
-মো.কামাল উদ্দিন
বাংলাদেশের ইতিহাস এমন এক প্রবাহ, যেখানে ব্যক্তি, রাষ্ট্র, যুদ্ধ, সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই ইতিহাসে কিছু অধ্যায় আছে যেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি বিতর্কিত হয়ে উঠেছে—রক্ষীবাহিনী তেমনই একটি অধ্যায়। আর এই ইতিহাসের আলোচনায় জননেতা তোফায়েল আহমেদকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব মন্তব্য ও অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে, তা ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠকে ব্যাহত করছে। এই লেখার উদ্দেশ্য কারও পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং ইতিহাসকে তার প্রকৃত প্রেক্ষাপটে দাঁড় করিয়ে বোঝার চেষ্টা করা। তোফায়েল আহমেদ: রাষ্ট্রগঠনের নীরব সংগঠক তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাথমিক সময়ের একজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী। তাঁর পদ ছিল রাজনৈতিক সচিব, যার মর্যাদা প্রশাসনিক কাঠামোয় মন্ত্রীর সমতুল্য। তবে এটি কোনো সামরিক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব ছিল না। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ, রাজনৈতিক সমন্বয় এবং প্রশাসনিক যোগাযোগের মধ্যেই তাঁর ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল। রক্ষীবাহিনীর মতো একটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর পরিচালনা বা কার্যক্রমে তাঁর সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিল—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। রক্ষীবাহিনী: জন্মের ঐতিহাসিক বাস্তবতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ একটি ভাঙা রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে যাত্রা শুরু করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসন, বিপর্যস্ত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে দেশ ছিল গভীর সংকটে। এই সময়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। পুলিশ বাহিনী তখনো সম্পূর্ণ পুনর্গঠিত হয়নি, সেনাবাহিনী ছিল সীমিত সক্ষমতায়, আর বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর উত্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই বাস্তবতায় ১৯৭২ সালের শুরুতে একটি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সহায়ক বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে রক্ষীবাহিনী নামে পরিচিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করা—বিশেষ করে পুলিশের সীমিত সক্ষমতার সময়ে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। রক্ষীবাহিনীর কাঠামো: রাষ্ট্রীয় নাকি দলীয়? রক্ষীবাহিনীকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো—এটি কি কোনো রাজনৈতিক দলের বাহিনী ছিল, নাকি রাষ্ট্রীয় বাহিনী? ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, এটি একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে পরিচালিত বাহিনী ছিল। এর পরিচালনায় একটি বোর্ড ছিল, যেখানে সামরিক ও প্রশাসনিক প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এটি কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় মিলিশিয়া ছিল না।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই সময়ের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে থাকতে পারে না—এটি ইতিহাসের একটি সাধারণ সত্য। প্রশিক্ষণ, সীমাবদ্ধতা ও যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতা রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা মূলত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধফেরত তরুণ ও নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্য। তাদের প্রশিক্ষণ সময় ছিল সীমিত, যা যুদ্ধপরবর্তী রাষ্ট্রের বাস্তব সীমাবদ্ধতারই প্রতিফলন। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যেখানে প্রশাসন পুনর্গঠনই ছিল প্রধান কাজ, সেখানে দ্রুত একটি নিরাপত্তা কাঠামো দাঁড় করানো ছাড়া বিকল্প খুব বেশি ছিল না। এই বাস্তবতায় রক্ষীবাহিনীর কার্যক্রম শুরু হয় অত্যন্ত চাপপূর্ণ ও সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে। ১৯৭২–১৯৭৫: রাষ্ট্রের অস্থির অধ্যায় এই সময়কাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটি। রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র হয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি, খুন ও সহিংসতা বাড়ে থানাগুলো পর্যন্ত হামলার শিকার হয় রাষ্ট্র তখন একসঙ্গে পুনর্গঠন ও নিরাপত্তা—দুই কাজই সামলাতে বাধ্য ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে রক্ষীবাহিনীকে মাঠে নামানো হয়, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা স্থিতি আনার চেষ্টা করে। অভিযোগ, সংখ্যা ও ইতিহাসের বিতর্ক রক্ষীবাহিনী নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো নিহতের সংখ্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক ঐতিহাসিক প্রশ্ন রয়েছে— এই সংখ্যাগুলোর নির্ভরযোগ্য উৎস কী? ইতিহাসে যেকোনো বড় দাবির জন্য প্রয়োজন: নিরপেক্ষ গবেষণা রাষ্ট্রীয় নথি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সমসাময়িক সংবাদ দলিল কিন্তু রক্ষীবাহিনী নিয়ে যে বিভিন্ন সংখ্যা প্রচলিত, তার মধ্যে অনেকগুলোই রাজনৈতিক বক্তব্য, অনুমান এবং পরবর্তী ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। ইতিহাসে অতিরঞ্জন যেমন বিপজ্জনক, তেমনি অস্বীকারও ইতিহাসকে অসম্পূর্ণ করে তোলে। রাজনৈতিক বয়ান ও ইতিহাসের পুনর্লিখন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বাস্তবতা হলো—প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের ব্যাখ্যাও পরিবর্তিত হয়েছে। রক্ষীবাহিনীকে কখনো “রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনীয়তা” হিসেবে দেখা হয়েছে, আবার কখনো “রাজনৈতিক দমনযন্ত্র” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই দুই বয়ানের মাঝখানে থেকে হারিয়ে গেছে প্রেক্ষাপট—যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মওলানা ভাসানী ও সমকালীন উপলব্ধি তৎকালীন বিভিন্ন বর্ণনায় দেখা যায়, রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের অনেকেই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধফেরত তরুণ। তাঁদের পরিচয় ও বাস্তবতা নিয়ে সমাজে বিভ্রান্তিও ছিল। এই বাহিনীকে ঘিরে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকাংশে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও তথ্য বিভ্রান্তির ফল। সেনাবাহিনী, রক্ষীবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো একই সময়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং রক্ষীবাহিনী—তিনটি কাঠামোই ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করছিল। রাষ্ট্রীয় বাজেট, অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ছিল বাস্তব সত্য। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই রাষ্ট্র টিকে থাকার চেষ্টা করছিল। তোফায়েল আহমেদ: ইতিহাসের সাক্ষী, লক্ষ্যবস্তু নয় তোফায়েল আহমেদ এই পুরো ইতিহাসের একজন প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সাক্ষী। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাথমিক পর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী ছিলেন, কিন্তু রক্ষীবাহিনীর অপারেশনাল সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সামরিক পরিচালনার সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাঁকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ব্যাখ্যা তৈরি করা হচ্ছে, তা অনেকাংশে ইতিহাসের জটিলতাকে সরলীকরণ করে দেখার প্রবণতা। ইতিহাসের শেষ শিক্ষা ইতিহাস কোনো একক গল্প নয়—এটি বহু কণ্ঠের সমষ্টি। সেখানে রাষ্ট্র থাকে, রাজনীতি থাকে, যুদ্ধ থাকে, আবার থাকে মানুষের জীবন ও বেদনা। রক্ষীবাহিনীকে বুঝতে হলে যেমন রাষ্ট্রের সংকট বুঝতে হয়, তেমনি তোফায়েল আহমেদকে বুঝতে হলে বুঝতে হয় রাষ্ট্র গঠনের সেই কঠিন সময়কে। ইতিহাসের প্রতি ন্যায় করতে হলে প্রয়োজন— প্রেক্ষাপট বোঝা দলিল নির্ভরতা এবং আবেগের বাইরে গিয়ে বিশ্লেষণ করা শেষ পর্যন্ত ইতিহাস আমাদের শেখায়—সত্য কখনো একরৈখিক নয়, কিন্তু সত্যের অনুসন্ধানই একটি জাতির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।