” হট্টগোলের ভেতর গণতন্ত্রের নীরব কান্না—জাতীয় সংসদে এক দিনের প্রত্যক্ষ দিনলিপি-

By admin
5 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ—এটি শুধু একটি আইন প্রণয়নের স্থান নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের বিবেকের প্রতিফলন। এখানে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়, প্রতিটি আচরণ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মাণ করে। অথচ সেই পবিত্র অঙ্গনেই যখন শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা, যুক্তির পরিবর্তে উচ্চকণ্ঠ, আর সহনশীলতার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উগ্র রূপ দেখা যায়—তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কোন পথে এগোচ্ছি? গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশন ছিল ঠিক তেমনই এক দিন—যেখানে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য যেমন ছিল, তেমনি তার আঘাতপ্রাপ্ত রূপও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সংসদের ভেতরের দিন—সময়, দৃশ্য ও পরিবেশ বিকেল তিনটা থেকে আমি জাতীয় সংসদ ভবনে উপস্থিত ছিলাম—“দ্য টুরিস্ট” পত্রিকার ডেপুটি এডিটর হিসেবে সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে। সংসদের সাংবাদিক গ্যালারি, বিশেষ করে ২ নম্বর গ্যালারিটি, এমন একটি স্থান যেখানে বসে পুরো সংসদের স্পন্দন অনুভব করা যায়। এই গ্যালারিটি স্পিকারের বাম পাশে, বিরোধী দলের আসনের ঠিক পেছনে অবস্থিত। ফলে বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া, তাদের দেহভঙ্গি, স্লোগানের তীব্রতা—সবকিছু খুব কাছ থেকে দেখা সম্ভব। আবার ডান পাশে সরাসরি দেখা যায় সরকারি দলের সামনের সারি—মন্ত্রী, সিনিয়র নেতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি। আমাদের ঠিক সামনের সারিতে বসা ছিলেন চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য—আবু সুফিয়ান, এরশাদ উল্লাহ, এনামুল হক এনাম, জসিমউদ্দীন, জিন্নাহসহ আরও অনেকে। তাদের মাঝে মাঝে পারস্পরিক কথোপকথন, হাসি, আবার হঠাৎ গম্ভীর হয়ে ওঠা—সব মিলিয়ে সংসদের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি চোখের সামনে ফুটে উঠছিল। ফজলুর রহমানের বক্তব্য—উত্তেজনার সূচনা অধিবেশনের এক পর্যায়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান তার বক্তব্য শুরু করেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, ভাষায় ছিল স্পষ্টতা, আর বক্তব্যে ছিল রাজনৈতিক বার্তা। কিন্তু সেই বক্তব্যই যেন সংসদের ভেতরে এক অদৃশ্য আগুন জ্বালিয়ে দেয়। বিরোধী দলের সদস্যরা ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে ওঠেন। প্রথমে কিছু ফিসফাস, তারপর আস্তে আস্তে প্রতিবাদ, এবং শেষে তা রূপ নেয় স্লোগান ও হট্টগোলে। একাধিক সদস্য একযোগে দাঁড়িয়ে পড়েন, স্পিকারের অনুমতি ছাড়াই কথা বলতে থাকেন, এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। স্পিকারের ধৈর্য ও সীমাবদ্ধতা এই অবস্থায় স্পিকার তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে আসেন। বারবার “Order! Order!” বলে তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। প্রথমে অনুরোধ, তারপর সতর্কতা—এভাবেই তিনি ধাপে ধাপে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু যখন দেখা গেল নির্দেশ মানা হচ্ছে না, তখন মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবুও বিশৃঙ্খলা থামেনি। এই মুহূর্তে স্পিকারের চেয়ারে বসে থাকা যেন একটি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়া—একদিকে শৃঙ্খলা রক্ষা, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা। সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে ‘নেমিং’ করে সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তোলে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি—এক ভিন্ন আবহ বিকেল ৩টা ৪৭ মিনিটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে প্রবেশ করেন। তার আগমনেই সংসদের পরিবেশে এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ও গুরুত্ব বাড়ে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা হয়ে ওঠে আরও কঠোর—প্রতিটি চলাচল, প্রতিটি দৃষ্টিপাত যেন নজরদারির আওতায়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো—আসর নামাজের বিরতির পর থেকে মাগরিবের বিরতির পূর্ব পর্যন্ত তিনি সরাসরি অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত না থাকলেও সংসদ ভবনের নির্ধারিত অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। এটি সংসদীয় কার্যক্রমের একটি স্বাভাবিক অংশ হলেও, তার উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে প্রভাবিত করে। বিরতির আড্ডা—সংসদের অন্যরূপ
অধিবেশনের বিরতিতে সংসদ ভবনের ক্যান্টিন যেন এক ভিন্ন জগৎ। সেখানে রাজনীতির উত্তাপ কিছুটা কমে আসে, জায়গা নেয় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সৌহার্দ্য আর হাস্যরস। আমরা সেখানে একসাথে খাবার গ্রহণ করি—অল্প খরচে সাদামাটা কিন্তু তৃপ্তিকর খাবার। চায়ের কাপ হাতে আলাপচারিতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের সাক্ষাৎকার, বিভিন্ন এমপিদের সঙ্গে মতবিনিময়—সব মিলিয়ে সময়টা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। আমার সঙ্গে ছিলেন মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, দৈনিক “আমাদের বাংলা” পত্রিকার চিফ রিপোর্টার—সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের পেশাগত জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
একটি ছোট ঘটনা—বড় ইঙ্গিত শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এমপি আবু সুফিয়ান দাঁড়িয়ে “মিথ্যা” উচ্চারণের চেষ্টা করেন। কিন্তু সরকারি দলের শীর্ষ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ইশারায় তিনি সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়েন। এই ছোট ঘটনাটি অনেক বড় বাস্তবতা তুলে ধরে—সংসদে দৃশ্যমান উত্তেজনার আড়ালেও থাকে কঠোর দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বের প্রভাব। শৃঙ্খলা না জানার সমস্যা সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—অনেক সংসদ সদস্যের আচরণ দেখে মনে হয়েছে তারা সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত নন, অথবা তা মানার প্রতি অনীহা রয়েছে। অথচ এই নিয়মগুলোই সংসদের মর্যাদা রক্ষা করে, গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখে। গণতন্ত্রের আয়নায় নিজের মুখ দিন শেষে যখন সংসদ ভবন থেকে বের হয়ে আসি, তখন মনে হচ্ছিল—এই একদিন যেন পুরো দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। একদিকে প্রাণবন্ততা, অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক তৎপরতা—অন্যদিকে বিশৃঙ্খলা, শৃঙ্খলাভঙ্গ, এবং পারস্পরিক অসম্মান। গণতন্ত্র কেবল ভোটে সীমাবদ্ধ নয়—এটি আচরণে, সহনশীলতায়, এবং নিয়ম মানার সংস্কৃতিতে প্রকাশ পায়। জাতীয় সংসদ যদি সেই সংস্কৃতির প্রতিফলন না হয়, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো রাষ্ট্রের জন্যই উদ্বেগের বিষয়। আমার এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাই শুধু একটি সংবাদ নয়—এটি একটি প্রশ্ন, একটি ভাবনা, এবং একটি প্রত্যাশা— আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্রের সেই পরিণত পথে হাঁটছি, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু শৃঙ্খলা থাকবে অটুট?

Share This Article
Leave a Comment