মো.কামাল উদ্দিনঃ
কবিতা মানুষের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতির ভাষা। কখনও তা নিঃসঙ্গতার সান্ত্বনা, কখনও প্রেমের পরশ, আবার কখনও বিদ্রোহের ডাক। এমন এক সময়ে, যখন শব্দগুলো অনেক সময় কেবল কোলাহলে মিশে যায়, তখন কিছু মানুষ আছেন যাঁরা শব্দকে রূপ দেন শিল্পে, সুরে, অনুভবে। কবি নন্দিনী সোমা তাঁদেরই একজন। তাঁর কবিতা, তাঁর কণ্ঠ, তাঁর উপস্থাপনা—সব মিলিয়ে তিনি যেন এক অবারিত সৃজন-অভিযানের যাত্রী।
“পাহাড়ের খোঁজে”—সোমার এই কবিতাটি শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়, এটি তাঁর মনের যাত্রাপথের প্রতিচ্ছবি। পাহাড় এখানে শুধু ভৌগোলিক প্রতীক নয়; এটি যেন আশ্রয়, প্রত্যাশা, কখনও হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্বের খোঁজ।
তিনি লিখেছেন—
“কোনও এক পাহাড়কে খুঁজতে এসে
আমি হারিয়ে গেলাম।”
এই কয়েকটি পংক্তি থেকেই বোঝা যায়, কবিতার আড়ালে রয়েছে এক বিশাল শূন্যতার আখ্যান। এখানে পাহাড় খোঁজার মধ্যে রয়েছে জীবনের অর্থ খোঁজার চেষ্টা। অথচ সে খোঁজে কবি হারিয়ে ফেলেছেন নিজেকেই। এ এক চিরন্তন মানবিক অভিজ্ঞতা—যেখানে মানুষ নিজেকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যায় বিশালতার মাঝে।
মেঘ, নদী, আকাশ, বৃষ্টি—এই প্রকৃতির উপাদানগুলো সোমার কবিতায় হয়ে ওঠে জীবনের প্রতীক। নদীর বুকে যন্ত্রণার যে তুলনা তিনি করেছেন, তা কেবল ব্যক্তিগত ব্যথার কথা নয়; এটি যেন সমগ্র মানবজাতির দীর্ঘশ্বাস।
সোমা কেবল কবিতার কারিগর নন, তিনি অনুভবের অনুপম শিল্পী। তাঁর লেখায় শব্দগুলো জড়ো হয়ে শুধু ছন্দ সৃষ্টি করে না; তারা হৃদয়ের গোপন দ্বার খুলে দেয়। পাঠক যখন তাঁর কবিতা পড়ে, তখন শব্দকে আর অক্ষরের মতো মনে হয় না; বরং মনে হয়—এগুলো হৃদয়ের ধ্বনি, নিঃশ্বাসের অনুরণন।
তিনি নিঃসঙ্গতাকে রঙিন করেন, ব্যথাকে পরিণত করেন গানে, আবার অভিমানকে রূপ দেন ফিরে আসার আশ্বাসে। তাঁর কবিতা তাই শুধু পড়ার বিষয় নয়; এটি পাঠকের ভেতরে আলোড়ন তোলে, ভেঙে দেয় নিস্তব্ধতার দেওয়াল। সাহিত্যের মঞ্চে সোমা কেবল লেখক হিসেবে নন, আবৃত্তিকার হিসেবেও সমান উজ্জ্বল। তাঁর কণ্ঠে যখন কবিতার পঙ্ক্তি উচ্চারিত হয়, তখন মনে হয় শব্দগুলো নতুন প্রাণ পেয়েছে। তাঁর সুরেলা উচ্চারণ, আবেগঘন ভঙ্গি, থেমে থেমে মুগ্ধকর বিরতি—সবকিছু মিলিয়ে শ্রোতার মনে সৃষ্টি করে এক অনন্য অনুভব।
তিনি কবিতাকে কেবল পড়েন না; তিনি কবিতাকে বাঁচেন। তাই তাঁর কণ্ঠে কবিতা যেন নিঃশ্বাস ফেলে, হৃদয় দোলে, অশ্রু ঝরে। শ্রোতারা তখন আর কেবল শব্দ শোনে না, তারা অনুভব করে কবিতার ভেতরে লুকানো ব্যথা, ভালোবাসা, আকুলতা।
আবৃত্তির মঞ্চে তিনি যেন প্রকৃতিরই প্রতিনিধি। তাঁর কণ্ঠে কখনও গর্জে ওঠে সমুদ্রের ঢেউ, কখনও ঝরে পড়ে নীরব বৃষ্টির শব্দ। আর তাই শ্রোতারা মোহাবিষ্ট হয়ে তাঁর আবৃত্তি শোনেন, যেন প্রতিটি শব্দ তাঁদের হৃদয়ে আলোকিত প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। সোমা কেবল কবিতা লিখে বা আবৃত্তি করে থেমে থাকেননি। তাঁর মধ্যে রয়েছে বহুমাত্রিক প্রতিভার ঝলক। সাহিত্যচর্চা, মঞ্চনাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই তিনি সমান সাবলীল। তিনি যেন এক বহুগুণের নারী, যার প্রতিটি পদক্ষেপে ফুটে ওঠে সৃষ্টির দীপ্তি।
তাঁর কবিতায় রয়েছে মায়া ও আকর্ষণ, তাঁর কণ্ঠে রয়েছে আবেগের স্রোত, আর তাঁর ব্যক্তিত্বে রয়েছে এক অদম্য শক্তি। সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনন্য সত্তা, যাঁকে চিনলেই বোঝা যায়—এমন মানুষ খুব বেশি নেই।
আজকের সময় যেখানে অধিকাংশ শব্দ কেবলমাত্র আওয়াজে রূপ নেয়, সেখানে সোমা নিয়ে আসেন নির্মলতার সুধা। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—কবিতা কেবল ছন্দবদ্ধ শব্দ নয়; কবিতা হলো মানুষের জীবনের রস, বেদনা, ভালোবাসা এবং মুক্তির গান।
তাঁর লেখায় আমরা পাই একদিকে নিঃসঙ্গতার তীব্রতা, অন্যদিকে জীবনের আশ্বাস। তাঁর কণ্ঠে আমরা শুনি ভালোবাসার মধুরতা, আবার বিদ্রোহের ধ্বনি। তিনি আমাদের শিখিয়ে দেন—কবিতা শুধু পড়ার বিষয় নয়; কবিতা শোনারও শিল্প, অনুভব করারও সাধনা।
সোমাকে আমি চিনি, জানি—তিনি প্রতিভায় অনন্যা। তিনি যে সৃজনের আলো বুনে চলেছেন, তা নিঃসন্দেহে একদিন আরও বিস্তৃত আকাশে ছড়িয়ে পড়বে। তাঁর কণ্ঠ, তাঁর কবিতা, তাঁর অভিব্যক্তি—সব মিলিয়ে তিনি সত্যিই এক কাব্য-সুধার নন্দিনী।
তিনি আমাদের শেখান—কাব্যের পথ কখনও সহজ নয়। এখানে আছে অভিমান, নিঃসঙ্গতা, আবার আছে আশ্রয়ের খোঁজ। কিন্তু যাঁরা এই পথ বেছে নেন, তাঁরা নিজেদের আলোয় আলোকিত করে দেন অন্যকেও। নন্দিনী সোমা সেই আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছেন সাহিত্য–সংস্কৃতির পথ।
কবি নন্দিনী সোমার কবিতা ও আবৃত্তি কেবল তাঁর প্রতিভার পরিচয় নয়, এটি আমাদের সময়েরও দর্পণ। তাঁর শব্দ আমাদের শেখায় কীভাবে বেদনা থেকে সৌন্দর্য জন্ম নেয়, কীভাবে অভিমান থেকে আলো ফোটে, আর কীভাবে নিঃসঙ্গতা থেকে জন্ম নেয় গান।
তিনি আমাদের সাহিত্যকে করেছেন সমৃদ্ধ, সংস্কৃতিকে করেছেন প্রাণবন্ত। তাঁর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি, তাঁর কবিতার ঝংকার আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে। তিনি সত্যিই এক কাব্য-সুধার নন্দিনী, যিনি কবিতাকে বাঁচেন, কণ্ঠে সঞ্জীবন দেন, আর আমাদের শোনান জীবনের চিরন্তন সুর।