদি আমি কথাটি না বলতাম? যদি তিনি উত্তর না দিতেন? তাহলে হয়তো মুনা উইলসন আমার জীবনের গল্পের একটি চরিত্র হয়ে উঠতেন না। জীবন কখনো কখনো কত অদ্ভুতভাবে গল্প লিখে! আমরা কলম হাতে নিয়ে গল্প লিখি। আর জীবন নিজেই আমাদের জন্য আরও সুন্দর গল্প লিখে রাখে। ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য কোথায়? বহু বছর ভ্রমণ করতে করতে আমি একটি বিষয় বুঝেছি—ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়। ভ্রমণ মানে নতুন মানুষ দেখা। নতুন চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। নিজের পরিচিত পৃথিবীর বাইরে আরেকটি পৃথিবীকে অনুভব করা। কখনো একটি শহর আমাদের মনে থাকে। কখনো একটি পাহাড়। কখনো কোনো সমুদ্রের ঢেউ। আবার কখনো একজন অচেনা মানুষের হাসি। আমার কাছে মুনা উইলসনের সেই হাসিটিও তেমনই একটি ভ্রমণস্মৃতি। শেষ কথা—কিছু মানুষ গল্প হয়ে থেকে যায়। আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, শারজাহ বিমানবন্দরের সেই সাক্ষাৎ আসলে কোনো সাধারণ সাক্ষাৎ ছিল না। সেটি ছিল জীবনের দেওয়া একটি ছোট্ট উপহার। একজন লন্ডনি তরুণী ব্যবসায়ী, একজন বিশ্বপরিব্রাজক, একজন স্বপ্নবান মানুষ এবং একজন লেখক-সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর আকস্মিক পরিচয়—দুই ঘণ্টার কথোপকথন, একটি কলম, একটি কপি আর একটি স্মৃতি; সব মিলিয়ে একটি গল্প। মুনা উইলসন—আপনি হয়তো জানেন না, কিন্তু আপনার সঙ্গে সেই আকস্মিক সাক্ষাৎ আমার স্মৃতির ভেতর আজও জীবন্ত। পৃথিবীর পথে আমরা সবাই যাত্রী। কেউ আগে নামে, কেউ পরে। কেউ কয়েক স্টেশন পাশাপাশি বসে থাকে। কেউ শুধু একবার চোখাচোখি করে চলে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ—একবার দেখা দিয়েই আজীবনের গল্প হয়ে যায়। মুনা উইলসন তেমনই একজন। শারজাহ বিমানবন্দরের ব্যস্ততার মধ্যে পাওয়া আমার সেই দুই ঘণ্টার মধুময় গল্প আজও আমার ভ্রমণস্মৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। হয়তো পৃথিবীর মানচিত্রে শারজাহ একটি ছোট্ট বিন্দু। কিন্তু আমার স্মৃতির মানচিত্রে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০-এর সেই শারজাহ বিমানবন্দর একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প। একটি হাসির গল্প, একটি পরিচয়ের গল্প, একটি দীর্ঘ আড্ডার গল্প, একটি কলমের গল্প—আর সবচেয়ে বেশি, দুজন অচেনা মানুষের হঠাৎ পরিচিত হয়ে ওঠার গল্প। —মো. কামাল উদ্দিন | লেখক | সাংবাদিক | গবেষক | টেলিভিশন উপস্থাপক

দেশে সংকটের মাঝে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে সার

দেশে সার নিয়ে সংকট, কৃষকের বাড়তি দামে সার কেনার অভিযোগের মধ্যেই চট্টগ্রাম উপকূল দিয়ে মিয়ানমারে পাচারের চেষ্টাকালে ধরা পড়ছে বিপুল পরিমাণ সার। মাত্র দুই দিনে চট্টগ্রামের হালিশহর ও সীতাকুণ্ডে পৃথক অভিযানে ৩১ দশমিক ৫ টন সার জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড। এর আগে জুলাইয়ের শেষদিকে পতেঙ্গা উপকূল থেকে আরও ২২ দশমিক ৫ টন ডিএপি সার মিয়ানমারে পাচারের সময় জব্দ করা হয়। সর্বশেষ বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টার দিকে নগরীর হালিশহর থানার দারবিরখাল এলাকায় কোস্ট গার্ড বেইস চট্টগ্রামের অভিযানে ধরা পড়ে ১১ টন রাসায়নিক সারের চালান। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে একটি ট্রাক থেকে মাছ ধরার নৌযানে সার স্থানান্তরের সময় অভিযান চালানো হয়। পরে ২২০ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এসব বস্তায় মোট ১১ হাজার কেজি সার ছিল, যার আনুমানিক মূল্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ সময় তিনজনকে আটক এবং সার পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকটি জব্দ করা হয়। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। জব্দ করা সার, ট্রাক ও আটক ব্যক্তিদের আইনগত ব্যবস্থা নিতে হালিশহর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এর একদিন আগে, গত ১ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। ৫০ কেজির হিসাবে এসব সারের পরিমাণ ২০ হাজার ৫০০ কেজি বা ২০ দশমিক ৫ টন। আনুমানিক মূল্য ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, সারগুলো মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল। এ সময় একটি নৌযানও জব্দ করা হয়। ফলে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে চট্টগ্রামের দুই উপকূলীয় এলাকায় ৬৩০ বস্তা বা ৩১ দশমিক ৫ টন সার মিয়ানমারমুখী হওয়ার সময় ধরা পড়ে। এর আগে ৩০ জুলাই পতেঙ্গার বহির্নোঙর ও ১৫ নম্বর জেটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। এসব সারের পরিমাণ ২২ হাজার ৫০০ কেজি বা ২২ দশমিক ৫ টন। মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়ার সময় চালানটি জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় একটি কার্গো বোটসহ ২৩ জনকে আটক করা হয়েছিল। তিন দফা অভিযানে জব্দ হওয়া সারের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৪ টন। একই সময়ে দেশে সার নিয়ে মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্রের কথা বলছেন কৃষকরা। বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়া, ডিলারদের কাছে সরবরাহ কম থাকা এবং খোলা বাজারে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে সার সংকট নেই,পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং কিছু এলাকায় সরবরাহ ও বিতরণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। সরকারের মজুত ও আমদানির হিসাবও বলছে, সার সরবরাহ ঠিক রাখতে বড় ধরনের প্রস্তুতি চলছে। ২ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি ও ৩০ হাজার টন টিএসপি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর আগে আগস্টেও সৌদি আরব, রাশিয়া, মরক্কো, কানাডা ও কেএএফকো থেকে কয়েক লাখ টন সার আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকার যখন কৃষকের চাহিদা পূরণে আমদানি বাড়াচ্ছে, তখন দেশের ভেতর থেকে সার মিয়ানমারে পাচারের চেষ্টা ধরা পড়ায় সরবরাহব্যবস্থার নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম উপকূলে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক চালান ধরা পড়ায় শুধু বাহক বা নৌযান আটকের মধ্যে তদন্ত সীমাবদ্ধ না রেখে এসব চালানের উৎস খুঁজে বের করার দাবি জোরালো হয়। চোরাচালানবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড।

বন্যায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত, বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ

নেপালে ভয়াবহ বন্যায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশে দেশটির বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। গত ২৬ আগস্ট ভোটকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যার পর বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী দুটি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমতি চেয়ে ভারতের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে বলেও জানান তিনি। বন্যায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন পাওয়া ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াটের ত্রিশুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে প্রকল্প দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। বর্ষা মৌসুমে সাধারণত নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ায় নেপালের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও বেড়ে যায়। তখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতিবেশী দেশগুলোতে রপ্তানি করে থাকে দেশটি। বন্যার আগে বর্ষা মৌসুমে নেপাল গড়ে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করলেও বন্যার পর তা কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। এখন পর্যন্ত বন্যার কারণে অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। পাশাপাশি সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সানজেন, আপার সানজেন ও সালাসুঙ্গি প্রকল্প জাতীয় গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রকল্প বর্তমানে শুধু আশপাশের এলাকার চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তবে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানির সংকট শুধু বন্যার কারণে তৈরি হয়নি। ভারতের অনুমোদন নবায়ন না হওয়ায় আরও তিনটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৭৩ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে পারছে না নেপাল। বর্তমানে ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের জ্বালানি সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের সঙ্গে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানির বিষয়ে সম্মতি হয়েছিল। তবে সঞ্চালন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমতি দেয়নি ভারত। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সঞ্চালন অবকাঠামো দ্রুত পুনরুদ্ধারে কাজ করছে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে চালু থাকা অন্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিকল্প পথে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন পেতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

রেলওয়ের তিন শীর্ষ পদে বড় রদবদল

0

বাংলাদেশ রেলওয়ের তিন শীর্ষ কর্মকর্তার দায়িত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। জনস্বার্থে জারি করা আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. সুবক্তগীণকে ঢাকার রেলভবনে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) (চলতি দায়িত্ব) পদে বদলি করা হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) পদে দায়িত্ব পেয়েছেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) (চলতি দায়িত্ব) মামুনুল ইসলাম, পিইঞ্জ। অন্যদিকে, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) (চলতি দায়িত্ব) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) (চলতি দায়িত্ব) পদে পদায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তাকে যমুনা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের উপসচিব কামরুল হাসান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের স্মারক নম্বর ০০.০০০০.০০০.০৪০.১৯.০০১৯.২২.৬৫৩। মামুনুল ইসলাম এতদিন বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। নতুন দায়িত্বে তাকে চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একসঙ্গে রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ তিন পদে এই রদবদলের ফলে ঢাকার রেলভবন ও চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে পরিবর্তন এলো।

ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়নে আইডিবির সঙ্গে বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই

0

দেশের জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা তিনগুণ বৃদ্ধির জন্য ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ প্রকল্পে অর্থায়নে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিচ্ছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসের উপস্থিতিতে ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়নের চুক্তিটি প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মোস্তফা জুলফিকার হাসান গণমাধ্যমের কাছে তথ্যটি নিশ্চিত করেন। উল্লেখ্য, চুক্তির আওতায় ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

ফটিকছড়িতে ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধুর রহস্যজনক মৃত্যুঃ স্বামী সহ ২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা

মোঃ সাইফুল ইসলাম : চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে সামিহা হাকিম নিহা (১৯) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) রাতে উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কান্দিরপাড় এলাকায় নিজ বাড়িতে তার মৃ’ত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের মা রুপা আকতার বাদী হয়ে ফটিকছড়ি থানায় হত্যা মামলা রুজু করেছেন। মামলায় গৃহবধূর স্বামী মারুফ পারভেজ সহ দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। সংবাদ পেয়ে মঙ্গলবার রাতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহার মরদেহ উ’দ্ধা’র করে। ঘটনার পর থেকে নিহতের স্বামী মারুফ পারভেজ সেখানে ছিলেন না বলে জানা গেছে। নিহা ফটিকছড়ি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের রাজু সুলতানের বাড়ির লোকমান হাকিমের মেয়ে। নিহতের মা রুপা আকতারের দাবি, বিয়ের পর থেকেই তার মেয়ের সাথে স্বামীর পারিবারিক বিরোধ চলছিল। বিভিন্ন সময় যৌতুকের দাবীতে নিহাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নি’র্যা’ত’ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে জানান তিনি। রুপা আকতারের অভিযোগ, মৃ’ত্যু’র ঘটনাটিকে আ’ত্ম’হ’ত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মুলতঃ তাকে পিটিয়ে নতুবা শ্বাসরুদ্ধকরে মেরে ফেলা হয়েছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। ফটিকছড়ি থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ রবিউল আলম খান বলেন, পুলিশ ম’র’দে’হ উদ্ধার করে ম’য়’না’ত’দ’ন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ম’র্গে পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় নি’হ’তে’র মা মামলা করেছেন। ওসি আরও বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃ’ত্যু’র প্রকৃত কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। সেই সাথে মামলাটি ত’দ’ন্ত করে প্রয়োজনীয় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

খাগড়াছড়িতে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন

স ম জিয়াউর রহমান, চট্টগ্রাম থেকে :
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে খাগড়াছড়িতে নানা বর্ণাঢ্য কর্মসূচি পালন করেছে জেলা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনসমূহ। আনন্দ শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা নিবেদন ও বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হয়। এসব কর্মসূচিতে দলটির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ​প্রতিষ্ঠানবার্ষিকীর প্রথম পর্বে খাগড়াছড়ি খাদ্য গুদামসংলগ্ন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাস্কর্যে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূইয়া। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এক পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। ​সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শহরের চেঙ্গী স্কয়ার এলাকায় রঙিন বেলুন উড়িয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এমপি ওয়াদুদ ভূইয়া। শোভাযাত্রাটি চেঙ্গী স্কয়ার থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাপলা চত্বর অতিক্রম করে খাগড়াছড়ি টাউন হলে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রা শেষে টাউন হল প্রাঙ্গণে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ​আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ম্রাসা থোয়াই মারমা, খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রবীণ চন্দ্র চাকমা, সাধারণ সম্পাদক এমএন আবছার বক্তব্য রাখেন। আলোচনা সভায় জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই বিশেষ দিনে জেলার তৃণমূল পর্যায় থেকেও সর্বস্তরের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে পুরো শহরকে উৎসবমুখর করে তোলেন।

“পুলিশের পোশাকে কর্তব্যের দৃঢ়তা, হৃদয়ে সুর ও সাহিত্যের কোমলতা- এসআই নওশের কোরাইশি—আইনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এক মানবিক পুলিশ কর্মকর্তার গল্প

একজন মানুষকে চেনার জন্য তাঁর পদবি জানা যথেষ্ট নয়। তাঁকে চিনতে হয় তাঁর কাজের ভেতর দিয়ে, মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণের ভেতর দিয়ে, দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এবং অবসরের নীরব মুহূর্তে তাঁর হৃদয়ের ভাষা শুনে। কারণ, পোশাক একজন মানুষের পেশার পরিচয় বহন করে; কিন্তু মানবিকতা বহন করে তাঁর চরিত্র। চট্টগ্রাম মহানগরীর ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোতোয়ালি থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই নওশের কোরাইশি—পেশাগত পরিচয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিদিনের নানা জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই তাঁর কর্মজীবনের বাস্তবতা। কিন্তু এই কঠোর পেশাগত পরিচয়ের আড়ালেও রয়েছে অন্য এক নওশের কোরাইশি—যিনি গান ভালোবাসেন, কবিতা লেখেন, সাহিত্যকে অনুভব করেন, সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী এবং দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাকে নিজের চিন্তা-চেতনার অংশ হিসেবে ধারণ করেন। এই দুই সত্তার সমন্বয়ই তাঁকে আলাদা করে দেখতে শেখায়। কোতোয়ালির ব্যস্ততায় একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানা চট্টগ্রাম মহানগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি থানা। নগরীর কেন্দ্রীয় এলাকার নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ব্যবসায়িক অঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনসমাগমস্থল এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে এখানকার পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সবসময়ই চ্যালেঞ্জপূর্ণ। একজন সেকেন্ড অফিসারকে কখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কখনো অপরাধের তথ্য যাচাই করতে হয়, কখনো মানুষের অভিযোগ শুনতে হয়, আবার কখনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে দ্রুত ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই দায়িত্বের প্রতিটি মুহূর্তে প্রয়োজন পেশাদারিত্ব, ধৈর্য, বিচক্ষণতা এবং আইনের প্রতি অটল আনুগত্য। এসআই নওশের কোরাইশির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও এই পেশাগত গুণাবলিগুলোই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর পদ, পোশাক কিংবা পরিচয় দিয়ে নয়—বরং তিনি দায়িত্ব কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করছেন এবং জনগণের নিরাপত্তায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছেন, তার ভিত্তিতে। কঠোর পেশার মানুষ, অথচ হৃদয়ে শিল্পের স্পর্শ পুলিশের পেশাকে অনেকেই শুধু কঠোরতার সঙ্গে দেখেন। কিন্তু একজন পুলিশ কর্মকর্তারও যে একটি কোমল হৃদয় থাকে, অনুভূতি থাকে, স্বপ্ন থাকে—সেটি অনেক সময় আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়। নওশের কোরাইশির বিশেষত্ব এখানেই।
তিনি গান করেন। কবিতা লেখেন। সাহিত্য ভালোবাসেন। শব্দ ও সুরের প্রতি তাঁর যে অনুরাগ, তা তাঁর ব্যক্তিসত্তার একটি সুন্দর দিক। দিনভর আইনশৃঙ্খলা, মামলা, অপরাধ, দায়িত্ব ও ব্যস্ততার মধ্যে থাকার পরও যে মানুষ কবিতার কাছে ফিরে যেতে পারেন, গানের মধ্যে প্রশান্তি খুঁজে নিতে পারেন, সাহিত্যের সৌন্দর্যে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারেন—তাঁর মধ্যে নিঃসন্দেহে একটি সংবেদনশীল মন কাজ করে। এক হাতে দায়িত্বের কঠোরতা, অন্যদিকে হৃদয়ে সুরের কোমলতা—এই বৈপরীত্যই একজন মানুষকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। সাহিত্যপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে মানুষের গল্প থাকে
সাহিত্য মানুষকে শুধু বই পড়তে শেখায় না; সাহিত্য মানুষকে মানুষ বুঝতে শেখায়। কবিতা কখনো একজন মানুষের চোখের জলকে ভাষা দেয়, গান কখনো না বলা অনুভূতিকে সুর দেয়, আর সাহিত্য কখনো সমাজের অদৃশ্য বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা যদি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁর ব্যক্তিত্বে মানবিক উপলব্ধির একটি অতিরিক্ত মাত্রা তৈরি হয়। মানুষের সুখ-দুঃখ, ভয়, হতাশা, প্রত্যাশা—এসব অনুভূতিকে বোঝার ক্ষমতা একজন পুলিশ কর্মকর্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুলিশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল আইন প্রয়োগের সম্পর্ক নয়; এটি আস্থা, নিরাপত্তা ও মানবিকতার সম্পর্কও। দেশপ্রেম—কথায় নয়, দায়িত্ব পালনের মধ্যেও দেশপ্রেমের বহুমাত্রিক প্রকাশ রয়েছে। কেউ লেখেন, কেউ গান করেন, কেউ সমাজসেবায় যুক্ত হন, আবার কেউ নিজের পেশাগত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে দেশ ও মানুষের সেবা করেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তার জন্য দেশের প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে বাস্তব প্রকাশ হতে পারে—আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করা। রাতের শহরে যখন অধিকাংশ মানুষ নিরাপদ ঘরে, তখনও কোনো পুলিশ সদস্য দায়িত্বে থাকেন। উৎসবের দিনে মানুষ যখন আনন্দে, তখনও পুলিশের অনেক সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। কোনো সংকট দেখা দিলে সবার আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর দায়িত্বও অনেক সময় তাঁদেরই। এই দায়িত্ববোধই রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি তাঁদের অঙ্গীকারের অংশ। সাংবাদিক ও পুলিশের সম্পর্ক—পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গা চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের পেশাগত যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকরা সমাজের বিভিন্ন ঘটনা, সমস্যা, অপরাধ ও মানুষের কথা তুলে ধরেন; পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং অপরাধ তদন্ত করে।
এই দুই পেশার মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্বশীল যোগাযোগ ও পেশাগত সৌহার্দ্য থাকলে উপকৃত হয় সাধারণ মানুষ। এসআই নওশের কোরাইশির সাংবাদিকবান্ধব মনোভাব তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করা যায়। একজন পুলিশ কর্মকর্তা যদি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্বকে সম্মান করেন এবং সাংবাদিকরা পুলিশের পেশাগত সীমাবদ্ধতা ও দায়িত্বকে সম্মান করেন, তাহলে উভয়ের মধ্যে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর সেই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত জনগণের তথ্যের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে পুলিশ, আইনের প্রতি অঙ্গীকার একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পুলিশের সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়। পুলিশের সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি আইনের রক্ষক। জনগণের প্রত্যাশাও এখন স্পষ্ট—পুলিশ হবে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে, আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষ এবং মানুষের কাছে জবাবদিহিমূলক। একজন কর্মকর্তার অতীত নিয়ে নানা আলোচনা থাকতে পারে, নানা মত থাকতে পারে; কিন্তু তাঁর বর্তমান দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন হওয়া উচিত প্রমাণ, কর্মদক্ষতা, আচরণ ও পেশাগত রেকর্ডের ভিত্তিতে। কোনো অভিযোগ থাকলে যথাযথ তদন্ত হবে; ভালো কাজ থাকলে তার স্বীকৃতিও হবে—এটাই একটি সুস্থ প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিচয়। সাবেক ও বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে দায়িত্ব পালন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাবেক পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ সাহেবের দায়িত্বকালেও এবং বর্তমানে পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী সাহেবের নেতৃত্বেও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এই সাংগঠনিক কাঠামোরই একজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে কোতোয়ালি থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই নওশের কোরাইশির দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মকর্তা যত বেশি জনগণের কাছাকাছি থাকবেন, তাঁর দায়িত্বও তত বেশি সংবেদনশীল হবে। তাই তাঁর প্রতিটি আচরণ, সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের সঙ্গে পুলিশের ভাবমূর্তিও কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থাকে। ভালো পুলিশ কর্মকর্তা মানেই শুধু কঠোর কর্মকর্তা নন আমাদের সমাজে অনেক সময় ধারণা থাকে—ভালো পুলিশ কর্মকর্তা মানেই কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা।
আসলে বিষয়টি এত সরল নয়। একজন ভালো পুলিশ কর্মকর্তা প্রয়োজনের সময় কঠোর হবেন, কিন্তু অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠোর হবেন না। অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করবেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতি মানবিক থাকবেন। আইন ভঙ্গকারীকে ছাড় দেবেন না, আবার নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি থেকেও রক্ষা করবেন। কঠোরতা যেখানে প্রয়োজন সেখানে দৃঢ়তা, আর মানবিকতা যেখানে প্রয়োজন সেখানে সহমর্মিতা—এই ভারসাম্যই একজন আদর্শ পুলিশ কর্মকর্তার বড় গুণ।
নওশের কোরাইশি—একজন বহুমাত্রিক মানুষ
একজন মানুষকে যদি কয়েকটি শব্দে চেনাতে হয়, নওশের কোরাইশির পরিচয় হতে পারে—
তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যাঁর কাঁধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব।
তিনি একজন দায়িত্বশীল পেশাজীবী, যাঁর কাছে কর্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি একজন গানপ্রেমী মানুষ, যাঁর হৃদয়ে সুরের বসতি।
তিনি একজন কবিতামনস্ক মানুষ, যিনি শব্দের সৌন্দর্য অনুভব করেন।
তিনি একজন সাহিত্যপ্রেমী, যিনি সংস্কৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক ধরে রেখেছেন।
তিনি একজন দেশপ্রেমিক, যাঁর পেশাই তাঁকে প্রতিদিন মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে দাঁড় করায়।
তিনি একজন সাংবাদিকবান্ধব কর্মকর্তা, যিনি গণমাধ্যমের পেশাগত ভূমিকার সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন।
আর সবকিছুর ওপরে তিনি একজন মানুষ—যাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হওয়া উচিত তাঁর মানবিকতা।
শেষের কথাটি হোক আস্থার
আজকের দিনে জনগণ এমন পুলিশ চায়, যাঁকে দেখে ভয় নয়—আস্থা জন্মাবে।
যাঁর কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে মানুষ কথা বলার সুযোগ পাবে।
যিনি আইনকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে রাখবেন।
যিনি অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকবেন।
যিনি সাধারণ মানুষের মর্যাদা রক্ষা করবেন।
যিনি সাংবাদিকের প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে নয়, গণমাধ্যমের দায়িত্ব হিসেবে দেখবেন।
যিনি নিজের পেশাকে শুধু চাকরি নয়, দায়িত্ব ও সেবার জায়গা হিসেবে বিবেচনা করবেন।
এসআই নওশের কোরাইশির প্রতি প্রত্যাশাও ঠিক তেমনই।
কোতোয়ালি থানার সেকেন্ড অফিসার হিসেবে তিনি তাঁর দায়িত্ব আরও নিষ্ঠা, সততা, পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিকতার সঙ্গে পালন করবেন—এটাই প্রত্যাশা।
পুলিশের পোশাক তাঁর পেশার পরিচয়।
আইনের প্রতি অঙ্গীকার তাঁর দায়িত্বের পরিচয়।
গান তাঁর হৃদয়ের পরিচয়।
কবিতা তাঁর অনুভূতির পরিচয়।
সাহিত্য তাঁর মননের পরিচয়।
দেশপ্রেম তাঁর চেতনার পরিচয়।
আর মানুষের প্রতি ভালো আচরণ—হোক তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
চট্টগ্রামের পুলিশ হোক জনতার আস্থার পুলিশ, কোতোয়ালি হোক নিরাপত্তা ও সেবার নির্ভরতার ঠিকানা।
আর সেই পথের একজন দায়িত্বশীল সৈনিক হিসেবে এসআই নওশের কোরাইশির কর্মজীবন আরও সুন্দর, সফল ও গৌরবময় হোক—এই শুভকামনা রইল।
পদ নয়, কর্মই হোক পরিচয়।
ক্ষমতা নয়, দায়িত্বই হোক শক্তি।
ভয় নয়, আস্থাই হোক পুলিশের সবচেয়ে বড় অর্জন।

মোহাম্মদপুরে র‍্যাব-২’র রাতভর অভিযান, অস্ত্র ও বিপুল মাদকসহ আটক ১৫

0

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় রাতভর অভিযান চালিয়ে বিদেশি পিস্তল, ওয়ান শুটারগান, তাজা গুলি, সামুরাই এবং বিপুল পরিমাণ মাদকসহ ১৫ জনকে আটক করেছে র‍্যাব-২। র‍্যাব-২ সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধ দমনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে বিভিন্ন স্থান থেকে ১৫ জনকে আটক করা হয়। অভিযানকালে তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ওয়ান শুটারগান, তাজা গুলি, একটি সামুরাইসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাদকও জব্দ করা হয়েছে। র‍্যাব-২ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। অভিযানে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও মাদকের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী সময়ে জানানো হবে। রাজধানীতে অস্ত্র ও মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলেও জানিয়েছে র‍্যাব।