Home Blog Page 29

বায়েজিদে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ ডেভিড ইমনের দুই সহযোগী গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের অন্যতম দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সিএমপি জানায়, শনিবার (২৬ জুলাই) রাতে বায়েজিদ বোস্তামী থানার এসআই মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে থানা পুলিশের একটি দল নিয়মিত অস্ত্র ও মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে অক্সিজেন কোয়াইশ রোডের ওয়াজেদিয়া খেলার মাঠ এলাকায় অভিযান চালায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আদালতের পরোয়ানাভুক্ত (জিআর-৪২৭/২৪) পলাতক আসামি মো. আসিফকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে সেখানে গেলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দুই ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করেন। পরে ধাওয়া করে তাদের আটক করা হয়। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম প্রকাশ আরিফ (২৪)। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তাদের দেহ তল্লাশি করা হয়। এ সময় আসিফের কোমর থেকে একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পিস্তলটির ম্যাগাজিনে দুই রাউন্ড গুলি লোড করা ছিল। এছাড়া আরিফের প্যান্টের পকেট থেকে কাগজে মোড়ানো অবস্থায় আরও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া গুলিগুলোর গায়ে ‘25’, ‘32’ ও ‘HPM’ লেখা খোদাই করা রয়েছে। পুলিশ জানায়, অস্ত্র ও গুলি বহনের বৈধ কোনো লাইসেন্স বা কাগজপত্র তারা দেখাতে পারেননি। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার দুজন চট্টগ্রামের আলোচিত চিহ্নিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের সহযোগী বলে দাবি করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হতো বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় অস্ত্র আইন, ১৮৭৮-এর ১৯-এ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতার আসিফের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতি, চাঁদাবাজি, দাঙ্গা, অস্ত্র আইন, সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা ও হত্যাচেষ্টাসহ মোট ১১টি মামলা রয়েছে। অপরদিকে সাইদুল ইসলাম প্রকাশ আরিফের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির দুটি মামলা রয়েছে।

রুমা জোনের মানবিক সহায়তা: দুর্গম পাহাড়ি পাড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ও জরুরি সেবায় সেনাবাহিনী

 নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান: বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি বিভিন্ন পাড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ও জরুরি মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রুমা জোন (৩৬ বীর)। স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করতে সোমবার (২৭ জুলাই) দিনব্যাপী এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। রুমা জোনের জোন কমান্ডার ৩৬ বীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী হাসান সরকারের নির্দেশনায় পরিচালিত এ কর্মসূচিতে শিক্ষা উপকরণ, ক্রীড়া সামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা, রোগী পরিবহনের সরঞ্জাম এবং নগদ আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে পুরাতন পাইন্দু উজানি পাড়ার বাসিন্দাদের জন্য ১ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি পানির ট্যাংকি প্রদান করা হয়। এছাড়া কিউলংক্ষ্যাং পাড়ার তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে একটি ফুটবল, একটি ভলিবল এবং দুটি ভলিবল নেট বিতরণ করা হয়। এদিকে বড়থলি মার্মা পাড়া, ছালছড়া পাড়া ও ত্রিপুরা পাড়ার শিক্ষার্থীদের মাঝে খাতা, হোয়াইট বোর্ড, ফুটবলসহ বিভিন্ন শিক্ষা ও ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে বড়থলি পাড়ার রোগীদের জরুরি পরিবহনের সুবিধার্থে একটি স্ট্রেচার (বেয়ারাসহ) প্রদান করা হয়েছে। মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে বগালেক পাড়ায় এক মৃত ব্যক্তির দাফন-সৎকারের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়া বড়থলি ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দা কর্ণ ত্রিপুরার দুই সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় নির্বাহে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া অসহায় কয়েকজন ব্যক্তির হাতেও নগদ সহায়তা তুলে দেয় রুমা জোন। এর মধ্যে পানতলা পাড়ার নুমংপ্র মারমা পেয়েছেন ৭ হাজার টাকা, মুলফি পাড়ার মং ওয়াই মারমা পেয়েছেন ৩ হাজার টাকা এবং একই পাড়ার সাংনুপ্রু মারমা পেয়েছেন ৩ হাজার টাকা। সহায়তা পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের প্রয়োজনভিত্তিক উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করবে। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, শিক্ষা উপকরণ, রোগী পরিবহনের সুবিধা এবং খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবেন। বড়থলি ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দা কর্ণ ত্রিপুরা বলেন, “দুই সন্তানের লেখাপড়া ও পরিবারের খরচ চালাতে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে ছিলাম। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই সহায়তা তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অনেক সহায়ক হবে। এজন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।” রুমা জোনের জোন কমান্ডার ৩৬ বীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী হাসান সরকার বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই দায়িত্ব পালন করে না, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় ভবিষ্যতেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবিক সহায়তা এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”

আবাসিক গ্যাস সংযোগে দ্রুত পদক্ষেপের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি খোলা চিঠি

0

আবাসিক গ্যাস সংযোগের দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  প্রতি খোলা চিঠির মাধ্যমে দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন গ্রাহক-গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ ঠিকাদার ঐক্য ফেডারেশন,  বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক একে এম অলিউল্লাহ হক। খোলা চিঠিতে দাবি করা হয়, ২০১৫ সালে পেট্রোবাংলার অধীন 0৬টি সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার আবাসিক গ্রাহকের কাছ থেকে ডিমান্ড নোট ইস্যু করে সংযোগ ফি ও জামানতসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ নেওয়া হলেও, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তারা এখনো গ্যাস সংযোগ পাননি। এতে উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা গত ১১ বছর ধরে সংযোগ কার্যক্রম সম্পন্নের অপেক্ষায় রয়েছেন। অথচ ২০২৪ সালের সরকারি নীতিমালা (গেজেট) অনুযায়ী, আবেদন নিষ্পত্তি করে ১৮ কার্যদিবসের মধ্যে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, সংযোগ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হচ্ছে প্রান্তিক ঠিকাদারদের। অনেক ক্ষেত্রে তারা গালমন্দ, অপমান ও দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে কঠিন করে তুলেছে। সংগঠনের দাবি, সিরিয়ালে থাকা ২ লাখ ১৫ হাজার গ্রাহককে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হলে দেশের মোট দৈনিক গ্যাস ব্যবহারে মাত্র ১ শতাংশের মতো বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং অবৈধ গ্যাস সংযোগের প্রবণতাও কমে আসবে। এ অবস্থায় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে দ্রুত আবাসিক গ্যাস সংযোগ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে প্রান্তিক গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ ঠিকাদার ফেডারেশন। সংগঠনটির ভাষ্য, সরকারের একটি নির্দেশেই লক্ষাধিক গ্রাহক এবং হাজারো ঠিকাদার পরিবারের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটতে পারে।

এক কক্ষে মানুষের আর্তনাদ, মানবিক ডিসির গণশুনানিতে ফিরল আশার আলো

 আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী ১৮ জনের সমস্যা শুনে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা; অসহায়দের আর্থিক সহায়তা, ২১ পরিবার পেল ত্রাণ চট্টগ্রাম: জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি কক্ষ। কেউ চোখের জল লুকোচ্ছেন, কেউ বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজের জীবনের গল্প বলছেন। কারও স্বামী এক বছর ধরে সমুদ্রে নিখোঁজ, কারও ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে, কেউ ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন, কেউ কিডনি জটিলতায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। আবার কেউ অর্থাভাবে কলেজে ভর্তি হয়েও বই-ড্রেস কিনতে পারছেন না, কারও কাছে নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার ভাড়াটুকুও নেই। এমন অসংখ্য অসহায় মানুষের কান্না, আবেদন আর শেষ আশ্রয়ের জায়গা হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাপ্তাহিক গণশুনানি। মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা একে একে সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, সান্ত্বনা দেন এবং অধিকাংশ সমস্যার ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। বুধবার (২২ জুলাই) অনুষ্ঠিত এই গণশুনানিতে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ১৮ জন সেবাপ্রত্যাশী তাঁদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সংকট তুলে ধরেন। প্রতিটি আবেদন শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। পাশাপাশি কয়েকটি অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করে আবেদনকারীদের ফলাফল জানাতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়। গণশুনানিতে সাতজন অসহায় ব্যক্তি ও একজন শিক্ষার্থীকে নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়া ২১টি পরিবারকে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়াগুঁড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

নিখোঁজ স্বামীর অপেক্ষায়, দুই সন্তান নিয়ে অসহায় এক মায়ের আর্তনাদ 

মোসাম্মৎ মাইনা খাতুনের স্বামী আজাদ প্রায় এক বছর আগে ট্রলারে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন। আজও তিনি জানেন না, তাঁর স্বামী বেঁচে আছেন নাকি আর কখনো ফিরবেন না। দুই ছোট সন্তানের দায়িত্ব এখন তাঁর একার কাঁধে। এরই মধ্যে তিনি নিজেও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। নিয়মিত চিকিৎসা কিংবা ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই। গণশুনানিতে তিনি সন্তানদের ভরণ-পোষণ, নিজের চিকিৎসা এবং নিখোঁজ স্বামীর সন্ধানে প্রশাসনিক সহযোগিতা কামনা করেন। তাঁর কথা শুনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

বন্যায় ঘরহারা পরিবার পেল পুনর্বাসনের আশ্বাস

বাঁশখালীর ইলশা গ্রামের রেয়াজুল জান্নাত রাহাত জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় তাঁদের বাড়িতে পাঁচ থেকে ছয় ফুট পানি ওঠে। এতে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় কাঁচা বসতঘর, নষ্ট হয়ে যায় কৃষিজমির ফসল। তাঁর বাবা রেয়াজ আহামদ দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রোকে আক্রান্ত ও শারীরিকভাবে অক্ষম। বর্তমানে পরিবারটি অস্থায়ী আশ্রয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিষয়টি শুনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক সহায়তা দেন এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত শাহাজাহানের চিকিৎসায় সহায়তা

বোয়ালখালীর পশ্চিম শাকপুরার মো. শাহাজাহান দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় বহন করা তাঁর পরিবারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।তাঁর অসহায় অবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসক চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

অর্থাভাবে থমকে যাওয়া শিক্ষাজীবনে নতুন আশা

বাঁশখালীর মিনজিরিতলার মিফতাহুল জান্নাত রিয়া সরকারি সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে। সাম্প্রতিক বন্যায় তাঁদের বসতঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অর্থের অভাবে বই, কলেজ ড্রেস ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কিনতে না পারায় তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি শুনে জেলা প্রশাসক তাঁকে বিশেষ আর্থিক অনুদান প্রদান করেন, যা তাঁর শিক্ষাজীবন চালিয়ে যেতে নতুন আশা জাগিয়েছে।

ক্যান্সার আক্রান্ত কর্মচারীর পাশে জেলা প্রশাসন

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আরএম শাখার অফিস সহায়ক নিলুফার ইয়াসমিন কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন কন্যা ও এক পুত্রকে নিয়ে সংগ্রাম করছেন তিনি।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং ঢাকায় পিইটি স্ক্যানসহ ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে আরও প্রায় তিন লাখ টাকার প্রয়োজন। তাঁর আবেদন বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

অস্ত্রোপচারের অর্থ পেলেন দুর্ঘটনায় আহত যুবক

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ মোহাম্মদ আবু কাউছারের ডান পায়ের গোড়ালির হাড় সড়ক দুর্ঘটনায় ভেঙে যায়। চিকিৎসা করাতে গিয়ে তাঁর সব সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে চিকিৎসা থমকে ছিল।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির এমন দুর্দশার কথা শুনে জেলা প্রশাসক তাঁর চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেন।

বাড়ি ফেরার ভাড়াও ছিল না, সহায়তা পেলেন শফিকুল

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মো. শফিকুল ইসলাম জীবিকার সন্ধানে চট্টগ্রামে এসে কোনো কাজ পাননি। একপর্যায়ে তাঁর কাছে দৈনন্দিন খরচ কিংবা নিজ জেলায় ফিরে যাওয়ার ভাড়াটুকুও ছিল না। জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করলে তাঁকে দিনাজপুরে ফেরার প্রয়োজনীয় গাড়িভাড়া প্রদান করা হয়।

প্রবাসীদের অভিযোগও শুনলেন জেলা প্রশাসক

একই দিনে জেলা প্রশাসক প্রবাসীদের জন্য অনলাইন গণশুনানির আয়োজন করেন। এতে এক প্রবাসী তাঁর পারিবারিক জমিজমা জবরদখলের অভিযোগ তুলে ধরেন। অভিযোগ শুনে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

আবেদন নয়, আস্থার ঠিকানা

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানি এখন আর কেবল আবেদন গ্রহণের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; এটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায়। কেউ ফিরেছেন চিকিৎসার অর্থ হাতে নিয়ে, কেউ পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সাহস নিয়ে, কেউ নতুন ঘর তৈরির আশ্বাস নিয়ে, আবার কেউ নিজের বাড়ি ফেরার ভাড়া নিয়ে। হয়তো একটি দিনের সহায়তায় জীবনের সব সংকট দূর হয় না। কিন্তু অসহায় মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁদের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাৎক্ষণিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে গেছে—রাষ্ট্রের দরজা এখনও সাধারণ মানুষের জন্য খোলা, আর সেই দরজায় মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

ভুলের ভেলায় ভেসে জীবন লিখতে বসে করি ভুল

মো. কামাল উদ্দিন প্রিয় গোলাপ ফুল, হারাইলাম তিনকুল—এখন যেন খালকুল! লিখতে বসে করি ভুল। জীবনে কত ভুল করেছি, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ভুলের খাতা খুলে বসলে হয়তো আরেকটি জীবনও কম পড়ে যাবে। তবু একটি কথা দৃঢ়ভাবে বলা যায়—সবকিছুতে ভুল করা চললেও, ভুলকে শুদ্ধ বানান হিসেবে লেখা কখনোই চলবে না। সেটাই হবে সবচেয়ে বড় ভুল।
ছোটবেলায় ম্যাট্রিক পরীক্ষার টেস্ট পেপারের বাংলা ব্যাকরণ অংশে একটি বাক্য বারবার চোখে পড়ত—“ভুল বানান, কিন্তু ভুল করিও না।” আজও সেই কথাটি মনে গেঁথে আছে। কারণ, ভুলে যাওয়া আর ভুল করা এক জিনিস নয়। মানুষ ভুলে যায় স্মৃতির কারণে, আর ভুল করে অসাবধানতায়। আমরা কত বিচিত্র ভুলই না করি! কখনো চিঠির ঠিকানা ভুল লিখি, আবার সেই ভুল ঠিকানার চিঠিটাই ডাকবাক্সে ফেলতে ভুলে যাই। মনে পড়ে, এইচ. জি. ওয়েলসের একটি কথার কথা—মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো একটি ভালো রকমের ভুল করা। হয়তো সে কারণেই অনেক ব্যবসায়ী ইচ্ছা করেই সাইনবোর্ডে বানান ভুল রাখেন। মানুষ দোকানের নাম ভুলে যায়, কিন্তু সেই অদ্ভুত ভুলটি ভুলতে পারে না। ভাবুন তো, যদি কোনো ঘিয়ের দোকানে লেখা থাকে—“এখানে বিষুদ্ধ ঘৃত পাওয়া য়ায়।” বানান দেখে হাসি পেলেও দোকানটির কথা কিন্তু মনে থেকে যায়! ভুল নিয়ে বাংলা সাহিত্যের রসিক সম্রাট শিবরাম চক্রবর্তীর গল্পগুলো আজও অমলিন। এক ভদ্রলোকের পায়ে দুই রঙের দুই মোজা। একজন বন্ধু বললেন, “মোজা দুটো তো আলাদা!” ভদ্রলোক নির্বিকার উত্তর দিলেন, “এ আর নতুন কী! বাসায় আরেক জোড়া আছে—সেটাও একটা লাল, একটা কালো!”
এই ধরনের ভুলের ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে যুক্তিও কখনো হেরে যায়।  আর আছে ছাপাখানার সেই অদৃশ্য বাসিন্দা—‘প্রিন্টার্স ডেভিল’। বাংলায় যাকে অনেকে মুদ্রণভূত বলেন। তাকে কেউ কখনো দেখেনি, কিন্তু তার কীর্তিকলাপ সবাই দেখেছে। একটি অক্ষরের ভুলে অর্থের কী ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটে, তার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। একজন খ্যাতিমান আইনজীবী নিজের লেখা মামলার কাগজ বহুবার প্রুফ দেখে সংশোধন করলেন। প্রথমবার চল্লিশটি ভুল, দ্বিতীয়বার প্রায় একশো ডলারের ভুল, তৃতীয়বারও এগারোটি ভুল ধরা পড়ল! তখন তিনি বুঝলেন—মুদ্রণপ্রমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা মানে মরুভূমিতে বালুকণা গোনা। আসলে ভুল মানুষের চিরন্তন সঙ্গী। পৃথিবীর কত বিখ্যাত বই বানান বা মুদ্রণপ্রমাদ নিয়েও বেস্টসেলার হয়েছে। এমনকি প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর নামও একবার ভুল ছাপা হয়েছিল। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত সংবাদপত্রও রাজপ্রাসাদের নাম ছাপতে গিয়ে এমন ভুল করেছিল, যা আজও মুদ্রণপ্রমাদের ইতিহাসে হাস্যরসের উদাহরণ হয়ে আছে। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, “আমাদের ভুল আর ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই আমরা সব জানতে পারি।” সত্যিই তো—ভুল না করলে মানুষ শেখে কীভাবে? এক জরিপে মানুষকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কী? কেউ বললেন, “অতিরিক্ত বই পড়ে চোখ নষ্ট করেছি।” আরেকজন বললেন, “পড়াশোনা না করাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।” কেউ আফসোস করলেন—“খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছি।” অন্যজনের দীর্ঘশ্বাস—“অনেক দেরিতে বিয়ে করেছি।” কেউ বললেন—বাবার কথা না শোনা ভুল। কেউ বললেন—টাকা উপার্জনের চেষ্টা না করা ভুল। কেউ বললেন—টাকা জমাতে না পারা ভুল। কেউ বললেন—নির্বাচনে দাঁড়ানোই ভুল। অর্থাৎ, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল—মানুষভেদে একেক রকম। আমারও মনে হয়, প্রত্যেক মানুষের বুকের ভেতরে একটি অদৃশ্য তালিকা থাকে, যেখানে লেখা থাকে—“যদি আবার জীবন শুরু করতে পারতাম…” ভুলের মজার গল্পও কম নয়। এক ভদ্রমহিলা স্বামীর সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খেয়ে বেরিয়ে হঠাৎ মনে করলেন, তাঁর রুমালটি টেবিলে ফেলে এসেছেন। তিনি দ্রুত ফিরে গিয়ে টেবিলের নিচে উঁকি মারতেই বেয়ারা ভদ্রভাবে বলল— “ম্যাডাম, আপনি ভুল করছেন। আপনার স্বামী এখানে নন, বাইরে ফুটপাথে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন!” ভুলেরও যে ভুল বোঝাবুঝি আছে, তা এই ঘটনাই প্রমাণ করে। জীবনকেও অনেক সময় আমার ভুলভুলাইয়ার মতো মনে হয়। সামনে যত পথ, সব যেন একই রকম। কোনটি সঠিক, কোনটি ভুল—বুঝে ওঠার আগেই মানুষ ভুল দরজায় কড়া নাড়ে। তারপর আবার ফিরে আসে, আবার চেষ্টা করে। এই চলার নামই হয়তো জীবন। শেষ করি একটি ছোট্ট অথচ গভীর গল্প দিয়ে। শীতের ট্রেনে পাশাপাশি দুদিন ভ্রমণ করলেন একজন অধ্যাপক ও একজন সাধারণ পিয়ন। গন্তব্যে পৌঁছে অধ্যাপক দেখলেন তাঁর বালাপোশ নেই। সন্দেহ গেল দরিদ্র সহযাত্রীর ওপর। তল্লাশি হলো, বিছানা খোলা হলো। শেষে দেখা গেল বালাপোশটি ট্রেনের বার্থের নিচেই পড়ে আছে।
অধ্যাপক লজ্জিত হয়ে বললেন—
“ক্ষমা করবেন, আমি ভুল করেছিলাম।”
পিয়ন মৃদু হেসে উত্তর দিলেন—
“আমিও ভুল করেছিলাম।”
অধ্যাপক বিস্মিত—“আপনি আবার কী ভুল করলেন?”
পিয়নের শান্ত উত্তর—
“আপনি আমাকে চোর ভেবেছিলেন। আর আমি আপনাকে ভদ্রলোক ভেবেছিলাম।” সত্যিই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভুল অনেক সময় বানানে নয়—মানুষ চেনায়।  তাই ভুল হবেই। ভুল মানুষ করবে, মানুষই শিখবে। কিন্তু একটি ভুল যেন না করি—কাউকে না জেনে, না বুঝে বিচার করার ভুল। কারণ, সেই ভুলের কোনো সংশোধনী থাকে না।

ক্রাইম সাংবাদিকতার পথচলা: এক সাহসী অভিযাত্রা—২

 – মো. কামাল উদ্দিনঃ এই পথচলা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। সহজ ছিল না পদে পদে বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া, যখন কলমের নিব থেকে প্রতিধ্বনিত হয়েছে সমাজের অন্ধকারতম সত্য। অনেকেই ছিলেন বিরুদ্ধ পক্ষে—হুমকি দিয়েছেন, ভয় দেখিয়েছেন, প্রতিহিংসার জাল বিছিয়েছেন আমার চারপাশে। এমনকি মৃত্যুর কাছাকাছিও গিয়েছি একাধিকবার। তবু থেমে যাইনি। কলম ছিল আমার অস্ত্র, সত্য ছিল আমার ঢাল। আমি বিশ্বাস করেছি এবং আজও করি—একজন প্রকৃত সাংবাদিক কখনো ভয়ের কাছে নত হয় না। তিনি সামনে এগিয়ে যান, সমাজের জন্য ঝুঁকি নেন, সত্যের পক্ষে অবস্থান নেন। আমার দীর্ঘ পেশাগত জীবনে বহুবার আমাকে “ডাঙাবাজ ক্রাইম সাংবাদিক” নামে অভিহিত করা হয়েছে। কেউ কেউ তা বিদ্রুপ করে বলেছে, আবার কেউ তা বলেছে শ্রদ্ধার সঙ্গে। কিন্তু আমি জানি, আমার কাজের ফলেই অপরাধের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা অনেক গোপন তথ্য প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এসেছে। অপরাধীর মুখোশ খুলে ফেলা, প্রশাসনের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো—এই কাজগুলো সহজ ছিল না, কিন্তু তৃপ্তিদায়ক ছিল অসীমভাবে। আমি বিশ্বাস করি, ক্রাইম সাংবাদিকতা শুধুই অপরাধের বিবরণ তুলে ধরা নয়, এটি সমাজ বদলের এক অদৃশ্য কিন্তু অদম্য হাতিয়ার। আমার লেখা প্রতিটি প্রতিবেদন শুধু তথ্য বহন করেনি, বরং একেকটি প্রতিবেদন হয়ে উঠেছে সমাজ পরিবর্তনের সোপান।  আজ যখন দেখি অপরাধ জগত প্রতিনিয়ত রূপ পাল্টাচ্ছে—তাদের কৌশল পরিবর্তন হচ্ছে, প্রযুক্তির অপব্যবহার বাড়ছে, প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাতও গভীরতর হচ্ছে—তখনো মনে হয়, আমার দায়িত্ব শেষ হয়নি। সত্যের সন্ধানে এই অভিযাত্রা থামার নয়। যতদিন না অপরাধের অন্ধকার দূর হয়, ততদিন এই লড়াই চলবে। ক্রাইম সাংবাদিকতা: উৎপত্তি, বিকাশ ও দায়বদ্ধতা  ক্রাইম সাংবাদিকতা গণমাধ্যমের একটি বিশেষায়িত শাখা। এখানে সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু খবর প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে সমাজের বিবেকের আয়না। অপরাধের সংবাদ যেমন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তেমনি অপরাধ প্রতিরোধে নীতিনির্ধারকদেরও সক্রিয় হতে বাধ্য করে। এই সাংবাদিকতার মূল কাজ হলো—অপরাধ বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও জনসমক্ষে উপস্থাপন। এতে অপরাধের প্রকৃতি, কারণ, সামাজিক প্রভাব এবং প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। তবে এটি শুধু তথ্য পরিবেশন নয়, বরং অপরাধের নেপথ্য কাহিনি খুঁজে বের করার এক নিরন্তর সংগ্রাম। ক্রাইম সাংবাদিকতার ইতিহাস ও জনক-ক্রাইম সাংবাদিকতার সূচনা একক কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে হয়নি। এটি সময়ের প্রয়োজনে, সমাজের চাহিদা মেটাতে ধাপে ধাপে বিকশিত হয়েছে। তবে এই ধারার ইতিহাসে কিছু অগ্রণী নাম ও প্রতিষ্ঠান অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।
১. জোসেফ পুলিৎজার (১৮৪৭–১৯১১) তিনি ছিলেন আমেরিকার একজন কিংবদন্তি সাংবাদিক ও সংবাদপত্র প্রকাশক। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকাগুলো, বিশেষ করে New York World, অপরাধ ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনের মাধ্যমে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। সেই সময় “হলুদ সাংবাদিকতা” বা Yellow Journalism নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, পুলিৎজার তাঁর পত্রিকায় তথ্যনিষ্ঠ, জনস্বার্থভিত্তিক অপরাধ বিষয়ক সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে একটি নতুন ধারার সূচনা করেন।
২. নেলি ব্লাই (১৮৬৪–১৯২২) 
নেলি ব্লাই ছিলেন এক সাহসী অনুসন্ধানী নারী সাংবাদিক। তাঁর সবচেয়ে আলোড়ন তোলা প্রতিবেদন ছিল নিউ ইয়র্কের এক মানসিক হাসপাতালে গোপনে ঢুকে সেখানকার নারীদের উপর চালানো নির্যাতনের তথ্য উন্মোচন। তিনি নিজের নাম, পরিচয় গোপন করে ভেতর থেকে সত্য বের করে আনেন। তাঁর প্রতিবেদন শুধু পাঠকদের মন জয় করেনি, প্রশাসনকেও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে।
৩. “পেনি প্রেস” ও অপরাধ সংবাদ
১৮৩০-এর দশকে আমেরিকায় “পেনি প্রেস” নামে সস্তা সংবাদপত্রগুলোর আবির্ভাব ঘটে, যেমন The Sun, The New York Herald। এই পত্রিকাগুলো অপরাধ সংক্রান্ত সংবাদকে জনপ্রিয় করে তোলে। এ সময়ই অপরাধ রিপোর্টিং গণমানুষের সংবাদ হয়ে ওঠে, যেখান থেকে ক্রাইম সাংবাদিকতার আধুনিক ভিত্তি গড়ে ওঠে।
একজন ক্রাইম সাংবাদিকের দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ  একজন ক্রাইম সাংবাদিকের কাজ শুধু অপরাধের বর্ণনা দেওয়া নয়। তাঁকে হতে হয় সাহসী, নিরপেক্ষ এবং অনুসন্ধানী। তার দায়িত্ব হলো—অপরাধের প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধান করা,নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা, ভুয়া বা মিথ্যা অভিযোগের ফাঁদে পা না দেওয়া, নিরাপত্তা বজায় রেখে ন্যায়বিচারের পক্ষে কলম চালানো। তবে এই পেশার চ্যালেঞ্জও কম নয়— হুমকি ও প্রতিহিংসার ভয়, প্রশাসনিক চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব, ভুয়া তথ্যের জাল থেকে নিজেকে রক্ষা করা। ক্রাইম সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়—এটি একটি দায়িত্ব, একটি আদর্শের লড়াই। আজকের বাংলাদেশে যখন সত্য বলা কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন একজন সত্যনিষ্ঠ ক্রাইম সাংবাদিক যেন অন্ধকারে আলোর প্রদীপ। আমি, মো. কামাল উদ্দিন, এই পেশায় আমার জীবন উৎসর্গ করেছি এই বিশ্বাস নিয়ে যে, অপরাধকে অন্ধকারে রাখলে তা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তাই তাকে আলোর মুখে আনাই আমার কর্তব্য। যতদিন কলম চালাতে পারি, ততদিন আমার এই সাহসী অভিযাত্রা চলবে—সত্যের সন্ধানে, সমাজের স্বার্থে, ন্যায়ের পক্ষে।
[চলবে]

যে ৮ টুথপেস্টে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি

0

আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্ট নিয়ে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ESDO) পরিচালিত এক বছরের গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্ট নমুনার মধ্যে ২৬টিতেই (৭৬.৫ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে স্বস্তির খবর হলো, ৮টি টুথপেস্টে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়নি।গবেষণাটি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত হয়। দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, খুচরা ও পাইকারি বাজার থেকে সংগ্রহ করা ১৯টি দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের ৩৪টি নমুনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের Environmental Health and Ecotoxicology (EHE) Laboratory-তে পরীক্ষা করা হয়।

মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত ৮টি টুথপেস্ট

গবেষণা অনুযায়ী যেসব টুথপেস্টে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি, সেগুলো হলো—

১. Genfresh Toothpaste (জেনফ্রেশ)

  • দেশীয় ব্র্যান্ড।
  • পরীক্ষায় কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়নি।

২. Parachute Just for Baby – Mango (প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি – ম্যাঙ্গো)

  • শিশুদের জন্য তৈরি দেশীয় টুথপেস্ট।
  • পরীক্ষায় নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

৩. Close-Up Red Hot Zinc Fresh Technology

  • দেশে উৎপাদিত এই নির্দিষ্ট ভ্যারিয়েন্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।

৪. Parodontax Expert Gum Care

  • ভারতে উৎপাদিত।
  • মাড়ির যত্নে ব্যবহৃত এই টুথপেস্টও পরীক্ষায় মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত পাওয়া গেছে।

৫. Sensodyne Fresh Gel

  • সংবেদনশীল দাঁতের জন্য তৈরি জেল-ভিত্তিক টুথপেস্ট।
  • পরীক্ষায় কোনো প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়নি।

৬. Colgate MaxFresh

  • ভারতে উৎপাদিত এই ভ্যারিয়েন্টটি পরীক্ষায় নিরাপদ তালিকায় স্থান পেয়েছে।

৭. Colgate Active Salt

  • কোলগেটের এই ভ্যারিয়েন্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।

৮. Kodomo Orange

  • থাইল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত শিশুদের টুথপেস্ট।
  • পরীক্ষায় মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?  মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা দাঁত ব্রাশ করার সময় অজান্তেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে। গবেষকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এসব কণার স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। যদিও মানবদেহে এর সব ধরনের প্রভাব এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত হয়নি, তবুও অপ্রয়োজনীয় মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমানো জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

ESDO-এর পর্যবেক্ষণ

  • পরীক্ষিত ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে (৭৬.৫%) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
  • ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।
  • শিশুদের জন্য বাজারজাত ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
  • টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে কোথাও মাইক্রোপ্লাস্টিক বা সিনথেটিক পলিমারের উপস্থিতির তথ্য উল্লেখ ছিল না।

নিরাপদ টুথপেস্ট বেছে নেওয়ার পরামর্শ

বিশ্বস্ত ও নিবন্ধিত ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহার করুন।  ESDO বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গবেষণা ও হালনাগাদ তথ্য অনুসরণ করুন। শিশুদের জন্য টুথপেস্ট কেনার সময় পরীক্ষিত ও নিরাপদ পণ্যকে অগ্রাধিকার দিন। কেবল “হারবাল” বা “ন্যাচারাল” লেখা দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পণ্যের উপাদান ও নির্ভরযোগ্য গবেষণার তথ্য যাচাই করুন।

 

দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা ও সফলতা কামনা

— মো. কামাল উদ্দিন  আগামী ১ আগস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর গৌরবময় ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ দেড় দশকের পথচলায় পত্রিকাটি সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন, জনস্বার্থ রক্ষা এবং চট্টগ্রামের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার কথা সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরে পাঠকমহলে একটি আস্থার ঠিকানা হিসেবে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। এই গৌরবোজ্জ্বল আয়োজনের সফল বাস্তবায়নের জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মিজানুর রহমান চৌধুরীকে। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, সংবাদপত্রের প্রতি নিবেদন, পেশাদারিত্ব এবং নিরলস পরিশ্রমের ফলেই পত্রিকাটি আজ ১৫ বছরের সফল পথচলার মাইলফলকে পৌঁছেছে। সংবাদপত্রকে তিনি শুধু একটি প্রকাশনা হিসেবে নয়, বরং সমাজের সত্য, ন্যায় এবং মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।  একজন সম্পাদক হিসেবে তাঁর বিচক্ষণতা, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্যও অনুকরণীয়। তাঁর নেতৃত্বে দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম আগামী দিনেও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, মানবিক মূল্যবোধ এবং গণমানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে আরও সমৃদ্ধ হবে—এটাই প্রত্যাশা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১ নম্বর হলে আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান সর্বাঙ্গীণ সফল হোক, অংশগ্রহণকারী অতিথি, সাংবাদিক, শুভানুধ্যায়ী ও পাঠকদের মিলনমেলায় পরিণত হোক—এই কামনা করছি। দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সফল হোক। সম্পাদক ও প্রকাশক মিজানুর রহমান চৌধুরীর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি। সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এই অগ্রযাত্রা আরও অনেক দূর এগিয়ে যাক—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

কোর্টের বারান্দায় একদিন: বিচারপ্রার্থীদের কান্না, দীর্ঘশ্বাস আর রাষ্ট্রের বিবেকের সামনে কিছু প্রশ্ন

 মো. কামাল উদ্দিন আজ সকাল ঠিক ১০টায় আদালতে পৌঁছেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল একটি মামলা দায়ের করা। সঙ্গে ছিলেন আমার ভাতিজা, বিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মফিজ। ভেবেছিলাম, নিয়মমাফিক কাজটি শেষ করে ফিরে যাব। কিন্তু আদালতের বাস্তবতা যেন আবারও বুঝিয়ে দিল—বিচার চাওয়া যত সহজ, বিচার পাওয়া তত সহজ নয়। জানতে পারলাম, যে আদালতে মামলাটি দায়ের হওয়ার কথা, সেই আদালতের বিচারক অন্য আদালতে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে শুরু হলো দীর্ঘ প্রতীক্ষা। আর সেই অপেক্ষার সময়টুকুই আমাকে নিয়ে গেল এক ভিন্ন জগতে—যেখানে প্রতিটি মুখ একটি গল্প, প্রতিটি চোখে একটি দীর্ঘশ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপে জমে আছে জীবনের না-পাওয়া হিসাব। আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এটি কেবল একটি সরকারি ভবন নয়; এটি যেন মানুষের কান্না, বেদনা, আশা, প্রতারণা, অন্যায়, নির্যাতন, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, ক্ষমতার লড়াই এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার এক বিশাল জীবন্ত জাদুঘর। ছবিটির দিকে তাকালে দেখা যায়—একজন মা কালো পোশাকে কোলে শিশুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখে অনিশ্চয়তা। পাশে আরেক নারী বেঞ্চে বসে আছেন, মুখ ঢাকা। হয়তো তিনি নিজের সম্মান রক্ষার লড়াইয়ে এসেছেন, হয়তো স্বামীর নির্যাতনের বিচার চাইতে, হয়তো সন্তানদের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করছেন। সেই শিশুটি কিছুই জানে না—সে শুধু মায়ের বুকের উষ্ণতা খুঁজছে। অথচ তার শৈশবের প্রথম স্মৃতিই হয়তো হয়ে থাকবে আদালতের এই করিডোর। ভাবছিলাম, এই শিশুদের কী অপরাধ? তারা তো আদালতে জন্মায়নি। সমাজের অন্যায়, পারিবারিক ভাঙন, ক্ষমতার অপব্যবহার আর মানুষের নিষ্ঠুরতার কারণেই তাদের ছোট্ট জীবন আদালতের বারান্দায় শুরু হয়। এই দৃশ্য দেখে বুকটা হাহাকার করে উঠল। অপেক্ষার সময় দেখা হলো পটিয়ার পরিচিত মুখ কাসেমের সঙ্গে। স্থানীয় নির্বাচনে জয়ী হয়েও নানা রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি তাঁর প্রাপ্য দায়িত্ব পাননি বলে অনেকেই অভিযোগ করেন। পরবর্তীতে তাঁর প্রতিদন্ধি কাসেম চেয়ারম্যান এর ছোট ভাই হত্যার একটি মামলায় মিথ্যা আসামি হয়ে কারাগারে যেতে হয় এবং আজ আদালতে হাজিরা দিতে এসেছেন। কিছুক্ষণ কথা হলো। তাঁর চোখেও দেখলাম ক্লান্তি। রাজনীতি, মামলা আর ক্ষমতার লড়াই—সবকিছু মিলে একজন মানুষের জীবন কীভাবে বদলে যেতে পারে, তারও এক নীরব সাক্ষী এই আদালত। পরে দেখা হলো সাংবাদিক আহমেদ কবির, জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ইউনুস ভাই, আন্দোলনের সহযোদ্ধা এবং বহু আইনজীবী বন্ধুর সঙ্গে। আদালত যেন এক বিশাল মিলনমেলা, কিন্তু এখানে আনন্দের নয়—অপেক্ষার, উৎকণ্ঠার, বিচারপ্রার্থনার। চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম—শত শত মানুষ। কেউ বাদী, কেউ বিবাদী, কেউ সাক্ষী, কেউ জামিনের আশায়, কেউ রায়ের অপেক্ষায়। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, এত মানুষের ভিড়ে একজন মানুষের মুখেও প্রকৃত হাসি নেই।  একজন বৃদ্ধ লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে আদালতের সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন। তাঁর মুখে বয়সের ভার, চোখে অসহায়ত্ব। হয়তো জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও জমির একটি মামলার রায় দেখতে চান। পাশে একজন বৃদ্ধা মা কাঁদছেন। হয়তো তাঁর ছেলেকে পুলিশ ধরে এনেছে, হয়তো তিনি নিজের শেষ সম্বল বিক্রি করে আইনজীবীর ফি জোগাড় করেছেন। এই কান্না কেবল একজন মায়ের নয়—এটি অসহায় মানুষের কান্না। সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগল গরিব মানুষের দিকে তাকিয়ে। অনেকেই দিনমজুর। আজ আদালতে এসেছেন বলে আজকের রোজগার বন্ধ। একজন রিকশাচালক আদালতের সিঁড়িতে বসে শুকনো রুটি খাচ্ছেন। একজন কৃষক ময়লা গামছা দিয়ে ঘাম মুছছেন। একজন শ্রমিক তাঁর মামলার তারিখ শুনে হতাশ হয়ে আবার বাড়ি ফিরছেন। হয়তো পরের তারিখে আসতেও তাঁকে ধার করতে হবে।
এই মানুষগুলোর কাছে একটি তারিখ মানে শুধু একটি দিন নয়—একটি কর্মদিবস হারানো, একটি পরিবারের রাতের খাবার অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া। হাজতখানার সামনে গিয়ে আরও বেদনাদায়ক দৃশ্য দেখলাম। পুলিশের পাহারায় একের পর এক আসামিকে আনা হচ্ছে। কেউ মাথা নিচু করে হাঁটছেন, কেউ স্বজনের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছেন। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী, মা, বাবা কিংবা সন্তানের চোখে শুধু জল। একজন বৃদ্ধা মায়ের কণ্ঠে শুনলাম—”বাবা, একটু ভালো থাকিস।” এই একটি বাক্যের মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত মায়ের ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। তবে এই করুণ দৃশ্যের মাঝেও একটি আশার আলো দেখলাম। আদালতের করিডোরে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করছেন অনেক নারী আইনজীবী। কালো কোট পরে যুক্তি, আইন ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তাঁরা বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নিচ্ছেন। একসময় যে পেশা ছিল পুরুষদের আধিপত্যে, আজ সেখানে নারীদের দৃপ্ত পদচারণা সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক। আদালতের প্রতিটি দেয়াল যেন অসংখ্য মানুষের অশ্রু শুষে নিয়েছে। প্রতিটি বেঞ্চ জানে কত মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার ইতিহাস। প্রতিটি ফাইলের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা, বিশ্বাসঘাতকতা, সম্পত্তির বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা মিথ্যা অভিযোগের গল্প। একজন সাংবাদিক হিসেবে আজ আমার মনে হয়েছে, আদালতের প্রকৃত সংবাদ শুধু রায়ের কপি নয়; প্রকৃত সংবাদ হলো সেই মায়ের চোখের জল, যে শিশুকে কোলে নিয়ে বিচার চাইতে এসেছে। প্রকৃত সংবাদ হলো সেই বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস, যিনি জীবনের শেষ বয়সেও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। প্রকৃত সংবাদ হলো সেই গরিব শ্রমিকের কষ্ট, যিনি একটি তারিখের জন্য দিনের উপার্জন হারিয়েছেন। প্রকৃত সংবাদ হলো সেই নির্যাতিত নারীর সাহস, যিনি সমস্ত ভয়কে জয় করে আদালতের দরজায় দাঁড়িয়েছেন।  বিচারব্যবস্থা শুধু আইন দিয়ে চলে না; এটি চলে মানবিকতা, সময়ানুবর্তিতা, জবাবদিহি এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ দিয়ে। বিচার যদি বিলম্বিত হয়, তবে অনেক সময় সেটি বিচার নয়—নতুন এক যন্ত্রণার নাম হয়ে দাঁড়ায়।
আজ আদালত থেকে ফিরে মনে হয়েছে, আমাদের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু আদালতের সংখ্যা বাড়ানো নয়; মানুষের দুর্ভোগ কমানো, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, মিথ্যা মামলার অপব্যবহার রোধ করা এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। কারণ আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি বুঝেছি—এখানে কেউ আনন্দ নিয়ে আসে না। এখানে আসে শেষ আশ্রয়ের বিশ্বাস নিয়ে।  হয়তো একদিন এই দেশের আদালতের করিডোরে অপেক্ষা থাকবে, কিন্তু হতাশা থাকবে না; মামলা থাকবে, কিন্তু মিথ্যা মামলা থাকবে না; বিচার হবে, কিন্তু বছরের পর বছর নয়—সময়ের মধ্যে। সেদিন আদালতের এই বারান্দা শুধু দীর্ঘশ্বাসের নয়, ন্যায়বিচারের স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠবে।  আজকের এই আদালত সফর আমাকে একটি কথাই নতুন করে শিখিয়েছে—মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, ক্ষমতা নয়; প্রকৃত সম্পদ হলো ন্যায়বিচার। আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই একটি রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে মানবিক, সভ্য ও গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে।

“আলো-আঁধারির নেভালে: কর্ণফুলীর মোহনায় কিছু মানুষ, কিছু গল্প, কিছু কবিতা-

মো. কামাল উদ্দিনঃ  কখনো কখনো মানুষের জীবনে এমন কিছু সন্ধ্যা আসে, যার কোনো পূর্বপরিকল্পনা থাকে না, কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজনও থাকে না। তবুও সেই ক্ষণিক সময়গুলো বছরের পর বছর হৃদয়ের অ্যালবামে রঙিন ছবি হয়ে বেঁচে থাকে। রাতের পতেঙ্গা নেভালের আড্ডাটাও ছিল ঠিক তেমনই—কোলাহল থেকে দূরে, ব্যস্ততা থেকে কিছুটা মুক্ত, আর কর্ণফুলীর মোহনায় রাতের ঝিকিমিকি আলোর সঙ্গে মিশে থাকা এক টুকরো নির্মল সময়। ইট-পাথরের নগরী মানুষকে জীবিকা দেয়, কিন্তু প্রকৃতি মানুষকে বাঁচার শক্তি দেয়। দিনের পর দিন লেখালেখির ব্যস্ততা, সংবাদ সংগ্রহ, মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প, সামাজিক নানা দায়িত্ব—সবকিছুর ভিড়ে নিজের জন্য সময় বের করা যেন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তাই হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত—চলুন, কিছু সময় শহরের কোলাহল ছেড়ে কর্ণফুলীর মোহনায় গিয়ে বসা যাক। রাত তখন গভীর হওয়ার অপেক্ষায়। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা, মাঝেমধ্যে চাঁদের ম্লান আলো, নদীর বুকে জাহাজের সারি, দূরে জ্বলজ্বল করা আলোগুলো যেন অন্ধকারের বুকে ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্র। হালকা বাতাস এসে মুখ ছুঁয়ে দিচ্ছিল, আর মনে হচ্ছিল—প্রকৃতি যেন নীরবে বলছে, “এখানে কিছুক্ষণ সব দুঃশ্চিন্তা রেখে যাও।” আমি রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কর্ণফুলীর কালো জলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেই জলরাশি যেন অসংখ্য গল্প লুকিয়ে রেখেছে নিজের বুকে। কত মানুষ আসে, কত মানুষ চলে যায়, কিন্তু নদী সব গল্প নিজের বুকেই জমা রাখে। সেদিনের আড্ডার সঙ্গী ছিলেন তিনজন ভিন্ন স্বভাবের, ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষ—নাজমা আপা, শারমিন আপা এবং ইতু (ইতি)। তিনটি ভিন্ন নদীর মতো তাঁদের চরিত্র, অথচ শেষ পর্যন্ত সবাই মিশে গেলেন একই আড্ডার স্রোতে। নাজমা আপা—ব্যস্ততার মাঝেও প্রাণবন্ত এক মানুষ নাজমা আপা যেন কর্মব্যস্ততার আরেক নাম। মনে হচ্ছিল অফিসের দেয়াল ছেড়ে তিনি এসেছেন ঠিকই, কিন্তু অফিস তাঁকে ছাড়েনি। মোবাইল ফোন যেন তাঁর আরেকটি সহচর। একের পর এক কল, বিভিন্ন কাজের সমন্বয়—নেভালের সেই খোলা পরিবেশও যেন কিছুক্ষণের জন্য তাঁর কর্মস্থলে পরিণত হয়েছিল। তবুও তাঁর হাসি ছিল প্রাণখোলা। মাঝে মাঝে কথার ফাঁকে এমন রসিকতা করছিলেন যে সবাই হেসে উঠছিলাম। তিনি হঠাৎ বললেন, — “ডাব খেতে ইচ্ছে করছে।” অনেক খোঁজাখুঁজির পরও ডাব পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত পেঁয়াজু, ঝালমুড়ি, মাছ ভাজা আর চা দিয়েই ছোট্ট আয়োজন। তবে চায়ের স্বাদ নিয়ে সবারই একটাই মন্তব্য “চা আরেকটু ভালো হলে ক্ষতি ছিল না!”
শারমিন আপা—হাসির আড়ালে ঘরের টান
শারমিন আপার চোখেমুখে এক ধরনের কোমলতা ছিল। আড্ডায় ছিলেন, হাসছিলেন, গল্পও করছিলেন; কিন্তু কোথাও যেন তাঁর মনটা পড়ে ছিল পরিবারের কাছে। ঘরে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে—এই চিন্তা তাঁকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল সময়ের কথা। তবুও তাঁর কণ্ঠে ভেসে এলো গান। সেই সুরে রাতের বাতাস যেন আরও নরম হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল কর্ণফুলীর ঢেউও বুঝি থেমে থেমে সেই গান শুনছে। ইতু—স্বাধীনচেতা হাসির ভেতর লুকানো কবিতার অনুপ্রেরণা তারপর আসে ইতুর কথা। মানুষের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় নাম দিয়ে, কিন্তু মনে জায়গা হয় আচরণ দিয়ে। ইতুকে দেখে ঠিক এমনটাই মনে হলো। তাঁর মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত প্রাণশক্তি। কখনো গল্প, কখনো হাসি, কখনো আবার হঠাৎ নীরবতা। মনে হচ্ছিল তিনি যেন প্রকৃতির সঙ্গেই কথা বলছেন।
মনে প্রশ্ন জাগছিল—আমি কি তাঁকে আগে কোথাও দেখেছি? হয়তো দেখিনি। আবার মনে হচ্ছিল, দেখেছি। কিছু মানুষকে প্রথম দেখাতেই আপন মনে হয়। হয়তো সেই অনুভূতিরই নাম পরিচয়ের আগের পরিচয়। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই যে চাঁদ… ওকে নিয়ে একটা কবিতা লিখুন না!” আমি মুচকি হেসে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম। তারপর মোবাইলের নোটে কয়েকটি লাইন লিখে পড়ে শোনালাম। তিনি হেসে বললেন— “আপনি যদি আমাদের সঙ্গে কয়েক দিন সী-বিচে থাকেন, তাহলে তো একটা পুরো কবিতার বই হয়ে যাবে!” কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠলাম। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সেই কথার ভেতরেই ছিল এক ধরনের আন্তরিক অনুপ্রেরণা। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তখনই, যখন তাঁর লেখা লিখতে কেউ উৎসাহ দেয়। ইতুর হাসিটা ছিল একেবারে শিশুর মতো নির্মল। কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো অহংকার নেই। তাঁর হাসি দেখে মনে হচ্ছিল—মানুষের মুখের হাসিও কখনো কখনো কবিতা হয়ে যায়। এরপর শারমিন আপা আর ইতুর কণ্ঠে ভেসে এলো গান। কোকিলকণ্ঠের সেই সুর কর্ণফুলীর বাতাসে মিশে গিয়ে যেন রাতটাকে আরও স্নিগ্ধ করে তুলল। বিউটি আপার গাড়ি আর পথের আনন্দ সেদিন আমরা এসেছিলাম নাজমা-প্রকাশ বিউটি আপার গাড়িতে। বিউটি আপা ভীষণ প্রাণবন্ত ও রসিক মানুষ। পথের ক্লান্তিকে তিনি হাসিতে উড়িয়ে দিতে জানেন। তাঁর সহজ কথাবার্তা পুরো যাত্রাটিকে আরও আনন্দময় করে তুলেছিল। কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। নাজমা আপার ফোন শেষ হলো, অথচ ততক্ষণে শারমিন আপার ঘরে ফেরার তাড়া আরও বেড়ে গেছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও আড্ডা আর দীর্ঘ হলো না। ফেরার আগে একবার কর্ণফুলীর দিকে তাকিয়ে মনে হলো এই নদী কত মানুষের গল্প জানে! কত না-বলা কথা, কত না-লেখা কবিতা, কত হাসি, কত দীর্ঘশ্বাস—সবই সে নীরবে নিজের বুকে বহন করে চলেছে।
সেই রাতেই কয়েকটি পঙ্‌ক্তি লিখেছিলাম—
আলো-আঁধারির নদীর বুকে
জেগে ছিল চাঁদের আলো,
তিনটি হাসি, একটি কলম—
লিখে গেল নীরব ভালো।
কেউ ব্যস্ত মোবাইল কথায়,
কেউ ঘরের টানে ফেরার পথ,
কেউ বা বলল—”আরও লিখুন”,
জন্ম নিল শত শত রথ।
কর্ণফুলী শুধু নদী নয়,
স্মৃতিরও এক গভীর তীর,
মানুষ চলে, সময় ফুরায়—
থেকে যায় কিছু অনুভব, কিছু অধীর।
জীবনের সব সুখ বড় আয়োজনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। কখনো কখনো চারজন মানুষের প্রাণখোলা আড্ডা, এক কাপ অসম্পূর্ণ স্বাদের চা, ঝালমুড়ির কাগজের ঠোঙা, নদীর হাওয়া, রাতের চাঁদ, আর একজনের বলা “আরও লিখুন”—এই সামান্য ঘটনাগুলোই একজন লেখকের কাছে হয়ে ওঠে অমূল্য সম্পদ। হয়তো ভবিষ্যতে এই রাতের কথা আর কেউ মনে রাখবে না। কিন্তু একজন লেখকের ডায়েরিতে, একজন কবির কলমে, একজন মানুষের হৃদয়ে—পতেঙ্গার সেই আলো-আঁধারির রাত, কর্ণফুলীর মোহনার বাতাস, শারমিনের সুর, নাজমা আপার ব্যস্ততা, বিউটি আপার প্রাণখোলা হাসি এবং ইতুর সেই অনুপ্রেরণামাখা বাক্য “আরও লিখুন, একটা কবিতার বই হয়ে যাবে”—চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। এখান থেকেই হয়তো জন্ম নেবে আরও কিছু কবিতা, আরও কিছু গল্প, আরও কিছু অমর স্মৃতি।