সততা, সৌজন্য ও সেবার প্রতীক—স্মরণে এ.ওয়াই.বি.আই. সিদ্দিকী”

By admin
6 Min Read
 —মো. কামাল উদ্দিন  গতকাল ১৮ই জুলাই ছিল প্রয়াত সাবেক বাংলাদেশ পুলিশ মহাপরিদর্শক, সচিব ও হাইকমিশনার জনাব আবু ইউসুফ বুরহানুল ইসলাম সিদ্দিকী (এ.ওয়াই.বি.আই সিদ্দিকী) সাহেবের ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। ২০২১ সালের ১৮ জুলাই দিবাগত রাত ১টায়, তিনি ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর জানাজা ওইদিন আসরের নামাজের পর নিজ গ্রাম চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দক্ষিণ রহমতনগরে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাঁকে সমাহিত করা হয় পিতা মরহুম আবুল মনসুর লুৎফে আহমেদ সিদ্দিকী এবং বড়ভাই, সাবেক মন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকার মরহুম আবুল হাসনাত লুৎফুল কবির সিদ্দিকী (এল.কে. সিদ্দিকী) সাহেবের কবরের পাশে। জনাব এ.ওয়াই.বি.আই. সিদ্দিকী শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সজ্জন, সদালাপী, চিন্তাশীল ও দূরদর্শী মানুষ। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেই তিনি সততার সঙ্গে কাজ করে গেছেন। তাঁর কর্মজীবনে যেমন সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে, তেমনি ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন সাদামাটা, পরিশীলিত ও প্রজ্ঞাবান। আমার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বিশেষভাবে মনে পড়ে ২০০১ সালের কথা—বিএনপি সরকারের শুরুর সময়। তখন চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা এবং ডবলমুরিং থানাকে মডেল থানা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল। সেই সময় তিনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানিয়ে পরামর্শের জন্য ডেকেছিলেন। এই আহ্বানে আমি গভীরভাবে সম্মানিত ও অভিভূত হয়েছিলাম। উন্নয়নমুখী, কার্যকর পুলিশ প্রশাসন গঠনে তিনি যে উদার মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতেন, তা আজকের বাংলাদেশে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও অনুপস্থিত। তিনি ছিলেন সীতাকুণ্ডের একজন গর্বিত সন্তান। তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব দেশের প্রশাসন ও কূটনীতিতে এখন বিরল হয়ে উঠেছে। আমরা যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি, তাঁরা জানি—তিনি ক্ষমতার অহংকারে ভোগেননি, বরং ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার চেষ্টাই করেছেন সবসময়। এই শ্রদ্ধেয় মানুষটির মৃত্যু দিবসে আমি তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ তাআলা যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ স্থানে স্থান দেন—এই প্রার্থনা করি।
আমিন। মুরাদপুরের সন্তান সাবেক আইজিপি বোরহান সিদ্দিকী বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব মরহুম এ. ওয়াই. বি. আই.
(বোরহান) সিদ্দিকীর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও দোয়া জ্ঞাপন করছি।
আজ গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও শোকের সঙ্গে স্মরণ করছি মুরাদপুরের সন্তান, বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাজ্ঞ প্রশাসক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী মরহুম এ. ওয়াই. বি. আই. (বোরহান) সিদ্দিকী-কে। চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার ৪নং মুরাদপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ রহমতনগর গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী ও শিক্ষিত পরিবারে ১৯৪৫ সালে তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন মরহুম আবুল মুনসুর সিদ্দিকী-এর সুযোগ্য সন্তান এবং সীতাকুণ্ডের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, সাবেক মন্ত্রী, চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার এল. কে. সিদ্দিকী-এর ছোট ভাই। তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অবদানের জন্য পরিচিত। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সুশৃঙ্খল ও অধ্যবসায়ী। উচ্চশিক্ষা শেষে ১৯৭০ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। দীর্ঘ কর্মজীবনে সততা, দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণে তিনি পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০০ সালের ৭ জুন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ১৬তম পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করে। পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯–১৯৯০ সালে জাতিসংঘের অধীনে নামিবিয়ায় শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ও প্রধান লিয়াজোঁ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম বেসামরিক শান্তিরক্ষা কন্টিনজেন্টের কমান্ডার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০০৪ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়নবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সংস্কৃতিমনা একজন মানুষ ছিলেন এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পী ও উপস্থাপক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।  রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেও তিনি ছিলেন বিনয়ী, সজ্জন ও মার্জিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর কর্মময় জীবন, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ তাঁকে একজন অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন একজন আদর্শ পারিবারিক মানুষ। ১৯৭১ সালে তিনি রেহানা সিদ্দিকী-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ছেলে লুৎফে সিদ্দিকী আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একজন স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ, নীতি-বিশেষজ্ঞ ও করপোরেট নির্বাহী। মেয়ে হুসনা সিদ্দিকী-লসন। তাঁদের পরিবারে চারজন নাতি-নাতনি আরিয়ান, ইশান, শিরিন ও তুলিন, রয়েছেন। দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করার পর ২০২১ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।  মরহুম এ. ওয়াই. বি. আই. (বোরহান) সিদ্দিকীর জীবন আমাদের শেখায়, সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব একজন মানুষকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করতে পারে। তাঁর কর্মময় জীবন, প্রশাসনিক অবদান ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করি, তিনি যেন মরহুমের সকল নেক আমল কবুল করেন, তাঁর গুনাহসমূহ ক্ষমা করেন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আল্লাহুম্মাগফির লাহু, ওয়ারহামহু, ওয়া আফিহি, ওয়া’ফু আনহু। আমীন।
Share This Article
Leave a Comment