শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ও সরকার : একটি বিশ্লেষণ —
- পাঞ্জাবিটাও নিয়ে নিলেন…!
- ‘জাস্টিস’টা আগে গণমাধ্যমে দিন, প্লিজ !
প্রিয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। বলেন ভালো। সম্মোহনের ক্ষমতাও আছে। মন্দ নয়তো! আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন বিষয়ে বেশ ইতিবাচকভাবেই বললেন। সরকারি তরফ থেকে যতটুকুই বলা যায়, ততটুকুই বলার চেষ্টা করলেন। বারবার বলেছেন ‘জাস্টিস’ বা ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার প্রসঙ্গ। বিষয়টি বেশ ইতিবাচক। বললেন জুলাই চেতনার দোহাই দিয়েই। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে এও বললেন, ‘যে মানুষটি ন্যায়বিচার পর্য়ুদস্ত করেছেন, তাঁকেও তিনি বা তাঁর সরকার ন্যায় বিচার দিতে চান। ‘
জানালেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত রায়ের পর শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পরবর্তী বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার। কিভাবে তিনি( শেখ হাসিনা) আত্মসমর্পণ করবেন, সাজার বিষয়টি কি হবে, খালাস পাবেন কিনা, পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে তা অবশ্যই আদালতের বিবেচনাধীন। ‘ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রদেষ্টা হিসেবে ডা. জাহেদ যথার্থই বলেছেন।
কিন্তু, আমার কাছে বিষয়টি ‘আদার বেপারী জাহাজের খবর নেওয়া’র মতো ! এক সময় অবশ্য আদার ব্যাপারীরা জাহাজের খবর নিতেন না বা নিতে পারতেন না বা সে খবর নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। এখন দিন পাল্টেছে। জাহাজের খবরটা হাল জমানায় অনেকটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তেমনিভাবে, আমার মত গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের কাছে জাতীয় নেতা-নেত্রীদের খবর সামগ্রিক অর্থে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার কিংবা আমার সহযোদ্ধাদের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাজুক জীবনদশার আলোচনাটাও জরুরি প্রাধান্য। গণমাধ্যমকে দিয়েই আমি আমার প্রিয় বাংলাদেশকে দেখতে চাই। গণমাধ্যমকে জিম্মি দশা থেকে মুক্ত করতে না পারলে কিংবা গণমাধ্যমের ‘জাস্টিস’ নিশ্চিত করতে না পারলে বঙ্গবন্ধুর কন্যা কিংবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিংবা দেশের জন্মের সাথে জড়িত রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতি ‘সুবিচার’ হবে বলে আমি মনে করছি না। ২৪ পরবর্তী তান্ডবে রাজনৈতিক প্রশাসনিক অঙ্গনের মত গণমাধ্যম স্বাধীন বাংলাদেশে এযাবৎকালের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা পর্যন্ত দুই/ তিনটি করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক মামলার আসামি হয়েছেন। আমার মত অনেকের চাকরি গেছে। প্রতিষ্ঠানের কাছে সঞ্চিত পাওনাটুকুও এখনো জোটেনি। ইউনুস নানার ইন্টেরিম গিয়ে ‘জুলাই চেতনা’র রাজনৈতিক বলয়ের নির্বাচিত সরকার এসেছে। কিন্তু গণমাধ্যম এখনো বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেসক্লাব দখল রেখে, সাংবাদিক ইউনিয়ন কার্যালয় গুলো জিম্মি করে রেখে বস্তুত বিএনপি’র ছাতা ধরে মৌলবাদী অপশক্তি তাদের ভবিষ্যৎ অপতৎপরতার জন্য আখের গোছাচ্ছে। বিএনপি কি তা বুঝতে পারছে? বুঝতে পারছেন কি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি প্রধান তারেক রহমান কিংবা তাঁর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ? আগেও বলেছি, বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অনেক নেতাই এখন গণমাধ্যমে যাদের ‘নিজেদের লোক’ বলে ভাবছেন, তারা আসলে ‘গুপ্ত’। দিনশেষে, চূড়ান্ত বিচারে, বিশেষ সময়ে পাশে ফিরে দেখবেন তারা কেউ নেই ! বর্তমান সরকার কিংবা বিএনপি’র নীতি নির্ধারকরা এই নির্জলা সত্যটি যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন ততই তাদের রাজনৈতিক প্রশাসনিক মঙ্গল।
২৪ এর চেতনার দোহাই দিয়ে জাস্টিসের কথা বলছেন, প্রিয় তথ্য উপদেষ্টা। কেস স্টাডি হিসেবে, তথ্য উপদেষ্টা অন্তত আমাকে দিয়েই বুঝার চেষ্টা করতে পারেন। ২৪ এর পর তাঁর( তথ্য উপদেষ্টার) সখাদের তান্ডবে আমার চাকরিটা গেল। আমার মত অনেকেই একইভাবে চাকরি হারিয়েছেন । তাহাদের( তথ্য উপদেষ্টার আদর্শিক সংগীদের) প্রভাবে দুই বছর হতে চললেও আজও চুকেনি দেনা পাওনার হিসেব। উপর্যুপরি মামলা-ষড়যন্ত্রে ফাঁসানোর আপতৎপরতার মধ্যে ইউনুস নানার জমানায় বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র ডিঙ্গিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো রেকর্ড ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হলেও আমার চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের চেয়ারটাও গেল ! কারণ, তাঁরা কার্যালয়টা তালা মেরে দখল করে নিয়েছেন। ৬৫ বছর আগে আমাদের এই ইউনিয়নের সদস্যদের দ্বারা গঠিত প্রেসক্লাবটি ধারালো অস্ত্র ও লাঠি সোটা নিয়ে দখল করে তারা সেখানে আরেকটি ঘরানার দলীয় লেজুরের সংগঠনের কার্যালয় উদ্বোধন করেছেন। ইউনুস জামানায় দখল করে নেওয়া প্রেস ক্লাবে নতুন সংগঠনের কার্যালয় উদ্বোধন করে গেলেন অন্য কেউ নন, খোদ ‘গণতান্ত্রিক’ জুলাই চেতনার নতুন সরকারের তথ্য মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ! ইউনূস নানার আমলে চট্টগ্রামের শিল্প গ্রুপ ‘এস আলম গ্রুপে’র বিরুদ্ধে ন্যায় ও শুদ্ধতায় কথার খই ফুটালেন উপদেষ্টারা। অথচ পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘এস আলম শিল্প গ্রুপে ‘র অর্থায়নে স্থাপিত ‘বঙ্গবন্ধু হলে’র নাম বদল করেই ইউনুস নানার প্রেস সচিব শফিকুল উদ্বোধন করে গেলেন ‘জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হল ‘! অর্থাৎ এস আলমের অর্থায়নটা তারা বৈধতা দিয়ে গেলেন। বেরসিক জনেরা বলেন, ‘যেই লাউ সেই কধু “! এই রং বদলের খেলা রুখে পেশাদারদের দ্বিতীয় আবাস প্রেসক্লাব -সাংবাদিক ইউনিয়ন কার্যালয়কে মুক্ত করতে – গণমাধ্যমকে জিম্মিমুক্ত করতে বিএনপি নেতাদের দ্বারে দ্বারে গেলেন চট্টগ্রামের অসহায় নিরস্ত্র নিরীহ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারকে স্মারকলিপিও দিলাম আমরা। কেউ কেউ ছুটে গেলেন এসবের আড়ালে থাকা জামাত- এনসিপির নিয়ন্ত্রক নেতাদের কাছেও। শত আবেদন আকুলতা তাঁদের কর্ণগহবরে ঢুকলোই না ! তবে কি আমরা ধরে নেবো, সংসদে বাদ-বিবাদ, যুক্তি- পাল্টা যুক্তি, মত- ভিন্ন মত, ন্যায় -অন্যায় যত উচ্চ আওয়াজই হোক না কেন, মাঠের রাজনীতিতে আসলে ইনুস জামানার সেই ‘ভাই-ভাই’ খেলা চলছে!? প্রিয় তথ্য উপদেষ্টা, আপনাকেই বলি। ২৪ পরবর্তী কত জন সাংবাদিক চাকরিহারা হয়েছেন? কতজন বিনা অপরাধে মিথ্যে মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন, গ্রেফতার হয়েছেন, কারা অন্তরীণ রয়েছেন? কতজন আজ কার্যত: ফেরারি জীবন যাপন করছেন? কতজন চাকরি নিজের কর্মস্থল প্রতিষ্ঠান বিচ্যুত হয়ে হতদরিদ্র রূপে আজ অসহায়? পূর্ববর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গঠন করা ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট’ তহবিল রাজনৈতিক কারনে ‘নয় ছয়’ এখন কারা করছেন? দুস্থ অসহায় সাংবাদিকদের জন্য এই কল্যাণ ট্রাস্ট, প্রেস কাউন্সিল কিংবা সাংবাদিকদের সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত কোন ভূমিকা রাখতে পারছে কি? ২৪ পরবর্তী গণমাধ্যম দখল বেদখলের আড়ালে কোন রাজনৈতিক শক্তি ছিল? কেন ছিল? তারা আসলেই বাংলাদেশে কি করতে চায়?
এসবের খবর কি আপনি জানেন?
যদি জেনে থাকেন, তাহলে এই নজিরবিহীন সংকট নিরসনে কোন পদক্ষেপ নিলেন কি? আমি তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন প্রকৃত পেশাদার। প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে সাপ্তাহিক পত্রিকা থেকে আঞ্চলিক এবং জাতীয় দৈনিক, অনলাইন এবং দেশের শীর্ষ টেলিভিশন মাধ্যম : গণমাধ্যমের প্রায় সব ধারাতেই আমার চাকরি করার সৌভাগ্য হয়েছে। এই সময়কালের রাজনৈতিক উত্থান পতন, তথ্যমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী উপদেষ্টাদের বাগাড়ম্বর, দলবাজি কিংবা অসহায়ত্ব, অনেক কিছুই দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে। আত্মতুষ্টি নিয়েই বলি, অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পেশাগত সততা, নৈতিকতা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে অটল অবস্থান থেকেও কখনো বিচ্যুত হইনি। আমার চরম শত্রুরাও এটি অস্বীকার করতে পারবেন না। আওয়ামীলীগ আমলে অনেক মন্ত্রী এমপি হুইপ মেয়রের বিরুদ্ধেও আমার স্পষ্ট অবস্থান ছিল আমার লেখালেখি বক্তৃতা এবং কার্যক্রমে। সেই সময়ের মামলা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব বা তাঁর কন্যার গণমাধ্যম সহ বিভিন্ন খাতে ভিশনারি লিডারশিপ এর প্রতি আকর্ষণ নির্ভরতা কিংবা আস্থা থাকাটাই কি আমার মত সাংবাদিকদের অপরাধ? আপনারা না জাস্টিস চান? জাস্টিসের জন্যই না ২৪ হয়েছে? তাহলে গণমাধ্যমের লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে প্রকৃত পেশাদারদের বিরুদ্ধেই কেন আপনাদের অবস্থান? আজ আমি কিংবা আমার মত অগুনতি গণমাধ্যম কর্মীর এমন প্রতিকূলতায় নীড় হারা পাখির মত পেশাগত – সাংগঠনিক নেতিবাচকতার ছাপ যখন আমাদের আর্তসামাজিক-ব্যক্তি জীবনকেও পর্যুদস্ত করছে, মনের জমিন যখন চরম উৎকণ্ঠায়, তখন দেখি আমাদের তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ সাহেব তাঁর সরকারের মত করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু তনয়ার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে কথা বললেন। কথাগুলো সাফ সাফ জানালেন। উচ্চ কন্ঠে বললেন ‘জাস্টিস’ দেওয়ার কথা ! যে দেশে গণমাধ্যম ‘জাস্টিস’ পায় না, সে দেশে রাজনৈতিক-প্রশাসনিক প্রতারণার শিকার হয়ে মেগা মবের কবল থেকে শুভার্থী ভিনদেশের সহায়তায় নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে প্রাণে রক্ষা পাওয়া জীবনের প্রান্ত সীমায় দাঁড়ানো উদ্বিগ্ন উৎকণ্ঠিত প্রায় অশীতিপর নারী শেখ হাসিনা জাস্টিস পাবেন, এটা কিভাবে ভাবতে পারি?! অবশ্য, আমার কিংবা আমার মত মাঠের নির্যাস নেওয়া গণমাধ্যমের নির্বাচিত প্রতিনিধির এমন কোন প্রশ্ন কিংবা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা সাম্রাজ্যবাদের নব আগ্রাসনে জাগ্রত-উদ্বেলিত কারো মনে কোন যৌক্তিকতা রাখবে না, জানি। তবুও আশ্বস্ত হতাম, যদি আপনাদের ওই আদর্শিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণা অনুযায়ী রাজনীতিতে-প্রশাসনে-গণমাধ্যমে প্রতিশোধ পরায়ণতা না থাকতো। কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কথার বা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন আপনারা নিশ্চিত করতে পারতেন। যাতে মুখের কথা কেবল মুখেরই কথা’ই থেকে না যায়। তবে, প্রিয় তথ্য উপদেষ্টার সংবাদ সম্মেলনে চোখ পড়তেই দেখি অন্য ঘটনা, যা সঙ্গত কারণেই আমার খুব দৃষ্টি কাড়লোই ! রসাত্মক ভাষায় বলতেই পারি, একে একে সব আপনারা নিয়ে নিলেন, প্রিয় তথ্য উপদেষ্টা, শেষতক আমার পাঞ্জাবীটাও নিয়ে নিলেন !!! খারাপ না। বেশ ভালই মানিয়েছে। তবুও, আমাদের শত প্রতিকূলতায়ও শুভকামনা, একজন পেশাজীবীর জন্য। কবির ভাষায় বলতে চাই – ‘আমারি এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর… ” ( বাকিটা বলা অপ্রয়োজনীয়। কারণ, এমন একটি সমাজ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছি, অন্তর থেকে কারো শুভকামনা করলেও একটি শ্রেণি মনে করেন, আমরা যেন তাদের এই ক্ষমতাবানদের লেজুড় হতে চলেছি ! তারা উৎকণ্ঠায় থাকেন যেন আমাদের পেশাদারিত্ব ও সাংগঠনিক সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে তাদের পেটে না আবার লাথি পড়ছে ! মনের বা চেতনার মেরুদন্ড ঠিক না থাকলে যা হয় আর কি ! অবশ্য গণমাধ্যমের দখলদারদের ভাষা রুচি চিন্তার গতি এমনই তো হবে ! সেসব নিয়ে আর বিচলিত হই না। কেবল হাসি পায়।) প্রিয় বাংলাদেশ, জাস্টিস বা আইনের শাসনের প্রতি বিনয়াবনত আমি একজন নগণ্য গণমাধ্যম কর্মী। গণমাধ্যমের মুক্তি চাই। গণমানুষের প্রকৃত মুক্তি চাই।গণমাধ্যম মুক্ত হলেই গণমানুষের প্রকৃত মুক্তি আসবে।
রিয়াজ হায়দার চৌধুরী