বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল্লাহ আল নোমান: চট্টগ্রামের রাজনীতি ও জনজীবনে তাঁর অবদান

By admin
6 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
বিগত কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছিল, আজ নোমান ভাইকে নিয়ে একটি লেখা লিখতে হবে। এই লেখা শুধু তার প্রতি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা নয়, বরং চট্টগ্রাম, বিএনপি, এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে তার স্মৃতিচিহ্ন স্মরণ করানোও বটে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলা টিভিতে আমার উপস্থাপনায় ‘চট্টগ্রাম সংলাপ’ চলছিল। সেই ধারাবাহিকতায় “নির্বাচন ভাবনা” শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের গণমানুষের নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সফল মন্ত্রী এবং চট্টগ্রামের উন্নয়নের নিবেদিত প্রাণ আব্দুল্লাহ আল নোমান। আজ তিনি আমাদের মধ্যে নেই, তবে তার স্মৃতি চিরন্তন। আমাদের সম্পর্কের সূত্রপাত হয়েছিল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন থেকে। আমি তখন একজন তরুণ সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষ। নোমান ভাই তখনও চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশিষ্ট নাম। কিন্তু আমাদের সম্পর্কের মুল ভিত্তি ছিল চট্টগ্রামের উন্নয়ন এবং মানুষের কল্যাণ। সেই সম্পর্কের অসংখ্য স্মৃতি আজও আমার মনে তাজা। আমি বহুবার তাকে কাছ থেকে দেখেছি, তার সঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু একজন টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ এবং টকশো রেকর্ড করা ছিল এক স্বপ্নের মতো। আমি তার নিকট বহুবার গিয়েছি, বহুবার তার পরামর্শ পেয়েছি, কিন্তু যে প্রথম টকশো রেকর্ডের অভিজ্ঞতা, সেটি আজও আমার মনে অমলিন। আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের খবর এসেছে, নোমান ভাইয়ের সুযোগ্য সন্তান সাঈদ আল নোমানকে আসন্ন নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে বিএনপি মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এটি সত্যিই যুগোপযোগী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। একজন সাংবাদিক, লেখক ও টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে আমি এর স্বাগত জানাই। বিশেষ করে দেশের ভবিষ্যতের কাণ্ডারি তারেক রহমানের এই সুদূরদর্শী পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। নোমান ভাইয়ের মানবিক ও রাজনৈতিক দিক নোমান ভাই শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন মানবিক নেতা, যিনি মানুষের কল্যাণ এবং দেশের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন, মন্ত্রী হিসেবে চট্টগ্রামের উন্নয়নে অক্লান্তভাবে কাজ করেছেন এবং রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থেকেছেন। তার মানবিকতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা আমার জন্য শিক্ষণীয়। স্মৃতির পাতায় ফিরে গেলে মনে পড়ে, ২০০১ সালে আলজেরিয়ায় যুব কনফারেন্সে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে এক হাজার ডলার উপহার দিয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে মাসব্যাপী বিজয় রজতজয়ন্তীতে লালদিঘির ময়দানে তিনি আমার হাতে ‘সেরা বক্তা’ ও ‘সেরা তরুণ সংগঠক’ হিসেবে পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন। এছাড়াও নবীন চন্দ্র সেন সাহিত্য পুরস্কারও তার হাত থেকে গ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এই সব স্মৃতি শুধু পুরস্কার নয়, বরং তার উদারতা, উৎসাহ এবং মানুষের প্রতি আন্তরিকতার পরিচায়ক। আমার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছিল ভিআইপি টাওয়ারে। আমি প্রস্তাব দিলাম নির্বাচনি ভাবনা বিষয়ক টকশো তার বাসাতেই রেকর্ড করতে চাই। তিনি বিনীতভাবে বললেন, “না, তোমাদের স্টুডিওতে আসব আমি। কোথায় যেতে হবে বলো।” তার সহজ, সাদাসিধে মনোভাব আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সেই স্টুডিও ছিল আসকার দীঘির পাড়ে এস আলমের মিডিয়া টাওয়ার। নির্বাচনের হাওয়া তখন উত্তপ্ত, তবে নোমান ভাই একজন হেভিওয়েট নেতা হিসেবে সহজভাবে টকশোতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। টকশো ও শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা টকশো রেকর্ডিং চলাকালীন তিনি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আনন্দ এবং পরিপূর্ণতায় দিতেন। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতেগড়া বিএনপি, চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা গভীরভাবে বোঝাতেন। তিনি চট্টগ্রামের শিক্ষা বোর্ড, ভেটনারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে আমার আন্দোলনের ভূমিকাও স্মরণ করতেন। ১৯৯৪ সালের ৯ জুলাই চট্টগ্রামে হরতাল পালন ও হরতাল প্রত্যাহারের বিষয়ে মন্ত্রী হিসেবে তার সঙ্গে বৈঠক ছিল এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
আমি সেই প্রথম দিনেই বুঝতে পারি, একজন নেতা হিসেবে তিনি শুধু দায়িত্বশীল নয়, বরং শিক্ষণীয় ও প্রজ্ঞাময়। তার সঙ্গে প্রতিটি কথোপকথন ছিল একটি পাঠশালা, যেখানে আমি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, উন্নয়নমূলক চিন্তা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার পাঠ শিখেছি। চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও নোমান ভাইয়ের অবদান নোমান ভাই চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য এক অদম্য শক্তি ছিলেন। তার হাতেগড়া চট্টগ্রামে এখনো বহু প্রকল্প এবং প্রতিষ্ঠান আছে যা তার দূরদর্শিতা ও পরিশ্রমের সাক্ষী। শিক্ষা বোর্ড, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তার অবদান চিরস্থায়ী। তিনি কখনো নিজেকে প্রাধান্য দিতেন না, বরং জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন। তিনি প্রতিটি সভা, টকশো, বৈঠক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনগণের কথা প্রথমে ভাবতেন। তার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শুধু একটি শহরই নয়, বরং একটি উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তার অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতা চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতাদের জন্য চিরকালের অনুপ্রেরণা। নোমান ভাইয়ের মানবিক গুণাবলী নোমান ভাইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গুণ ছিল তার মানবিকতা। তিনি কখনো ক্ষমতার দম্ভে হার মানতেন না। প্রতিটি মানুষকে সমান দৃষ্টিতে দেখতেন। তার সঙ্গে কাজ করা মানুষদের মনে পড়ে, তিনি কেবল রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, বরং একজন প্রিয় মানুষ, অভিভাবক এবং বন্ধুও ছিলেন। তার উদারতা, সহজতা, মানবিকতা এবং দায়িত্বশীলতা আজও আমার মনে চিরস্থায়ীভাবে জ্বলজ্বল করছে। ভবিষ্যতের প্রত্যাশা আজ যখন আমি এই লেখাটি লিখছি, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, আশা করি তার সুযোগ্য সন্তান সাঈদ আল নোমান তার বাবার আদর্শ ও চট্টগ্রামের উন্নয়ন আন্দোলনকে অব্যাহত রাখবেন। তিনি চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। আমরা আশা করি তিনি নোমান ভাইয়ের মতো দূরদর্শী, দায়িত্বশীল এবং মানবিক নেতা হিসেবে উদ্ভাবনী পদক্ষেপ নেবেন। নোমান ভাইয়ের শিক্ষা, আদর্শ এবং কর্মজীবনের প্রজ্ঞা আমাদের পথপ্রদর্শক। তার স্মৃতি চট্টগ্রামের প্রতিটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। তার হাতেগড়া উন্নয়ন, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং মানবিক গুণাবলী চিরকালের জন্য ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।

Share This Article
Leave a Comment