
মো. কামাল উদ্দিনঃ কখনো কখনো মানুষের জীবনে এমন কিছু সন্ধ্যা আসে, যার কোনো পূর্বপরিকল্পনা থাকে না, কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজনও থাকে না। তবুও সেই ক্ষণিক সময়গুলো বছরের পর বছর হৃদয়ের অ্যালবামে রঙিন ছবি হয়ে বেঁচে থাকে। রাতের পতেঙ্গা নেভালের আড্ডাটাও ছিল ঠিক তেমনই—কোলাহল থেকে দূরে, ব্যস্ততা থেকে কিছুটা মুক্ত, আর কর্ণফুলীর মোহনায় রাতের ঝিকিমিকি আলোর সঙ্গে মিশে থাকা এক টুকরো নির্মল সময়। ইট-পাথরের নগরী মানুষকে জীবিকা দেয়, কিন্তু প্রকৃতি মানুষকে বাঁচার শক্তি দেয়। দিনের পর দিন লেখালেখির ব্যস্ততা, সংবাদ সংগ্রহ, মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প, সামাজিক নানা দায়িত্ব—সবকিছুর ভিড়ে নিজের জন্য সময় বের করা যেন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তাই হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত—চলুন, কিছু সময় শহরের কোলাহল ছেড়ে কর্ণফুলীর মোহনায় গিয়ে বসা যাক। রাত তখন গভীর হওয়ার অপেক্ষায়। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা, মাঝেমধ্যে চাঁদের ম্লান আলো, নদীর বুকে জাহাজের সারি, দূরে জ্বলজ্বল করা আলোগুলো যেন অন্ধকারের বুকে ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্র। হালকা বাতাস এসে মুখ ছুঁয়ে দিচ্ছিল, আর মনে হচ্ছিল—প্রকৃতি যেন নীরবে বলছে, “এখানে কিছুক্ষণ সব দুঃশ্চিন্তা রেখে যাও।” আমি রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কর্ণফুলীর কালো জলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেই জলরাশি যেন অসংখ্য গল্প লুকিয়ে রেখেছে নিজের বুকে। কত মানুষ আসে, কত মানুষ চলে যায়, কিন্তু নদী সব গল্প নিজের বুকেই জমা রাখে। সেদিনের আড্ডার সঙ্গী ছিলেন তিনজন ভিন্ন স্বভাবের, ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষ—নাজমা আপা, শারমিন আপা এবং ইতু (ইতি)। তিনটি ভিন্ন নদীর মতো তাঁদের চরিত্র, অথচ শেষ পর্যন্ত সবাই মিশে গেলেন একই আড্ডার স্রোতে। নাজমা আপা—ব্যস্ততার মাঝেও প্রাণবন্ত এক মানুষ নাজমা আপা যেন কর্মব্যস্ততার আরেক নাম। মনে হচ্ছিল অফিসের দেয়াল ছেড়ে তিনি এসেছেন ঠিকই, কিন্তু অফিস তাঁকে ছাড়েনি। মোবাইল ফোন যেন তাঁর আরেকটি সহচর। একের পর এক কল, বিভিন্ন কাজের সমন্বয়—নেভালের সেই খোলা পরিবেশও যেন কিছুক্ষণের জন্য তাঁর কর্মস্থলে পরিণত হয়েছিল। তবুও তাঁর হাসি ছিল প্রাণখোলা। মাঝে মাঝে কথার ফাঁকে এমন রসিকতা করছিলেন যে সবাই হেসে উঠছিলাম। তিনি হঠাৎ বললেন, — “ডাব খেতে ইচ্ছে করছে।” অনেক খোঁজাখুঁজির পরও ডাব পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত পেঁয়াজু, ঝালমুড়ি, মাছ ভাজা আর চা দিয়েই ছোট্ট আয়োজন। তবে চায়ের স্বাদ নিয়ে সবারই একটাই মন্তব্য “চা আরেকটু ভালো হলে ক্ষতি ছিল না!”
শারমিন আপা—হাসির আড়ালে ঘরের টান
শারমিন আপার চোখেমুখে এক ধরনের কোমলতা ছিল। আড্ডায় ছিলেন, হাসছিলেন, গল্পও করছিলেন; কিন্তু কোথাও যেন তাঁর মনটা পড়ে ছিল পরিবারের কাছে। ঘরে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে—এই চিন্তা তাঁকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল সময়ের কথা। তবুও তাঁর কণ্ঠে ভেসে এলো গান। সেই সুরে রাতের বাতাস যেন আরও নরম হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল কর্ণফুলীর ঢেউও বুঝি থেমে থেমে সেই গান শুনছে। ইতু—স্বাধীনচেতা হাসির ভেতর লুকানো কবিতার অনুপ্রেরণা তারপর আসে ইতুর কথা। মানুষের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় নাম দিয়ে, কিন্তু মনে জায়গা হয় আচরণ দিয়ে। ইতুকে দেখে ঠিক এমনটাই মনে হলো। তাঁর মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত প্রাণশক্তি। কখনো গল্প, কখনো হাসি, কখনো আবার হঠাৎ নীরবতা। মনে হচ্ছিল তিনি যেন প্রকৃতির সঙ্গেই কথা বলছেন।
মনে প্রশ্ন জাগছিল—আমি কি তাঁকে আগে কোথাও দেখেছি? হয়তো দেখিনি। আবার মনে হচ্ছিল, দেখেছি। কিছু মানুষকে প্রথম দেখাতেই আপন মনে হয়। হয়তো সেই অনুভূতিরই নাম পরিচয়ের আগের পরিচয়। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই যে চাঁদ… ওকে নিয়ে একটা কবিতা লিখুন না!” আমি মুচকি হেসে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম। তারপর মোবাইলের নোটে কয়েকটি লাইন লিখে পড়ে শোনালাম। তিনি হেসে বললেন— “আপনি যদি আমাদের সঙ্গে কয়েক দিন সী-বিচে থাকেন, তাহলে তো একটা পুরো কবিতার বই হয়ে যাবে!” কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠলাম। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সেই কথার ভেতরেই ছিল এক ধরনের আন্তরিক অনুপ্রেরণা। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তখনই, যখন তাঁর লেখা লিখতে কেউ উৎসাহ দেয়। ইতুর হাসিটা ছিল একেবারে শিশুর মতো নির্মল। কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো অহংকার নেই। তাঁর হাসি দেখে মনে হচ্ছিল—মানুষের মুখের হাসিও কখনো কখনো কবিতা হয়ে যায়। এরপর শারমিন আপা আর ইতুর কণ্ঠে ভেসে এলো গান। কোকিলকণ্ঠের সেই সুর কর্ণফুলীর বাতাসে মিশে গিয়ে যেন রাতটাকে আরও স্নিগ্ধ করে তুলল। বিউটি আপার গাড়ি আর পথের আনন্দ সেদিন আমরা এসেছিলাম নাজমা-প্রকাশ বিউটি আপার গাড়িতে। বিউটি আপা ভীষণ প্রাণবন্ত ও রসিক মানুষ। পথের ক্লান্তিকে তিনি হাসিতে উড়িয়ে দিতে জানেন। তাঁর সহজ কথাবার্তা পুরো যাত্রাটিকে আরও আনন্দময় করে তুলেছিল। কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। নাজমা আপার ফোন শেষ হলো, অথচ ততক্ষণে শারমিন আপার ঘরে ফেরার তাড়া আরও বেড়ে গেছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও আড্ডা আর দীর্ঘ হলো না। ফেরার আগে একবার কর্ণফুলীর দিকে তাকিয়ে মনে হলো এই নদী কত মানুষের গল্প জানে! কত না-বলা কথা, কত না-লেখা কবিতা, কত হাসি, কত দীর্ঘশ্বাস—সবই সে নীরবে নিজের বুকে বহন করে চলেছে।
সেই রাতেই কয়েকটি পঙ্ক্তি লিখেছিলাম—
আলো-আঁধারির নদীর বুকে
জেগে ছিল চাঁদের আলো,
তিনটি হাসি, একটি কলম—
লিখে গেল নীরব ভালো।
কেউ ব্যস্ত মোবাইল কথায়,
কেউ ঘরের টানে ফেরার পথ,
কেউ বা বলল—”আরও লিখুন”,
জন্ম নিল শত শত রথ।
কর্ণফুলী শুধু নদী নয়,
স্মৃতিরও এক গভীর তীর,
মানুষ চলে, সময় ফুরায়—
থেকে যায় কিছু অনুভব, কিছু অধীর।
জীবনের সব সুখ বড় আয়োজনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। কখনো কখনো চারজন মানুষের প্রাণখোলা আড্ডা, এক কাপ অসম্পূর্ণ স্বাদের চা, ঝালমুড়ির কাগজের ঠোঙা, নদীর হাওয়া, রাতের চাঁদ, আর একজনের বলা “আরও লিখুন”—এই সামান্য ঘটনাগুলোই একজন লেখকের কাছে হয়ে ওঠে অমূল্য সম্পদ। হয়তো ভবিষ্যতে এই রাতের কথা আর কেউ মনে রাখবে না। কিন্তু একজন লেখকের ডায়েরিতে, একজন কবির কলমে, একজন মানুষের হৃদয়ে—পতেঙ্গার সেই আলো-আঁধারির রাত, কর্ণফুলীর মোহনার বাতাস, শারমিনের সুর, নাজমা আপার ব্যস্ততা, বিউটি আপার প্রাণখোলা হাসি এবং ইতুর সেই অনুপ্রেরণামাখা বাক্য “আরও লিখুন, একটা কবিতার বই হয়ে যাবে”—চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। এখান থেকেই হয়তো জন্ম নেবে আরও কিছু কবিতা, আরও কিছু গল্প, আরও কিছু অমর স্মৃতি।