
–মো.কামাল উদ্দিনঃ নদীভাঙা মানুষের প্রেম, ধর্মীয় বিভেদ, জেলে জীবনের আর্তনাদ ও মানবতার চিরন্তন সত্য নিয়ে প্রতিভাস নাট্যদলের এক অনবদ্য মঞ্চকাব্য চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমীর মঞ্চে গত ১২ মে ২০২৬, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রতিভাস নাট্যদলের সপ্তদশ প্রযোজনা “ঈশ্বর গাঙে ভাসে” যেন শুধুই একটি নাট্য মঞ্চায়ন ছিল না—এটি ছিল নদী, মানুষ, প্রেম, ধর্ম, কুসংস্কার ও মানবতার গভীরতম অনুভূতির এক জীবন্ত শিল্পভাষ্য। তৃতীয়বারের মতো মঞ্চস্থ হওয়া এই নাটকটি দর্শকদের হৃদয়ে এমন এক আবেগের জন্ম দিয়েছে, যা নাটক শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে হলের বাতাসে ভেসে ছিল। নাটক শুরু হওয়ার আগেই পুরো মিলনায়তন এক শোকাভিভূত পরিবেশে নীরব হয়ে যায়। দেশবরেণ্য অভিনেতা, নাট্যকার, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মঞ্চসারথি আতাউর রহমানের মৃত্যুতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন উপস্থিত দর্শক, শিল্পী ও নাট্যকর্মীরা। এরপর প্রতিভাস নাট্যদল তাদের এই প্রযোজনা “ঈশ্বর গাঙে ভাসে” নাটকটি প্রয়াত এই গুণী শিল্পীর প্রতি উৎসর্গ করে। যেন শিল্পের মঞ্চেই আরেকবার উচ্চারিত হলো—শিল্পীর মৃত্যু হয়, কিন্তু শিল্পের মৃত্যু হয় না।
আমি নিজেও সেই সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমীর হলে বসে নাটকটি উপভোগ করেছি। অনেক নাটক দেখেছি, অসংখ্য মঞ্চনাটক নিয়ে লিখেছি, কিন্তু “ঈশ্বর গাঙে ভাসে” আমার ভেতরে অন্যরকম এক নাড়া দিয়েছে। কারণ এই নাটক কেবল অভিনয় নয়, এটি মানুষের জীবনের গভীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। নদীর মানুষের কান্না, ভালোবাসা, অভিমান, দারিদ্র্য আর সমাজের নির্মমতা—সবকিছু যেন মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। নাটকটির মূল উপজীব্য জেলে সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রাম। নদী আর সাগরপাড়ের মানুষের জীবন যে কতটা অনিশ্চয়তায় ভরা, কতটা ঝড়-তুফান ও বৃষ্টির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়—তা এই নাটকে অসাধারণ বাস্তবতায় উঠে এসেছে। নদীতে নৌকাই তাদের ঘর, মাছ ধরাই তাদের জীবিকা, অথচ সেই জীবনেও নেই নিরাপত্তা। মহাজনের ঋণের বোঝা, দারিদ্র্যের চাপ আর সমাজের প্রভাবশালীদের অত্যাচার তাদের জীবনকে প্রতিনিয়ত সংকুচিত করে তোলে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ভাসান যেন নদীরই সন্তান। একদিন তাকে নদীতে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। কেউ জানে না তার জন্মপরিচয়, মা-বাবা কারা, কোন ধর্মে তার জন্ম। এক মুসলিম জেলে পরিবার তাকে আশ্রয় দেয়, লালন-পালন করে বড় করে তোলে। কিন্তু তার পরিচয়ের প্রশ্নটি কখনো মুছে যায় না। সে কি মুসলিম? হিন্দু? খ্রিস্টান? নাকি কেবলই একজন মানুষ? এই প্রশ্নই নাটকের গভীরে গিয়ে মানবতার সবচেয়ে বড় প্রশ্নে রূপ নেয়। ভাসান বড় হয়ে জেলের পেশায় যুক্ত হয়। তার জীবনে আসে আমেনা—এক সহজ, সরল, নদীর মতো নির্মল প্রেম। তাদের সংসারে ছিল অভাব, কিন্তু ভালোবাসার কমতি ছিল না। নদীর ঢেউ, মাছ ধরা, ঝড়ের রাত আর ভালোবাসার ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল তাদের জীবন। কিন্তু নদী যেমন কাউকে স্থায়ী আশ্রয় দেয় না, তেমনি এক ভয়াবহ ঝড়ের রাতে ভাসান হারিয়ে যায় উত্তাল স্রোতে। সবাই ধরে নেয় ভাসান আর বেঁচে নেই। কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় বহুদিন পর সে ফিরে আসে। তবে এবার তার জীবনে নতুন এক অধ্যায়—শিখা নামে আরেক জেলে কন্যা তার জীবনের অংশ হয়ে যায়। দুই ধর্মের দুই নারীকে নিয়ে ভাসান নতুন সংসার গড়ে তোলে। সেখানে প্রেম ছিল, মানবতা ছিল, কিন্তু সমাজের চোখে সেটিই হয়ে ওঠে অপরাধ। ধর্মীয় কুসংস্কার, সামাজিক সংকীর্ণতা আর তথাকথিত ধর্মরক্ষকদের চাপে ভাসানকে একসময় এলাকা ছাড়া করা হয়। মানুষ ভুলে যায় তার মানবিক পরিচয়। তারা কেবল খুঁজতে থাকে—সে কোন ধর্মের? অথচ ভাসানের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য ছিল মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা। শেষ পর্যন্ত নদীই হয়ে ওঠে তার একমাত্র আশ্রয়। নৌকাতেই তার বসবাস। নদীর জলে ভাসমান সেই নৌকা যেন হয়ে ওঠে তার ঈশ্বরের ঘর। আর সেখানেই নাটকটি পৌঁছে যায় তার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক পরিণতিতে। ভাসান মারা যায়। কিন্তু মৃত্যুর পর শুরু হয় আরেক প্রশ্ন—তাকে কীভাবে সৎকার করা হবে? মুসলিম হলে কবর, হিন্দু হলে দাহ, খ্রিস্টান হলে আলাদা নিয়ম—কিন্তু তার প্রকৃত পরিচয় কেউ জানে না। সমাজ তাকে জীবিত অবস্থায় যেমন আপন করে নিতে পারেনি, মৃত্যুর পরও তাকে কোনো পরিচয় দিতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তার মৃতদেহ নৌকায় ভাসিয়ে দেওয়া হয় নদীর জলে। আর তখন চারদিকে ধ্বনিত হতে থাকে— “ঈশ্বর গাঙে ভাসে…”
এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন পুরো নাটকের দর্শন লুকিয়ে আছে। এখানে নাট্যকার বলতে চেয়েছেন—ঈশ্বর মন্দিরে, মসজিদে, গির্জায় কিংবা প্যাগোডায় সীমাবদ্ধ নন; ঈশ্বর ভাসে মানুষের ভালোবাসায়, মানবতায়, নদীর জলে, কষ্টে আর সত্যে। বর্তমান পৃথিবীতে যখন ধর্মের নামে বিভেদ, হিংসা ও ঘৃণা বাড়ছে, তখন “ঈশ্বর গাঙে ভাসে” নাটকটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সবচেয়ে বড় পরিচয় মানুষ হওয়া। ধর্ম মানুষের জন্য, মানুষ ধর্মের জন্য নয়। নাটকটির পান্ডুলিপি, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় মোকাদ্দেম মোরশেদ অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সংলাপগুলো ছিল কাব্যিক, আবেগঘন ও গভীর অর্থবহ। আলোক পরিকল্পনায় আদনান সামী, সুর ও আবহে মঈন উদ্দিন কোহেল, কোরিওগ্রাফিতে প্রমা অবন্তী এবং পোষাক পরিকল্পনায় অমিত চক্রবর্তীর কাজ নাটকটিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে ঝড়ের দৃশ্য, নদীর ঢেউয়ের শব্দ, জেলেদের গান এবং নৌকার দোল—সব মিলিয়ে দর্শক যেন বাস্তব নদীজীবনের মাঝখানে পৌঁছে গিয়েছিল। সুচরিত টিংকু, শাহীন চৌধুরী, মৌসুমী চক্রবর্তী মৌ, শ্রেয়সী স্রোতস্বিনীসহ প্রতিটি শিল্পী অসাধারণ অভিনয় করেছেন। তাদের সংলাপ, চোখের ভাষা, শরীরী অভিব্যক্তি ও আবেগ দর্শকদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। “ঈশ্বর গাঙে ভাসে” তাই কেবল একটি নাটক নয়, এটি নদীমাতৃক বাংলার মানুষের জীবনবেদনার এক জীবন্ত মহাকাব্য। প্রেম এখানে ধর্মকে অতিক্রম করেছে, মানুষ এখানে পরিচয়ের দেয়াল ভেঙে মানবতার দিকে হাত বাড়িয়েছে। আর শেষ পর্যন্ত নদীই যেন ঘোষণা দিয়েছে— মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ধর্ম নয়, তার মানবতা। “ঈশ্বর গাঙে ভাসে” নাটকের মঞ্চে যারা অভিনয় করেছেন, তারা প্রত্যেকেই যেন নিজেদের চরিত্রের ভেতরে আত্মার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। এটি শুধু অভিনয় ছিল না, ছিল জীবনকে মঞ্চে তুলে আনার এক গভীর শিল্পসাধনা। তাদের সংলাপ, চোখের ভাষা, শরীরী অভিব্যক্তি, নীরবতা, কান্না, প্রেম ও প্রতিবা

দ—সব মিলিয়ে পুরো নাটকটি যেন নদীমাতৃক বাংলার মানুষের জীবন্ত আত্মকথায় পরিণত হয়েছিল। দর্শকরা কেবল নাটক দেখে ননি, তারা যেন নদীর ঢেউ, ঝড়ের ভয়, ভালোবাসার উষ্ণতা এবং মানুষের অস্তিত্বের সংকটকে অনুভব করেছেন শিল্পীদের অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। সুচরিত টিংকু তাঁর অভিনয়ে চরিত্রের অন্তর্গত বেদনা, ভালোবাসা, নিঃসঙ্গতা ও মানবিক আর্তিকে এমন গভীরতায় তুলে ধরেছেন, যা দর্শকের হৃদয়ে দীর্ঘসময় অনুরণিত হয়েছে। তাঁর সংলাপ উচ্চারণ ছিল কখনো নদীর শান্ত ঢেউয়ের মতো কোমল, আবার কখনো ঝড়ো রাতের উত্তাল স্রোতের মতো তীব্র। শাহীন চৌধুরীর অভিনয়ে ছিল দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস ও বাস্তব জীবনের গন্ধ। তাঁর প্রতিটি উপস্থিতি মঞ্চকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে এবং চরিত্রের ভেতরের সংগ্রামকে অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মৌসুমী চক্রবর্তী মৌ তাঁর অভিনয়ের আবেগময় অভিব্যক্তি ও মমতাভরা উপস্থাপনায় দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করেছেন। তাঁর চোখের ভাষায় ছিল অপেক্ষা, ভালোবাসা ও হারিয়ে ফেলার ভয়। শ্রেয়সী স্রোতস্বিনী মঞ্চে যেন নদীর জলের মতো এক কোমল অথচ গভীর আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর অভিনয়ে ছিল নারীর হৃদয়ের নিঃশব্দ কান্না ও ভালোবাসার নির্মল সৌন্দর্য। পার্থ প্রতীম মহাজন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চরিত্রের বাস্তবতাকে মঞ্চে জীবন্ত করেছেন। তাঁর সংলাপ পরিবেশনায় ছিল আত্মবিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার ছাপ। এ টি এম সাইফুর রহমান তাঁর অভিনয়ের দৃঢ়তা ও সংযত অভিব্যক্তির মাধ্যমে নাটকের দৃশ্যগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন। আসরাফ মাসুদের অভিনয়ে ছিল জীবনের কঠিন বাস্তবতার স্পষ্ট প্রতিফলন। তাঁর সংলাপ দর্শকদের ভাবনার গভীরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। সালমা অত্যন্ত আন্তরিক অভিনয়ের মাধ্যমে চরিত্রের আবেগকে জীবন্ত করে তুলেছেন। তাঁর অভিনয়ে ছিল গ্রামীণ জীবনের সহজ সরল সৌন্দর্য। সাইদুর রহমান চৌধুরী তাঁর সংযত অথচ গভীর অভিনয়ে মঞ্চে এক বিশেষ আবহ তৈরি করেছেন। মনিরুল মান্নান (মামুন) তাঁর সহজাত অভিনয় দক্ষতায় চরিত্রকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন মনে হয়েছে তিনি অভিনয় করছেন না, বরং বাস্তব জীবন থেকেই উঠে এসেছেন। নুর স্বপ্ন তাঁর অভিনয়ে চরিত্রের ভেতরের যন্ত্রণা ও আবেগকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রকাশ করেছেন। অর্পিতা চৌধুরী রূপার অভিনয়ে ছিল এক মায়াবী আবেদন, যা দর্শকদের মনোযোগ পুরো সময় ধরে ধরে রেখেছিল। জেসমিন জুঁই তাঁর প্রাণবন্ত অভিনয় ও সংলাপ উপস্থাপনায় নাটকে এক ভিন্ন প্রাণসঞ্চার করেছেন। আদম শফিউল্লাহ মিজভী অভিনয়ে দৃঢ়তা, আবেগ ও সংবেদনশীলতার এক চমৎকার মিশ্রণ উপহার দিয়েছেন। রাফিয়া নেওয়াজ তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় ও সাবলীল উপস্থাপনায় চরিত্রকে অত্যন্ত জীবন্ত করে তুলেছেন। মৌসুমা সৈয়দা আঁকা অভিনয়ে আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে দাগ কেটেছেন। বীণা দাশ গুপ্তা তাঁর পরিমিত অথচ গভীর অভিনয়ে নাটকের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। আওয়াল খান শাহীন তাঁর দৃঢ় মঞ্চ উপস্থিতি ও সংলাপ পরিবেশনায় বিশেষ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। দিগন্ত দেব রায়ের অভিনয়ে ছিল চরিত্রের গভীর উপলব্ধি ও আন্তরিকতা। অবন্তি বিশ্বাস দিঘী তাঁর অভিনয়ে এক অনন্য কোমলতা ও আবেগময় আবেদন সৃষ্টি করেছেন। পার্থ সরকারের অভিনয় ছিল পরিণত, স্বাভাবিক ও বাস্তবতানির্ভর। আহাদুল্লাহ রাব্বি চরিত্রের অনুভূতিগুলোকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছেন। শিবেশ তাঁর সংলাপ, অভিব্যক্তি ও মঞ্চ উপস্থিতির মাধ্যমে নাটকের গতি ও আবহকে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অয়ন দাশ তরুণ উদ্যম, আবেগ ও প্রাণবন্ত অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। শান্তা দাশ তাঁর অভিনয়ে চরিত্রের আবেগ, বেদনা ও মানবিক অনুভূতিকে অত্যন্ত নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। সব মিলিয়ে “ঈশ্বর গাঙে ভাসে” নাটকের প্রতিটি শিল্পী যেন একেকজন নদীর মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। তারা শুধু অভিনয় করেননি, বরং নদীভাঙা জীবনের কান্না, প্রেম, বেদনা, ধর্মীয় বিভেদ ও মানবতার চিরন্তন সত্যকে নিজেদের হৃদয় দিয়ে অনুভব করিয়ে দিয়েছেন। তাদের সম্মিলিত অভিনয়ই নাটকটিকে একটি সাধারণ মঞ্চনাটক থেকে শিল্পের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। দর্শকরা তাই নাটক শেষে শুধু করতালি দেননি, তারা যেন নিজেদের ভেতরেও মানবতার এক নতুন আলো অনুভব করেছেন