
মো. কামাল উদ্দিন আজ সকাল ঠিক ১০টায় আদালতে পৌঁছেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল একটি মামলা দায়ের করা। সঙ্গে ছিলেন আমার ভাতিজা, বিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মফিজ। ভেবেছিলাম, নিয়মমাফিক কাজটি শেষ করে ফিরে যাব। কিন্তু আদালতের বাস্তবতা যেন আবারও বুঝিয়ে দিল—বিচার চাওয়া যত সহজ, বিচার পাওয়া তত সহজ নয়। জানতে পারলাম, যে আদালতে মামলাটি দায়ের হওয়ার কথা, সেই আদালতের বিচারক অন্য আদালতে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে শুরু হলো দীর্ঘ প্রতীক্ষা। আর সেই অপেক্ষার সময়টুকুই আমাকে নিয়ে গেল এক ভিন্ন জগতে—যেখানে প্রতিটি মুখ একটি গল্প, প্রতিটি চোখে একটি দীর্ঘশ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপে জমে আছে জীবনের না-পাওয়া হিসাব। আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এটি কেবল একটি সরকারি ভবন নয়; এটি যেন মানুষের কান্না, বেদনা, আশা, প্রতারণা, অন্যায়, নির্যাতন, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, ক্ষমতার লড়াই এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার এক বিশাল জীবন্ত জাদুঘর। ছবিটির দিকে তাকালে দেখা যায়—একজন মা কালো পোশাকে কোলে শিশুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখে অনিশ্চয়তা। পাশে আরেক নারী বেঞ্চে বসে আছেন, মুখ ঢাকা। হয়তো তিনি নিজের সম্মান রক্ষার লড়াইয়ে এসেছেন, হয়তো স্বামীর নির্যাতনের বিচার চাইতে, হয়তো সন্তানদের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করছেন। সেই শিশুটি কিছুই জানে না—সে শুধু মায়ের বুকের উষ্ণতা খুঁজছে। অথচ তার শৈশবের প্রথম স্মৃতিই হয়তো হয়ে থাকবে আদালতের এই করিডোর। ভাবছিলাম, এই শিশুদের কী অপরাধ? তারা তো আদালতে জন্মায়নি। সমাজের অন্যায়, পারিবারিক ভাঙন, ক্ষমতার অপব্যবহার আর মানুষের নিষ্ঠুরতার কারণেই তাদের ছোট্ট জীবন আদালতের বারান্দায় শুরু হয়। এই দৃশ্য দেখে বুকটা হাহাকার করে উঠল। অপেক্ষার সময় দেখা হলো পটিয়ার পরিচিত মুখ কাসেমের সঙ্গে। স্থানীয় নির্বাচনে জয়ী হয়েও নানা রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি তাঁর প্রাপ্য দায়িত্ব পাননি বলে অনেকেই অভিযোগ করেন। পরবর্তীতে তাঁর প্রতিদন্ধি কাসেম চেয়ারম্যান এর ছোট ভাই হত্যার একটি মামলায় মিথ্যা আসামি হয়ে কারাগারে যেতে হয় এবং আজ আদালতে হাজিরা দিতে এসেছেন। কিছুক্ষণ কথা হলো। তাঁর চোখেও দেখলাম ক্লান্তি। রাজনীতি, মামলা আর ক্ষমতার লড়াই—সবকিছু মিলে একজন মানুষের জীবন কীভাবে বদলে যেতে পারে, তারও এক নীরব সাক্ষী এই আদালত। পরে দেখা হলো সাংবাদিক আহমেদ কবির, জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ইউনুস ভাই, আন্দোলনের সহযোদ্ধা এবং বহু আইনজীবী বন্ধুর সঙ্গে। আদালত যেন এক বিশাল মিলনমেলা, কিন্তু এখানে আনন্দের নয়—অপেক্ষার, উৎকণ্ঠার, বিচারপ্রার্থনার। চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম—শত শত মানুষ। কেউ বাদী, কেউ বিবাদী, কেউ সাক্ষী, কেউ জামিনের আশায়, কেউ রায়ের অপেক্ষায়। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, এত মানুষের ভিড়ে একজন মানুষের মুখেও প্রকৃত হাসি নেই। একজন বৃদ্ধ লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে আদালতের সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন। তাঁর মুখে বয়সের ভার, চোখে অসহায়ত্ব। হয়তো জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও জমির একটি মামলার রায় দেখতে চান। পাশে একজন বৃদ্ধা মা কাঁদছেন। হয়তো তাঁর ছেলেকে পুলিশ ধরে এনেছে, হয়তো তিনি নিজের শেষ সম্বল বিক্রি করে আইনজীবীর ফি জোগাড় করেছেন। এই কান্না কেবল একজন মায়ের নয়—এটি অসহায় মানুষের কান্না। সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগল গরিব মানুষের দিকে তাকিয়ে। অনেকেই দিনমজুর। আজ আদালতে এসেছেন বলে আজকের রোজগার বন্ধ। একজন রিকশাচালক আদালতের সিঁড়িতে বসে শুকনো রুটি খাচ্ছেন। একজন কৃষক ময়লা গামছা দিয়ে ঘাম মুছছেন। একজন শ্রমিক তাঁর মামলার তারিখ শুনে হতাশ হয়ে আবার বাড়ি ফিরছেন। হয়তো পরের তারিখে আসতেও তাঁকে ধার করতে হবে।
এই মানুষগুলোর কাছে একটি তারিখ মানে শুধু একটি দিন নয়—একটি কর্মদিবস হারানো, একটি পরিবারের রাতের খাবার অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া। হাজতখানার সামনে গিয়ে আরও বেদনাদায়ক দৃশ্য দেখলাম। পুলিশের পাহারায় একের পর এক আসামিকে আনা হচ্ছে। কেউ মাথা নিচু করে হাঁটছেন, কেউ স্বজনের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছেন। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী, মা, বাবা কিংবা সন্তানের চোখে শুধু জল। একজন বৃদ্ধা মায়ের কণ্ঠে শুনলাম—”বাবা, একটু ভালো থাকিস।” এই একটি বাক্যের মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত মায়ের ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। তবে এই করুণ দৃশ্যের মাঝেও একটি আশার আলো দেখলাম। আদালতের করিডোরে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করছেন অনেক নারী আইনজীবী। কালো কোট পরে যুক্তি, আইন ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তাঁরা বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নিচ্ছেন। একসময় যে পেশা ছিল পুরুষদের আধিপত্যে, আজ সেখানে নারীদের দৃপ্ত পদচারণা সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক। আদালতের প্রতিটি দেয়াল যেন অসংখ্য মানুষের অশ্রু শুষে নিয়েছে। প্রতিটি বেঞ্চ জানে কত মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার ইতিহাস। প্রতিটি ফাইলের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা, বিশ্বাসঘাতকতা, সম্পত্তির বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা মিথ্যা অভিযোগের গল্প। একজন সাংবাদিক হিসেবে আজ আমার মনে হয়েছে, আদালতের প্রকৃত সংবাদ শুধু রায়ের কপি নয়; প্রকৃত সংবাদ হলো সেই মায়ের চোখের জল, যে শিশুকে কোলে নিয়ে বিচার চাইতে এসেছে। প্রকৃত সংবাদ হলো সেই বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস, যিনি জীবনের শেষ বয়সেও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। প্রকৃত সংবাদ হলো সেই গরিব শ্রমিকের কষ্ট, যিনি একটি তারিখের জন্য দিনের উপার্জন হারিয়েছেন। প্রকৃত সংবাদ হলো সেই নির্যাতিত নারীর সাহস, যিনি সমস্ত ভয়কে জয় করে আদালতের দরজায় দাঁড়িয়েছেন। বিচারব্যবস্থা শুধু আইন দিয়ে চলে না; এটি চলে মানবিকতা, সময়ানুবর্তিতা, জবাবদিহি এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ দিয়ে। বিচার যদি বিলম্বিত হয়, তবে অনেক সময় সেটি বিচার নয়—নতুন এক যন্ত্রণার নাম হয়ে দাঁড়ায়। আজ আদালত থেকে ফিরে মনে হয়েছে, আমাদের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু আদালতের সংখ্যা বাড়ানো নয়; মানুষের দুর্ভোগ কমানো, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, মিথ্যা মামলার অপব্যবহার রোধ করা এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। কারণ আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি বুঝেছি—এখানে কেউ আনন্দ নিয়ে আসে না। এখানে আসে শেষ আশ্রয়ের বিশ্বাস নিয়ে। হয়তো একদিন এই দেশের আদালতের করিডোরে অপেক্ষা থাকবে, কিন্তু হতাশা থাকবে না; মামলা থাকবে, কিন্তু মিথ্যা মামলা থাকবে না; বিচার হবে, কিন্তু বছরের পর বছর নয়—সময়ের মধ্যে। সেদিন আদালতের এই বারান্দা শুধু দীর্ঘশ্বাসের নয়, ন্যায়বিচারের স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠবে। আজকের এই আদালত সফর আমাকে একটি কথাই নতুন করে শিখিয়েছে—মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, ক্ষমতা নয়; প্রকৃত সম্পদ হলো ন্যায়বিচার। আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই একটি রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে মানবিক, সভ্য ও গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে।