বাউল থেকে বাউল মোজাহের: আধ্যাত্মিক সুরে চট্টগ্রামের গৌরবময় এক সঙ্গীতযাত্রা”

By admin
9 Min Read

—মো. কামাল উদ্দিনঃ
অজস্র নদী, অসংখ্য জনপদ আর হাজার বছরের লোকঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাংলার আত্মা যখন শব্দ পায়, তখন তাকে আমরা বাউল বলি। বাউল—শুধু গায়ক নয়, শুধু আধ্যাত্মিক সাধকও নয়; তিনি এক অন্তহীন যাত্রার পথিক, যিনি মানুষের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজতে বের হন সুরের ভেলায় ভর করে। তিনি কখনও অচেনা পথিক, কখনও গ্রামের হাটে দাঁড়ানো স্বপ্নবাহক, আবার কখনও জনমানুষের হৃদয়ের গভীরে থাকা প্রিয়জনের আর্তি। বাউল হলেন সেই গায়ক, যার কণ্ঠে স্বর্গ আর মাটির মিশ্র সুর। যার সঙ্গীতে সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া, নাগরিক ব্যাকুলতা এবং অন্তরপুরুষের সন্ধান একই সুরে বাঁধা। এই বাউল ঐতিহ্য শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা বা মেঘালয়ের কোনো নির্দিষ্ট প্রান্তিক মানুষের সম্বল নয়; এটি সমগ্র বাংলা জাতিসত্তার আত্মিক উত্তরাধিকার। এই ঐতিহ্য ২০০৫ সালে ইউনেস্কোর মানবতার মৌখিক ও অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত হয়েছে—বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে, বাংলার মাটির গন্ধ, আকাশের রঙ, মানুষের অন্তর্গানকে ধ্বনি দেওয়া এক অমূল্য সম্পদই হলো বাউল। এই ইতিহাস, এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের বুকে জন্মেছে অসংখ্য বাউল, সুফি, কবিয়াল, সাধক; আর সেই ধারারই সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকাদের একজন—বাউল মোজাহের। যার কণ্ঠে আজও বেজে ওঠে বাংলা, চট্টগ্রাম, সুফিবাদ, প্রেম, মানবধর্ম আর আধ্যাত্মিকতার দিগন্ত। এই লেখাটি সেই সকল বাউলের ইতিহাস, পাশাপাশি এক বাউল শিল্পীর অন্তর্জাগতিক পথচলার সাক্ষ্য—যিনি আজকের চট্টগ্রামের গর্ব, বোয়ালখালীর কৃতিমান সন্তান মোজাহিদ। বাউল শব্দের ব্যুৎপত্তি থেকেই শুরু করা যাক। সংস্কৃত ‘ভাতুল’—যার অর্থ উন্মাদ, পাগল; কেউ বলে ‘ব্যাকুল’—অধীর-উদ্বিগ্ন। আবার কেউ কেউ বলেন, এর উৎস ফারসি ‘আউল’—যার অর্থ পথিক, আল্লাহমগ্ন দরবেশ। অন্য গবেষণার দাবি‘বা‘আল’, সুফিবাদের এক প্রাচীন শাখা। অর্থাৎ বাউল কোনো একটি পথ নয়; এটি বহু তীর, বহু স্রোত, বহু দর্শনের মিলন। বাংলা ভাষার প্রথম দিকের গ্রন্থ—চৈতন্য ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত—এ ‘বাউল’ শব্দটি দেখা যায়। কিন্তু এই শব্দ কবে ‘উন্মাদ’ অর্থ ছাড়িয়ে একটি ধর্মীয়-দার্শনিক সম্প্রদায়ের পরিচয় হয়ে উঠল, সেটি নিয়ে আজও বিতর্ক আছে। যা নিশ্চিত—বাউলের কোনো প্রতিষ্ঠাতা নেই। বাউল কোনো ধর্ম নয়—এটি এক অনুভূতির পথ।বাউল একদিকে সুফি, অন্যদিকে বৈষ্ণব; তিনি দেহতত্ত্ব অনুসরণ করেন, আবার দেহের বাইরেও সমগ্র মহাবিশ্বকে অনুভব করেন। জীবনের পরম সত্যকে খোঁজেন মানুষের মধ্যেই—দূর আকাশে নয়, দূরের কোনো ঈশ্বরেও নয়। তাই লালন শাহ গেয়েছেন— “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি…” এই তত্ত্ব, এই দর্শনই বাউলকে আলাদা করে।
বাংলাদেশে বাউল ঐতিহ্য সবচেয়ে গভীরভাবে বিকশিত হয়েছিল কুষ্টিয়া-ফরিদপুর অঞ্চলে। তবে চট্টগ্রামের ইতিহাসেও বাউলের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। চট্টগ্রাম হচ্ছে বার আউলিয়ার ভূমি—এক এমন অঞ্চল যেখানে সুফিবাদ, লোকসাধনা, মাইজভান্ডারী আধ্যাত্মিকতা এবং কবিয়ালি গানের জোয়ার একই সঙ্গে বইত। এই চট্টগ্রামের বোয়ালখালী—আপনার আমার জন্মভূমি বহু যুগ ধরে ছিল আধ্যাত্মিক শিল্পীদের উর্বর ক্ষেত্র। এখানেই জন্ম নিয়েছিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি কবিয়াল রমেশ শীল, যার গান, কবিতা, কবিয়াল লড়াই, মানবধর্মী দর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। রমেশ শীলের মধ্যে মাইজভান্ডারী আধ্যাত্মিকতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল খাঁটি বাউলীয় ভাবধারা। এই অঞ্চলের মাটিতে তাই নতুন বাউলের জন্ম হওয়া কোনো বিস্ময় নয়। কারণ চট্টগ্রাম হলো সেই পবিত্র ভূখণ্ড— যেখানে গান শুধু গান নয়, গান আধ্যাত্মিকতার সিঁড়ি। গান মানবতার ভাষা। গান মানুষের মুক্তির পথ। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় জন্ম নিয়েছেন আজকের আমাদের গর্ব—বাউল মোজাহিদ। যখন সারা বাংলাদেশে বাউল শিল্পীকে ঘিরে নানা ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, কেউ বাউল নাম ব্যবহার করে অনৈতিকতা করেছে, কেউ বাউলের গানকে বিকৃত করেছে, অন্য কেউ আবার স্বার্থে বাউল পরিচয় নিয়েছে,ঠিক সেই সময়েই আমি বসলাম লিখতে চট্টগ্রামের বাউল সম্রাট মোজাহের-কে নিয়ে। কারণ মোজাহিদ ভন্ড নয়। তিনি আলো। তিনি শুদ্ধতা। তিনি সাধনার সুর। চট্টগ্রামের আঙিনায় আজও যদি কেউ পূর্ণরূপে বাউল দর্শনের শুদ্ধতা বহন করে থাকে—তবে তিনি মোজাহের। তার পোশাকে, তার আচার-আচরণে, তার গানের বাচনভঙ্গিতে, তার চলনে-বলনে—সবকিছুতেই বাউল দর্শনের গভীর রস রয়েছে। তিনি শুধু গান করেন না; তিনি গান হয়ে ওঠেন। মানুষ তার কাছে শুধু শ্রোতা নয়; তারা সঙ্গীতের সাধনার সঙ্গী। এবং সবচেয়ে বড় কথা— তার জন্ম চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে।
এই এলাকায় বাউল সাধনার ঐতিহ্য বহু পুরনো—রমেশ শীল থেকে শুরু করে অসংখ্য লোকশিল্পী, সুফি, সাধক—যারা চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। মোজাহিদ সেই ধারারই উত্তরসূরি। মোজাহিদের কণ্ঠে এমন এক বিশেষ শক্তি আছে, যা শ্রোতাকে খুব সহজে আকৃষ্ট করে ফেলে। তার কণ্ঠ মাদক নয়— তার কণ্ঠ মুক্তি। তিনি যখন আধ্যাত্মিক গান করেন— মনে হয় যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে পথ দেখাচ্ছে।  যখন বাউল গান করেন,মনে হয় লালন কিংবা রমেশ শীল পুনর্জন্ম নিয়েছেন। যখন ভাটিয়ালি করেন। মনে হয় নদী ভেসে যাচ্ছে তার গলার সুরে। যখন ভান্ডারী গান করেন। মনে হয় মাইজভান্ডার দরবারের আলো ঝলমল করছে। যখন আধুনিক পল্লীগীতি করেন—  মনে হয় এক মায়াবী জগৎ সামনে খুলে যাচ্ছে।  সবচেয়ে বড় কথা—তার মুখস্থ গান কয়েক হাজার। এটি শুধু প্রশংসা নয়, অভাবনীয় বাস্তবতা। আজকের সময়ে যেখানে শিল্পীরা মোবাইল স্ক্রিন থেকে লিরিক পড়ে গান করেন, সেখানে মোজাহিদ গান মুখস্থ করেন মন দিয়ে, আত্মা দিয়ে। গান তার মগজে নয়; গান তার রক্তে।
মোজাহের সঙ্গীতভুবন বর্ণনা করতে গেলে বিস্ময় জাগে। তিনি একই সঙ্গে— সুফি ভাটিয়ালি পল্লীগীতি, ভান্ডারী বাওয়ালি কাওয়ালী, লোক গীতি, আধ্যাত্মিক গান সব গাইতে পারেন। এবং সবই একেবারে শুদ্ধ উচ্চারণে, সঠিক সুরে। তার গান শুরু করলে শ্রোতা আর যেতে পারে না। এক গান শুনতে শুনতে আরও গান, আরেক গান… সমস্ত পরিবেশ যেন এক সম্মোহনের জাদুতে ঢেকে যায়। এ সময়ে অনেক শিল্পী আছেন যারা জনপ্রিয়তার জন্য বিতর্ক সৃষ্টি করেন, অশালীন কথা বলেন,
ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করেন, অথবা বাউল ধারাকে বিকৃত করেন। কিন্তু মোজাহের তিনি এদের কেউ নন। তিনি শুদ্ধ বাউল। তার মধ্যে কোনো ভণ্ডামি নেই। তিনি কখনো ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করেন না। সব ধর্মের মানুষের কাছে তার সমান গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— তিনি নিজের গান নিজে লেখেন, নিজে সুর করেন, নিজেই গেয়ে তোলেন। এটি তাকে করে তুলেছে ওস্তাদের পর্যায়ের শিল্পী। চট্টগ্রামের প্রতিটি সংস্কৃতি সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পর্ক উষ্ণ, গভীর এবং পারস্পরিক সম্মানের।
বিশেষ করে চাটগাঁইয়া নওজোন—চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠনমোজাহের এখানে একজন নিয়মিত শিল্পী। তার গান শুধু মঞ্চে নয়, মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে সাংবাদিক, লেখক, টেলিভিশন উপস্থাপক, সাংস্কৃতিক কর্মীদের—সবাইয়ের। আমার সৌভাগ্য— তিনি আমার বোয়ালখালীর মানুষ। সেই মাটিরই সন্তান। সেই নদীরই ধারে বেড়ে ওঠা। সেই ইতিহাসেরই ধারক। মোজাহের শুধু চট্টগ্রামের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের পরিচিত নাম এখন। তার গান ইউটিউবে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিভিন্ন টেলিভিশন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে গেছে।বিদেশেও প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে,তার অসংখ্য শ্রোতা। যেখানেই তিনি গান করেছেন, সেখানে শ্রোতারা তাকে বাউল মোজাহের নয়, সুরের দরবেশ হিসেবেই স্বাগত জানিয়েছেন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাউল সঙ্গীত নিয়ে অনেক বিতর্ক দেখা গেছে। কেউ বাউলের পোষাক পরে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে, কেউ ধর্মীয় উস্কানিমূলক লিরিক ব্যবহার করে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে, কেউ গানকে করেছে বাণিজ্যিক অশ্লীলতায় ভরা। এই সময়ে দাঁড়িয়ে— মোজাহিদ যেন সেই অন্ধকারে আলো জ্বালানো মানুষ। তিনি যে বাউল—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি যে শুদ্ধ এ নিয়েও কোনো প্রশ্ন নেই। কারণ তার জীবনই প্রমাণ মানবতা, গান, আধ্যাত্মিকতা এবং সৎ শিল্প সাধনাই তার নীতি। যে মানুষ হাজার হাজার গান মুখস্থ রাখে সে শুধু শিল্পী নয়; সে মানবস্মৃতি ও সুরের এক জীবন্ত ভাণ্ডার। যে মানুষ নিজের গান নিজেই লেখে সে শুধু গায়ক নয়; সে কবি। সে দার্শনিক। যে মানুষ সমস্ত ধর্মের মানুষকে সমভাবে সম্মান করে সে শুধু বাউল নয়; সে মানবধর্মী সাধক। যে মানুষ কারও সাথে বিরোধ করেন না, সে শুধু জনপ্রিয় নয়; সে মহানুভব মোজাহের মধ্যে এই সবই আছে। এ কারণে আজ তিনি চট্টগ্রামের গর্ব, বোয়ালখালীর আলো, বাংলার বাউল ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। আজ যখন বাউলের শুদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ, যখন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, যখন মানুষ জানতে চায় আসল বাউল কে? তখন আমি লিখতে বসলাম বাউল মোজাহিদ-কে নিয়ে। কারণ তিনি সেই মানুষ— যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বুঝবে বাউল মানে কী, সুফিবাদ মানে কী, মানবধর্ম মানে কী, সাধনা মানে কী, এবং শিল্পীর প্রকৃত দায়িত্ব কী। তিনি গান করেন, গান দিয়ে বাঁচেন, মানুষকে ভালোবাসেন, মানুষকে এক করেন। এটাই তো বাউল। এটাই তো শিল্পী। এটাই তো সাধনা। চট্টগ্রামের মাটিতে এমন শিল্পী জন্মায় এটাই আমাদের গর্ব। এটাই আমাদের সৌভাগ্য। এটাই আমাদের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি।বাউল মোজাহের শুধু একজন শিল্পী নন,তিনি এক আলোকবর্তিকা, যিনি বাউল ঐতিহ্যের হাজার বছরের সুরকে আজও সমান আবেগে, সমান শুদ্ধতায় বহন করে চলেছেন। তার কণ্ঠে যে জাদু তা প্রজন্মকে টানবে, মানুষকে জাগাবে, বাংলা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখবে। আমরা গর্ব করি তিনি আমাদের চট্টগ্রামের মানুষ। আমাদের বোয়ালখালীর সন্তান। আমাদের দেশের বাউল ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।

Share This Article
Leave a Comment