
ঢাকা–কক্সবাজার আকাশপথে বিমানভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অস্বাভাবিক ওঠানামা ও যাত্রীভোগান্তি চলছে, তা কোনোভাবেই একটি পর্যটননির্ভর জেলার জন্য কাম্য হতে পারে না। আমরা মনে করি, বিমানভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজারব্যবস্থার পাশাপাশি কার্যকর সরকারি নজরদারি ও জবাবদিহিতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কক্সবাজার শুধু একটি জেলা শহর নয়—এটি বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের পর্যটক, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, সাংবাদিক, গবেষক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজার এখন আন্তর্জাতিক মানবিক কার্যক্রমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অতিথিরা এখানে আসেন। ফলে ঢাকা–কক্সবাজার বিমান যোগাযোগের ভাড়া, মান ও নির্ভরযোগ্যতা শুধু স্থানীয় যাত্রীদের বিষয় নয়—এটি বাংলাদেশের পর্যটন ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। প্রশ্ন হচ্ছে—ভাড়া নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণ কোথায়? একই রুটে কোনো কোনো সময়ে বিমানভাড়া এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। একজন যাত্রী যখন দেখেন, কয়েক দিন বা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একই রুটের টিকিটের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই ভাড়া নির্ধারণের স্বচ্ছ নীতিমালা কী? চাহিদা বাড়লে ভাড়া কিছুটা বাড়তে পারে—এটি ব্যবসায়িক বাস্তবতা। কিন্তু চাহিদার সুযোগ নিয়ে যদি যাত্রীদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে সেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি থাকা প্রয়োজন। আমরা জানতে চাই— বিমানভাড়া নির্ধারণে সর্বোচ্চ সীমা বা যৌক্তিক কাঠামো কী? কোন নীতিমালার ভিত্তিতে ভাড়া বাড়ানো হয়?
যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে তার জবাবদিহিতা কোথায়? পর্যটন মৌসুমে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের পর্যবেক্ষণ কী? কক্সবাজারকে কি শুধু পর্যটন মৌসুমের বাজার হিসেবে দেখা হবে? কক্সবাজারের অর্থনীতি পর্যটনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিমানভাড়া অস্বাভাবিক হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পর্যটন পরিবহন, ট্যুর অপারেটর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ অসংখ্য মানুষের জীবিকার ওপর। একজন পর্যটক যদি ঢাকা থেকে কক্সবাজার আসার বিমানভাড়াকেই অস্বাভাবিক মনে করেন, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই অন্য গন্তব্য বেছে নিতে পারেন। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসা এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতি। আর বিদেশি অতিথিদের কাছে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তারা যখন একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরীতে এসে দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগের উচ্চ ও অনিয়মিত ভাড়া দেখতে পান, তখন দেশের পর্যটন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমাদের দাবি—বিমানভাড়ায় স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা চাই কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডের পক্ষ থেকে আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি— 1. ঢাকা–কক্সবাজার রুটের বিমানভাড়া নির্ধারণে কার্যকর সরকারি নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। 2. বিমানভাড়া নির্ধারণের পদ্ধতি ও বিভিন্ন শ্রেণির ভাড়ার কাঠামো যাত্রীদের কাছে স্পষ্ট করতে হবে। 3. বিশেষ করে পর্যটন মৌসুম, ঈদ, সরকারি ছুটি ও বিশেষ সময়ে অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। 4. কক্সবাজারকে জাতীয় পর্যটন অগ্রাধিকার এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে সাশ্রয়ী ও স্থিতিশীল বিমান যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। 5. প্রয়োজন হলে ঢাকা–কক্সবাজার রুটে ন্যায্য ও যৌক্তিক ভাড়া নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
6. যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। আমরা সংঘাত চাই না—সমাধান চাই কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেড কোনো এয়ারলাইন্সের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বিরোধিতা করে না। আমরা চাই সুস্থ প্রতিযোগিতা, উন্নত সেবা এবং ন্যায্য ব্যবসায়িক পরিবেশ। কিন্তু ব্যবসার স্বাধীনতার নামে যাত্রীস্বার্থ উপেক্ষিত হতে পারে না।
কক্সবাজারের মানুষ এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এই দেশেরই মানুষ ও অতিথি। তাদের জন্য আকাশপথের যোগাযোগ সহজ, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী করা রাষ্ট্রের বৃহত্তর দায়িত্বের অংশ। আমরা সরকারের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের স্পষ্ট কথা— কক্সবাজারের আকাশপথ কোনো অনিয়ন্ত্রিত বাজার হতে পারে না। পর্যটনের নামে পর্যটককে অতিরিক্ত ভাড়ার বোঝা চাপানো চলবে না। আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ নিয়ে কোনো নেতিবাচক বার্তা যেতে দেওয়া উচিত নয়। ঢাকা–কক্সবাজার বিমানভাড়ায় নৈরাজ্য নয়—চাই স্বচ্ছতা। অযৌক্তিক ভাড়া নয়—চাই যৌক্তিকতা। ভোগান্তি নয়—চাই যাত্রীবান্ধব আকাশ যোগাযোগ। কক্সবাজারের পর্যটন, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির স্বার্থে সরকার এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মো. কামাল উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেড