“আনোয়ারার মাটিতে এক বিকেল: সরফরাজ খান থেকে মিজানুর রহমান চৌধুরী— ঐতিহ্য, আদর্শ ও প্রত্যাবর্তনের গল্প”

By admin
8 Min Read

–মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে এক শান্ত জনপদ— আনোয়ারা। সবুজ ধানক্ষেতের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বাতাসে এখনো মিশে আছে নদী, মাটি আর মানুষের গন্ধ। এখানকার মানুষ যেমন পরিশ্রমী, তেমনি হৃদয়বান; তারা গর্ব করে তাদের ঐতিহ্যে, সংস্কৃতিতে, এবং সেই অমলিন মানবিক বন্ধনে, যা শহরের কোলাহলে হারিয়ে গেছে বহু আগেই। সেই আনোয়ারারই এক ঐতিহ্যবাহী গ্রাম বরুমছড়া, যেখানে ইতিহাস এখনো নিঃশব্দে কথা বলে গাছের পাতায়, পুকুরের জলে, কিংবা ঘরের দোচালার ছায়ায়।
এই বরুমছড়ায়ই আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম এক বিকেলে— একরাশ nostalgia, এক চিলতে রোদ, আর স্মৃতির মায়াজালে জড়ানো এক অনন্ত সময়ের মধ্যে। ছবির ফ্রেমে আমরা চারজন— আমি, আমার প্রিয় বন্ধু সাংবাদিক মিজানুর রহমান চৌধুরী, সরফরাজ খানের সন্তান গোলাম সারোয়ার ও গোলাম খোকন। পেছনে শান্ত নীল আকাশ, সামনে সবুজ ধানক্ষেত; আর মাঝখানে আমরা, সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছি এক বিকেলের আলোয়। বরুমছড়ার ঐতিহ্যের ধারক: সরফরাজ খান-বরুমছড়ার নাম উঠলে

 

ই যে মানুষটির কথা আসে, তিনি সরফরাজ খান— এই এলাকার ঐতিহ্যের ধারক, এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার। তাঁর স্মৃতি আজও বেঁচে আছে মানুষের মনে, তাঁর নাম যেন একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। তাঁর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যেন অতীতের কোনো পবিত্র মুহূর্তে ফিরে গিয়েছিলাম। সেই দিনটি ছিল এক অর্থে ঐতিহাসিকও— কারণ আমরা একত্রিত হয়েছিলাম তিনটি সড়কের নামফলক উন্মোচনের উপলক্ষে। যথাক্রমে জেমারত খান, সরফরাজ খান, এবং রোকেয়া বেগম (সরফরাজ খানের স্ত্রী)— এই তিন মহান নামের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সড়কগুলোর নামকরণ করা হয়। এ যেন শুধু রাস্তার নাম নয়, বরং এ

ক দীর্ঘ ঐতিহ্যের, এক বংশের, এক মানবিক উত্তরাধিকারের স্বীকৃতি।

এক বিকেলের সংলাপ -সেদিন বিকেলে আমরা যখন সরফরাজ খানের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, হালকা রোদ তখন গাছের ফাঁক দিয়ে মাঠে পড়ছিল। বাতাসে ধানের গন্ধ। পাখিরা তখন বাসায় ফিরছে। সেই মুহূর্তে আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন আমার প্রিয় বন্ধু, সময়ের সন্তান, সাংবাদিক মিজানুর রহমান চৌধুরী। যে মানুষটিকে আমি শুধু একজন সাংবাদিক হিসেবে দেখি না, বরং দেখি একজন যোদ্ধা হিসেবে— কলমের সৈনিক, দেশপ্রেমিক, আদর্শের প্রতীক। আনোয়ারা ও চট্টগ্রামের মাটির মানুষ তাঁকে ভালোবাসে; কারণ তিনি তাদেরই একজন, তাদের ভাষায় কথা বলেন, তাদের ব্যথা বোঝেন, এবং তাদের অধিকারের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান। সাহসী এক কলমযোদ্ধা-মিজানুর রহমান চৌধুরী শুধু একজন সাংবাদিক নন, তিনি এক প্রতীতযশা জননেতা। তাঁর জীবন সংগ্রাম যেন বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা সাংবাদিকতার ইতিহাসেরই অংশ। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অপশাসনের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলমকে অস্ত্র করেছেন।
বিগত সময়ে যখন সাংবাদিকতা ছিল ভয় আর চাপে নিপতিত, তখনও তিনি আপোষ করেননি। তাঁর কলমে ছিল প্রতিবাদের আগুন, কিন্তু হৃদয়ে ছিল গভীর মানবতা। আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও চট্টগ্রামের মানুষ তাঁকে চেনে সেই আলোকিত মানুষ হিসেবে, যিনি ভয় পান না, চাটুকার হন না, আর অন্যায়ের সামনে নতজানু হন না। তিনি বিশ্বাস করেন— রাজনীতি মানে ক্ষমতা নয়, রাজনীতি মানে দেশকে ভালোবা সা। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন “লাভ বাংলাদেশ” নামের রাজনৈতিক সংগঠন— যার লক্ষ্য একটাই: দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ মানুষ তৈরি করা। এই দল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়; এটি এক আত্মার আহ্বান— “দেশকে ভালোবাসো, মানুষকে ভালোবাসো।” তাঁর দল থেকে তিনি একসময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন, প্রতীক ছিল তালা-চাবি। প্রতীকটি যেন অর্থবহ— তালা খুলে দিতে চাওয়া এক নবযুগের দোরগোড়ায় দাঁড়ানো মানুষ। আবারও সময়ের তাগিদে- আজ, সময় আবার সেই আহ্বান নিয়ে ফিরেছে। দেশের বর্তমান দুঃসময়ে, যখন রাজনীতি থেকে মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে, যখন মানুষ বিভ্রান্ত ও ক্লান্ত, তখন আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর মানুষ আবার তাকিয়ে আছে মিজানুর রহমান চৌধুরীর দিকে। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন— আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসন থেকে প্রার্থী হবেন। এটি কেবল একটি প্রার্থিতা নয়, বরং এক দেশপ্রেমিকের প্রত্যাবর্তন। তিনি জানেন, এটি সহজ পথ নয়। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস— “যে পথে সত্য আছে, সেই পথই শেষ পর্যন্ত জয়ের।” মিজান ভাইয়ের মুখে যখন তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা শুনছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল, এই মানুষটি রাজনীতিতে এসেছেন ক্ষমতার জন্য নয়, বরং মানুষকে ফেরানোর জন্য— ন্যায়ের পথে, মানবতার পথে, দেশের প্রতি ভালোবাসার পথে।অহংকারহীন হৃদয়-যে মানুষ অহংকারকে চেনেন না, তাঁরই নাম মিজানুর রহমান চৌধুরী। তিনি কখনো নিজেকে বড় ভাবেন না; বরং অন্যের মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজে পান। সাংবাদিকতার জগতে তাঁর মতো সৎ, স্বচ্ছ ও সাহসী মানুষ আজ বিরল। তাঁর বন্ধুত্বে একধরনের আলোকিত মমতা আছে— যেমন আছে দেশপ্রেমে, তেমনি আছে সাধারণ মানুষের প্রতি টান। সেদিন সরফরাজ খানের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কথা বলছিলাম, তিনি বারবার বলছিলেন— “দেশের মানুষ অনেক দিয়েছে, কিন্তু ফিরে পায়নি কিছুই। সময় এসেছে শোষণের হিসাব চাওয়ার।” এই উচ্চারণে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা— যেন আনোয়ারার বাতাসে তাঁর কণ্ঠ মিলেমিশে যাচ্ছিল।
শোষণ থেকে মুক্তির স্বপ্ন-বাংলাদেশের রাজনীতি আজ যেন বিভ্রান্তির অন্ধকারে। একশ্রেণীর শোষণবাজ রাজনীতিক দেশের সম্পদ, মানুষের বিশ্বাস আর ভবিষ্যৎ সব গ্রাস করে নিয়েছে। মিজান ভাই বলেন, “এই শোষণের জাল ছিঁড়ে ফেলতেই হবে।”
তাঁর স্বপ্ন— এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে সত্য বলবে, যেখানে রাজনীতি হবে নীতি ও সততার উপর দাঁড়ানো, আর যেখানে আনোয়ারার মাটির মানুষ গর্ব করে বলবে— “আমরাও এই দেশের মালিক।” এই স্বপ্নই তাঁকে প্রতিদিন নতুন করে জাগায়, নতুন করে লিখতে শেখায়। তাঁর কলম যেন দেশের মাটিতে গজিয়ে ওঠা এক বৃক্ষ— যার ছায়ায় আশ্রয় পায় সাধারণ মানুষ, প্রতিবাদ পায় অন্যায়। সেই বিকেলের স্মৃতি-আমাদের সেদিনের সেই বিকেলটা যেন এখনো মনে পড়ে— মাঠের ওপারে গরু ফিরছে ঘরে, দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। সূর্য তখন একটু হেলে পড়েছে পশ্চিমে। মিজান ভাইয়ের চোখে ছিল এক গভীর দৃষ্টি— যেন তিনি সময়ের গহীন থেকে ভবিষ্যৎকে দেখছেন। আমরা তখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। শাটারের ক্লিকের সাথে থেমে গেল সেই মুহূর্ত— কিন্তু তার ভেতরে বন্দী হয়ে রইল ইতিহাস, বন্ধুত্ব, আদর্শ আর দেশপ্রেমের এক অনন্ত প্রতীক। ছবিটি যেন নিছক একটি ফটো নয়, বরং একটা সময়ের দলিল— এক বিকেলের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা চারজন মানুষ, যারা প্রত্যেকে নিজের মতো করে ইতিহাসের সাক্ষ্য দিচ্ছে।আনোয়ারা ঘুরে আসার পর-
আনোয়ারা ঘুরে এসে মনে হলো, এই জনপদের মাটি শুধু উর্বর নয়, এ মাটি জন্ম দিয়েছে সাহসী মানুষদের। সরফরাজ খান থেকে শুরু করে মিজানুর রহমান চৌধুরী— তাঁরা সবাই এই মাটির সন্তান, যারা মানুষের পাশে থেকেছেন, মানুষের জন্য লড়েছেন। গ্রামীণ জলপথ এখনো বয়ে চলে শান্ত নদীর মতো, কিন্তু সেই জলপথের দিশারীরা আজও লড়ছে সময়ের সঙ্গে। আনোয়ারা আজও জেগে আছে, তার মানুষের চোখে আছে একবুক আশা— হয়তো একদিন এই মাটিতেই আবার ফিরবে সত্য, সততা আর মানবতার রাজনীতি। আজকের পৃথিবীতে যেখানে স্বার্থ, অর্থ আর ক্ষমতা মানুষকে গ্রাস করছে, সেখানে মিজানুর রহমান চৌধুরীর মতো মানুষ আমাদের আশার আলো। তাঁর মধ্যে আমরা দেখি— সাহস, সততা ও মানবিকতার এক সুন্দর সংমিশ্রণ। আনোয়ারার মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন তাঁর চোখে সেই আশার ঝিলিক দেখেছি, তখন মনে হয়েছে— এ দেশ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সরফরাজ খানের বাড়ির সেই বিকেল তাই কেবল একদিনের স্মৃতি নয়, বরং এক প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। যেমন আমি আজও মনে রাখব— “ছবি কথা বলে”— কিন্তু কখনো কখনো, ছবির নীরবতা হাজার শব্দের চেয়েও গভীর হয়।

Share This Article
Leave a Comment