অবৈধ অনলাইন অপপ্রচার বন্ধে হাইকোর্টের উদ্যোগ: রাষ্ট্র, সমাজ ও সাংবাদিকতার সুরক্ষায় এক সময়োপযোগী পদক্ষেপ-

By admin
6 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ের এই ডিজিটাল যুগে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ কেন জরুরি বর্তমান বিশ্ব এক অভূতপূর্ব ডিজিটাল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন এক সংকট—“তথ্য-সন্ত্রাস”। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইউটিউব চ্যানেল এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন আর শুধু তথ্যের মাধ্যম নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা পরিণত হয়েছে বিভ্রান্তি ছড়ানোর শক্তিশালী অস্ত্রে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচার বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে দায়ের করা জনস্বার্থমূলক রিট আবেদন নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ও ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এসএম জুলফিকুর আলী (জুনু) কর্তৃক দায়েরকৃত এই রিটটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, তথ্যের সত্যতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এক নতুন আলোচনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আমরা দ্য টুরিস্ট পত্রিকার পক্ষ থেকে এই রিট উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং একই সঙ্গে আশা করি মাননীয় হাইকোর্ট বিষয়টির গভীরতা অনুধাবন করে একটি কার্যকর, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত নির্দেশনা প্রদান করবেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: স্বাধীনতার হাতিয়ার না কি অপপ্রচারের কেন্দ্র? বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ মানুষের মতপ্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই সুযোগের অপব্যবহারও সমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি ফেসবুক পেজ, একটি ইউটিউব চ্যানেল বা একটি অনলাইন পোর্টাল খুলে যেকেউ এখন নিজেকে “সাংবাদিক” বা “মিডিয়া” হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে—যার পেছনে নেই কোনো নীতিমালা, নেই কোনো সম্পাদকীয় দায়িত্ব, নেই কোনো পেশাগত জবাবদিহিতা। এই অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল পরিবেশে যে সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো হলো— পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ছড়ানো ব্ল্যাকমেইল ও ভয়ভীতি প্রদর্শন যাচাইবিহীন সংবাদ পরিবেশন সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট করার প্রচেষ্টা এসব কার্যক্রম কেবল অনৈতিক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। প্রকৃত সাংবাদিকতা আজ কেন সংকটে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যারা পেশাদার সাংবাদিকতা চর্চা করছেন, তারা আজ এক ধরনের দ্বৈত চাপে রয়েছেন। একদিকে রয়েছে পেশাগত দায়িত্ব ও সত্য প্রকাশের দায়, অন্যদিকে রয়েছে ভুঁইফোঁড় অনলাইন অপপ্রচারকারীদের কারণে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস ও বিভ্রান্তি। প্রকৃত সাংবাদিকতা একটি গবেষণাভিত্তিক ও নৈতিক প্রক্রিয়া। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক—তথ্য যাচাই করেন একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেন সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করেন এবং সম্পাদনার মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, কিছু অবৈধ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কয়েক মিনিটের মধ্যে যাচাইবিহীন তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা পরবর্তীতে জনমনে ভুল ধারণা তৈরি করছে। এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরাও সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। এটি শুধু পেশাগত সংকট নয়, এটি গণতন্ত্রের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রভাব রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান—এসবের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অপপ্রচার জনমনে গভীর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এর কিছু সুস্পষ্ট প্রভাব হলো— জনগণের আস্থা হ্রাস পাওয়া রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা দুর্বল হওয়া সামাজিক বিভাজন বৃদ্ধি পাওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া একটি মিথ্যা তথ্য আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, যা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। রিট আবেদনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা দায়েরকৃত রিটে যেসব বিষয় উত্থাপন করা হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে— অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রকৃত মালিকানা যাচাই নিবন্ধন ও বৈধতা পরীক্ষা অপপ্রচারমূলক কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অনিবন্ধিত প্ল্যাটফর্ম বন্ধ বা ব্লক করার নির্দেশনা এবং অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে ডিজিটাল স্পেসে একটি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। তবে এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অত্যন্ত জরুরি। কারণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মৌল ভিত্তি। তাই কোনোভাবেই যেন এই উদ্যোগ— স্বাধীন সাংবাদিকতা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা সরকারের নীতির গঠনমূলক সমালোচনাকে বাধাগ্রস্ত না করে। অবৈধ অনলাইন ও “সাইবার ভুঁইফোঁড় সাংবাদিকতা” বর্তমানে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করছে। তারা—চাঁদাবাজি করছে ব্যক্তিগত আক্রমণ চালাচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপপ্রচার করছে এবং সামাজিকভাবে মানুষকে হেয় করছে এই প্রবণতা সাংবাদিকতার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য কাজের পরিবেশ কঠিন করে তুলছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আইনি প্রেক্ষাপট বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে অনলাইন তথ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য স্পষ্ট আইন রয়েছে। যেমন ভুয়া খবর (fake news) প্রচারে শাস্তি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক কনটেন্ট মনিটরিং ব্যবস্থা এবং সাইবার অপরাধের জন্য দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশেও ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার আইন রয়েছে, তবে এর কার্যকর ও ন্যায্য প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। দ্য টুরিস্ট পত্রিকার অবস্থান দ্য টুরিস্ট পত্রিকা মনে করে অবৈধ ও অনিবন্ধিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি অপপ্রচার ও গুজব সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে প্রকৃত সাংবাদিকতা রক্ষায় রাষ্ট্রকে ভূমিকা রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে আমরা বিশ্বাস করি, মাননীয় হাইকোর্ট এই রিটের মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী নির্দেশনা প্রদান করবেন, যা রাষ্ট্র, সমাজ এবং সাংবাদিকতা—তিন ক্ষেত্রকেই ভারসাম্যপূর্ণভাবে সুরক্ষা দেবে। সত্যের পক্ষে একটি প্রয়োজনীয় অবস্থান ডিজিটাল যুগে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা প্রতিদিনই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ শুধু আইনগত বিষয় নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও বটে। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, জনগণের আস্থা এবং সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় এখন প্রয়োজন দায়িত্বশীল নীতিমালা কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান আমরা আশা করি, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাকে আরও শৃঙ্খলিত, নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে যেখানে সত্য কথা বলার অধিকার থাকবে সবার, কিন্তু মিথ্যার কোনো আশ্রয় থাকবে না।

Share This Article
Leave a Comment