ষাট বছরের প্রেমের মামলা: আদালতে রায়, শেষে এক কাপ চায়ের দাওয়াত!”

By admin
5 Min Read
 মো. কামাল উদ্দিন  চট্টগ্রামের সেই পুরোনো আদালতটিতে আজ যেন অন্যরকম এক সকাল। করিডোরজুড়ে মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কৌতূহলী ফিসফাস, করণিকদের চাপা হাসি—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত উৎসবের আবহ। একজন করণিক পাশেরজনকে কানে কানে বলল, — “ভাই, এই মামলার ফাইলটা নাকি আমার চাকরিরও আগে আদালতে এসেছে! আজ বুঝি অবশেষে বিচার হবে!” কিছুক্ষণ পর বিচারক এজলাসে বসলেন। চশমাটা খুলে রুমালে মুছলেন, সামনে রাখা মোটা ফাইলের ধুলো উড়িয়ে প্রথম পাতায় চোখ রাখলেন। তারপর কাঠগড়ার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। মাথার অধিকাংশ চুল স্মৃতির পাতায় হারিয়ে গেছে, কাঁধে সাদা শাল, হাতে পুরোনো কাঠের লাঠি। বয়স আশির কোঠা পেরিয়েছে। দাঁড়িয়ে থাকতেই কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু মুখে এমন এক সরল হাসি—যেন আজও তিনি কলেজের সেই প্রেমে পড়া তরুণ। বিচারক গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “এই বয়সেও মেয়েদের উত্যক্ত করেন? লজ্জা লাগে না? আপনার অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য!” বৃদ্ধ ভদ্রভাবে মাথা নিচু করলেন। “স্যার… একটা কথা বলার অনুমতি চাই।”  “না! কোনো কথা নয়। আপনি তো আর বাইশ বছরের যুবক নন!” বৃদ্ধ মুচকি হেসে উত্তর দিলেন,  “ঠিকই বলেছেন স্যার। কিন্তু মামলাটা যখন হয়েছিল… তখন আমি সত্যিই বাইশ বছরের প্রেমে পাগল এক যুবক ছিলাম।” আদালতজুড়ে চাপা হাসির ঢেউ বয়ে গেল।  বিচারক ভ্রু কুঁচকে বললেন, “তাহলে কী করেছিলেন?” বৃদ্ধ একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, “স্যার, তখনকার প্রেম ছিল খুব ভদ্র। দূর থেকে দেখা, লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা, আর সাহস করে দু-একটা কবিতা বলা।” “কী কবিতা?” বৃদ্ধ গলা পরিষ্কার করে আবৃত্তি শুরু করলেন— “তোমার চোখে জোছনার আলো, দেখলেই হারিয়ে যায় সব কালো। একবার যদি হাসো তুমি, আমার জীবন হবে ভরা পূর্ণিমি।” এবার পুরো আদালত হেসে উঠল। বিচারকও হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। “এই কবিতা বলেই মামলা?” “জি স্যার। উনি তখন লজ্জায় লাল হয়ে চলে গিয়েছিলেন। আমি ভেবেছিলাম প্রেমে পড়ে গেছেন। পরে শুনি, আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে!” হাসির রোল আবারও বয়ে গেল। বিচারক জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, এতদিন পরে মামলা উঠল কেন?”
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “স্যার, তারিখের পর তারিখ… তারিখের পর তারিখ… এভাবে অপেক্ষা করতে করতে যৌবন চলে গেল, চুল চলে গেল, দাঁতও অর্ধেক চলে গেল।”
তিনি একটু থেমে আবার বললেন,  “যিনি আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, তিনি আজ আদালতেই আছেন। এখন আমরা একই মহল্লায় থাকি। একই মসজিদে নামাজ পড়ি। উনার নাতির সাইকেল ধরে আমি হাঁটতে শিখি।” সবাই এবার বাদিনীর দিকে তাকাল। একজন স্নিগ্ধ মুখের বৃদ্ধা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। চোখে মমতা, মুখে শান্ত হাসি। তিনি বিচারকের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“স্যার, তখন বয়স কম ছিল। রাগে-অভিমানে মামলাটা করেছিলাম। আজ বুঝি, ওটা কোনো অসভ্যতা ছিল না; ছিল এক টুকরো নিষ্পাপ ভালোবাসা। আজ আমি মামলাটা তুলে নিতে চাই।”
আদালত মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল। বিচারক কিছুক্ষণ দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন, “এই আদালত প্রেমের বিচার করে না, ন্যায়বিচার করে। তবে ষাট বছর ধরে বেঁচে থাকা একটি অনুভূতি যদি আজও দুজন মানুষের চোখে সম্মান হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভালোবাসাকে শাস্তি নয়—সম্মান দেওয়া উচিত।” তিনি হাতুড়ি ঠুকলেন। “মামলা খারিজ করা হলো।”
একটু থেমে হেসে যোগ করলেন, “তবে একটা শর্ত আছে।” সবাই কৌতূহলী। “আজই আদালতের সামনের পুরোনো চায়ের দোকানে গিয়ে দুজন একসঙ্গে বসে এক কাপ চা খাবেন। বিল আদালত দেবে না, নিজেরাই দেবেন!” পুরো আদালত হাসিতে ফেটে পড়ল। বৃদ্ধ হেসে বললেন, “স্যার, আমি এখন ডায়াবেটিসের রোগী। চায়ে চিনি খাব না। কিন্তু উনার পাশে বসে এক কাপ চা খাওয়ার সুযোগ যদি আজও পাই… তাহলে মনে হবে, ষাট বছরের অপেক্ষা বৃথা যায়নি।” বৃদ্ধাও মুচকি হেসে বললেন, “আজ কবিতা শোনাতে পারবেন?” বৃদ্ধ চোখ টিপে উত্তর দিলেন, “কবিতা এখনো মুখস্থ আছে। শুধু গলার জোরটা আগের মতো নেই।” আবারও হাসির ঝড় উঠল আদালতজুড়ে। এজলাসের বাইরে বেরিয়ে দুজন ধীরে ধীরে পাশাপাশি হাঁটতে লাগলেন। লাঠির শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল বহু বছর আগের কলেজের ঘণ্টাধ্বনি, পুরোনো দিনের লাজুক দৃষ্টি, আর না বলা হাজারো কথার প্রতিধ্বনি। চায়ের দোকানে বসে দুজন যখন ধোঁয়া ওঠা কাপ হাতে নিলেন, তখন তাদের নাতি-নাতনিরা মজা করে বলল, “দাদু, এবার কিন্তু আর মামলা নয়!” বৃদ্ধ হেসে উত্তর দিলেন, “না রে, এবার শুধু চা… আর একটু পুরোনো প্রেমের গল্প।” গল্পের শিক্ষা: সময়ের সঙ্গে সৌন্দর্য বদলায়, চুল পাকে, মুখে ভাঁজ পড়ে; কিন্তু সম্মান, আন্তরিকতা আর নির্মল ভালোবাসা যদি সত্যিই হৃদয়ে বেঁচে থাকে, তবে তার বিচার আদালতে নয়—মানুষের হৃদয়ে হয়। আর কখনো কখনো, জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ মামলারও সবচেয়ে সুন্দর রায় হয় এক কাপ চা আর একটি আন্তরিক হাসি।
Share This Article
Leave a Comment