
বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, জাতীয় অধ্যাপক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ ড. আব্দুল করিম-এর ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রাম একাডেমি হলে অনুষ্ঠিত হলো এক গভীর শ্রদ্ধা, জ্ঞানচর্চা ও ইতিহাসচিন্তার অনন্য আয়োজন। চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র এবং ইতিহাসের পাঠশালা-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই স্মরণসভা বিকেল ৫টায় শুরু হয়ে ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, লেখক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবী এবং সচেতন নাগরিকদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে এক বর্ণাঢ্য বুদ্ধিবৃত্তিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। এই মহতী আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন। তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা, ইতিহাসচর্চা এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী করে তোলার নিরলস প্রচেষ্টারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ছিল এই অনুষ্ঠান। তাঁর সুচিন্তিত পরিকল্পনা, আন্তরিকতা এবং ঐতিহাসিক চেতনা অনুষ্ঠানটিকে এক ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত করেছে। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক, গবেষক, ইতিহাসবিদ, লেখক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং ইতিহাস-অনুসন্ধিৎসু মানুষ উপস্থিত থেকে ড. আব্দুল করিমের জীবন, কর্ম, গবেষণা, চিন্তাধারা ও ইতিহাসচর্চার পদ্ধতি নিয়ে মূল্যবান আলোচনা করেন। বক্তারা একবাক্যে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ক্ষেত্রে ড. আব্দুল করিমের অবদান অনন্য ও অবিস্মরণীয়। এই আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমি বলেছি—ড. আব্দুল করিম ছিলেন এমন একজন ইতিহাসবিদ, যিনি ইতিহাসকে কেবল অতীতের গল্প হিসেবে দেখেননি; তিনি ইতিহাসকে দেখেছেন একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতি তার অতীতকে যত গভীরভাবে জানবে, তার ভবিষ্যৎ ততই সুদৃঢ় হবে। আমি আরও উল্লেখ করি, ইতিহাস রচনায় তিনি কখনো জনশ্রুতি, গুজব কিংবা আবেগকে প্রাধান্য দেননি। তিনি আরবি, ফারসি, বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রাচীন দলিল, শিলালিপি, মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি, সরকারি নথি এবং সমসাময়িক উৎস বিশ্লেষণ করে সত্য অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর গবেষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—”ইতিহাসের প্রতি সততা ছাড়া একজন গবেষক কখনো প্রকৃত ইতিহাসবিদ হতে পারেন না।” ড. আব্দুল করিমের জীবন আমাদের শেখায় যে গবেষণা মানে শুধু বই পড়া নয়; গবেষণা মানে প্রশ্ন করা, মাঠে যাওয়া, তথ্য সংগ্রহ করা, বিভিন্ন উৎস মিলিয়ে সত্য যাচাই করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাসবিদের কলম কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা মতাদর্শের কাছে নয়; সত্য ও প্রমাণের কাছেই জবাবদিহি করে। বাংলার সুলতানি ও মুঘল যুগ, সমাজজীবন, অর্থনীতি, প্রশাসন, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলার ইতিহাস নিয়ে তাঁর গবেষণা আজও দেশ-বিদেশের গবেষকদের জন্য অপরিহার্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম পিএইচডি এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্য ও আফ্রিকা বিষয়ক অধ্যয়ন বিদ্যালয় (SOAS) থেকে দ্বিতীয় পিএইচডি অর্জনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস গবেষণাকে বিশ্বপরিসরে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। আমি আমার বক্তব্যে আরও বলেছি—বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় ড. আব্দুল করিমের গবেষণাপদ্ধতি আমাদের জন্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—একটি তথ্য যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, দলিল ও প্রমাণ ছাড়া তাকে ইতিহাস বলা যায় না। ইতিহাসের প্রতি এই সততা ও দায়বদ্ধতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
আজকের তরুণ গবেষকদের প্রতি তাঁর জীবন এক নীরব আহ্বান। তিনি যেন বলে গেছেন—পড়ো, জানো, অনুসন্ধান করো, প্রশ্ন করো এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করো। কারণ একটি জাতির ইতিহাস যত সমৃদ্ধ হবে, সেই জাতির আত্মমর্যাদা তত দৃঢ় হবে। আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, ড. আব্দুল করিমের অপ্রকাশিত গবেষণা, পাণ্ডুলিপি ও প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সহজলভ্য করতে হবে। তাঁর নামে গবেষণা বৃত্তি, স্মারক বক্তৃতা এবং ইতিহাস গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবিও সভায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সবাই গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে এই মহান ইতিহাসবিদকে স্মরণ করেন এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে প্রত্যেকে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন—ড. আব্দুল করিমের দেখানো পথ অনুসরণ করে প্রমাণভিত্তিক ইতিহাসচর্চাকে আরও শক্তিশালী করবেন। ড. আব্দুল করিম আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত হলেও তাঁর চিন্তা, গবেষণা, গ্রন্থ, আদর্শ এবং সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চার দর্শন যুগের পর যুগ গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীদের পথ দেখাবে। ইতিহাসের আকাশে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো কখনো নিভে যাবে না। তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, বিনম্র কৃতজ্ঞতা এবং আন্তরিক দোয়া।