আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের কিছু কথা।

By admin
14 Min Read

মো. কামাল উদ্দিন।

জাদুঘরের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছে, জাদুঘর হল অলাভজনক, জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত এবং স্থায়ী সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান যা শিক্ষালাভ, জ্ঞানচর্চা ও আনন্দলাভের উদ্দেশ্যে মানব ঐতিহ্যের স্পর্শযােগ্য ও স্পর্শ-অযােগ্য জিনিসপত্র সংগ্রহ করে, সংরক্ষণ করে, প্রদর্শন করে এবং সেগুলি নিয়ে গবেষণা করে। বাংলা আকাদেমির অভিমত: পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধান অনুসারে, যে-ঘরে নানা অত্যাশ্চর্য জিনিস বা প্রাচীন জিনিস সংরক্ষিত থাকে তাই হল জাদুঘর। সাধারণ সংজ্ঞা: সাধারণভাবে বলা যায় জাদুঘর হল বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপাদানের সংগ্রহশালা, যেখানে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক, শিল্প-বিষয়ক প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সংরক্ষণ করে তা জনসাধারণের উদ্দেশ্যে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। এক কথায়, বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ করে সেগুলি যেসব প্রতিষ্ঠান বা ভবনে সংরক্ষণ করে রাখা হয় সেসব প্রতিষ্ঠান বা ভবনকে জাদুঘর বলে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাদুঘরগুলির সাধারণ উদ্দেশ্য বা কার্যাবলির মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। জাদুঘরের এরকমই কয়েকটি সাধারণ উদ্দেশ্য হল, প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ: জাদুঘরের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন যুগের নানা নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। জাদুঘরে প্রাচীন মুদ্রা, লিপি, নানা শিল্পকর্ম (ভাস্কর্য, স্থাপত্য, চিত্রকলা), দুষ্প্রাপ্য পুরাবস্তুসমূহ এবং নানা মডেল ও চার্ট সংরক্ষিত রাখা হয়। ঢাকার শাহবাগে ব্যতিক্রম স্থাপত্য নকশার কারণে বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরের ভবনটি যে কারোর দৃষ্টি কেড়ে নেয়।  ২০ হাজার বর্গমিটারের চারতলা ভবনটির ৪৫টি গ্যালারিতে রয়েছে প্রায় ৮৩ হাজারের বেশি নিদর্শন। কেবল বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ জাদুঘর। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস আজ। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘পাওয়ার অব মিউজিয়াম’। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়াম সের আহ্বানে ১৯৭৭ সালে প্রথম বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। সেই থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছরই দিবসটিতে জাদুঘরের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়— যাতে ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং নাগরিকরা তার আপন ঐতিহ্য সম্পর্কে ভাবতে শেখেন। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস (আইসিওএম)। এর সদস্য হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ১৮০টি দেশের ২৮ হাজার জাদুঘর যুক্ত রয়েছে। পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যতো ইতিহাস জমা হচ্ছে তারই প্রতিচ্ছবি হলো জাদুঘর। এ উপমহাদেশে জাদুঘরের ধারণাটি এসেছে ব্রিটিশদের মাধ্যমে। ভারতীয় এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যরা এ অঞ্চলের জাতিতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূ-তাত্ত্বিক এবং প্রাণী বিষয়ক নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যাপারে উদ্যোগী হন। লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস, যিনি এশিয়াটিক সোসাইটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন— তিনি কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে জমির ব্যবস্থা করেন। ১৮০৮ সালে সেখানে জাদুঘরের জন্য ভবন নির্মাণ শেষ হয়। এ প্রক্রিয়ায় ১৮১৪ সালে উপমহাদেশের প্রথম জাদুঘর ‘এশিয়াটিক সোসাইটি মিউজিয়াম’-এর জন্ম ও প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯১০ সালের এপ্রিলে দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় শরৎকুমার রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর’ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর। এটি নির্মাণ শেষ হয় ১৯১৩ সালে। বাংলাদেশে শতাধিক জাদুঘর রয়েছে। তার আগে বিশ্বের কিছু যাদুঘরের ইতিহাস দেখে আসি। জাদুঘর এবং সমাজে তাদের ভূমিকা পালনের জন্য প্রতি বছর ১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালন করা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত যাদুঘরগুলি অন্বেষণ করার চেয়ে উদযাপনের আর কোনও ভাল উপায় নেই৷ চলুন বিশ্বজুড়ে কিছু বিখ্যাত যাদুঘরের ভার্চুয়াল সফর করি এবং তাদের অনন্য এবং আকর্ষণীয় প্রদর্শনীগুলি ঘুরে দেখি। শিল্প থেকে ইতিহাস এবং বিজ্ঞান পর্যন্ত, এই আইকনিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে প্রত্যেকের জন্য কিছু না কিছু আছে। এই জনপ্রিয় জাদুঘরগুলি দেখুন, যা তাদের প্রদর্শনী এবং স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। ফ্রান্সের প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামের উল্লেখ না করে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত জাদুঘরের কোনো তালিকা সম্পূর্ণ হবে না। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনা লিসার আইকনিক পেইন্টিংয়ের বাড়ি, দ্য ল্যুভর হল বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প জাদুঘর এবং শিল্প উত্সাহীদের জন্য একটি অবশ্যই দেখার গন্তব্য৷ প্রাচীন সভ্যতা থেকে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত ৩৮,০০০টিরও বেশি শিল্পকর্মের সাথে, ল্যুভর হল মানুষের সৃজনশীলতা এবং কল্পনার ভান্ডার। ওয়াশিংটন, ডিসির স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন হল বিশ্বের বৃহত্তম জাদুঘর, শিক্ষা এবং গবেষণা কমপ্লেক্স, যেখানে ১৯টি জাদুঘর এবং গ্যালারী, ন্যাশনাল জুলজিক্যাল পার্ক এবং নয়টি গবেষণা সুবিধা রয়েছে। ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি থেকে ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়াম পর্যন্ত, ১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত, যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম বিশ্বের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ জাদুঘরগুলির মধ্যে একটি। যাদুঘরের সংগ্রহটি মানব ইতিহাস এবং সংস্কৃতির দুই মিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত, প্রাচীন শিল্পকর্ম থেকে সমসাময়িক শিল্প পর্যন্ত প্রদর্শনী সহ। রোসেটা স্টোন, পার্থেনন ভাস্কর্য এবং মিশরীয় মমি যাদুঘরের সবচেয়ে আইকনিক এবং জনপ্রিয় প্রদর্শনী। স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন  মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট, যা দ্য মেট নামেও পরিচিত, এটি বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ব্যাপক শিল্প জাদুঘরগুলির মধ্যে একটি। নিউ ইয়র্ক সিটিতে অবস্থিত, দ্য মেটের সংগ্রহটি৫,০০০ বছরেরও বেশি বিশ্ব সংস্কৃতি এবং শিল্পকে বিস্তৃত করে, যেখানে প্রাচীন মিশরীয় শিল্পকর্ম থেকে সমসাময়িক চিত্রকর্ম এবং ভাস্কর্যের প্রদর্শনী রয়েছে। মেটের ছাদের বাগান এবং কস্টিউম ইনস্টিটিউট হল এর কিছু জনপ্রিয় আকর্ষণ। ভ্যাটিকান সিটির ভ্যাটিকান মিউজিয়াম হল জাদুঘর এবং গ্যালারির একটি সংগ্রহ যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান এবং উল্লেখযোগ্য শিল্প ও নিদর্শন রয়েছে। জাদুঘরের সংগ্রহে মাইকেলেঞ্জেলো, রাফেল এবং অন্যান্য বিখ্যাত শিল্পীদের কাজ, সেইসাথে প্রাচীন রোমান এবং মিশরীয় শিল্পকর্ম রয়েছে। সিস্টিন চ্যাপেল, মাইকেলেঞ্জেলোর আঁকা তার চমৎকার ছাদ সহ, ভ্যাটিকান যাদুঘরের সবচেয়ে পরিদর্শন করা এবং আইকনিক আকর্ষণগুলির মধ্যে একটি। বিভিন্ন ধরনের প্রদর্শনী এবং  গ্রীসের এথেন্সের অ্যাক্রোপলিস যাদুঘরটি প্রাচীন দুর্গ এবং এর চারপাশের স্মৃতিস্তম্ভ, পার্থেনন, এথেনা নাইকির মন্দির এবং এরেকথিয়ন সহ নিবেদিত। জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে ভাস্কর্য, মৃৎশিল্প এবং অন্যান্য নিদর্শন যা অ্যাক্রোপলিস এবং আশেপাশের এলাকা থেকে খনন করা হয়েছিল। যাদুঘরের কাঁচের মেঝে দর্শকদের বিল্ডিংয়ের নীচে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ দেখতে দেয়, একটি অনন্য এবং নিমগ্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করে।  অভিজ্ঞতার অফার করে যা  তাইওয়ানের তাইপেই ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়াম হল চীনের শিল্প ও নিদর্শনগুলির বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘরগুলির মধ্যে একটি। যাদুঘরের সংগ্রহ ওভার নিয়ে গঠিত প্রাচীন চীনা চিত্রকর্ম, মৃৎশিল্প, ক্যালিগ্রাফি এবং জেড খোদাই সহ ৭০০,০০০ বস্তু। জাদুঘরের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রদর্শনী হল জাদেইট বাঁধাকপি, জেডের একটি ছোট টুকরো যা বাঁধাকপির মাথার মতো খোদাই করা হয়েছে এবং এটি কিং রাজবংশের জেড খোদাইয়ের অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হয়।  সব বয়সের এবং আগ্রহের দর্শকদের জন্য পূরণ করে।   রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের হারমিটেজ মিউজিয়াম বিশ্বের বৃহত্তম এবং বিখ্যাত শিল্প জাদুঘরগুলির মধ্যে একটি। যাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে ত্রিশ লাখেরও বেশি আইটেম, যার মধ্যে রয়েছে প্রাচীন শিল্পকর্ম থেকে শুরু করে আধুনিক শিল্প, বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে প্রদর্শনী সহ। শীতকালীন প্রাসাদ, রাশিয়ান রাজাদের প্রাক্তন বাসস্থান, এটিও যাদুঘরের একটি অংশ এবং এটি রাশিয়ান রাজপরিবারের ঐশ্বর্যময় জীবনধারার একটি আভাস দেয়। জাতীয় জাদুঘর মেক্সিকো সিটিতে নৃবিজ্ঞানের একটি বিশ্ব-বিখ্যাত জাদুঘর যা মেক্সিকো এবং মেসোআমেরিকার প্রাচীন সভ্যতার জন্য নিবেদিত। জাদুঘরের সংগ্রহে অ্যাজটেক, মায়া এবং অন্যান্য প্রাচীন সংস্কৃতির শিল্পকর্ম রয়েছে, যেখানে প্রাক-কলম্বিয়ান শিল্প থেকে সমসাময়িক মেক্সিকান লোকশিল্প পর্যন্ত প্রদর্শনী রয়েছে। যাদুঘরের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রদর্শনী হল অ্যাজটেক ক্যালেন্ডার স্টোন, একটি বিশাল পাথরের চাকতি যা অ্যাজটেকরা ক্যালেন্ডার এবং আনুষ্ঠানিক বস্তু হিসেবে ব্যবহার করত। ইতালির ফ্লোরেন্সের উফিজি গ্যালারি হল বিশ্বের প্রাচীনতম এবং বিখ্যাত শিল্প জাদুঘরগুলির মধ্যে একটি, যেখানে মিকেলেঞ্জেলো, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এবং অন্যান্য ইতালীয় রেনেসাঁর মাস্টারদের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁ পর্যন্ত ইতালীয় শিল্পের বিবর্তন প্রদর্শনের জন্য কালানুক্রমিক ক্রমে সাজানো প্রদর্শনী সহ যাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে পেইন্টিং, ভাস্কর্য এবং অন্যান্য শিল্পকলা। জাদুঘরের ছাদের টেরেস ফ্লোরেন্স এবং আশেপাশের গ্রামাঞ্চলের অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখায়।  আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস হল একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান যা জাদুঘর এবং সমাজে তাদের ভূমিকা পালন করে। এটি প্রতি বছর ১৮ মে পালিত হয়। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস থিম হল “জাদুঘরের ভবিষ্যত: পুনরুদ্ধার এবং পুনর্গঠন।” মোনালিসার চিত্রকর্মটি ফ্রান্সের প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামে রাখা আছে। ভোপালের ১৫টি পর্যটন স্থান. ভারতে দেখার জায়গা. চূড়ান্ত আরাম এবং সুবিধার জন্য শীর্ষ ৪ তাডোবা রিসর্ট. আপনার সেরা বন্ধুর সাথে ভারতে আপনাকে অবশ্যই ৫৯টির বেশি জায়গা দেখতে হবে.পাপানাসাম, তিরুনেল ভেলিতে দেখার জায়গা বিশ্বের আইকনিক ভবনের তালিকা,আবার বলছি জাদুঘর আসলে কী? উত্তরে বলা যায়, জাদুঘর হলো জ্ঞানের আধার। জাদুঘর হলো সমাজের দর্পণ। জাদুঘর হলো একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতির সংগ্রহভান্ডার। এই সংগ্রহভান্ডারের এক একটি উপাদানের দিকে তাকালে জাতির শেকড় সন্ধান করা যায়। উপাদানের গায়ে ফুটে ওঠে ঐতিহ্যের আলো। যে আলো আলোকিত করে, উদ্বুদ্ধ করে, উদ্বেলিত করে উত্তর প্রজন্মের মানুষদের। তারা জানতে পারে পূর্বপুরুষের কৃষ্টি ও কীর্তিময় সময়কে। এই কীর্তিময় সময়ে থাকে বহমান নদী, প্রকৃতি-নিসর্গ, ফুল-পাখি, মানুষ, তার আচার-আচরণ, অভিব্যক্তি, তার জীবনের ভাষণ বা জীবনগাথা, তার ব্যবহার্য নানা উপাদান, তার সুর ও স্বর। এই স্বরগুলো ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক থেকে তুলে এনে যেখানে উপস্থাপন করা হয়, সেটিই একটি সমৃদ্ধ জাতির বা একটি স্বাধীন দেশের সংগ্রহশালা। এই সংগ্রহশালা বা সংগ্রহভান্ডার কেবল দেশের মানুষকেই অনুপ্রাণিত করে না, অনুপ্রাণিত করে বিভিন্ন জাতি বা নানা দেশের নানা শ্রেণি ও প্রকৃতির মানুষকে। এখান থেকে তারা প্রত্যক্ষ শিক্ষা লাভ করে, তাই এই একুশ শতকে জাদুঘরকে বলা হয় জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় বা গণবিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরও বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা উপাদান ধারণ করে আছে। বায়ান্নর রক্ত-সিঁড়ি পেরিয়ে বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঁকের নাম একাত্তর। এই একাত্তরেই বাঙালি জাতি তার এক নদী রক্ত ঢেলে দিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার সূর্যকে এনেছে। স্বাধীনতার বয়স প্রায় অর্ধশত বছরের কাছাকাছি হলেও, বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রায় আড়াই হাজার বছরের। এই ঐতিহ্যের অনুসন্ধান মিলেছে উয়ারী-বটেশ্বরে আবিষ্কৃত বেশ কিছু নিদর্শনে; যা শোভা পাচ্ছে সেখানেই জনাব হাবিবুল্লাহ পাঠানের গড়ে তোলা ছোট্ট জাদুঘরে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরেও রয়েছে এই বাংলা অঞ্চলের হাজার বছরের ঐতিহ্যিক নিদর্শন। এসব নিদর্শন নানা ধরনের। জনজীবন, বাংলাদেশের নৌকা, মৃৎশিল্প, পোড়ামাটির নিদর্শন, মূর্তি, কয়েন, অলংকার, হাতির দাঁতের শিল্পকর্ম, প্রাকৃতিক সম্পদ, খাদ্যদ্রব্য, পশুপাখি, জীবজন্তু, গাছপালা, অস্ত্রশস্ত্র, ধাতব শিল্পকর্ম, পুতুল, বাদ্যযন্ত্র, পোশাক, নকশিকাঁথা, কাঠের শিল্পকর্ম, পাণ্ডুলিপি, বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের আঁকা নান্দনিক চিত্রকর্ম, নবাব সিরাজউদ্দৌলার ব্যবহৃত নিদর্শন, অর্থাৎ ১৭৫৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর ইতিহাসের ধারাবাহিক সঠিক ইতিহাসের গৌরবময় ঐতিহাসিক নিদর্শন। আছে বিশ্বসভ্যতার অনেক নিদর্শন এবং সাম্প্রতিক কালে করা কয়েকটি দেশের নিদর্শন নিয়ে কর্নার। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহে নানা প্রকৃতির নিদর্শনের সংখ্যা প্রায় ৮৬ হাজার। আর এর আওতাধীন আহসান মঞ্জিল, সিলেট ওসমানী জাদুঘর, চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি,৩২ বঙ্গবন্ধু জাদুঘর,  জাদুঘর, ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালার নিদর্শন নিয়ে মোট নিদর্শনের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। দুঃখজনক হলেও সত্য, জায়গার অভাবে এই বিশাল সংগৃহীত নিদর্শন থেকে সামান্য অংশই দর্শকদের জন্য প্রদর্শন করা যাচ্ছে। তবে আশার কথা, জাদুঘর দেখতে এখন প্রচুর দর্শকের সমাগম হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর একটি বহুমাত্রিক জাদুঘর। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ এ জাদুঘরটির প্রাচীন নাম ‘ঢাকা জাদুঘর’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য যে বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, সেই একই বছরে অর্থাৎ ১৯১৩ সালে বাংলা অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাঙালির গর্বের ও গৌরবের এ প্রতিষ্ঠানটি। হাঁটি হাঁটি পা-পা করে এ বছর এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি ১০২ বছরে পদার্পণ করল। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন এই স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানটি এখন দাঁড়িয়ে আছে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থল শাহবাগে। ১৯৮৩ সালে ঢাকার নিমতলীর ছোট্ট পরিসর থেকে শাহবাগের এই বিস্তৃত পরিসরে আনা হয় জাদুঘরটিকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছায় ও পরিকল্পনায় শাহবাগের এই পরিসরে প্রতিষ্ঠিত হয়। রূপান্তরিত হয় ‘ঢাকা জাদুঘর’ থেকে ‘বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর’। বর্তমানে জাদুঘরে রয়েছে ছয়টি কিউরেটরিয়াল বিভাগ। এগুলো হলো ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগ, জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগ, প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগ, সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা বিভাগ, সংরক্ষণ রসায়নাগার বিভাগ এবং গণশিক্ষা বিভাগ। এসব বিভাগের মাধ্যমে নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষণা করা হয়। পাশাপাশি নানামাত্রিক অনুষ্ঠান, বিশেষ প্রদর্শনী, স্কুল প্রোগ্রাম, সেমিনার, স্মরণীয়-বরণীয়, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ অসংখ্য কার্যক্রম। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং বর্তমান সরকারের ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর অনেক এগিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে প্রায় এক লাখ নিদর্শনের ছবিসহ ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। জাদুঘরের রয়েছে নিজস্ব ওয়েবসাইট। এই ওয়েবসাইটে পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো ব্যক্তি পাবেন জাদুঘরের সর্বশেষ তথ্য। প্রতিনিয়ত জাদুঘরে বাড়ছে দর্শকের সংখ্যা। কারণ দর্শক তাঁদের শিকড়ের সন্ধান করতে জাদুঘরে আসেন। জাদুঘরও দর্শকদের জন্য, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের জন্য আহ্বান জানায়, ‘জাদুঘরে আসুন, নিজের ঐতিহ্যকে জানুন’। জাদুঘরে আপনার সন্তানকে নিয়ে আসুন। নিজের ঐতিহ্যকে জানতে তাদের সাহায্য করুন। কারণ তারাই তো জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার, তারাই তো বাঙালির সমৃদ্ধ সাথে যাবে। জাদুঘর সত্যিকার অর্থেই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের তৃণভূমি।আমাদের চট্টগ্রামের চার হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য একটি আধুনিক মানের জাদুঘরের দাবী চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র বিগত ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্মারক লিপি প্রদান করেছিলেন, বিষয়টি তখনকার মেয়র আ জম নাছির উদ্দীন অবগত ছিলেন, উনাকেও জাদুঘর স্হাপনের জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। আজ সময়ের দাবীতে চট্টগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য একটি জাদুঘরে প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিটি মানুষের জীবন একবার হলেও জাদুঘর পরিদর্শন করার দরকার রয়েছে, সাথে সাথে ইতিহাস ঐতিহ্য জানার ও বুঝার জন্য ছেলে মেয়েদেরকে জাদুঘরে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করি। লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।

Share This Article
Leave a Comment