
আজ ভোরের আলো পুরোপুরি পৃথিবীর বুক ছুঁয়ে ওঠার আগেই আমি এসে দাঁড়িয়েছি পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের বালুকাবেলায়। আমার সামনে অসীম সমুদ্র, মাথার ওপরে মেঘে মোড়া আকাশ, চারদিকে নিরন্তর ছুটে চলা ঢেউয়ের গর্জন। আমি দু’হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছি, অথচ মনে হচ্ছে আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি সময়ের সামনে, জীবনের সামনে, নিজের বিবেকের সামনে। এই মুহূর্তে আমি কোনো মানুষ নই—আমি শুধু একজন অনুভূতির ভ্রমণকারী। আমি একজন লেখক, যার ভাষা কখনো কাগজে জন্ম নেয় না; জন্ম নেয় মানুষের কান্না, প্রকৃতির নীরবতা আর হৃদয়ের গভীরতম স্পন্দনের ভেতর।
আজ সমুদ্রকে দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবি প্রকৃতি। সে কখনো শব্দ দিয়ে কবিতা লেখে না, অথচ প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি বাতাস, প্রতিটি মেঘ, প্রতিটি জোয়ার-ভাটা এক একটি অমর কবিতার পঙক্তি হয়ে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
সমুদ্রের কোনো অহংকার নেই। সে জানে তার বিশালতা, কিন্তু সে কখনো নিজেকে বড় বলে ঘোষণা করে না। মানুষ যত বড়ই হোক, যদি বিনয় হারিয়ে ফেলে, তবে সে সমুদ্রের কাছ থেকেও ছোট হয়ে যায়। জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় প্রকৃতির কাছে। কারণ প্রকৃতি কখনো মিথ্যা বলে না। সূর্য প্রতিদিন ওঠে, আবার অস্ত যায়। ঢেউ বারবার ভেঙে পড়ে, তবুও আবার ফিরে আসে। গাছ ঝড়ের আঘাতে নুয়ে পড়ে, কিন্তু শিকড় ছেড়ে দেয় না। প্রকৃতি প্রতিদিন শেখায়—হার মানা আর থেমে যাওয়া এক জিনিস নয়। আজ এই উত্তাল ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, প্রতিটি ঢেউ যেন মানুষের জীবনের একটি অধ্যায়। কিছু অধ্যায়ে হাসি থাকে, কিছু অধ্যায়ে অশ্রু, কিছু অধ্যায়ে বিচ্ছেদ, কিছু অধ্যায়ে নতুন সূচনা। কিন্তু বইটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত গল্প কখনো শেষ হয় না। আমি বিশ্বাস করি, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পোশাকে নয়, তার পদবিতে নয়, তার ব্যাংক ব্যালেন্সেও নয়। মানুষের আসল পরিচয় তার চরিত্রে, তার ব্যবহারে, তার বিবেকে এবং তার ভালোবাসায়। এই পৃথিবীতে আমরা সবাই কিছুদিনের অতিথি। অথচ এই সামান্য সময়টুকুতেই কত অহংকার, কত হিংসা, কত প্রতারণা, কত ঘৃণা! অথচ মৃত্যুর পরে কেউ সম্পদের হিসাব জিজ্ঞেস করে না; মানুষ মনে রাখে শুধু একটি প্রশ্ন—মানুষটি কেমন ছিলেন? আজ সমুদ্রের বাতাস আমার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে প্রকৃতি যেন নীরবে বলছে—
“যা কিছু সুন্দর, তা ধরে রাখার চেষ্টা করো না; ভালোবেসে মুক্ত করে দাও। কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো শিকল পরায় না, ডানা মেলে উড়তে শেখায়।” ভালোবাসা এমন একটি শক্তি, যা মানুষকে বদলে দিতে পারে। ভালোবাসা যুদ্ধ থামাতে পারে, ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগাতে পারে, অন্ধকার জীবনে আলো জ্বালাতে পারে। কিন্তু সেই ভালোবাসা হতে হবে নিঃস্বার্থ।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ ভালোবাসার চেয়ে প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। প্রয়োজন শেষ হলে সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়। অথচ প্রকৃত ভালোবাসা প্রয়োজনের নয়, অনুভূতির। সমুদ্র কি কখনো হিসাব করে কতবার ঢেউ পাঠিয়েছে? আকাশ কি কখনো হিসাব করে কতবার বৃষ্টি দিয়েছে? সূর্য কি কখনো হিসাব করে কত আলো বিলিয়েছে? প্রকৃতি কিছুই হিসাব করে না। কারণ দানই তার ধর্ম। আমাদের জীবনও তেমন হওয়া উচিত। আমরা যদি মানুষের মুখে একটি হাসি ফোটাতে পারি, একটি কষ্টের মুহূর্তে পাশে দাঁড়াতে পারি, একটি নিরাশ মানুষকে সাহস দিতে পারি—সেটিই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। একজন লেখকের কলম শুধু কালি দিয়ে লেখে না। সেই কলমে মিশে থাকে মানুষের কান্না, সমাজের বাস্তবতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ভালোবাসার উষ্ণতা এবং বিবেকের আহ্বান। আমি যখন লিখি, তখন আমি কোনো গল্প লিখি না; আমি সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা করি। আমি মানুষের অনুভূতির ইতিহাস লিখি। আমি চাই, আমার প্রতিটি শব্দ মানুষের হৃদয়ে প্রশ্ন জাগাক—”আমি কেমন মানুষ?”
আজকের এই মেঘলা আকাশ আমার কাছে বিষণ্ন নয়। বরং এটি জীবনের বাস্তবতা। সব দিন রৌদ্রোজ্জ্বল হয় না। কিছু দিন মেঘ আসে, ঝড় আসে, অন্ধকার নামে। কিন্তু সেই অন্ধকারই মানুষকে আলো খুঁজতে শেখায়। জীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। কষ্টও নয়, আনন্দও নয়। তাই দুঃখে ভেঙে পড়া যেমন ঠিক নয়, সুখে অহংকার করাও ঠিক নয়।
আমি আজ সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কী রেখে যাব? সম্পদ? না। পদ-পদবি? না। আমি রেখে যেতে চাই কিছু সত্য কথা, কিছু মানবিক অনুভূতি, কিছু সাহসী লেখা, কিছু ভালোবাসা, কিছু বিবেকের আলো। মানুষ একদিন আমার নাম ভুলে যাবে। কিন্তু যদি আমার লেখা কোনো তরুণকে সত্যের পথে হাঁটতে শেখায়, যদি কোনো হতাশ মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, যদি কোনো হৃদয়ে মানবতার প্রদীপ জ্বালাতে পারে—তবেই আমার জীবন সার্থক। আজ সমুদ্রের প্রতিটি ঢেউ যেন আমাকে বলছে— “তুমি থেমো না। মানুষ তোমাকে ভুল বুঝবে, সমালোচনা করবে, আঘাত দেবে। তবুও সত্যের পথ ছেড়ে যেও না। কারণ ঢেউ কখনো পাথরের ভয় পায় না। বারবার আঘাত করেই সে পাথরকে বদলে দেয়।” জীবনে সবচেয়ে বড় প্রেম হলো মানুষের প্রতি প্রেম। যে মানুষ অন্যের কষ্ট বুঝতে পারে, যে অন্যের অশ্রু মুছে দিতে পারে, যে অন্যের সুখে আনন্দ খুঁজে পায়—সেই মানুষই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী। আজ এই বিস্তীর্ণ সমুদ্র আমাকে শিখিয়েছে—জীবন খুব ছোট, কিন্তু ভালোবাসা খুব বড়। সময় খুব দ্রুত চলে যায়, কিন্তু একটি ভালো কাজ যুগের পর যুগ মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। আমার চোখের সামনে অগণিত ঢেউ জন্ম নিচ্ছে, আবার হারিয়েও যাচ্ছে। মনে হচ্ছে মানুষের জীবনও যেন ঠিক এমনই। আমরা আসি, কিছু স্বপ্ন দেখি, কিছু মানুষকে ভালোবাসি, কিছু ভুল করি, কিছু শিক্ষা নিয়ে একদিন চলে যাই। কিন্তু ভালোবাসা কখনো মরে না। সত্য কখনো হারায় না। মানবতা কখনো পরাজিত হয় না। একজন লেখকও কখনো সত্যিকার অর্থে মারা যান না। তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শব্দে, তাঁর চিন্তায়, তাঁর আদর্শে। আজকের এই সকাল, এই সমুদ্র, এই মেঘলা আকাশ, এই নীরবতা—সবকিছু যেন আমাকে নতুন করে শপথ করাচ্ছে আমি লিখব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখব। মানুষের জন্য লিখব। ভালোবাসার জন্য লিখব। প্রকৃতির জন্য লিখব। বিবেকের জন্য লিখব। কারণ আমি বিশ্বাস করি— কলমের কালি শুকিয়ে যায়, কিন্তু সত্যের ভাষা কখনো শুকিয়ে যায় না। ঢেউ থেমে যায়, কিন্তু সমুদ্রের অস্তিত্ব থামে না। মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা থেকে যায়। আর একজন প্রকৃত লেখক তাঁর দেহে নয়, তাঁর লেখায়, তাঁর আদর্শে এবং মানুষের হৃদয়ের গভীরে চিরকাল বেঁচে থাকেন। সেই অমরত্বের স্বপ্ন নিয়েই আজ আমি কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে আছি—অসীম নীলের সামনে, নিজের ক্ষুদ্রতাকে উপলব্ধি করে, আর মহান সৃষ্টিকর্তার অপরিসীম সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, প্রেম ও কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে।