রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপালন ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন তিনি। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের আগে আমি দল, সংসদ ও মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করে এসেছি। আমি এখন সম্পূর্ণভাবে একজন দলনিরপেক্ষ মানুষ। দলনিরপেক্ষভাবেই আমি আমার দায়িত্বপালন করে যাবো।’ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বঙ্গভবনের দরবার হলে সকাল সাড়ে ১১টায় বঙ্গভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতির প্রথম দরবারে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর কারো প্রতি আমার কোনো রাগ-অনুরাগ থাকবে না। দেশ, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থই হবে আমার একমাত্র লক্ষ্য।’ তিনি যে কোনো পরিস্থিতিতে জনগণের আস্থা অর্জন, সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও আনুগত্য রাখতে হবে।’ এসময় তিনি বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি বঙ্গভবনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, ‘বঙ্গভবন হলো রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এর মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।’ রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘বঙ্গভবনের দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত-সংক্রান্ত সব বিষয় অত্যন্ত কঠোরভাবে গোপনীয়তা বজায় রেখে পরিচালনা করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়।’ এসময় তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী ও দায়িত্বশীল এবং অপচয় রোধের আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দেশের জনগণের অর্থেই সরকারি সম্পদ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পরিচালিত হয়। তাই এসব সম্পদের সঠিক, দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজেদের জীবনে শৃঙ্খলা মেনে চলার পাশাপাশি নিয়মিত নৈতিক মনোবল ও সুন্দর চরিত্র গঠনে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একইসাথে তিনি যুদ্ধপরবর্তী দেশ ও রাষ্ট্রগঠনে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগ ও কৃতিত্ব শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। একইসঙ্গে তিনি পূর্ববর্তী সব রাষ্ট্রপতির কথাও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। বঙ্গভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমরা এখানে একটা পরিবার। সবাই একই জায়গায় কাজ করি। আমরা যখন সুযোগ পাবো, সেই সময় পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করবো।’
অপরাধ কথা-১ রংপুরের গণপতি চক্রবর্তী পরিবার হত্যাকাণ্ড: পুলিশের গল্পের বাইরে কি আরও কোনো সত্য লুকিয়ে আছে? চার প্রাণের নৃশংস পরিণতি, ৭টি বড় অসংগতি, সম্ভাব্য ৫টি মোটিভ এবং তদন্তের অমীমাংসিত প্রশ্ন
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শ্রদ্ধেয় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ২৩ বছর বয়সী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ১২ বছরের শিশু প্রিয়ম চক্রবর্তী—একটি পরিবারের চারটি প্রাণ একই ঘটনায় নিভে যাওয়ার খবর শুধু রংপুর নয়, পুরো দেশের মানুষকে স্তব্ধ করেছে। একজন শিক্ষক, তাঁর স্ত্রী, এক তরুণী এবং একটি শিশু—চারজন মানুষ। একটি পরিবার। অথচ আজ তাঁদের ঘর নীরব, উঠান নীরব, স্বজনদের কণ্ঠে শুধু আহাজারি। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ ইতোমধ্যে দুই তরুণ—সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত এবং পরে চারজনকে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির কথাও সামনে এসেছে। কিন্তু একজন অপরাধ বিশ্লেষক সাংবাদিক হিসেবে এখানেই আমার প্রশ্ন—
একটি হত্যাকাণ্ডের ‘গল্প’ কি সত্যিই একটি হত্যাকাণ্ডের ‘প্রমাণ’ হতে পারে?
অপরাধবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি হলো—Evidence first, theory second.
অর্থাৎ আগে প্রমাণ, পরে তত্ত্ব।
কোনো অভিযুক্তের বক্তব্য, পুলিশের প্রাথমিক ধারণা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো তথ্য—কোনোটিই এককভাবে চূড়ান্ত সত্য নয়। সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় যখন ময়নাতদন্ত, ডিএনএ, ফরেনসিক, কললিস্ট, ডিজিটাল ডেটা, আর্থিক লেনদেন, সিসিটিভি, সাক্ষ্য এবং অভিযুক্তের বক্তব্য—সব একই ঘটনাপ্রবাহকে সমর্থন করে। এই জায়গা থেকেই গণপতি চক্রবর্তী পরিবার হত্যাকাণ্ডে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
প্রথম প্রশ্ন: ইয়াবাই কি হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ?
পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যা—ছাদে ইয়াবা সেবনকে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং সেই বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ড।
এটি তদন্তের একটি সম্ভাব্য তত্ত্ব হতে পারে। কিন্তু এটি সত্য প্রমাণের জন্য আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
ঘটনাস্থল-সংক্রান্ত বর্ণনায় ঘরের ভেতরেও ইয়াবা সেবনের আলামতের কথা এসেছে।
যদি নিরাপদ ও নিরিবিলিতে ইয়াবা সেবনই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে ছাদ কি তুলনামূলক নিরাপদ ছিল না?
দুই বাসার ছাদ সংযুক্ত। সেখানে একজন নারী ভাড়াটিয়ার যাতায়াত ছিল বলে জানা গেছে। তিনি অভিযোগ করতে পারতেন, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল না।
তাহলে প্রশ্ন—
ছাদ থেকে ঘরের ভেতরে যাওয়ার প্রয়োজন হলো কেন?
আর যদি ইয়াবা সেবনকে কেন্দ্র করে হঠাৎ উত্তেজনা থেকেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে, তাহলে হত্যার পর দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলে থাকা, খাওয়া-দাওয়া, গোসল করা কিংবা মোবাইলের আলামত নষ্ট করার চেষ্টা—এসব আচরণ কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
নেশা অপরাধের একটি প্রেক্ষাপট হতে পারে।
কিন্তু—
নেশাই যে হত্যার একমাত্র কারণ—এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে বস্তুগত প্রমাণ প্রয়োজন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: আকস্মিক হত্যাকাণ্ড, নাকি পরিকল্পিত অপরাধ?
অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় অপরাধের পর অপরাধীর আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে অপরাধী অনেক সময় আতঙ্কিত হয় এবং দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করার চেষ্টা করে।
কিন্তু যদি তদন্তে সত্যিই প্রমাণিত হয় যে হত্যার পর অভিযুক্তরা প্রায় ৬–৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতে অবস্থান করেছে, তাহলে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আচরণগত আলামত।

কেন তারা পালাল না?
কেন এতক্ষণ সেখানে থাকল?
তারা কি কোনো নির্দিষ্ট বস্তু খুঁজছিল?
টাকা?
নথি?
মোবাইল?
অন্য কোনো আলামত?
নাকি কারও সঙ্গে যোগাযোগ বা নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল?
যদি তারা হত্যার পর গোসল করে, ফ্রিজ থেকে খাবার খায় এবং মোবাইল ডিটারজেন্টে ভিজিয়ে থাকে—তাহলে এগুলো কি নিছক নেশাগ্রস্ত দুই যুবকের আচরণ?
নাকি অপরাধের পর conscious evidence management—অর্থাৎ আলামত নিয়ন্ত্রণের সচেতন চেষ্টা?
এটি তদন্তে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তৃতীয় প্রশ্ন: চারজন মানুষকে নিঃশব্দে হত্যা—কীভাবে সম্ভব হলো?
এটি পুরো মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপরাধবৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।
একটি বাড়িতে চারজন মানুষ ছিলেন।
একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।
তাঁর স্ত্রী।
২৩ বছরের তরুণী।
১২ বছরের শিশু।
যদি দুইজন ব্যক্তি একাই তাঁদের হত্যা করে থাকে, তাহলে হত্যার ধারাবাহিকতা কী ছিল?
কে প্রথম আক্রান্ত হন?
কীভাবে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়?
অন্যরা কেন চিৎকার করেননি?
কেউ পালানোর চেষ্টা করেননি কেন?
একজনকে হত্যার পর অন্য তিনজন কী করছিলেন?
তাঁদের কি আগে কোনোভাবে অচেতন করা হয়েছিল?
নাকি আকস্মিকভাবে সবাইকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে—
ময়নাতদন্ত, আঘাতের ধরন, রক্তের ছাপ, ডিএনএ, টক্সিকোলজি, ঘটনাস্থলের বিন্যাস এবং ফরেনসিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে।
এ কারণে ‘দুইজনই করেছে’—এটি প্রমাণের বিষয়; অনুমানের নয়।
চতুর্থ প্রশ্ন: বিদ্যুৎ সংযোগ কেন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল?
ঘটনার সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
পুলিশের ব্যাখ্যা যদি হয়—বাড়িতে কেউ নেই এমন ধারণা তৈরি করার জন্য বিদ্যুৎ বন্ধ করা হয়েছিল, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—
কেউ নেই বোঝানোর জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন কেন হলো?
বরং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকলে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তাই তদন্তে বের করতে হবে—
বিদ্যুৎ কখন বন্ধ করা হয়েছিল?
কে বন্ধ করেছিল?
মিটার বা সুইচে কারও আঙুলের ছাপ ছিল কি?
আশপাশে ওই সময় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কী ছিল?
বিদ্যুৎ বন্ধের সময়ের সঙ্গে হত্যার সময়ের সম্পর্ক কী?
এই তথ্যগুলো ঘটনাটির সময়রেখা তৈরি করতে সহায়তা করবে।
পঞ্চম প্রশ্ন: গ্রেপ্তারের সময় পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি কী?
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এখানে কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন ঘোষণা করা নয়; বরং তদন্তের একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো—
হত্যাকাণ্ডের সময় পরা পোশাক কোথায়?
সেটি কি উদ্ধার করা হয়েছে?
ফরেনসিক পরীক্ষা হয়েছে?
রক্ত, চুল, ত্বকের কোষ, ঘাম বা অন্য কোনো জৈবিক আলামত পাওয়া গেছে?
কারণ অপরাধবিজ্ঞানে পোশাকও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
অভিযুক্তের বক্তব্য এবং পোশাকের ফরেনসিক ফলাফল যদি পরস্পর মিলে যায়, তাহলে তদন্ত শক্তিশালী হবে।
না মিললে প্রশ্ন আরও বাড়বে।
ষষ্ঠ প্রশ্ন: লাশের অবস্থান কি কোনো উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দেয়?
লাশ কোথায় পাওয়া গেছে, কী অবস্থায় ছিল, আগে কোথায় ছিল—এসব অপরাধ তদন্তের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যদি হত্যাকারীরা প্রতিবেশীর উপস্থিতির ভয় পেয়ে বিদ্যুৎ বন্ধ করে থাকে, তাহলে একই আশঙ্কার মধ্যে লাশ ছাদ বা সিঁড়ির মতো দৃশ্যমান স্থানে রাখার প্রয়োজন কেন হলো?
লাশগুলো কি হত্যার পর সরানো হয়েছিল?
নাকি হত্যার সময়ই সেখানে রাখা হয়েছিল?
কেউ কি ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনাস্থলের চেহারা পরিবর্তন করেছিল?
অপরাধী অনেক সময় ঘটনাস্থলকে এমনভাবে সাজাতে পারে যাতে তদন্তকারীরা ভুল ধারণায় পৌঁছান। অপরাধবিজ্ঞানে একে বলা হয় staged crime scene।
তবে এই ঘটনায় এমন কিছু ঘটেছে কি না—সেটি শুধু ফরেনসিক বিশ্লেষণেই নির্ধারিত হতে পারে।
সপ্তম প্রশ্ন: চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানোর উদ্দেশ্য কী?
চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানোর বিষয়টি যদি তদন্তে নিশ্চিত হয়, তাহলে সেটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মানুষের মুখ তার পরিচয়ের প্রধান উপাদান।
তাহলে কেন মুখমণ্ডল ঝলসানো হলো?
পরিচয় গোপন করার জন্য?
কোনো নির্দিষ্ট আলামত নষ্ট করার জন্য?
নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে?
আগুন কখন লাগানো হয়েছিল?
মৃত্যুর আগে না পরে?
মুখে পোড়ার ধরন কী?
আগুনের উৎস কী?
এগুলো ফরেনসিক প্যাথলজি ও ক্রাইম-সিন বিশ্লেষণের বিষয়।
একটি মুখ পোড়ানোর উদ্দেশ্য জানা গেলে অপরাধীর মানসিকতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
অষ্টম প্রশ্ন: লাশ পচন, তালাবদ্ধ বাড়ি এবং সময়ের হিসাব
লাশে পচন ও দুর্গন্ধের বিষয়টি নিয়েও নানা আলোচনা হয়েছে।
প্রথম দিকে অ্যাসিড ব্যবহারের কথা বলা হলেও পরবর্তী ময়নাতদন্তে সেটি নিশ্চিত হয়নি—এমন তথ্য সামনে এসেছে।
এখানে ‘কাক কেন আসেনি’—এটিকে রহস্য বানানোর চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—
লাশ কত সময় ধরে কোথায় ছিল?
বাড়িটি কখন বন্ধ করা হয়?
দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল কি?
চাবি কার কাছে ছিল?
শেষবার পরিবারের সদস্যদের জীবিত অবস্থায় কে দেখেছে?
মৃত্যুর আনুমানিক সময়ের সঙ্গে এই তথ্যগুলো মেলে কি?
অপরাধের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই টাইমলাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নবম প্রশ্ন: জুমার সময় পালানোর তত্ত্ব কতটা যৌক্তিক?
পুলিশের বক্তব্যে যদি জুমার নামাজের সময় রাস্তা তুলনামূলক ফাঁকা থাকার বিষয়টি আসে, তাহলে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে তা যাচাই করা দরকার।
ঘটনাস্থলের আশপাশে ওই সময়ে মানুষের চলাচল কেমন ছিল?
দোকানপাট খোলা ছিল কি?
কেউ অভিযুক্তদের দেখেছে কি?
সিসিটিভিতে কী আছে?
তারা কোন পথে বের হয়েছে?
কোনো যানবাহন ব্যবহার করেছে কি?
অপরাধ তদন্তে ‘রাস্তা ফাঁকা ছিল’—এটি একটি অনুমান হতে পারে; কিন্তু সিসিটিভি, মোবাইল লোকেশন ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যই তার সত্যতা যাচাই করবে।
দশম প্রশ্ন: ১৫ লাখ টাকা কোথায়?
এই প্রশ্নটি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়।
গণপতি চক্রবর্তী বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা তুলেছিলেন—তথ্যটি যদি ব্যাংক নথিতে নিশ্চিত হয়, তাহলে তদন্তে অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা জরুরি।
টাকা কোথায় ছিল?
কারা জানত?
পরিবারের বাইরে কেউ জানত কি?
টাকা উদ্ধার হয়েছে কি?
কোনো অংশ নিখোঁজ?
হত্যার আগে বা পরে কোনো অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন হয়েছে?
যদি টাকা নিখোঁজ থাকে, তাহলে এটি সম্ভাব্য instrumental motive—অর্থাৎ অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যার সম্ভাবনা—তদন্তের আওতায় আনবে।
আর টাকা যদি অক্ষত থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক মোটিভের সম্ভাবনা দুর্বল হতে পারে।
এগারোতম প্রশ্ন: ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের মেসেজ—কে পাঠিয়েছিল?
ডিজিটাল ফরেনসিক এই মামলার একটি বড় চাবিকাঠি হতে পারে।
আগামীর ফোন থেকে ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে একটি মেসেজ পাঠানোর তথ্য সামনে এসেছে।
এখন প্রশ্ন—
মেসেজটি কি আগামী নিজে পাঠিয়েছিলেন?
নাকি অন্য কেউ?
ফোনটি তখন কার হাতে ছিল?
ফোন কীভাবে আনলক করা হয়েছিল?
সিমের নেটওয়ার্ক লোকেশন কী বলছে?
মেসেজের সার্ভার টাইম ও ডিভাইস টাইম কি এক?
ডিলিট করা কোনো তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে?
এই মেসেজটি যদি হত্যাকারী ইচ্ছাকৃতভাবে পাঠিয়ে থাকে, তাহলে সেটি হতে পারে false timeline creation—অর্থাৎ তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করতে সময়ের ভুল ধারণা সৃষ্টি করার চেষ্টা।
আবার তিনি নিজেই পাঠিয়ে থাকলে হত্যার সময় সম্পর্কে পুলিশের বর্তমান ধারণাও নতুনভাবে যাচাই করতে হবে।
বারোতম ও সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন: মা ও মেয়েকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ
মা ও মেয়েকে হত্যার আগে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগের কথা সামনে এসেছে।
এখানে আবেগ নয়, বিজ্ঞান কথা বলবে।
যদি ময়নাতদন্তে যৌন সহিংসতার আলামত পাওয়া যায়, তাহলে—
ডিএনএ কার?
কোন নমুনা কোথা থেকে পাওয়া গেছে?
নমুনা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি?
গ্রেপ্তারকৃতদের ডিএনএর সঙ্গে মিলেছে কি?
অন্য কোনো ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া গেছে কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ যদি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, তাহলে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ ও প্রকৃতি নতুন মাত্রা পেতে পারে।
আর যদি প্রমাণ না মেলে, তাহলে সেই অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রচার করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হবে না।
অভিযোগ আর প্রমাণ এক নয়।
অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এই হত্যাকাণ্ড কী ধরনের অপরাধ হতে পারে?
পূর্ণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত শ্রেণিবিন্যাস করা ঠিক হবে না।
তবে সম্ভাব্য অপরাধবৈজ্ঞানিক কাঠামো হিসেবে কয়েকটি ধারণা বিবেচনা করা যায়।
1. Multiple Homicide
একই ঘটনাপ্রবাহে একাধিক মানুষকে হত্যা।
2. Familial Multiple Homicide
একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে একই অপরাধে হত্যা।
3. Retaliatory Homicide
কোনো বিরোধ বা অপমানের প্রতিশোধ হিসেবে হত্যা।
4. Instrumental Homicide
টাকা, সম্পদ, আলামত বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে হত্যা।
5. Witness Elimination
অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী বা সম্ভাব্য সাক্ষীকে হত্যা।
6. Staged Crime Scene
প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়াল করতে ঘটনাস্থলকে অন্য কোনো অপরাধের মতো সাজানো।
7. Complex Motive Homicide
একাধিক উদ্দেশ্য একসঙ্গে কাজ করা হত্যাকাণ্ড।
এই শ্রেণিগুলোর মধ্যে কোনটি প্রযোজ্য হবে, সেটি নির্ধারণ করবে তদন্তের প্রমাণ।
তাহলে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য মোটিভ কী কী?
একজন অপরাধ বিশ্লেষক হিসেবে অন্তত পাঁচটি মোটিভকে সমান্তরালভাবে যাচাই করা উচিত বলে মনে করি—
এক. মাদক-সংক্রান্ত বিরোধ
ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে ক্ষোভ ও প্রতিশোধ।
দুই. অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য
১৫ লাখ টাকা বা অন্য কোনো সম্পদের জন্য পরিকল্পিত অপরাধ।
তিন. ডাকাতি বা লুট
সম্পদ দখলের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড।
চার. অন্য অপরাধ আড়াল
হত্যার আগে বা পরে অন্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে তার সাক্ষী নির্মূল।
পাঁচ. যৌন অপরাধ বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য
যদি ফরেনসিক প্রমাণে যৌন সহিংসতা নিশ্চিত হয়, তাহলে সেটি আলাদা মোটিভ হিসেবে তদন্ত করতে হবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
একাধিক মোটিভ একই সঙ্গে কাজ করতে পারে।
অপরাধ সবসময় এক লাইনের গল্প নয়।
পুলিশ কি সত্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হচ্ছে?
এই মুহূর্তে ‘পুলিশ ব্যর্থ’—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া দায়িত্বশীল হবে না।
তদন্ত চলমান।
দুইজন গ্রেপ্তার হয়েছে।
১৬৪ ধারায় জবানবন্দির কথাও এসেছে।
কিন্তু জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়ার কারণগুলোকে উপেক্ষা করাও ঠিক হবে না।
তদন্তে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো Premature Closure—অর্থাৎ খুব দ্রুত একটি তত্ত্বকে চূড়ান্ত ধরে নিয়ে অন্য সম্ভাবনাগুলো অনুসন্ধান বন্ধ করে দেওয়া।
একজন দক্ষ তদন্তকারীকে নিজের তত্ত্বের পক্ষে যেমন প্রমাণ খুঁজতে হয়, তেমনি সেই তত্ত্ব ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করতে হয়।
কেন তদন্ত আটকে যেতে পারে?
প্রথমত—একটি তত্ত্বকে দ্রুত চূড়ান্ত ধরে নেওয়া।
দ্বিতীয়ত—স্বীকারোক্তিকে স্বাধীন প্রমাণ দিয়ে যথেষ্ট যাচাই না করা।
তৃতীয়ত—Crime Scene Reconstruction দুর্বল হওয়া।
চতুর্থত—ডিজিটাল ফরেনসিককে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া।
পঞ্চমত—অর্থনৈতিক লেনদেন অনুসরণ না করা।
ষষ্ঠত—DNA ও অন্যান্য জৈবিক আলামতের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ না করা।
সপ্তমত—Alternative Hypothesis বা বিকল্প তত্ত্বগুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা না করা।
এই দুর্বলতাগুলোর কোনোটি এই মামলায় ঘটছে—এমন দাবি করার আগে প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু এগুলো যেন না ঘটে, সেটিই এখন তদন্তের বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিবির কাছে অপরাধ বিশ্লেষকের ১২ দফা দাবি
8. চারটি হত্যার পূর্ণাঙ্গ Crime Scene Reconstruction করতে হবে।
9. চার নিহতের পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত ও টক্সিকোলজি রিপোর্ট তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
10. যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থাকলে DNA পরীক্ষা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
11. ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া প্রতিটি DNA, fingerprint, hair, fibre ও biological evidence পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
12. অভিযুক্তদের বক্তব্যের সঙ্গে ফরেনসিক প্রমাণের মিল পরীক্ষা করতে হবে।
13. নিহত ও অভিযুক্তদের Call Detail Record এবং Cell Tower Location বিশ্লেষণ করতে হবে।
14. ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের মেসেজের পূর্ণাঙ্গ Digital Forensic পরীক্ষা করতে হবে।
15. ঘটনাস্থলের আশপাশের CCTV ও সম্ভাব্য ডিজিটাল ফুটেজ সংগ্রহ করতে হবে।
16. বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় ও পদ্ধতি তদন্ত করতে হবে।
17. ১৫ লাখ টাকা এবং অন্যান্য সম্পদের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক অনুসন্ধান করতে হবে।
18. দুই গ্রেপ্তারকৃতের বাইরে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে।
19. পুলিশের বর্তমান তত্ত্বের পাশাপাশি অন্তত কয়েকটি Alternative Hypothesis পরীক্ষা করতে হবে।
শেষ কথা: আমরা পুলিশকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই না; আমরা সত্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই
এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—চারজন মানুষ মারা গেছেন, কিন্তু তাঁদের হয়ে কথা বলার মতো কেউ আর বেঁচে নেই।
গণপতি চক্রবর্তী কথা বলতে পারবেন না।
প্রীতিলতা চক্রবর্তী কথা বলতে পারবেন না।
আগামী কথা বলতে পারবেন না।
১২ বছরের শিশু প্রিয়মও বলতে পারবে না—শেষ রাতে কী ঘটেছিল।
তাই এখন ঘটনাস্থলের দেয়াল, দরজা, মেঝে, পোশাক, মোবাইল ফোন, রক্তের দাগ, ডিএনএ, ব্যাংক হিসাব, বিদ্যুৎ মিটার এবং ডিজিটাল তথ্যই তাঁদের হয়ে কথা বলবে।
সেই কারণেই তদন্তকে আবেগের ওপর নয়, বিজ্ঞানের ওপর দাঁড় করাতে হবে।
দুইজন গ্রেপ্তার হয়েছে—এটি তদন্তের একটি ধাপ।
১৬৪ ধারায় জবানবন্দি হয়েছে—এটিও তদন্তের একটি ধাপ।
কিন্তু—
এগুলো তদন্তের শেষ ধাপ নয়।
প্রকৃত সত্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন—
ময়নাতদন্ত + DNA + ফরেনসিক + কললিস্ট + মোবাইল ডেটা + CCTV + অর্থের হিসাব + সাক্ষ্য + ঘটনাস্থলের পুনর্গঠন + অভিযুক্তের বক্তব্য—সব একই সত্যের দিকে নির্দেশ করবে।
আর যদি কোনো একটি অংশও সেই গল্পের সঙ্গে না মেলে, তাহলে তদন্তকারীদের থামা যাবে না।
কারণ—
“প্রশ্ন মানেই পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; প্রশ্ন মানেই সত্যের দরজা খোলা।”
আমাদের প্রশ্ন কাউকে অপরাধী বানানোর জন্য নয়।
আমাদের প্রশ্ন—যে সত্যটি চারজন মানুষ সঙ্গে নিয়ে চলে গেছেন, সেই সত্যটি যেন তাঁদের কবরের নিচে চাপা না পড়ে।
গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের বিচার শুধু হত্যাকারী শনাক্ত করার নাম নয়।
প্রকৃত বিচার হলো—কেন হত্যা হলো, কীভাবে হলো, কারা করল, কারা সহযোগিতা করল এবং কোনো সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল কি না—সবকিছুর নির্ভুল উত্তর বের করা।
শেষ পর্যন্ত যদি পুলিশের বর্তমান তত্ত্বই সত্য হয়—প্রমাণ তা প্রতিষ্ঠিত করুক।
যদি তার বাইরে অন্য কোনো সত্য থাকে—প্রমাণ সেটিও প্রকাশ করুক।
আমরা গল্প চাই না।
আমরা অনুমান চাই না।
আমরা প্রতিশোধ চাই না।
আমরা চাই—প্রমাণভিত্তিক সত্য, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং চারটি প্রাণের পূর্ণাঙ্গ বিচার।
“খুনিকে ধরাই তদন্তের শেষ নয়; খুনের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনই তদন্তের সাফল্য।”
— মো. কামাল উদ্দিন
লেখক, সাংবাদিক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক
অপরাধ কথা
শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ-চীন সংযোগে বাড়বে কর্মসংস্থান: মাহদী আমিন
শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক সহযোগিতা দুই দেশের অংশীদারত্ব জোরদারের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও পেশাগত সম্ভাবনা বাড়াবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। চীনের গুয়াংডংয়ে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে ‘কারিগরি শিক্ষা সেতুবন্ধন ও চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক-বাণিজ্য মেধা উন্নয়ন’ শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে তিনি এসব কথা বলেন। কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়। মাহদী আমিন বলেন, সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো শিক্ষাকে কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা। এ লক্ষ্যে সবার জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখতে মান্দারিন বা চীনা ভাষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষক সহযোগিতা, শিক্ষার্থী বিনিময়, বৃত্তি, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করবে। মাহদী আমিন আরও বলেন, বাংলাদেশ-চীন ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে টেকসই করতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স, সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা, ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি ও আধুনিক লজিস্টিকসে দক্ষ জনশক্তি তৈরিকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি, যারা বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প খাতে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে। দুই দেশের শিক্ষক ও গবেষকদের মধ্যে নিয়মিত ফ্যাকাল্টি এক্সচেঞ্জ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, চীনের আধুনিক প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে চীনের বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। চীনা শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন এবং দুই দেশের মধ্যে কর্মসংস্থানভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কথাও জানান তিনি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষে ইন্টার্নশিপ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিক্স, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংসহ আধুনিক প্রযুক্তির ল্যাব ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। মাহদী আমিন চীনের শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে যৌথভাবে বিনিয়োগ এবং আধুনিক ল্যাব ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম চালুর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, চীনের কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি টেকসই সহযোগিতা কাঠামো তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া। শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন চীনের শিক্ষা, প্রযুক্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ খাতের অগ্রগতির প্রশংসা করেন। বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাকে আধুনিকায়নে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি প্রযুক্তিগত শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষায় দুই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। চীনের ১১টি শীর্ষ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত কলেজের যৌথ উদ্যোগে সিম্পোজিয়ামটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘চাইনিজ + ভোকেশনাল স্কিলস’ ইন্ডাস্ট্রি-এডুকেশন ইন্টিগ্রেশন অ্যালায়েন্স চালু করা। এর মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প-শিক্ষার সমন্বয়ে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশ ও চীনের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণে সহযোগিতা আরও জোরদার করে তা বাস্তব ও টেকসই অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
রুশ হ্যাকারদের মোকাবিলায় গেমারদের গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে জার্মানি
রাশিয়ার সাইবার হামলার পাল্টা জবাব দিতে প্রযুক্তিতে দক্ষ নতুন প্রজন্মের গুপ্তচর নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে জার্মানির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা। এ লক্ষ্যে এবার গেমারদেরও নিয়োগের তালিকায় রাখছে সংস্থাটি। জার্মানির ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্সের সমতুল্য বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা বুন্ডেসনাখরিশটেনডিন্সট বা বিএনডির কর্মকর্তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভিডিও গেম উৎসব গেমসকমে অংশ নিয়ে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজবেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। বিএনডির কর্মকর্তারা মনে করছেন, গেমারদের অনেক দক্ষতার সঙ্গে সংস্থাটির প্রয়োজনীয় সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। বিশেষ করে জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় রাশিয়ার হ্যাকারদের হামলার জবাব দিতে এসব দক্ষতা কাজে লাগানো যেতে পারে। ২০২৬ সালের গেমসকম উৎসব জার্মানির কোলোনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেখানে বিএনডির নিয়োগ কার্যক্রম দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাকে শক্তিশালী করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এর মাধ্যমে একসময় তুলনামূলক সীমিত ক্ষমতার অধিকারী বিএনডিকে এমআইসিক্স ও ইসরায়েলের মোসাদের মতো শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থায় পরিণত করতে চায় জার্মানি। গোয়েন্দা সংস্থাটির একটি সূত্র জানিয়েছে, উৎসবে বিএনডির কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতার সঙ্গে মেলে এমন গেমারদের পাঁচ ধাপের একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এতে তাদের সাইবার নিরাপত্তা ও হ্যাকিংয়ের দক্ষতা যাচাই করা হবে। সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎসের মন্ত্রিসভা বিএনডির কার্যক্রমে বড় ধরনের সংস্কারের একটি প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। এতে বিদেশে কাজ করা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি নাশকতামূলক কার্যক্রম পরিচালনারও সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে ‘হ্যাক ব্যাক’ নামে পরিচিত নতুন বিধান। এর মাধ্যমে রাশিয়ার সাইবার হামলার জবাবে বিএনডি পাল্টা সাইবার হামলা চালাতে পারবে। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে কিয়েভকে জার্মানির সমর্থনের প্রতিশোধ হিসেবে দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় রুশ সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০২৪ সালের মার্চে। ওই সময় রাশিয়া জার্মান বিমানবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি গোপন বৈঠকের রেকর্ডিং হাতে পায়। ওই বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জার্মানির সামরিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করছিলেন কর্মকর্তারা। সাইবার হামলার বাইরেও জার্মানির প্রতিরক্ষা খাতের কর্মকর্তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র, ইউক্রেনকে সরঞ্জাম সরবরাহকারী কারখানায় আগুন দেওয়া এবং জার্মান বিমানবন্দরে বোমা পেতে রাখার মতো কর্মকাণ্ডে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ মোকাবিলায় বিএনডির জন্য নতুন দক্ষ জনবল নিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে তরুণ জার্মান গোয়েন্দাদের রুশ সাইবার হামলার জবাবে মস্কোর গোয়েন্দা তথ্যভাণ্ডার কিংবা অস্ত্র উৎপাদন নেটওয়ার্কে পাল্টা সাইবার হামলা চালানোর মতো কাজ করতে হতে পারে। বিএনডির মুখপাত্র জুলিয়া লিনার দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, গেমারদের সঙ্গে সংস্থাটির প্রয়োজনীয় প্রতিভার উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। তারা প্রযুক্তিতে দক্ষ, বিভিন্ন চরিত্রে কাজ করতে পছন্দ করে, মিশন সম্পন্ন করতে আগ্রহী এবং সফল না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে যাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তারা সম্ভবত এমন একটি নতুন বিএনডিতে যোগ দেবেন, যার কাঠামো চলমান আইন সংস্কারের মাধ্যমে পরিবর্তিত হবে। গেমারদের আকৃষ্ট করতে বিএনডি নিজেই একটি ভিডিও গেম তৈরি করেছে। ‘বিএনডি লিজেন্ডস’ নামের গেমটিতে গুপ্তচরবৃত্তি ও হ্যাকিংয়ের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। গেমসকমে বিএনডির স্টলে এটি খেলার সুযোগ থাকবে। বিএনডির কর্মকর্তারা বলছেন, গেমারদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলার পাশাপাশি উৎসবে প্রযুক্তি ও হ্যাকিংয়ে দক্ষ পেশাজীবীদেরও খুঁজে বের করবেন সংস্থার কর্মকর্তারা। তবে গেমারদের নিয়োগই জার্মানির অস্বাভাবিক জনবল সংগ্রহের একমাত্র উদ্যোগ নয়। দেশটির সামরিক বাহিনী বুন্ডেসভেরকেও ক্যারিয়ার প্রচারের জন্য ক্যামোফ্লাজ নকশার কাবাবের মোড়ক ব্যবহার করতে দেখা গেছে। সেই মোড়কে সামরিক বাহিনীর চাকরির ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হয়েছে। ইংরেজিতে ‘ওয়ান ক্যারিয়ার উইথ এভরিথিং’ লেখা ওই মোড়কটি জার্মান ভাষায় ‘সবকিছুসহ একটি কাবাব’ কথাটির সঙ্গে শব্দের খেলার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএনডিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থায় তুলনামূলক সীমিত পর্যবেক্ষক ভূমিকার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল। এর মাধ্যমে নাৎসি আমলের গেস্টাপো ও এসএসের নিরাপত্তা শাখা সিশেরহাইটসডিন্সটের সঙ্গে সংস্থাটির স্পষ্ট দূরত্ব তৈরি করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনডির কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আসছেন, রাশিয়ার মতো সম্ভাব্য বড় হুমকির মুখে সংস্থাটির ওপর আরোপিত অনেক বিধিনিষেধ পুরোনো ও অযৌক্তিক।মেরৎস সরকারও গোয়েন্দা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে বলেছে, এর মাধ্যমে জার্মানি অবশেষে একটি প্রকৃত গোয়েন্দা সংস্থা পাবে। যদিও বিএনডিকে আরও শক্তিশালী করার এই পরিকল্পনা নিয়ে জার্মানিতে সমালোচনাও রয়েছে। বাম ও ডান উভয় রাজনৈতিক শিবিরের একটি অংশ গোয়েন্দা সংস্থার ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে উদ্বিগ্ন। বামপন্থি দল ডি লিংকের মতে, গোয়েন্দা সংস্থার ক্ষমতা বাড়ানো জার্মানির অতীতের দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দলটির সংসদ সদস্য উলরিশ থোডেন বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নিশ্চিত করা জার্মানির ইতিহাস থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, বিশেষ করে গেস্টাপোর অভিজ্ঞতা থেকে। অন্যদিকে ডানপন্থি পপুলিস্ট দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানিও সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। দলটি বিশেষ করে জার্মান নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে নতুন সংস্কারেও বিএনডিকে পুরোপুরি ‘জেমস বন্ড’ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের কাউকে হত্যা করার মতো সরাসরি অনুমোদন বা ‘লাইসেন্স টু কিল’ দেওয়া হয়নি।
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে চট্টগ্রামে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, যেসব সড়কে ডাইভারশন ও রোড ব্লক
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন-২০২৬ উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগরীতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক উত্তর বিভাগ। জশনে জুলুসকে কেন্দ্র করে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে রোড ডাইভারশন ও রোড ব্লক করা হবে। ট্রাফিক নির্দেশনা অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৬টা থেকে পাঁচলাইশ থানা অভিমুখী সড়কের মির্জারপুল এবং বিবিরহাট হামজার এলাকায় রোড ব্লক করে যানবাহন ডাইভারশন করা হবে। একই সময় থেকে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালে জুলুশে অংশ নেওয়া লোকজনবাহী গাড়ির পার্কিং ও ডাইভারশনের ব্যবস্থা থাকবে। এন মোহাম্মদ ইউটার্নেও সকাল সাড়ে ৬টা থেকে জুলুশের লোকজনবাহী গাড়ি ডাইভারশন করা হবে। জুলুশ শুরু হলে সেখানে সব ধরনের যানবাহন ডাইভারশন করা হবে। জুলুশের মিছিল শুরু হলে এন মোহাম্মদ ফ্লাইওভারের ওঠার মুখ, বেবি সুপার মার্কেট ফ্লাইওভারের ওঠার মুখ এবং বাটা র্যাম্পে ফ্লাইওভারের ওঠার মুখে রোড ব্লক করা হবে। এ ছাড়া জুলুশের মিছিল মুরাদপুরে পৌঁছালে প্রবর্তক মোড় থেকে ষোলশহর ২ নম্বর গেট অভিমুখী সড়কে যানবাহন ডাইভারশন করা হবে। মিছিল ২ নম্বর গেটে পৌঁছালে গোলপাহাড় থেকে জিইসি ও পুনাক অভিমুখী সড়ক এবং হাউজিং সেটেলমেন্ট গ্যাপে ডাইভারশন কার্যকর হবে। অন্যদিকে, সকাল সাড়ে ৬টা থেকে অক্সিজেন মোড় থেকে বিবিরহাট এবং শেরশাহ মোড় থেকে ২ নম্বর গেট অভিমুখী জুলুশের লোকজনবাহী গাড়িগুলো ডাইভারশনের আওতায় থাকবে। মুরগীর ফার্ম এলাকা থেকেও জিইসি অভিমুখী জুলুশের লোকজনবাহী গাড়ি ডাইভারশন করা হবে। ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, বাকলিয়া আবাসিক এলাকা ও বায়েজিদ আবাসিক এলাকার বিমানবন্দরগামী যাত্রীদের হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে যাতায়াতের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। যাত্রীদের যানজট ও সড়ক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প হিসেবে বায়েজিদ লিংক রোড ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জশনে জুলুশ চলাকালে নগরবাসীকে ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা মেনে চলার এবং প্রয়োজন ছাড়া সংশ্লিষ্ট সড়কগুলো এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে সিএমপির ট্রাফিক উত্তর বিভাগ।
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে চট্টগ্রামে শোভাযাত্রা, যেসব সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকবে
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগরীতে শোভাযাত্রা ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিশেষ ট্রাফিক নির্দেশনা জারি করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সিএমপি কমিশনারের স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আগামী ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি, ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন স্থানে র্যালি ও মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এসব আয়োজন সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ট্রাফিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সকাল ৮টায় চট্টগ্রাম জেলখানার আলমশাহী খানকা-এ কাদেরিয়া সৈয়দিয়া তৈয়্যবিয়া থেকে শোভাযাত্রা শুরু হবে। শোভাযাত্রাটি বিবিরহাট (বাঁশের মোড়), মুরাদপুর (ভাঁজের মোড়), ষোলশহর-২ নম্বর গেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা, দামপাড়া, লালখান বাজার ও টাইগারপাস হয়ে পুনরায় একই পথে ফিরে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা সংলগ্ন জুলুস ময়দানে গিয়ে শেষ হবে। এ কারণে শোভাযাত্রা চলাকালীন লালখান বাজার থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত ফ্লাইওভারটি বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে সিএমপি। এছাড়া শোভাযাত্রা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সড়কে যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে নগরবাসীকে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। গণবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচলে শিগগিরই নীতিমালা, জানাল সরকার
ঢাকার প্রধান সড়ক ও মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে দ্রুত নীতিমালা প্রণয় করতে যাচ্ছে সরকার। এতে এসব রিকশা কোথায় ও কতটুকু চলাচল করতে পারবে, যানবাহনের মান ও কারিগরি সক্ষমতা এবং চালকদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় নির্ধারণ করা হবে। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকার বড় ও প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল বেড়েছে। এতে মানুষের যাতায়াতে কিছুটা সুবিধা হলেও তৈরি হয়েছে নানা সমস্যা। বিশেষ করে যানজট বাড়ার পাশাপাশি রিকশাচালকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত এসব যানবাহন কারিগরিভাবে কতটা নিরাপদ ও মানসম্মত—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। জাহেদ উর রহমান বলেন, খুব দ্রুত এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। কোন এলাকায় এবং কতটুকু এসব রিকশা চলাচল করতে পারবে, যানবাহনের মান ও চালকদের প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নীতিমালায় নির্ধারণ করা হবে। সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং নগরীর যানজট ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শ্রমিক সংকটে দুমকীতে আমন রোপণে বিলম্ব
পটুয়াখালীর দুমকীতে কৃষিশ্রমিক সংকটে রোপা আমনের চারা রোপণ ব্যাহত হচ্ছে। চড়া মজুরি দিয়েও প্রয়োজনীয় শ্রমিক না পাওয়ায় অনেক কৃষক সময়মতো জমিতে চারা রোপণ করতে পারছেন না। এতে বেড়েছে আমন চাষের উৎপাদন খরচ। সরেজমিন উপজেলার পাঙ্গাশিয়া, লেবুখালী, আঙ্গারিয়া ও শ্রীরামপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক জমি চারা রোপণের জন্য প্রস্তুত থাকলেও শ্রমিকের অভাবে কাজ শুরু করতে পারছেন না কৃষকরা। স্থানীয়ভাবে আগে ৬০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক পাওয়া গেলেও বর্তমানে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, কোথাও ১ হাজার টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। বাধ্য হয়ে অনেকে আগাম চুক্তিতে মৌসুমি শ্রমিক এনে চারা রোপণ করছেন। কৃষকরা জানান, শ্রমিকের বাড়তি মজুরির পাশাপাশি ডিজেলের মূল্য ও জমি চাষের খরচ বেড়েছে। তেলের সংকটের কারণে অতিরিক্ত খরচে ট্রাক্টর দিয়ে জমি প্রস্তুত করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমন চাষে এবার উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। শ্রীরামপুর ইউনিয়নের কৃষক আবদুল মজিদ হাওলাদার বলেন, ‘একই জমিতে বোরো চাষের পর এখন আমন রোপণ করছি। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো চারা রোপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের কৃষক সৈয়দ জিয়া উল হাসান বলেন, ‘ডিজেলের দাম ও শ্রমিকের মজুরি দুটোই বেড়েছে। এত খরচ করে চাষাবাদ করতে গিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি।’ তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পুরোদমে জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের কাজ চলছে। শ্রাবণের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে উঁচু জমিতে আমন রোপণ শুরু হয়েছে। ভাদ্রের মধ্যে আমনের চারা রোপণ শেষ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে দুমকীতে ৬ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আবাদ ৬ হাজার ৬৮০ হেক্টর ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। দুমকী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘শুরুতে অতিবৃষ্টির কারণে বীজতলা তৈরিতে কিছুটা বিলম্ব হলেও বর্তমানে চারার অবস্থা ভালো। কৃষকদের উচ্চফলনশীল জাত চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে আমনের ভালো ফলন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
দেশের ৯ জেলায় ঝড়সহ বজ্রবৃষ্টির আভাস
দেশের ৯ জেলায় দুপুরের মধ্যে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সে সঙ্গে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির হতে পারে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়। ৯ জেলা হচ্ছে- রংপুর ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট। পূর্বাভাসে বলা হয়, এসব অঞ্চলের ওপর দিয়ে দক্ষিণ/দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়াসহ অস্থায়ীভাবে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
সকাল থেকে ১১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না বড়াইগ্রামের যেসব এলাকায়
জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ নতুন ৩৩ কেভি লাইনের তারকরণ কাজের কারণে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকায় মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল থেকে টানা ১১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে। সোমবার (২৪ আগস্ট) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নতুন ৩৩ কেভি লাইনের তারকরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য বড়াইগ্রাম-১ (বনপাড়া) উপকেন্দ্রের ৬ ও ৭ নম্বর এবং ৮ নম্বর ফিডারের আংশিক এলাকায় সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে। বিদ্যুৎবিহীন এলাকার মধ্যে রয়েছে—বনপাড়া ফজলিতলা, আহম্মেদপুর বাজার, খৌদ্দকাচুটিয়া, পার আহম্মেদপুর, বৃ-কাচুটিয়া, কেচুয়াকোড়া, বালিয়া, ধানুড়া (আংশিক), কলাকান্ত নগর, কায়েমকোলা, কুমরুল, রামাগাড়ি, কামারদহ, নওপাড়া, কালিকাপুর (আংশিক), আটঘরিয়া ও বড়বড়িয়া। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ হলে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হবে। সাময়িক এই অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ কর্তৃপক্ষ।