“সম্পাদকীয়: সাংবাদিকের কলমে হাত দিলে রাষ্ট্রের নীরব থাকার সুযোগ নেই:

By admin
8 Min Read

সম্পাদকীয়:-
সাংবাদিকের কলমে হাত দিলে রাষ্ট্রের নীরব থাকার সুযোগ নেই
হুমকি, হামলা ও গুমের ভয় দেখিয়ে গণমাধ্যমকে স্তব্ধ করার অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না
সাতক্ষীরায় দৈনিক সাতনদীর সম্পাদক ও প্রকাশক সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের ওপর হামলা, মারধর, হত্যার হুমকি এবং অপহরণ ও গুমের ভয় দেখানোর অভিযোগ আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। একই সঙ্গে এই অভিযোগ আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও দাঁড় করিয়েছে—একজন সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশ করবেন, নাকি সংবাদ প্রকাশের পর নিজের জীবন বাঁচানোর চিন্তায় কলম গুটিয়ে রাখবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট—সাংবাদিকের কলম গুটিয়ে নেওয়ার বাংলাদেশ আমরা চাই না।
সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের অভিযোগে বলা হয়েছে, তার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে তাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সাতক্ষীরা পৌরসভা এলাকায় তার পথরোধ করা এবং পৌরসভার একটি কক্ষে প্রবেশ করে তাকে মারধর, শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা ও গুরুতর পরিণতির হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আমরা আবারও পরিষ্কার করছি—অভিযোগের সত্যতা তদন্তের বিষয়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু একজন সাংবাদিকের করা এমন গুরুতর অভিযোগকে হালকা করে দেখারও কোনো সুযোগ নেই।
কারণ এখানে প্রশ্ন শুধু হাবিবুর রহমানের নয়।
প্রশ্ন—বাংলাদেশে একজন সাংবাদিক কতটা নিরাপদ?
সংবাদ প্রকাশ অপরাধ নয়
কোনো সংবাদে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ বা অনিয়মের তথ্য প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আপত্তি থাকতেই পারে। তিনি প্রতিবাদ করবেন, নিজের বক্তব্য দেবেন, তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সংবাদ খণ্ডন করবেন, প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেবেন—এটাই স্বাভাবিক ও সভ্য পথ।
কিন্তু সংবাদ প্রকাশের জবাবে সাংবাদিকের পথরোধ করা, গালিগালাজ করা, শারীরিকভাবে আক্রমণ করা, হত্যার ভয় দেখানো কিংবা অপহরণ-গুমের হুমকি দেওয়া—যদি অভিযোগের তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ নয়; এটি আইনের শাসন ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত।
আমরা কোনোভাবেই এমন সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিতে পারি না যেখানে—
সংবাদের জবাব যুক্তিতে নয়, মুষ্টির আঘাতে দেওয়া হবে;
প্রতিবাদের জবাব আইনে নয়, হুমকিতে দেওয়া হবে;
আর সাংবাদিককে সত্য লেখার আগে নিজের কবরের কথা ভাবতে হবে।
এমন পরিবেশ গণমাধ্যমের জন্য যেমন ভয়ংকর, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও বিপজ্জনক।
সাংবাদিককে ভয় দেখানো মানে জনগণকে ভয় দেখানো
একজন সাংবাদিক যখন মাঠে যান, তখন তিনি শুধু নিজের জন্য তথ্য সংগ্রহ করেন না। তিনি মানুষের হয়ে প্রশ্ন করেন। যে অন্যায় সাধারণ মানুষ মুখ খুলে বলতে পারেন না, সাংবাদিক সেটি তুলে ধরেন। যে অনিয়ম অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকে, সাংবাদিক সেটিকে আলোর সামনে আনেন।
তাই সাংবাদিককে ভয় দেখানোর অর্থ কেবল একজন ব্যক্তিকে ভয় দেখানো নয়—সমাজের প্রশ্ন করার অধিকারকে ভয় দেখানো।
আজ যদি হাবিবুর রহমানকে একটি সংবাদ প্রকাশের কারণে ভয় দেখানো হয়, আগামীকাল অন্য কোনো সাংবাদিক একই কারণে আক্রান্ত হতে পারেন। তারপর হয়তো একজন ক্যামেরাম্যান মাঠে যেতে ভয় পাবেন, একজন প্রতিবেদক অনুসন্ধান বন্ধ করবেন, একজন সম্পাদক ঝুঁকিপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ থেকে সরে দাঁড়াবেন।
এর ফল হবে ভয়ংকর—অপরাধীরা আরও সাহসী হবে, দুর্নীতি আরও গভীরে যাবে এবং জনগণের কাছে সত্য পৌঁছানোর পথ আরও সংকুচিত হবে।
সাংবাদিকতার সঙ্গে সন্ত্রাসের কোনো আপস নেই
আমরা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলতে চাই—
সাংবাদিকতার সঙ্গে পেশিশক্তির কোনো আপস নেই।
সত্যের সঙ্গে সন্ত্রাসের কোনো আপস নেই।
আইনের সঙ্গে ভয়ভীতির কোনো আপস নেই।
কেউ যদি মনে করেন টাকা, ক্ষমতা, রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা সন্ত্রাসী শক্তি ব্যবহার করে কোনো সাংবাদিককে চুপ করিয়ে দেওয়া যাবে—তাহলে সেটি শুধু ভুল ধারণা নয়, এটি রাষ্ট্রের আইন ও গণমাধ্যমের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করার দুঃসাহস।
সাংবাদিককে হত্যা বা ভয় দেখিয়ে একটি সংবাদ হয়তো সাময়িকভাবে থামানো যেতে পারে; কিন্তু সত্যকে চিরদিনের জন্য চাপা দেওয়া যায় না।
একজন সাংবাদিকের কণ্ঠ রুদ্ধ করলে আরও দশজন সাংবাদিক প্রশ্ন করবেন। একজনের কলম কেড়ে নিলে আরও শত কলম সত্যের পক্ষে লিখবে।
রাষ্ট্রের কাছে কঠোর বার্তা নয়—কঠোর দায়িত্বের দাবি
এখানে প্রশাসনের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি—সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের অভিযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হোক।
ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হোক। অভিযোগে যাদের নাম এসেছে এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিষয়ে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তা যাচাই করা হোক।
তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে কোনো ধরনের প্রভাব, চাপ কিংবা পরিচয়ের কাছে নতি স্বীকার না করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
একই সঙ্গে সাংবাদিক হাবিবুর রহমান ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে যদি বাস্তব কোনো আশঙ্কা থাকে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজ শুধু মামলা নেওয়া নয়; অপরাধ সংঘটনের আগে সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধ করাও তাদের দায়িত্বের অংশ।
আমরা প্রতিশোধ চাই না, বিচার চাই
এই সম্পাদকীয় কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রতিশোধের আহ্বান নয়। আমরা কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানাই না।
আমাদের দাবি অত্যন্ত সরল—
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।
প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধী শনাক্ত হোক।
অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা হোক।
আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হোক।
এটাই আইনের শাসন।
আমরা এমন বিচার চাই না যেখানে পরিচয় দেখে সিদ্ধান্ত হবে। আমরা এমন বিচার চাই যেখানে প্রমাণ কথা বলবে, আইন কথা বলবে এবং সত্য বিজয়ী হবে।
সাংবাদিক সমাজের প্রতিও আহ্বান
এই ঘটনার পর সাংবাদিক সমাজের দায়িত্বও কম নয়।
সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ হতে হবে ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু দায়িত্বশীল। আমরা যেন কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না করি। একই সঙ্গে কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে তার পাশে দাঁড়াতে হবে—কারণ সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোনো নির্দিষ্ট সংবাদপত্রের বিষয় নয়; এটি গোটা গণমাধ্যমের বিষয়।
একজন সাংবাদিক আক্রান্ত হলে অন্য সাংবাদিকের নীরবতা হামলাকারীর সাহস বাড়াতে পারে।
তাই সত্য, ন্যায় ও পেশাগত স্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
হাবিবুর রহমানের পাশে দি টুরিস্ট
দি টুরিস্ট একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হিসেবে বরাবরই সত্য, জনস্বার্থ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পক্ষে অবস্থান করে এসেছে।
সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের ওপর হামলা ও হুমকির অভিযোগের ঘটনায় দি টুরিস্ট পরিবার তার পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করছে।
তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তিনি আইনের আশ্রয় নেবেন—এটাই গ্রহণযোগ্য পথ। কিন্তু সাংবাদিককে ভয় দেখানো বা আক্রমণ করার অভিযোগ কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
আমরা বিশ্বাস করি—
সাংবাদিকের কলম স্বাধীন থাকবে।
সম্পাদকের সিদ্ধান্ত স্বাধীন থাকবে।
জনগণের জানার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
আইনের শাসন সবার জন্য সমান থাকবে।
শেষ কথা
আজ হাবিবুর রহমানের ঘটনা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
আমরা যদি আজ নীরব থাকি, কাল এই নীরবতার মূল্য দিতে হতে পারে আরও অনেক সাংবাদিককে।
তাই আজই স্পষ্ট করে দিতে হবে—
সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে সংবাদ বন্ধ করা যাবে না।
হামলা করে প্রশ্ন থামানো যাবে না।
হুমকি দিয়ে সত্যকে বন্দী করা যাবে না।
গুমের ভয় দেখিয়ে গণমাধ্যমকে জিম্মি করা যাবে না।
বাংলাদেশে সংবাদ প্রকাশের অধিকার কোনো ব্যক্তির দয়া বা অনুগ্রহ নয়। এটি গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য অংশ।
কলমের বিরুদ্ধে যদি কারও অভিযোগ থাকে—যুক্তি নিয়ে আসুন।
সংবাদের বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে—তথ্য নিয়ে আসুন।
অন্যায় মনে হলে—আইনের আশ্রয় নিন।
কিন্তু সাংবাদিকের গায়ে হাত তোলার অধিকার কারও নেই।
সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের ওপর হামলা ও হুমকির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে দি টুরিস্ট।
কারণ আমাদের বিশ্বাস—
“কলম থামিয়ে দিলে সংবাদ থামে না;
সত্যকে ভয় দেখালে সত্য আরও জোরে কথা বলে।”
মো. কামাল উদ্দিন
ডেপুটি এডিটর
দি টুরিস্ট পত্রিকা

Share This Article
Leave a Comment