রুশ হ্যাকারদের মোকাবিলায় গেমারদের গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে জার্মানি

By admin
5 Min Read

রাশিয়ার সাইবার হামলার পাল্টা জবাব দিতে প্রযুক্তিতে দক্ষ নতুন প্রজন্মের গুপ্তচর নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে জার্মানির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা। এ লক্ষ্যে এবার গেমারদেরও নিয়োগের তালিকায় রাখছে সংস্থাটি। জার্মানির ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্সের সমতুল্য বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা বুন্ডেসনাখরিশটেনডিন্সট বা বিএনডির কর্মকর্তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভিডিও গেম উৎসব গেমসকমে অংশ নিয়ে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজবেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। বিএনডির কর্মকর্তারা মনে করছেন, গেমারদের অনেক দক্ষতার সঙ্গে সংস্থাটির প্রয়োজনীয় সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। বিশেষ করে জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় রাশিয়ার হ্যাকারদের হামলার জবাব দিতে এসব দক্ষতা কাজে লাগানো যেতে পারে। ২০২৬ সালের গেমসকম উৎসব জার্মানির কোলোনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেখানে বিএনডির নিয়োগ কার্যক্রম দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাকে শক্তিশালী করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এর মাধ্যমে একসময় তুলনামূলক সীমিত ক্ষমতার অধিকারী বিএনডিকে এমআইসিক্স ও ইসরায়েলের মোসাদের মতো শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থায় পরিণত করতে চায় জার্মানি। গোয়েন্দা সংস্থাটির একটি সূত্র জানিয়েছে, উৎসবে বিএনডির কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতার সঙ্গে মেলে এমন গেমারদের পাঁচ ধাপের একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এতে তাদের সাইবার নিরাপত্তা ও হ্যাকিংয়ের দক্ষতা যাচাই করা হবে। সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎসের মন্ত্রিসভা বিএনডির কার্যক্রমে বড় ধরনের সংস্কারের একটি প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। এতে বিদেশে কাজ করা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি নাশকতামূলক কার্যক্রম পরিচালনারও সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে ‘হ্যাক ব্যাক’ নামে পরিচিত নতুন বিধান। এর মাধ্যমে রাশিয়ার সাইবার হামলার জবাবে বিএনডি পাল্টা সাইবার হামলা চালাতে পারবে। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে কিয়েভকে জার্মানির সমর্থনের প্রতিশোধ হিসেবে দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় রুশ সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০২৪ সালের মার্চে। ওই সময় রাশিয়া জার্মান বিমানবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি গোপন বৈঠকের রেকর্ডিং হাতে পায়। ওই বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জার্মানির সামরিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করছিলেন কর্মকর্তারা। সাইবার হামলার বাইরেও জার্মানির প্রতিরক্ষা খাতের কর্মকর্তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র, ইউক্রেনকে সরঞ্জাম সরবরাহকারী কারখানায় আগুন দেওয়া এবং জার্মান বিমানবন্দরে বোমা পেতে রাখার মতো কর্মকাণ্ডে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ মোকাবিলায় বিএনডির জন্য নতুন দক্ষ জনবল নিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে তরুণ জার্মান গোয়েন্দাদের রুশ সাইবার হামলার জবাবে মস্কোর গোয়েন্দা তথ্যভাণ্ডার কিংবা অস্ত্র উৎপাদন নেটওয়ার্কে পাল্টা সাইবার হামলা চালানোর মতো কাজ করতে হতে পারে। বিএনডির মুখপাত্র জুলিয়া লিনার দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, গেমারদের সঙ্গে সংস্থাটির প্রয়োজনীয় প্রতিভার উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। তারা প্রযুক্তিতে দক্ষ, বিভিন্ন চরিত্রে কাজ করতে পছন্দ করে, মিশন সম্পন্ন করতে আগ্রহী এবং সফল না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে যাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তারা সম্ভবত এমন একটি নতুন বিএনডিতে যোগ দেবেন, যার কাঠামো চলমান আইন সংস্কারের মাধ্যমে পরিবর্তিত হবে। গেমারদের আকৃষ্ট করতে বিএনডি নিজেই একটি ভিডিও গেম তৈরি করেছে। ‘বিএনডি লিজেন্ডস’ নামের গেমটিতে গুপ্তচরবৃত্তি ও হ্যাকিংয়ের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। গেমসকমে বিএনডির স্টলে এটি খেলার সুযোগ থাকবে। বিএনডির কর্মকর্তারা বলছেন, গেমারদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলার পাশাপাশি উৎসবে প্রযুক্তি ও হ্যাকিংয়ে দক্ষ পেশাজীবীদেরও খুঁজে বের করবেন সংস্থার কর্মকর্তারা। তবে গেমারদের নিয়োগই জার্মানির অস্বাভাবিক জনবল সংগ্রহের একমাত্র উদ্যোগ নয়। দেশটির সামরিক বাহিনী বুন্ডেসভেরকেও ক্যারিয়ার প্রচারের জন্য ক্যামোফ্লাজ নকশার কাবাবের মোড়ক ব্যবহার করতে দেখা গেছে। সেই মোড়কে সামরিক বাহিনীর চাকরির ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হয়েছে। ইংরেজিতে ‘ওয়ান ক্যারিয়ার উইথ এভরিথিং’ লেখা ওই মোড়কটি জার্মান ভাষায় ‘সবকিছুসহ একটি কাবাব’ কথাটির সঙ্গে শব্দের খেলার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএনডিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থায় তুলনামূলক সীমিত পর্যবেক্ষক ভূমিকার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল। এর মাধ্যমে নাৎসি আমলের গেস্টাপো ও এসএসের নিরাপত্তা শাখা সিশেরহাইটসডিন্সটের সঙ্গে সংস্থাটির স্পষ্ট দূরত্ব তৈরি করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনডির কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আসছেন, রাশিয়ার মতো সম্ভাব্য বড় হুমকির মুখে সংস্থাটির ওপর আরোপিত অনেক বিধিনিষেধ পুরোনো ও অযৌক্তিক।মেরৎস সরকারও গোয়েন্দা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে বলেছে, এর মাধ্যমে জার্মানি অবশেষে একটি প্রকৃত গোয়েন্দা সংস্থা পাবে। যদিও বিএনডিকে আরও শক্তিশালী করার এই পরিকল্পনা নিয়ে জার্মানিতে সমালোচনাও রয়েছে। বাম ও ডান উভয় রাজনৈতিক শিবিরের একটি অংশ গোয়েন্দা সংস্থার ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে উদ্বিগ্ন। বামপন্থি দল ডি লিংকের মতে, গোয়েন্দা সংস্থার ক্ষমতা বাড়ানো জার্মানির অতীতের দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দলটির সংসদ সদস্য উলরিশ থোডেন বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নিশ্চিত করা জার্মানির ইতিহাস থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, বিশেষ করে গেস্টাপোর অভিজ্ঞতা থেকে। অন্যদিকে ডানপন্থি পপুলিস্ট দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানিও সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। দলটি বিশেষ করে জার্মান নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে নতুন সংস্কারেও বিএনডিকে পুরোপুরি ‘জেমস বন্ড’ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের কাউকে হত্যা করার মতো সরাসরি অনুমোদন বা ‘লাইসেন্স টু কিল’ দেওয়া হয়নি।

Share This Article
Leave a Comment