ভুয়া সাংবাদিক হান্নান রহিমের দৌরাত্ম্য: চট্টগ্রামে সাংবাদিকতার মুখোশে প্রতারণা, চাঁদাবাজি ও মাদকচক্রের রাজত্ব

By admin
6 Min Read

সাইফুল ইসলামঃ

চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজ আজ এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি— এক ব্যক্তি বছরের পর বছর ধরে সাংবাদিকতার পবিত্র মুখোশ পরে চালিয়ে যাচ্ছে নানান অপকর্ম, প্রতারণা আর চাঁদাবাজির মহোৎসব। তার নাম হান্নান রহিম তালুকদার, যাকে স্থানীয়রা চেনেন “চোরা হান্নান” নামে। একসময় ছোটখাটো সিএনজি ব্যবসা ও টোকেন বিক্রির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আজ সে নিজেকে বড় সাংবাদিক, এমনকি সম্পাদক ও টেলিভিশন চেয়ারম্যান বলে দাবি করে বেড়ায়। তার এই ভয়ঙ্কর প্রতারণার গল্প আজ চট্টগ্রামের প্রতিটি সাংবাদিকের মুখে মুখে। একসময় স্থানীয় লোকেরা তাকে চিনত “অন্ধকার গলির মানুষ” হিসেবে। কিন্তু এখন সে পরিচিত ‘মিডিয়ার মানুষ’ নামে— হাতে বুম, গলায় আইডি কার্ড, গায়ে সাংবাদিক লেখা জ্যাকেট। অথচ তার সাংবাদিকতার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই— নেই কোনো স্বীকৃত পত্রিকার পদ, নেই প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ, এমনকি তার নামে সরকারি নিবন্ধনও নেই। সাংবাদিক পরিচয়ের মুখোশে প্রতারণা- হান্নান রহিম নিজের পরিচয় তৈরি করেছে পুরোপুরি ভুয়া কাগজপত্রের ওপর দাঁড়িয়ে। সে নিজেকে কখনো “দৈনিক চট্টগ্রাম সংবাদ”-এর সম্পাদক, কখনো বা “সিএসটিভি২৪”-এর চেয়ারম্যান বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুই প্রতিষ্ঠানের কোনো আইনগত বৈধতা নেই— নেই তথ্য অধিদপ্তরের নিবন্ধন বা প্রেস কাউন্সিলের অনুমোদন। তবুও ওই ভুয়া লোগো, অনলাইন ব্যানার, আইডি কার্ড ও ‘প্রেস’ লেখা স্টিকার ব্যবহার করে সে সাংবাদিক পরিচয়ে নগরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। স্থানীয় সূত্র বলছে, নতুন ব্রিজ থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত সিএনজি স্ট্যান্ডগুলোতে তার নামেই চলে প্রায় ৩০টি অটোরিকশা। প্রতিদিন টোকেন বিক্রি আর মাসিক চাঁদা আদায় করে কয়েক লাখ টাকা তোলে তার দল। ভুয়া পরিচয়ে হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাটে গিয়ে ভয় দেখানো, “রিপোর্ট হবে” বলে টাকা আদায় করা তার নিত্যকার কাজ।পুলিশের হাতে গ্রেফতার, তবুও অনুতাপহীন- বিগত সময়ে হান্নান রহিমের অপকর্ম প্রকাশিত হলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ-এর নির্দেশে চান্দগাঁও থানার ওসি আফতাব উদ্দিন তাকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার করেন। দীর্ঘ এক মাস জেল খাটার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— ভবিষ্যতে আর এমন কাজ করবে না। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। জেল থেকে বের হয়ে যেন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে চোরা হান্নান। পুরনো সহযোগীদের সঙ্গে মিলে আবারও গড়ে তোলে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। তার এই কর্মকাণ্ডের খবরে ক্ষুব্ধ স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, “হান্নান রহিম নামে কেউ কখনো আমাদের সদস্য ছিলেন না, তিনি সাংবাদিকতার নামে সমাজে প্রতারণা করছেন।”

চাঁদাবাজি ও ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি-
প্রতারণার মাধ্যমে হান্নান রহিম কেবল ব্যবসায়ী নয়, সাধারণ মানুষকেও হয়রানি করেছে। অনেক সময় পুলিশের নাম ব্যবহার করে সে ভয়ভীতি দেখাতো। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিক ও মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার গভীর যোগাযোগ রয়েছে। এক পর্যায়ে সাতকানিয়া এলাকার সাংবাদিক আক্কাছ আলী তাকে হাতে-নাতে ধরে পুলিশে দেন। তবুও অর্থ আর প্রভাবের জোরে অল্প সময়েই জামিনে বেরিয়ে আসে সে। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য বলেন— “আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে হান্নান রহিমকে ভুয়া সাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত করেছি। সাংবাদিকতার নামে প্রতারণা আমাদের লজ্জিত করছে।”ব্যক্তিগত জীবনে কলঙ্ক ও মাদকচক্রের যোগ- বহদ্দারহাট এলাকার এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে সংসার শুরু করে হান্নান রহিম।বর্তমানে সে অক্সিজেন এলাকার কুখ্যাত ইয়াবা ব্যবসায়ী মাজেদুল ইসলাম-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় সূত্র বলছে, তাদের দুজনকে ঘিরে একটি সক্রিয় মাদকচক্র গড়ে উঠেছে, যারা ইয়াবা ও চাঁদাবাজি—দুই পথেই বিপুল অর্থ উপার্জন করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “এই চক্রের বিরুদ্ধে নজরদারি চলছে, প্রয়োজনীয় প্রমাণ হাতে আসলেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”পপুলার গেস্ট হাউসে ‘তল্লাশি নাটক’ ও ভাইরাল ভিডিও-
গত ৫ জুন নগরের পপুলার গেস্ট হাউসে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। হান্নান রহিম নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়ে ক্যামেরা ও বুম হাতে নিয়ে অতিথিদের কক্ষে প্রবেশ করে একের পর এক জেরা শুরু করে।


ভিডিওতে দেখা যায়, সে এক দম্পতির ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অশোভন প্রশ্ন করছে, অতিথিদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছে। ঘটনার ভিডিও সে নিজেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সাংবাদিক সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তার এই আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করে।ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন—“পপুলার গেস্ট হাউসে সাংবাদিকতার নামে যা ঘটেছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি। হান্নান রহিমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা গ্রহণ করা হয়েছে, তদন্ত চলছে। তার বিরুদ্ধে আগেও তিনটি মামলার তথ্য রয়েছে।” অতীতের অন্ধকার ইতিহাস-হান্নান রহিমের বিরুদ্ধে আনোয়ারা থানায় ২০০৬ সালের ৯ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইনে মামলা হয়। ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল চান্দগাঁও থানায় মারধর, চুরি ও হত্যাচেষ্টার মামলা রুজু হয় তার নামে। এছাড়া ২০২১ সালে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তার বিরুদ্ধে একটি নালিশি মামলা হয়। সব মামলার ধারা এক— প্রতারণা, ভয়ভীতি, ও দখলবাজি। সাংবাদিক সমাজের ক্ষোভ ও আহ্বান-চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি সালাহউদ্দিন রেজা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ওই নামে আমাদের কোনো সদস্য ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। সে সাংবাদিকতার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।” চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ যোগ করেন— “হান্নান রহিম প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নিজের পরিচয় বানিয়েছে। আমাদের পেশার প্রতি এটা গভীর অবমাননা।”সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে আর কত অপমান?-সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা— সত্য, ন্যায় আর জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। কিন্তু হান্নান রহিমের মতো প্রতারকরা এই পেশার সুনাম কলঙ্কিত করছে। তাদের মুখোশ উন্মোচন করা শুধু পুলিশের কাজ নয়, আমাদের সকলের দায়িত্ব। আজ প্রয়োজন একটিই—আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ভুয়া সাংবাদিকদের স্থায়ীভাবে চিহ্নিতকরণ, যাতে আগামী প্রজন্মের চোখে সাংবাদিকতার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।
চলবে—

Share This Article
Leave a Comment