
মো. কামাল উদ্দিনঃ আজ ১৮ জুলাই। বিশ্ব মানবতার এক অনন্য প্রতীক, স্বাধীনতা ও সাম্যের মহান দূত, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিন। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই মহামানবকে, যিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন নিপীড়িত মানুষের মুক্তি, মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য। নেলসন ম্যান্ডেলা শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার একজন রাষ্ট্রনায়ক নন; তিনি ছিলেন বিশ্বমানবতার বিবেক। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, ক্ষমা ও সম্প্রীতির রাজনীতির মাধ্যমে ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবনগাথা শুধু একটি দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নয়, এটি মানবমুক্তির এক মহাকাব্য। ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার এম্ভেজো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা। তাঁর পিতা গাডলা হেনরি এমফাকানিসিওয়া ছিলেন থেম্বু গোত্রের প্রধান এবং মা নোসেকেনি ফ্যানি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ ও স্নেহময়ী নারী। শৈশবে তিনি রোলিহ্লাহ্লা নামে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তাঁকে “নেলসন” নাম দেন, যা পরবর্তীতে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়। ম্যান্ডেলা এমন এক সমাজে বেড়ে উঠেছিলেন, যেখানে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হতো তার চামড়ার রঙ দিয়ে। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জন্য শিক্ষা, চাকরি, বাসস্থান, ভোটাধিকার এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা ছিল সীমাবদ্ধ। এই অন্যায় বৈষম্য তাঁর কোমল মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা শুধু অধিকার নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় অলিভার টেম্বোর। পরবর্তীতে তাঁরা একসঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আইন পরামর্শ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকে শুরু হয় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নতুন অধ্যায়। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি)-তে যোগ দিয়ে ম্যান্ডেলা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন আন্দোলনের প্রধান মুখ। তিনি দেখেছিলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বারবার দমন করা হচ্ছে। তাই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি সংগঠনের সশস্ত্র শাখা ‘উমখন্তো উই সিজওয়ে’ বা “স্পিয়ার অব দ্য নেশন”-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল না সহিংসতা; তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ১৯৬২ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর রাষ্ট্রদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। বিখ্যাত রিভোনিয়া ট্রায়ালে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা আজও বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে বিবেচিত। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন— “আমি এমন একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে সবাই সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে। এই আদর্শের জন্য আমি জীবন দিতে প্রস্তুত।” এই বক্তব্য ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। ম্যান্ডেলাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। শুরু হয় ২৭ বছরের দীর্ঘ কারাজীবন। রোবেন দ্বীপের ছোট্ট কারাকক্ষে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কাটিয়েছেন তিনি। কঠোর শ্রম, অমানবিক পরিবেশ এবং সীমাহীন মানসিক চাপের মধ্যেও তিনি ভেঙে পড়েননি। কারাগার তাঁর শরীরকে বন্দি করতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁর চিন্তা, আদর্শ ও স্বপ্নকে বন্দি করতে পারেনি। কারাগারে থেকেও তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, রাজনৈতিক দর্শন চর্চা করেছেন এবং আন্দোলনের কর্মীদের অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর আত্মজীবনী Long Walk to Freedom পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হয়। ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি যখন তিনি মুক্তি পান, তখন পৃথিবী তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল। দীর্ঘ ২৭ বছরের বন্দিজীবনের পর মানুষ ভেবেছিল তিনি হয়তো প্রতিশোধের আহ্বান জানাবেন। কিন্তু তিনি সবাইকে বিস্মিত করে ক্ষমা, সম্প্রীতি এবং জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এফ. ডব্লিউ. ডি ক্লার্কের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটান। তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় দক্ষিণ আফ্রিকা গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যায়। এই অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৩ সালে তাঁরা যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সব নাগরিক সমান ভোটাধিকার নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। সেই নির্বাচনে জনগণ বিপুল ভোটে নেলসন ম্যান্ডেলাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। ১০ মে ১৯৯৪ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় এসে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি করেননি। তিনি সাদা ও কালো মানুষের মধ্যে বিভাজন নয়, ঐক্যের সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও তিনি মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিশু অধিকার, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং এইডস সচেতনতা বৃদ্ধিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নিজের সন্তানকে এইডসে হারানোর বেদনাও তিনি মানবসেবার শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন। বিশ্বের ইতিহাসে খুব কম মানুষ আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই মানবতা, সাহস, ত্যাগ এবং ক্ষমার কথা মনে পড়ে। নেলসন ম্যান্ডেলা সেই বিরল মানুষদের একজন। তিনি শিখিয়েছেন, প্রকৃত নেতৃত্ব বন্দুকের নল থেকে জন্ম নেয় না; জন্ম নেয় নৈতিক সাহস, সত্য এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে। জাতিসংঘ তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮ জুলাইকে “নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস” হিসেবে ঘোষণা করেছে। কারণ ম্যান্ডেলা শুধু একটি জাতির নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির সম্পদ। আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা যখন তাঁকে স্মরণ করছি, তখন তাঁর আদর্শ থেকেও শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। বিভেদ নয়, ঐক্য; ঘৃণা নয়, ভালোবাসা; প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা—এই ছিল ম্যান্ডেলার দর্শন। বর্তমান বিশ্বের সংঘাত, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার সময়ে তাঁর জীবন ও আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নেলসন ম্যান্ডেলা আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সংগ্রাম, দর্শন এবং মানবিক মূল্যবোধ কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আজও জীবন্ত। যতদিন পৃথিবীতে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম থাকবে, যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকবে, ততদিন নেলসন ম্যান্ডেলা বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে, ইতিহাসের পাতায় এবং মানবতার অনন্ত আলোকবর্তিকা হয়ে। শ্রদ্ধাঞ্জলি মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে। শুভ জন্মদিন মানবতার মহীরুহ। আপনার জীবন আমাদের জন্য সাহস, সত্য এবং মুক্তির চিরন্তন প্রেরণা।