
— মো. কামাল উদ্দিনঃ
মাঝেমধ্যে না, প্রায়ই আমার হাসি পায়! যাদের দেয়ালে ঝোলানো নানা ডিগ্রির সার্টিফিকেট, নামীদামী স্কুল-কলেজের গর্বে ফুলে ওঠা বুক—তাদের অনেকেই যখন লিখতে যান, কলম যেন রাগে ভেঙে পড়ে! যেন কলমই বলে ওঠে, “না ভাই, এমন লেখকের হাতে আর না!” আর আমি? হা হা হা! না আছে বড় কোনো সার্টিফিকেট, না কোনো স্কুলের বেঞ্চে বসার স্মৃতি। তবু লিখি—দিনে লিখি, রাতে লিখি। আর যারা লেখার গুরুগম্ভীর আলাপ করে গলা শুকিয়ে ফেলে, তারাও আমার কলমের ধার এড়িয়ে চলে। মনে করেন বা-ধরে নেন -এই আমি—কোন দিন স্কুলের সিঁড়িও কোনোদিন মাড়ায়নি—!!! বিদ্যালয়ে গেলেও সেটা আমার যাওয়া বলা হয় না। বিদ্যালয়ে গিয়ে কয়টা বই পড়েছি বা পড়েন?? সামান্য কয়টা বই- বিদ্যালয়ে পড়ানো হয়- তাতে যা পড়া হয় তার সংখ্যা বই কত? তাতে আমি যদি প্রথম শ্রেণী থেকে মাস্টার্স পাস করার পর্যন্ত পাঠ্য বইয়ে হিসাব করি- তাহলে দেখা যায়—-বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী যখন প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করেন, তখন তার শিক্ষা-জীবনে গড়ে প্রায় ১৪৮টি পাঠ্যবই পড়তে হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তর (১ম থেকে ৫ম শ্রেণি) পর্যন্ত থাকে গড়ে ৩৫ থেকে ৫০টি বই, মাধ্যমিক স্তর (৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি) পর্যন্ত প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বই, এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে (একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি) প্রায় ১৫ থেকে ২০টি বই। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পর্যায়ে গড়ে আরও ৩০ থেকে ৪০টি বই অধ্যয়ন করতে হয়, যা বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুযায়ী কিছুটা কম-বেশি হয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, একজন ছাত্র তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনে—প্রথম শ্রেণি থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর্যায় পর্যন্ত—প্রায় দেড় শতাধিক (প্রায় ১৪৮টি) পাঠ্যবই অধ্যয়ন করেন। এই সংখ্যাটি বাংলাদেশের জাতীয় পাঠ্যক্রম (NCTB) ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গড় হিসাবের ভিত্তিতে নির্ধারিত একটি বাস্তবসম্মত পরিসংখ্যান। আমিতো- এই ধরনের পাঠ্যবই একবছরে- সকল বই এক মাসের মধ্যে পড়ে শেষ করেছি- তখনতো বাকি ১১ মাস কি পড়তাম- কথার হিসাব দিয়েছি- কিন্তু আমি মনে হয় পাঠ্য বইয়ের
বাইরে বছরে একহাজারের বেশি পড়তাম- আমার পুরো জীবনে মনে আমি ৩ লক্ষর মতো বই পড়েছি- তাতে প্রথম শ্রেণী হতে মাস্টার্স পাস করার পর্যন্ত মাত্র ১৫০ শত মতো বই পড়ে কে কতটুকু জ্ঞান লাভ করবে–আমি তার কারণে বলছি আমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিতে যায়নি- আজ সাংবাদিকতার ময়দানে গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ চ্যালেঞ্জে করে আনার সাথে লেখা-লেখিতে আসে না? বিগত সময়ের আমি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের কিছু নামি-দামি সাংবাদিক বন্ধুদেরকে প্রকাশ্য আমার সাথে লেখা লেখি এবং টেলিভিশন উপস্থাপনাসহ নানান বিষয়ে প্রতিযোগীতায় আসার আহবান জানিয়েছিলাম – আমাকে পরাজিত করতে পারলে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে ছিলাম- কিন্তু আমার দুঃখ একজনও আমার আহবানে সারা দেয়নি- তাতে আমি বলছিনা আমি মহাপণ্ডিতের ভেকধারী- আমি সব সময় বলেছি এখনো বলছি আমি কিছুই জানি না- আমি প্রতিনিয়ত শেখার চেষ্টা করছি- আজীবন শিখে যাবো। আপাতত ঐসব কথা থাক, আমার হাসিই থাকুক শেষ উত্তর!আজকের এই লেখা আমার আত্মপ্রকাশও বটে, প্রতিবাদও বটে। আবাও বলছি আমি কিছুই জানি না- ধরে নিতে পারেন আমি ‘অশিক্ষিত’ হয়েও কলম হাতে নিয়েছি সেইসব তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ সাংবাদিকদের জন্য—যাদের মানুষ আড়ালে বলে ‘জ্ঞানপাপী’। তাদের অনেকেই মনে করেন—যিনি ইংরেজি অনর্গল বলতে পারেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেই, তাঁর বলার অধিকারও নেই। কিন্তু যারা জীবনকে চোখে চোখ রেখে পড়েছে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কলম তুলেছে—তাদের অবহেলা করা মানেই সত্যকে অস্বীকার করা। আমি মনে করি- আমি কখনও স্কুলে যাইনি। কিন্তু জীবনের প্রতিটি ধাপে, মানুষের হাসি-কান্না, রাজনীতি-অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি—সবকিছুর অভিজ্ঞতা আমার শিক্ষক। সেই জীবনের পাঠ নিয়েই আমি লিখেছি গবেষণাগ্রন্থ “সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা”, যা আজ দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমার লেখা বইয়ের সংখ্যা মাত্র তিরিশটি, কিন্তু প্রতিটি বই জীবনের মাটি ছুঁয়ে আছে। আমি এই লেখাটি উৎসর্গ করছি তাঁদের জন্য—যারা উচ্চশিক্ষিত হয়েও সত্য ও ন্যায়ের পথে কলম চালাতে ভয় পায়, কিংবা সুবিধাবাদের মাদকতায় নতজানু হয়ে গেছে। কারণ সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়—এটি নৈতিক দায়িত্ব, আত্মিক সাধনা, সমাজের বিবেক। সার্টিফিকেট দিয়ে সাংবাদিক হওয়া যায় না; সাংবাদিকতা শেখায় দৃষ্টিভঙ্গি, সততা, আর সত্য বলার সাহস। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যারা গড়েছেন ইতিহাস-মার্ক টোয়েন (Mark Twain, যুক্তরাষ্ট্র) মাত্র কয়েকদিন স্কুলে পড়েছিলেন। ১১ বছর বয়সে বাবার মৃত্যু হলে ছাপাখানায় কাজ শুরু করেন। পরে নৌচালক, তারপর সাংবাদিক। তাঁর লেখা The Adventures of Tom Sawyer ও Huckleberry Finn আজও সাহিত্য ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। হোরাস গ্রিলি (Horace Greeley, যুক্তরাষ্ট্র) দারিদ্র্যের কারণে বিদ্যালয়ের পাঠ সীমিত ছিল। ছাপাখানায় কাজ করতে করতে হয়ে ওঠেন The New York Tribune পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর লেখনী আমেরিকার গণতন্ত্র ও সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। জর্জ অরওয়েল (George Orwell, যুক্তরাজ্য) বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও হয়ে ওঠেন সত্যের সাহসী কণ্ঠ। ‘1984’ ও ‘Animal Farm’-এর লেখক এই মানুষটি প্রমাণ করেছেন—অভিজ্ঞতাই শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।
বাল ঠাকরে (ভারত) অল্পশিক্ষিত কার্টুনিস্ট থেকে গড়ে তোলেন ‘Saamana’ পত্রিকা। লেখার শক্তিতেই রাজনীতির প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন। জুলিয়ান আসাঞ্জ (অস্ট্রেলিয়া) প্রথাগত শিক্ষা নয়, আত্মশিক্ষায় গড়ে ওঠা এক বিস্ময়। WikiLeaks প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বব্যাপী সাহসী সাংবাদিকতার নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন। কুলদীপ নায়ার (ভারত) অল্পশিক্ষিত হলেও মাঠের অভিজ্ঞতায় হয়ে ওঠেন ভারতের সাংবাদিকতার বিবেক। তাঁর আত্মজীবনী Between the Lines আজও প্রাসঙ্গিক।
অন্য পেশা থেকে সাংবাদিকতায় উত্থান-ওরিয়ানা ফালাচি (ইতালি) নার্স হিসেবে কর্মজীবন শুরু। পরে হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম সাহসী যুদ্ধসংবাদদাতা। উইলিয়াম হার্স্ট (যুক্তরাষ্ট্র) ব্যবসায়ী থেকে সংবাদপত্র জগতে প্রবেশ করে গড়ে তোলেন সাম্রাজ্য। নেলি ব্লাই (যুক্তরাষ্ট্র) কারখানার শ্রমিক থেকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ।
ওয়াল্টার ক্রঙ্কাইট (যুক্তরাষ্ট্র) ট্রাক ড্রাইভার থেকে যুদ্ধ সংবাদদাতা, পরে বিশ্বের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ উপস্থাপক। বাংলাদেশে বিচিত্র পেশা থেকে উঠে আসা সাংবাদিকেরা-তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আইনজীবী থেকে সাংবাদিক হয়ে ইত্তেফাক পত্রিকায় নেতৃত্ব দেন ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠস্বর হিসেবে।
আবদুল গফ্ফার চৌধুরী লন্ডনের শ্রমিকজীবন থেকে হয়ে ওঠেন প্রবাসী সাংবাদিকতার কিংবদন্তি। শওকত ওসমান শিক্ষকতা থেকে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আসেন। মাহবুব তালুকদার প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকেও লেখার মাধ্যমে সমাজের মানবিক দিক তুলে ধরেছেন। মতিউর রহমান (সম্পাদক, প্রথম আলো) কৃষি পেশা থেকে সাংবাদিকতায় এসে দেশের গণমাধ্যমে নতুন যুগের সূচনা করেন। শ্রমজীবী মানুষের মধ্য থেকেও উঠে আসা সংবাদযোদ্ধারা আব্দুল হাকিম (চট্টগ্রাম) কুলি থেকে শ্রমিক পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে হয়ে ওঠেন শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর। আবু তাহের মিঠু
ফেরিওয়ালা থেকে সাংবাদিকতায়—তাঁর গল্প সংগ্রামের প্রতীক। ফিরোজ খান
নৌকার মাঝি থেকে গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। সাংবাদিকতা থেকে নেতৃত্বের পথে-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তরুণ বয়সে ‘কৃষক’ পত্রিকায় কাজ করেছেন। সাংবাদিকতার ভাষা ও জনগণের ভাষণ—দুটিতেই ছিলেন পারদর্শী। তোফায়েল আহমেদ ‘ছাত্রসংসদ’ সাময়িকীর সম্পাদক থেকে রাজনীতির অগ্রপথিক। মাহফুজ আনাম সিভিল সার্ভিস থেকে সাংবাদিকতায়—দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদনা করে তৈরি করেছেন নীতিনিষ্ঠ গণমাধ্যম সংস্কৃতি। আনিসুল হক সাংবাদিকতা ও উপস্থাপনা থেকে জনপ্রিয় মেয়র হয়ে জনসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। উইনস্টন চার্চিল যুদ্ধ সংবাদদাতা থেকে রাষ্ট্রনায়ক ও নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। এরনেস্ট হেমিংওয়ে যুদ্ধ সাংবাদিক থেকে বিশ্বসাহিত্যের কিংবদন্তি। মেরি কলভিন এক চোখ হারিয়েও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে লিখেছেন মানবতার জ্বলন্ত সত্য। শিক্ষা নয়, সত্য বলার সাহসই সাংবাদিকতার প্রাণ-এই মানুষগুলো প্রমাণ করেছেন—সাংবাদিকতার শক্তি কোনো ডিগ্রি নয়, বরং অন্তরের সততা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহস। কেউ কুলি, কেউ ফেরিওয়ালা, কেউ শিক্ষক বা আমলা—তবু তারা কলম হাতে ইতিহাস লিখেছেন। সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, রাষ্ট্র গঠনের সহযাত্রী এবং জাতির বিবেকের প্রতিচ্ছবি। একজন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকের কলমই পারে ইতিহাস লিখতে, আলো জ্বালাতে, আর নেতৃত্ব গড়তে।