সংবাদ, বিবেক ও সংশোধনের আলো—সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর মানবিক প্রশাসনিক দর্শন”

By admin
6 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিন
আজকের বাস্তবতায় পুলিশ নিয়ে লিখতে গেলে অনেক সময় সত্য কথাই অনেকের গায়ে লাগে, কারও কারও মনও খারাপ হয়ে যায়। সমালোচনার আড়ালে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়, আর সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সত্য উচ্চারণ করা হয়ে ওঠে কঠিন। কিন্তু ঠিক এই সময়েই কিছু ব্যতিক্রমী প্রশাসনিক কণ্ঠস্বর আশার আলো জ্বালায়। যেখানে ভুলকে আঘাত হিসেবে নয়, বরং সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়—সেখানেই সত্যিকার অর্থে প্রসংশার যোগ্য মানসিকতার প্রকাশ ঘটে। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর এমন দৃষ্টিভঙ্গি সেই বিরল উদাহরণ, যেখানে সমালোচনাকে ভয় নয়, বরং উন্নতির শক্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।চট্টগ্রাম নগরীর প্রশাসনিক পরিসরে সম্প্রতি এক বক্তব্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী যে ভাবনা প্রকাশ করেছেন, তা শুধু একটি প্রশাসনিক অবস্থানের বক্তব্য নয়; বরং এটি এক গভীর মানবিক উপলব্ধির প্রকাশ, যেখানে আইন, দায়িত্ব এবং আত্মসমালোচনার এক অনন্য সমন্বয় খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, পুলিশের ভুল-ত্রুটি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো সংবাদকে তিনি নেতিবাচকভাবে দেখেন না। বরং প্রতিটি সংবাদকে তিনি গ্রহণ করেন একটি দর্পণ হিসেবে—যেখানে প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশের নিজেদের চেহারা স্পষ্টভাবে দেখা যায়, আর সেই আয়নাতেই লুকিয়ে থাকে সংশোধনের সুযোগ। তিনি বলেন, “অনেকে মনে করেন পুলিশের বিষয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশিত হলে সেটি নেতিবাচক। কিন্তু আমি তা সেভাবে দেখি না। প্রতিটি সংবাদের ভেতরেই আমাদের জন্য কোনো না কোনো বার্তা থাকে। সেখানে ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকে, শেখার সুযোগ থাকে। আমরা সেই নির্যাস গ্রহণ করে নিজেদের কাজকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করি।” এই কথাগুলো শুধু প্রশাসনিক ব্যাখ্যা নয়; এটি এক ধরনের দার্শনিক উপলব্ধি—যেখানে সমালোচনাকে শত্রুতা নয়, বরং উন্নতির সোপান হিসেবে দেখা হয়। একজন পুলিশ কমিশনার যখন সংবাদকে আঘাত নয়, বরং শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন সেটি একটি প্রতিষ্ঠানের মানসিক পরিপক্বতার পরিচায়ক হয়ে ওঠে। তিনি আরও বলেন, আধুনিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের অভিব্যক্তি প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফেসবুক বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে নাগরিকদের মন্তব্য বা অভিযোগ তিনি অবহেলা করেন না। বরং সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে যাচাই-বাছাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। তার ভাষায়, “ফেসবুকে কোনো অভিযোগ বা মন্তব্য দেখলে আমি সেটির স্ক্রিনশট নিয়ে কর্মকর্তাদের দিয়ে যাচাই করতে বলি। কারণ জনগণের সরাসরি প্রতিক্রিয়া পাওয়ার এটি একটি বড় মাধ্যম।” এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক নতুন প্রশাসনিক চিন্তা—যেখানে প্রযুক্তি ও জনমতকে দূরে ঠেলে না দিয়ে বরং তাকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। আজকের যুগে যেখানে নাগরিকরা মুহূর্তের মধ্যেই তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন, সেখানে একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কমিশনারের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ ও জনমুখী করে তোলে। সিএমপি কমিশনার সাংবাদিকদের ভূমিকাকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা মাঠপর্যায়ে এমন অনেক তথ্য সংগ্রহ করেন, যা প্রশাসনের নজরে আসে না। তাদের অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, যা প্রশাসনকে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। তিনি বলেন, “আপনারা সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেন, আবার প্রশাসনের সহায়ক শক্তি হিসেবেও ভূমিকা রাখেন। অনেক তথ্য আমাদের অজানা থেকে যায়, যা সাংবাদিকরাই অনুসন্ধানের মাধ্যমে বের করে আনেন। আমি যদি সেই তথ্যগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করি, তাহলে সেটি সমাজের জন্যই মঙ্গলজনক হয়।” এই বক্তব্যে সাংবাদিকতা ও প্রশাসনের মধ্যকার সম্পর্ককে তিনি প্রতিযোগিতা নয়, বরং সহযোগিতার সম্পর্ক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, সাংবাদিক ও পুলিশ—উভয়েই সমাজের কল্যাণে কাজ করেন, তাই পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সম্মানই হতে পারে একটি নিরাপদ ও মানবিক নগর গঠনের মূল ভিত্তি। তিনি গণমাধ্যমকে প্রশাসনের “অন্যতম চালিকাশক্তি” হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, পুলিশ ও সাংবাদিক যদি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, তবে নাগরিক সেবা আরও উন্নত, গতিশীল এবং মানবিক হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, “পুলিশ ও সাংবাদিকরা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করলে নগরবাসীকে আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব। আমরা যদি একে অপরকে সহযোগিতা করি, তাহলে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী হবে।” এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গভীর বার্তা নিহিত আছে—ক্ষমতা নয়, বরং সহযোগিতাই প্রশাসনের প্রকৃত শক্তি। আর সেই সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জনগণ, তাদের অভিজ্ঞতা, তাদের প্রশ্ন এবং তাদের প্রত্যাশা। আজ সোমবার আগামীর সময়ের চট্টগ্রাম অফিসের সংবাদকর্মীদের সঙ্গে এক শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি ছিল অনানুষ্ঠানিক হলেও তার বক্তব্য ছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে তিনি শুধু একজন পুলিশ কমিশনার হিসেবে নয়, বরং একজন চিন্তাশীল প্রশাসক হিসেবে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তিনি পুলিশ বাহিনীকে একটি গতিশীল, শিখনক্ষম এবং আত্মসমালোচনামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান। যেখানে ভুলকে ঢেকে রাখা নয়, বরং স্বীকার করে তা সংশোধনের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়াই হবে মূল নীতি। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন শুধু কঠোরতা নয়, বরং মানবিকতা, সহানুভূতি এবং জনগণের সঙ্গে সংযোগ। আর এই সংযোগ গড়ে ওঠে তখনই, যখন গণমাধ্যমের প্রশ্নকে ভয় নয়, বরং সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর এই দৃষ্টিভঙ্গি এক অর্থে প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। যেখানে পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়, বরং একটি শেখার প্রতিষ্ঠান—যা প্রতিনিয়ত নিজেকে সংশোধন করে, জনগণের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। তার বক্তব্যে একটি বিষয় বারবার প্রতিফলিত হয়েছে—সংবাদ, সমালোচনা ও জনগণের মতামত কোনো বাধা নয়; বরং এগুলোই উন্নয়নের প্রধান উপাদান। আর সেই উপাদানগুলোকে গ্রহণ করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি মানবিক ও আধুনিক প্রশাসনের ভিত্তি। এই দৃষ্টিভঙ্গি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা শুধু সিএমপি নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যই একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে—যেখানে পুলিশ ও সাংবাদিক একসঙ্গে এগিয়ে যাবে একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও মানবিক নগর গঠনের পথে।

Share This Article
Leave a Comment