“দূরের দেশ, কাছের মানুষঃ ব্যাংককের বাগানে এক অপ্রত্যাশিত পরিচয়, যা আজও হৃদয়ের গভীরে বেঁচে আছে-

By admin
7 Min Read
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলোকে কোনো দিন, কোনো মাস, কোনো বছর দিয়ে মাপা যায় না। কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় মাত্র কয়েক ঘণ্টার, কয়েক দিনের কিংবা কয়েক সপ্তাহের; কিন্তু সেই পরিচয় কখনো কখনো এমন গভীর ছাপ ফেলে যায়, যা বছরের পর বছর ধরে হৃদয়ের গোপন কোণে বেঁচে থাকে। আমার জীবনের স্মৃতির অ্যালবামে এমনই একটি অধ্যায়ের নাম— “দূরের দেশ, কাছের মানুষ”। সেদিন ব্যাংককের আকাশ ছিল অদ্ভুত রকমের সুন্দর। শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে, সবুজ গাছপালা আর পাহাড়ি নীরবতায় ঘেরা একটি বাগানে বসেছিলাম। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষদের ভিড় ছিল সেখানে, কিন্তু তাদের মধ্যে একজনকে প্রথম দেখাতেই আলাদা মনে হয়েছিল। তার মধ্যে ছিল এক ধরনের আত্মবিশ্বাস, যা অহংকার নয়; ছিল জ্ঞানের গভীরতা, যা প্রদর্শনের জন্য নয়; ছিল সৌন্দর্য, যা শুধু বাহ্যিক নয়, বরং ব্যক্তিত্বের মধ্যেও ছড়িয়ে ছিল। প্রথম পরিচয়ের সময় আমি জানতাম না যে সামনে বসে থাকা মানুষটি আমার স্মৃতির দীর্ঘতম অধ্যায়গুলোর একটিতে পরিণত হবে।
প্রথমে সাধারণ কিছু কথাবার্তা।
কোথা থেকে এসেছি।
কি করি।
কতদিনের জন্য এসেছি।
কোথায় কোথায় ঘুরেছি।
এইসব সাধারণ প্রশ্ন থেকেই শুরু।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, তার প্রশ্ন করার ধরন অন্যরকম।
তিনি শুধু উত্তর শুনছিলেন না।
মানুষকে বোঝার চেষ্টা করছিলেন।
তার চোখে ছিল অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি।
একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের চোখ।
একজন কবির অনুভূতি।
একজন বিশ্বভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতা।
আমি যখন বাংলাদেশের কথা বলতে শুরু করলাম, তখন তার চোখে কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।
বাংলাদেশের নদী, মানুষ, ইতিহাস, সাহিত্য, সাংবাদিকতা—সবকিছু নিয়েই তার আগ্রহ ছিল।
আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“তুমি কি আগে বাংলাদেশে গিয়েছো?”
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“না, কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক পড়েছি। অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি।”
সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, পৃথিবীর সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ তারা নয় যারা শুধু ডিগ্রি অর্জন করে; বরং তারা, যারা পৃথিবীকে জানতে চায়।
সেদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত।
তবুও আমাদের আলাপ শেষ হচ্ছিল না।
আমরা কথা বলছিলাম সাংবাদিকতা নিয়ে।
তিনি বলছিলেন সত্য অনুসন্ধানের গল্প।
আমি বলছিলাম বাংলাদেশের মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা।
অপরাধ জগত।
দুর্নীতি।
ক্ষমতার অপব্যবহার।
মানুষের কান্না।
মানুষের সংগ্রাম।
তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন।
হঠাৎ বললেন,
“সত্যের জন্য কাজ করা মানুষ পৃথিবীর যেকোনো দেশে সম্মানের দাবিদার।”
কথাটি শুনে মনে হয়েছিল, তিনি শুধু সাংবাদিক নন, একজন মানবিক মানুষ।
সেই রাতে হোটেলে ফিরে আসার পরও তার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর এত মানুষের মধ্যে কেন যেন এই মানুষটিকে আলাদা মনে হচ্ছে।
হয়তো তার জ্ঞানের জন্য।
হয়তো তার সরলতার জন্য।
হয়তো তার মানবিকতার জন্য।
অথবা হয়তো এই তিনটির অপূর্ব মিশ্রণের জন্য।
পরবর্তী কয়েকদিনে আমাদের দেখা হতে লাগল নিয়মিত।
প্রতিটি দিন যেন নতুন কোনো অধ্যায় খুলে দিচ্ছিল।
প্রতিটি আলাপ যেন নতুন কোনো জানালা খুলে দিচ্ছিল পৃথিবীকে দেখার।
আমি বুঝতে পারছিলাম, কিছু মানুষকে চেনা যায় না পরিচয়পত্র দিয়ে।
তাদের চেনা যায় কথোপকথনের মধ্য দিয়ে।
তাদের চেনা যায় চিন্তার গভীরতা দিয়ে।
তাদের চেনা যায় অন্য মানুষের প্রতি সম্মান দেখার মধ্য দিয়ে।
আর সেই মানুষটি ছিলেন ঠিক তেমনই একজন।
সমুদ্রের ঢেউ, কিছু না বলা অনুভূতি এবং স্মৃতির দীর্ঘ যাত্রা
মানুষের জীবনে অনেক সম্পর্কের নাম থাকে।
বন্ধুত্ব।
সহকর্মী।
পরিচিত।
ভালোবাসা।
কিন্তু কিছু সম্পর্ক আছে, যাদের কোনো নির্দিষ্ট নাম দেওয়া যায় না।
তারা কেবল স্মৃতি হয়ে থাকে।
সম্মান হয়ে থাকে।
অনুভূতি হয়ে থাকে।
আমাদের সম্পর্কটাও হয়তো ঠিক তেমনই ছিল।
একদিন আমরা সমুদ্রের ধারে গিয়েছিলাম।
নীল জলরাশি।
দিগন্তজোড়া আকাশ।
আর অসংখ্য ঢেউ।
সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,
“তুমি কি জানো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস কী?”
আমি বললাম,
“কি?”
তিনি বললেন,
“অজানা পথ।”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।
তিনি আবার বললেন,
“কারণ অজানা পথেই নতুন মানুষ, নতুন গল্প আর নতুন জীবন অপেক্ষা করে।”
সেদিন তার কথাগুলো শুধু শুনিনি।
অনুভব করেছিলাম।
আমরা দীর্ঘ সময় সমুদ্রের পানিতে কাটিয়েছিলাম।
হাসছিলাম।
গল্প করছিলাম।
ছোট ছোট বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম।
কিন্তু মনের গভীরে কোথাও একটা উপলব্ধি কাজ করছিল।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
এই দিনগুলো আর বেশিদিন থাকবে না।
একদিন আমি তাকে আমার লেখা একটি বই উপহার দিলাম।
তিনি বইটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখলেন।
বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানলেন।
তারপর বললেন,
“যে মানুষ সমাজের প্রান্তিক মানুষের গল্প লেখে, সে শুধু লেখক নয়, ইতিহাসের সাক্ষী।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
কারণ এই প্রশংসা আমার কাছে যেকোনো পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল।
তিনি শুধু বইটি নেননি।
একজন লেখকের শ্রমকেও সম্মান করেছিলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় আমরা দীর্ঘ সময় কথা বলেছিলাম জীবন নিয়ে।
ভালোবাসা নিয়ে।
স্বপ্ন নিয়ে।
মানুষের একাকীত্ব নিয়ে।
আমি তাকে বলেছিলাম,
“পৃথিবী ঘুরে এত মানুষ দেখার পরও কি একাকীত্ব আসে?”
তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেছিলেন,
“সবচেয়ে বেশি মানুষের মাঝেই কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি একাকীত্ব থাকে।”
তার উত্তর শুনে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।
কারণ সত্যিই তো—
সব হাসি সুখের নয়।
সব নীরবতা দুঃখের নয়।
সব সফলতার আড়ালেও শান্তি থাকে না।
সেই রাতে আমরা দীর্ঘক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
অসংখ্য তারা জ্বলছিল।
আর আমি মনে মনে ভাবছিলাম—
মানুষের জীবনে কিছু পরিচয় আসে কোনো দাবি ছাড়াই।
কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই।
কিন্তু তারপরও তারা হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে যায়।
বিদায়ের আগের দিন তিনি বলেছিলেন,
“কখনো যদি পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে দেখা হয়, তখনও যেন এই কথোপকথন ভুলে না যাই।”
আমি হেসে বলেছিলাম,
“কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না।”
আজ বহু সময় পেরিয়ে গেছে।
হয়তো পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে তিনি নতুন কোনো গল্পের খোঁজে আছেন।
হয়তো নতুন কোনো মানুষের জীবন নিয়ে লিখছেন।
হয়তো নতুন কোনো শহরের আকাশের নিচে বসে কবিতা লিখছেন।
আর আমি এখনও মাঝে মাঝে ফিরে যাই সেই ব্যাংককের বাগানে।
সেই সমুদ্রের ধারে।
সেই কথোপকথনের কাছে।
সেই কয়েকটি দিনের কাছে।
কারণ জীবনের সব সম্পর্ক একসঙ্গে পথচলার জন্য আসে না।
কিছু সম্পর্ক আসে শুধু স্মৃতি হয়ে থাকার জন্য।
আর কিছু মানুষ আসে শুধু এটুকু শেখানোর জন্য—
পৃথিবী যত বড়ই হোক, হৃদয়ের দূরত্ব কখনো মানচিত্র দিয়ে মাপা যায় না।
তাই আজও যখন সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, তখন মনে হয়—
তিনি ছিলেন দূরের দেশের একজন মানুষ।
কিন্তু হৃদয়ের খুব কাছের একজন স্মৃতি।
আর সেই কারণেই—
“দূরের দেশ, কাছের মানুষ” শুধু একটি গল্প নয়; এটি সময়ের কাছে হারিয়ে না যাওয়া এক টুকরো মানবিক স্মৃতি।
Share This Article
Leave a Comment