Home Blog Page 21

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে বৈঠকে বিএনপির সংসদীয় দল

0

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে বৈঠকে বসেছেন সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা। বুধবার (১৯ আগস্ট) বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এ তথ্য জানিয়েছেন। বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর মনোনীত প্রার্থী এবং বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও উপস্থিত রয়েছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ সভাকক্ষে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর ২টা থেকে শুরু হয়ে ভোটগ্রহণ চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোটাভুটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার মোট ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদ ভবনের সভাকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ৯২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি পেয়েছিলেন ১৭২ ভোট।

১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পাচ্ছেন দীপু মনি

0

স্বামী মৃত্যুর ঘটনায় মানবিক বিবেচনায় কারাগারে থাকা সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনিকে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্যারোলে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার (১৯ আগস্ট) স্বামী তৌফিক নেওয়াজের মৃত্যুতে দীপু মনির আবেদনের প্রেক্ষিতে মানবিক দিক বিবেচনায় এনে মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক তার প্যারোলে মুক্তি মঞ্জুর করেন।  একইদিন দুপুরে তার পরিবারের পক্ষ থেকে মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট গাজী ফয়সাল ইসলাম। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দীপু মনির মেয়ে তানি দিপাবলী নেওয়াজ কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর দীপু মনির সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ করে পরিবারের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেন তার আইনজীবী। এ সময় দীপু মনির পরিবারের তিনজন সদস্য ও তার আইনজীবী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। দীপু মনির আইনজীবী জানান, স্বামীর মৃত্যুর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মানবিক কারণে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পর কারাগার থেকে তাকে মুক্তির প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়া হবে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দীপু মনির স্বামী তৌফিক নেওয়াজ মারা যান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও লিভারের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন।

চট্টগ্রামে সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামি গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানা পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, ১৯ আগস্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোতোয়ালী থানার এসআই মো. আসাদুজ্জামান, এএসআই সোহেল আহমেদ, এএসআই রিগান চাকমা, এএসআই হেলাল হোসেন ও এএসআই ইসমাইল হোসেনসহ একটি দল নগরীর আকবরশাহ থানা এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় বিভিন্ন মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. জয়নালকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

পুলিশের তথ্যমতে, জয়নালের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন থানায় মাদক, অস্ত্র, চুরি, বিস্ফোরক ও ডাকাতির প্রস্তুতিসহ মোট সাতটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এরপর একই অভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাকলিয়া থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওয়ারেন্টভুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. মনজুরকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, মনজুরের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ও ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে চারটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। গ্রেপ্তার দুই আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে কোতোয়ালী থানা পুলিশ।

চান্দগাঁওয়ে ৪৮ লিটার চোলাইমদসহ একজন গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে অভিযান চালিয়ে ৪৮ লিটার দেশীয় তৈরি চোলাইমদ ও বিভিন্ন কোম্পানির জুসের খালি বোতলসহ মিন্টু দাস (৩২) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে এসআই মো. জসিম উদ্দিন, এএসআই মো. আলমগীর হোসেন, এএসআই জুয়েল ত্রিপুরাসহ পুলিশের একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে চান্দগাঁও থানাধীন উত্তর মোহরার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের খেজুরতলা হায়দার আলীর কলোনি থেকে মিন্টু দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ৪৮ লিটার দেশীয় তৈরি চোলাইমদ এবং পাঁচটি প্লাস্টিকের বস্তাভর্তি বিভিন্ন কোম্পানির জুসের খালি বোতল উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার মিন্টু দাস চান্দগাঁও থানার কালুরঘাট, খেজুরতলা এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের তথ্যমতে, তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে চান্দগাঁও থানায় দুটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা ২০২৪ সালের ৮ জুলাই এবং অপরটি ২০২৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর দায়ের করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

“পাহাড়, গাছ, নদী ও জলবায়ু: প্রকৃতির কাছে মানুষের ঋণ-

-মো.কামাল উদ্দিনঃ সম্মানিত সভাপতি, এ্যাড ভিশন বাংলাদেশের সম্মানিত নেতৃবৃন্দ, পরিবেশবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, লেখক, সুধীজন এবং প্রিয় উপস্থিত সবাই, আসসালামু আলাইকুম।
গত ১৮ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় চট্টগ্রামের মুরাদপুরের বারকোড রেস্তোরাঁয় পরিবেশবাদী সংগঠন এ্যাড ভিশন বাংলাদেশ আয়োজিত “জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ রক্ষা” শীর্ষক সেমিনারে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব এবং লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক হিসেবে প্রধান বক্তা হওয়ার সুযোগ আমার জন্য নিঃসন্দেহে সম্মানের। তবে তার চেয়েও বড় কথা, এটি ছিল প্রকৃতির কাছে আমাদের দায়বদ্ধতার কথা বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আজ আমি আপনাদের সামনে শুধু কিছু পরিসংখ্যান কিংবা পরিবেশবিজ্ঞানের কঠিন শব্দ নিয়ে দাঁড়াইনি। আমি দাঁড়িয়েছি একজন নাগরিক হিসেবে, একজন লেখক হিসেবে, একজন সাংবাদিক হিসেবে এবং দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার, পরিবেশ ও নাগরিক নানা প্রশ্ন নিয়ে কাজ করা একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে। আজকের বক্তব্যে আমি ফিরে যেতে চাই কোটি কোটি বছর আগের সেই পৃথিবীতে, যে পৃথিবীতে মানুষ ছিল না, ছিল না নগর, কারখানা কিংবা ইট পাথরের অট্টালিকা। ছিল শুধু আকাশ, বাতাস, পাহাড়, নদী, বন, সমুদ্র আর জীবনের অদৃশ্য স্পন্দন।

একটি গল্প দিয়ে শুরু করি
একদিন এক মানুষ একটি পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে পাহাড়কে প্রশ্ন করল, “তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? তোমার কী প্রয়োজন? তোমাকে কেটে যদি রাস্তা বানাই, ঘর বানাই, ব্যবসা করি, তাহলে তো মানুষেরই উন্নতি হবে।”
পাহাড় কোনো উত্তর দিল না।
তার বুকের গা বেয়ে নেমে আসা ছোট্ট একটি ঝরনা তখন বলল,
“আমাকে চেনো?”
মানুষ বলল, “তুমি তো সামান্য পানি!”
ঝরনা মৃদু হেসে বলল,
“আমি পাহাড়ের বুকের জল। আমি নিচে নেমে ছড়া হবো, ছড়া থেকে নদী হবো। তোমার মাঠে যাবো, তোমার ফসল জন্মাবো, তোমার ঘরে পানি পৌঁছাবো।”
ঠিক তখন পাশের একটি গাছ কথা বলল,
“আর আমাকে?”
মানুষ বলল, “তুমি তো শুধু একটি গাছ!”
গাছ বলল,
“আমি শুধু গাছ নই। আমি তোমার নিঃশ্বাসের সঙ্গী। আমি বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করি, অক্সিজেন ছাড়ি। আমার শিকড় মাটিকে ধরে রাখে, আমার ছায়া মাটিকে শীতল রাখে, আমার ডালে পাখি বাসা বাঁধে, আমার পাতায় বৃষ্টির জল থামে।”
মানুষ এবার চুপ হয়ে গেল।
পাহাড় তখন ধীরে ধীরে বলল,
“আমাকে কাটলে ঝরনা হারাবে, গাছ কাটলে মাটি হারাবে, নদী হারালে সভ্যতা হারাবে, আর প্রকৃতি হারালে মানুষ নিজেকেই হারাবে।”
বন্ধুগণ, এই গল্প কোনো কল্পকথা নয়। এটি আমাদের বাস্তব জীবনের আয়না।
পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের অবস্থান খুবই ছোট
আমরা মানুষ নিজেদের পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী মনে করি। অথচ পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষ এসেছে প্রায় শেষ অধ্যায়ে।
পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন বছর। স্থলভাগে উদ্ভিদের বিস্তার শুরু হয়েছে প্রায় ৪৭ কোটি বছর আগে। বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদের বিকাশ এবং প্রাচীন বনভূমির বিস্তার ঘটেছে আরও পরে।
অর্থাৎ মানুষ আসার বহু কোটি বছর আগে পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মে নিজেকে সাজিয়েছে।
পাহাড় তৈরি হয়েছে।
নদী পথ কেটেছে।
বন জন্মেছে।
সমুদ্র তার ঢেউ তুলেছে।
বৃষ্টি মাটিকে ভিজিয়েছে।
অসংখ্য জীব পৃথিবীর জীবনের মহাকাব্যে নিজেদের অধ্যায় লিখেছে। মানুষ সেই মহাকাব্যের সর্বশেষ লেখক। কিন্তু আমরা যেন ভুলে গেছি, এই বইটি আমাদের লেখা নয়।
গাছ পৃথিবীর প্রাচীনতম সহযাত্রী একটি গাছকে আমরা প্রায়ই শুধু কাঠ, ফল কিংবা ছায়ার উৎস হিসেবে দেখি। কিন্তু একটি গাছের ভেতরে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির অসংখ্য জটিল প্রক্রিয়া।
গাছ বায়ুমণ্ডলের কার্বন চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার শিকড় মাটির কাঠামো ধরে রাখতে সাহায্য করে। বন বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশ ও সংরক্ষণে সহায়তা করে। গাছপালা অসংখ্য পাখি, কীটপতঙ্গ ও প্রাণীর আবাস তৈরি করে। একটি পুরোনো বনকে যদি আমরা কেটে ফেলি, শুধু কয়েক হাজার গাছ হারাই না, হারাই একটি সম্পূর্ণ জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। তাই বন মানে শুধু গাছের সারি নয়।
বন মানে মাটি, পানি, পাখি, প্রাণী, বাতাস, শিকড়, ছায়া এবং অসংখ্য অদৃশ্য জীবনের সমন্বিত সংসার।
পাহাড় প্রকৃতির জলাধার
পাহাড়কে আমরা অনেক সময় উন্নয়নের বাধা হিসেবে দেখি। কিন্তু পাহাড় প্রকৃতির বিশাল জলাধার এবং জলচক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পাহাড়ি বন বৃষ্টির পানি ধরে রাখে। সেই পানি ধীরে ধীরে ঝরনা ও ছড়ায় প্রবাহিত হয়। ছড়া নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়। নদী আবার মানুষের কৃষি, জীবিকা ও সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়।
অতএব, পাহাড়ের ওপর আঘাত মানে পানির ভবিষ্যতের ওপর আঘাত।
পাহাড় কাটা হলে শুধু সৌন্দর্য নষ্ট হয় না। ভূমিক্ষয়, পাহাড়ধস, পলি পরিবহন, ঝরনার স্বাভাবিক প্রবাহ এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রেও পরিবর্তন ঘটতে পারে।
আমাদের চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো তাই শুধু ভূমির উঁচু অংশ নয়। এগুলো আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পরিবেশগত নিরাপত্তার দেয়াল।
নদী মানবসভ্যতার শিরা উপশিরা
বিশ্বের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় বড় সভ্যতা নদীর তীরে জন্ম নিয়েছে।
নীল নদকে ঘিরে মিশরীয় সভ্যতা, টাইগ্রিস ইউফ্রেটিসকে ঘিরে মেসোপটেমীয় সভ্যতা, সিন্ধুকে ঘিরে সিন্ধু সভ্যতা এবং গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রকে ঘিরে বঙ্গীয় জনপদ গড়ে উঠেছে।
নদী যেন মানবসভ্যতার নীরব ধাত্রী।
বাংলাদেশকে তাই নদী ছাড়া কল্পনা করা যায় না।
আর চট্টগ্রামকে?
কর্ণফুলী ছাড়া চট্টগ্রামকে কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব।
কর্ণফুলী চট্টগ্রামের প্রাণের নদী
কর্ণফুলী ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রাম নগরীর পাশ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে।
এই নদী চট্টগ্রামের অর্থনীতি, বন্দর, নৌপরিবহন, শিল্প, মৎস্য এবং নগরজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
কর্ণফুলীর তীরে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর, যে বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার।
তাই কর্ণফুলীকে দূষিত করা মানে শুধু একটি নদীর পানি নষ্ট করা নয়। এটি চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা।
কর্ণফুলীর বুকেও ইতিহাসের ঢেউ
কর্ণফুলী শুধু অর্থনীতির সাক্ষী নয়, এটি ইতিহাসেরও সাক্ষী।
তার তীরে বাণিজ্যের পাল উঠেছে। তার বুক দিয়ে নৌযান চলেছে। তার তীরে নগর বেড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়েও নদীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কাপ্তাই বাঁধ এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্ণফুলীর ইতিহাসে যুক্ত করেছে উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জলাধার সৃষ্টি এবং মানুষের বাস্তুচ্যুতির মতো জটিল অধ্যায়।
অর্থাৎ কর্ণফুলীর ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
প্রকৃতিকে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু প্রকৃতির মূল্য ভুলে গেলে চলবে না।
কিন্তু সেই কর্ণফুলী আজ কাঁদছে
আজ কর্ণফুলীর পানিতে দূষণের চাপ রয়েছে। শিল্পবর্জ্য, নগরবর্জ্য, প্লাস্টিক, নৌযানের তেল, পয়ঃবর্জ্য এবং বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নদীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
আমরা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি, নদীকে ভালোবাসার কথা বলি। অথচ নদীর বুকেই ফেলে দিই আমাদের সভ্যতার আবর্জনা।
এ যেন মায়ের কোলে বসে মায়ের শরীরেই বিষ ঢেলে দেওয়া।
কর্ণফুলী আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। আমরা তাকে কী দিয়েছি?
জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ বাস্তবতা
জলবায়ু পরিবর্তন নতুন কোনো শব্দ নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে জলবায়ু বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানের ভয়াবহতা হলো, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবর্তনের গতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
শিল্পবিপ্লবের পর কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যাপক ব্যবহার, বন উজাড় এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে।
IPCC এর ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০ সময়ে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সময়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল এবং মানুষের কর্মকাণ্ডই এই উষ্ণায়নের প্রধান কারণ।
এই সংখ্যা হয়তো কাগজে ছোট। কিন্তু প্রকৃতিতে এর প্রতিধ্বনি অনেক বড়।
অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক বৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ আমাদের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
চট্টগ্রাম কেন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ
আমাদের বৃহত্তর চট্টগ্রাম ভৌগোলিকভাবে অসাধারণ বৈচিত্র্যময়।
একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র। মাঝখানে নদী, খাল, জলাভূমি, বন এবং ঘনবসতিপূর্ণ নগর।
এই ভূপ্রকৃতি আমাদের সৌন্দর্য দিয়েছে, অর্থনীতি দিয়েছে, বন্দর দিয়েছে, জীবিকা দিয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপ সবকিছু মিলিয়ে চট্টগ্রামকে ভবিষ্যতের জন্য নতুন করে ভাবতে হবে।
উন্নয়ন চাই, কিন্তু কেমন উন্নয়ন
আমি উন্নয়নের বিরুদ্ধে নই। বরং আমি মনে করি উন্নয়ন মানুষের অধিকার।
আমরা রাস্তা চাই।
সেতু চাই।
শিল্প চাই।
বন্দর চাই।
নগরায়ণ চাই।
কর্মসংস্থান চাই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, উন্নয়নের নামে আমরা কি প্রকৃতিকে হত্যা করব?
যে উন্নয়ন পাহাড় কেটে রাস্তা বানায়, কিন্তু কয়েক বছর পর সেই পাহাড় ধসে মানুষের প্রাণ নেয়, সেটি কি টেকসই উন্নয়ন?
যে শিল্প অর্থনীতি বাড়ায়, কিন্তু নদীকে বিষাক্ত করে, সেটি কি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন?
যে নগর ভবনের সংখ্যা বাড়ায়, কিন্তু খাল ভরাট করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে, সেটি কি পরিকল্পিত নগরায়ণ?
আমাদের উত্তর অবশ্যই হতে হবে, না।
উন্নয়ন হতে হবে এমন, যেখানে অর্থনীতি ও পরিবেশ একে অপরের শত্রু নয়, বরং সহযাত্রী।
সাংবাদিক হিসেবে আমার দায়
আমি দীর্ঘ তিন যুগের লেখালেখি ও সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, পরিবেশ নিয়ে সাংবাদিকতা শুধু গাছের ছবি ছাপা নয়।
সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো প্রশ্ন করা।
কে পাহাড় কাটছে?
কেন কাটছে?
কে অনুমতি দিচ্ছে?
কার বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে?
কেন বর্জ্য পরিশোধন হচ্ছে না?
কার দায়িত্ব নদী রক্ষা করা?
কেন জলাধার ভরাট হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোই পরিবেশ সাংবাদিকতার প্রাণ।
একজন সাংবাদিকের কলম কখনো কখনো একটি গাছের চারা রোপণের চেয়েও বড় কাজ করতে পারে, যদি সেই কলম অন্যায় বন্ধ করার শক্তি তৈরি করতে পারে।
নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে আমার আহ্বান
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে আমি মনে করি, পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত “চট্টগ্রাম পরিবেশ সুরক্ষা কর্মপরিকল্পনা”।
যেখানে থাকবে পাহাড় রক্ষা, বন রক্ষা, কর্ণফুলী রক্ষা, খাল উদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ, শিল্পবর্জ্য পরিশোধন এবং জলবায়ু সহনশীল নগর পরিকল্পনা।
শুধু প্রকল্প নয়, প্রয়োজন জবাবদিহি।
শুধু গাছ লাগানো নয়, প্রয়োজন গাছ বাঁচানো।
শুধু নদী পরিষ্কার নয়, প্রয়োজন নদীতে বর্জ্য পড়ার পথ বন্ধ করা।
শুধু পাহাড়ধসের পর উদ্ধার অভিযান নয়, প্রয়োজন পাহাড় কাটার আগেই প্রতিরোধ।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাব
বন্ধুগণ,
আমরা হয়তো আরও ৩০ বছর বাঁচব, ৪০ বছর বাঁচব।
কিন্তু আমাদের সন্তানরা?
আমাদের নাতি নাতনিরা?
তারা কেমন পৃথিবী পাবে?
আমরা কি তাদের জন্য রেখে যাব বিষাক্ত নদী, কাটা পাহাড়, উজাড় বন, দূষিত বাতাস ও জলাবদ্ধ নগর?
নাকি রেখে যাব একটি সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী?
আজকের সিদ্ধান্তই আগামী দিনের উত্তরাধিকার।
শেষ কথা
আমি আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই একটি উপলব্ধি দিয়ে।
একটি গাছ যখন আকাশের দিকে উঠে দাঁড়ায়, সে শুধু নিজের জন্য বাঁচে না। সে ছায়া দেয় অন্যকে।
একটি নদী যখন সাগরের দিকে ছুটে যায়, সে শুধু নিজের জন্য বয়ে চলে না। সে বহন করে মানুষের জীবন, কৃষি, মাছ, বন্দর এবং সভ্যতা।
একটি পাহাড় যখন হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, সে শুধু পাথরের স্তূপ নয়। সে ধরে রাখে বন, মাটি, পানি এবং অসংখ্য জীবনের আশ্রয়।
তাই,
গাছকে বাঁচানো মানে নিজের শ্বাসকে বাঁচানো।
পাহাড়কে বাঁচানো মানে নিজের পানির ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।
নদীকে বাঁচানো মানে সভ্যতাকে বাঁচানো।
আর জলবায়ুকে রক্ষা করা মানে মানবজাতির ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
আসুন, আমরা এমন একটি চট্টগ্রাম গড়ে তুলি, যেখানে পাহাড় থাকবে সবুজ, নদী থাকবে প্রবহমান, কর্ণফুলী থাকবে জীবন্ত, খাল থাকবে উন্মুক্ত, বন থাকবে সুরক্ষিত, আকাশ থাকবে নির্মল।
মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, প্রকৃতির হাত ধরে উন্নয়নের পথে হাঁটবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে,
“প্রকৃতি আমাদের উত্তরাধিকার নয়; প্রকৃতি আমাদের কাছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আমানত।”
সেই আমানতের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থাকুক।
পাহাড় বাঁচুক।
গাছ বাঁচুক।
নদী বাঁচুক।
কর্ণফুলী বাঁচুক।
চট্টগ্রাম বাঁচুক।
মানুষ বাঁচুক।
ধন্যবাদ।
এ্যাড ভিশন এর পক্ষ থেকে আমাকে সেরা বক্তা ও পরিবেশ রক্ষায় প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকায় একটি সম্মান সূচক পুরস্কার দেওয়ার হয়-

“”বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস আলোর ফ্রেমে সময়ের গল্প—একটি ক্লিকেই বন্দী জীবন ও ইতিহাস

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
আজ ১৯ আগস্ট—বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস। একটি ছবি কখনো শুধু একটি ছবি নয়; তার ভেতরে বন্দী থাকে সময়, স্মৃতি, অনুভূতি এবং ইতিহাস। আর এই আলোকচিত্রের বিশ্বযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ১৮৩৯ সালের ১৯ আগস্টের একটি ঐতিহাসিক দিন। ফরাসি উদ্ভাবক লুই-জাক-মান্দে দাগের (Louis-Jacques-Mandé Daguerre) উদ্ভাবিত ডাগেরিওটাইপ (Daguerreotype) আলোকচিত্র পদ্ধতি ওই দিন প্যারিসে ফরাসি বিজ্ঞান একাডেমির সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে ঘোষণা করা হয়। এটি ছিল স্থায়ী ছবি তৈরির প্রথম দিককার বাস্তব ও কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি, যা আধুনিক ফটোগ্রাফির বিকাশে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। দাগেরের এই কাজের পেছনে ছিলেন ফরাসি উদ্ভাবক নিকেফোর নিএপ্স (Nicéphore Niépce)-ও। নিএপ্স ১৮২০-এর দশকেই হেলিওগ্রাফি পদ্ধতিতে স্থায়ী আলোকচিত্র ধারণের পথ তৈরি করেছিলেন; পরবর্তীতে দাগেরের গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে আলোকচিত্রের প্রযুক্তি আরও কার্যকর রূপ পায়। ঐতিহাসিক সেই ১৯ আগস্ট ১৮৩৯-এর ঘটনাকেই স্মরণ করে প্রতিবছর ১৯ আগস্ট বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস পালিত হয়। তবে দিবসটির আধুনিক বিশ্বব্যাপী উদযাপনের উদ্যোগটি আরও সাম্প্রতিক; World Photography Day-এর নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, ভারতীয় ফটোগ্রাফি শিক্ষক ও. পি. শর্মা ১৯৮৮ সালে বিশ্বব্যাপী একটি ফটোগ্রাফি দিবস পালনের ধারণা দেন এবং ১৯৯১ সালে প্রথম পর্যায়ের উদযাপন শুরু হয়। পরে অনলাইনভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিস্তৃত হয়। সেই থেকে ক্যামেরা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, ফিল্ম থেকে ডিজিটাল, আর ডিজিটাল থেকে স্মার্টফোন—ফটোগ্রাফি পৌঁছে গেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। কিন্তু বদলায়নি এর মূল শক্তি—একটি ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তকে ধরে রেখে তাকে স্মৃতিতে, আর কখনো কখনো ইতিহাসে পরিণত করা। আজকের এই দিনে তাই ফটোগ্রাফিকে শুধু একটি শিল্প হিসেবে নয়, মানুষের স্মৃতি, সমাজের দলিল এবং সময়ের নীরব ভাষা হিসেবে স্মরণ করি। আর শ্রদ্ধা জানাই সেইসব আলোকচিত্রীকে, যাঁদের একটি ক্লিক কখনো কখনো হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমি এই বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস। আলোকচিত্রের এই বিশেষ দিনে বিশ্বের সব ফটোগ্রাফার, আলোকচিত্রী, ক্যামেরাপ্রেমী ও দৃশ্যশিল্পীদের প্রতি জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা, গভীর শ্রদ্ধা এবং অফুরন্ত ভালোবাসা। ফটোগ্রাফি আমার কাছে নিছক ছবি তোলার কোনো প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়। এটি সময়কে ধরে রাখার শিল্প, স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব ভাষা এবং ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম। শব্দ যেখানে অনেক সময় থেমে যায়, একটি ছবি সেখানে অনায়াসে কথা বলে। একটি ছবি কখনো হাসায়, কখনো কাঁদায়, কখনো প্রশ্ন তোলে, আবার কখনো বহু বছর আগের কোনো বিস্মৃত দরজা খুলে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় অতীতে। আমিও জানি ফটোগ্রাফি। এ কথা বলার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের এক ভালোবাসা, কৌতূহল এবং স্মৃতি। ফটোগ্রাফির প্রতি আমার আকর্ষণ শৈশব থেকেই। ছোট্ট বয়সে ক্যামেরার বাটনে আলতো করে চাপ দিয়ে যখন প্রথম ছবি তুলেছিলাম, তখন হয়তো বুঝিনি—সেই ছোট্ট ক্লিকটি আমার ভেতরে একটি দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার জন্ম দেবে। ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারের ছোট্ট ফ্রেমের ভেতর দিয়ে পৃথিবীকে দেখা ছিল আমার কাছে এক ধরনের বিস্ময়। একই দৃশ্য, একই মানুষ, একই প্রকৃতি—ক্যামেরার চোখে যেন অন্য এক অর্থ নিয়ে হাজির হতো। সময়ের সঙ্গে সেই ভালোবাসা হারিয়ে যায়নি; বরং আরও গভীর হয়েছে। জেনিথ ক্যামেরা ও এক অন্যরকম সময়
২০০১ সালে চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফি সোসাইটি আয়োজিত বেসিক ফটোগ্রাফি কোর্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ আমার ফটোগ্রাফি-জীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। তখন হাতে ছিল আমার প্রিয় রাশিয়ান জেনিথ ক্যামেরা। আজকের স্মার্টফোনের মতো এক ক্লিকে ছবি তুলে সঙ্গে সঙ্গে দেখে নেওয়ার সুযোগ তখন ছিল না। প্রতিটি ফ্রেমের আগে ছিল ভাবনা, অপেক্ষা ও হিসাব। আলো কোথা থেকে আসছে, বিষয়টি ফ্রেমের কোথায় থাকবে, ব্যাকগ্রাউন্ড কেমন হবে, কখন শাটার চাপতে হবে—এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হতো। ভুল করলে মুহূর্তটি আর ফিরে আসত না। সেই সময়ের ফটোগ্রাফি আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—ছবি তোলার আগে ছবি দেখতে হয়। ক্যামেরার লেন্সের ভেতর দিয়ে শুধু দৃশ্য দেখলেই হয় না; দৃশ্যের অন্তর্নিহিত গল্পটিও দেখতে হয়। একজন মানুষের মুখের হাসির পেছনে হয়তো দীর্ঘদিনের কষ্ট আছে, একজন বৃদ্ধের চোখে হয়তো একটি প্রজন্মের ইতিহাস আছে, একটি পুরোনো ভবনের দেয়ালে হয়তো একটি শহরের স্মৃতি লুকিয়ে আছে। ফটোগ্রাফারের চোখকে তাই শুধু ক্যামেরার চোখ হলেই চলে না; তাকে হতে হয় অনুভূতির চোখ। আজও সেই জেনিথ ক্যামেরার প্রতি আমার আলাদা টান রয়েছে। জীবনের ব্যস্ততা, সাংবাদিকতা, লেখালেখি, গবেষণা ও নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে নেওয়া হয়নি। কিন্তু কোনো ভালোবাসা পেশা না হলেই যে তার মূল্য কমে যায়, তা নয়। বরং কিছু ভালোবাসা জীবনের গভীরে শখ, স্মৃতি ও নেশা হয়ে বেঁচে থাকে। সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও ফটোগ্রাফি—তিনটি ভাষা, একটি সত্য দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা ও লেখালেখির অভিজ্ঞতা আমাকে আরও বেশি করে বুঝিয়েছে—শব্দ এবং ছবির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একজন সাংবাদিক ঘটনার ভাষ্য লেখেন, একজন লেখক অনুভূতিকে শব্দে রূপ দেন আর একজন ফটোগ্রাফার সেই মুহূর্তকে দৃশ্যমান করে তোলেন। তিনজনের পথ আলাদা হলেও লক্ষ্য অনেক সময় এক—সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরা। একটি সংবাদ হয়তো কয়েকদিন পর পুরোনো হয়ে যায়। একটি লেখা হয়তো সময়ের সঙ্গে বিস্মৃত হয়। কিন্তু একটি শক্তিশালী আলোকচিত্র বহু দশক পরও মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে পারে। ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আমরা আজও মনে রাখি ছবির কারণে। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, আন্দোলন, মানুষের বিজয়, বেদনা, আনন্দ, বিপর্যয়, মানবিকতার অসংখ্য মুহূর্ত—সবই ফটোগ্রাফির মাধ্যমে আমাদের কাছে দৃশ্যমান হয়ে আছে। তাই ফটোগ্রাফার কেবল ক্যামেরা হাতে থাকা একজন মানুষ নন। তিনি অনেক সময় সময়ের সাক্ষী, ইতিহাসের নীরব দলিল-সংরক্ষক এবং সমাজের দৃশ্যমান বিবেক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লেখক সম্মেলন, সাহিত্যসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেখানে আমার একটি স্বাভাবিক অভ্যাস আছে—প্রথমেই একজন ভালো ফটোগ্রাফারের খোঁজ করি। কারণ আমি জানি, আজকের মুহূর্তটি আগামীকাল আর থাকবে না। আজ যে মানুষটির সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি, হয়তো কয়েক বছর পর তিনি অন্য দেশে থাকবেন। যে সাহিত্যিকের সঙ্গে আজ প্রাণখোলা আড্ডা, হয়তো সময়ের স্রোতে সেই আড্ডা শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে। যে সম্মেলন আজ প্রাণবন্ত, একদিন তার মঞ্চও হয়তো অতীতের অংশ হয়ে যাবে। কিন্তু একটি ছবি সেই মুহূর্তটিকে ধরে রাখতে পারে।
অনেক বছর পর পুরোনো ছবি খুলে দেখলে মনে হয়—সময় আসলে কোথাও হারিয়ে যায়নি; ছবির ভেতর নীরবে ঘুমিয়ে আছে। মোবাইল ক্যামেরার যুগ—ফটোগ্রাফির গণতন্ত্র
প্রযুক্তির অগ্রগতিতে ফটোগ্রাফি আজ মানুষের হাতের মুঠোয়। স্মার্টফোনের ক্যামেরা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে ছবি তোলার সুযোগ দিয়েছে। আজ একটি শিশুও মুহূর্তের মধ্যে ছবি তুলতে পারে, সম্পাদনা করতে পারে এবং পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। এটি ফটোগ্রাফির ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, ক্যামেরা ছবি তুলতে পারে; কিন্তু ছবির গল্প আবিষ্কার করতে পারে মানুষের চোখ ও মন। একটি দামি ক্যামেরা থাকলেই একজন মানুষ বড় ফটোগ্রাফার হয়ে যান না। আবার সাধারণ একটি মোবাইল ফোন দিয়েও অসাধারণ ছবি তৈরি করা সম্ভব—যদি তার পেছনে থাকে সঠিক মুহূর্ত চিনে নেওয়ার ক্ষমতা, নান্দনিক দৃষ্টি এবং মানবিক অনুভূতি। ফটোগ্রাফির মূল শক্তি যন্ত্রে নয়; দৃষ্টিভঙ্গিতে।
একটি ছবি মানেই একটি গল্প আমি মনে করি, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনেই অসংখ্য ছবি লুকিয়ে আছে। কারও মুখে সংগ্রামের ইতিহাস, কারও চোখে অপেক্ষা, কারও হাসিতে সাফল্যের আনন্দ, কারও নীরবতায় হারানোর বেদনা। একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার সেই অদৃশ্য গল্পটিকে দৃশ্যমান করে তোলেন। বৃষ্টিতে ভেজা রিকশাচালক, ভোরের আলোয় হাঁটতে থাকা শ্রমিক, নদীর ঘাটে অপেক্ষমাণ মাঝি, স্কুলে ছুটে চলা শিশু, বৃদ্ধ মায়ের জানালার পাশে বসে থাকা কিংবা কোনো তরুণীর স্বপ্নময় চোখ—এসবই আসলে জীবনের ছবি। ফটোগ্রাফি তাই শুধু সৌন্দর্য খোঁজে না; ফটোগ্রাফি বাস্তবতাকেও ধারণ করে। কখনো একটি ছবি সমাজের অন্যায় তুলে ধরে, কখনো মানুষের দুর্দশা দেখায়, কখনো পরিবেশ বিপর্যয়ের দলিল হয়ে ওঠে, আবার কখনো মানবিকতার এমন গল্প বলে—যা হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। ছবির ভেতর মানুষ, মানুষের ভেতর ইতিহাস একটি পুরোনো ছবি হাতে নিলে আমরা শুধু ছবির মানুষগুলোকে দেখি না। আমরা দেখতে পাই সেই সময়ের পোশাক, স্থাপত্য, রাস্তা, যানবাহন, সামাজিক সম্পর্ক, মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও পরিবর্তনের ইতিহাস। এই কারণেই ফটোগ্রাফি একটি জাতির স্মৃতিভাণ্ডার। আজকের একটি সাধারণ রাস্তার ছবি হয়তো আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু পঞ্চাশ বছর পর সেই ছবিই গবেষকের কাছে একটি শহরের পরিবর্তনের মূল্যবান দলিল হতে পারে। আজকের একটি পারিবারিক ছবি আগামী প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠতে পারে তাদের পূর্বপুরুষকে জানার একমাত্র জানালা। এই জায়গাতেই ফটোগ্রাফির মহত্ত্ব। আমার কাছে ফটোগ্রাফি—সময়ের সঙ্গে এক নীরব বন্ধুত্ব
লেখালেখির কারণে আমি শব্দের সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করেছি। শব্দ দিয়ে মানুষ, সমাজ, ইতিহাস ও সময়কে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ফটোগ্রাফি আমাকে শিখিয়েছে সব গল্প শব্দে বলা যায় না।

কিছু গল্প শুধু চোখে দেখা যায়।
কিছু অনুভূতি শুধু একটি ছবিতে ধরা পড়ে।
কিছু স্মৃতি শুধু একটি পুরোনো ছবির স্পর্শেই ফিরে আসে।
তাই আমার কাছে ক্যামেরা শুধু একটি যন্ত্র নয়; এটি সময়ের সঙ্গে মানুষের এক নীরব বন্ধুত্বের মাধ্যম।
আজও কোনো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সামনে এলে মনে হয়—এটি ধরে রাখা দরকার।
কারণ আমরা জানি না, এই মুহূর্তটি ভবিষ্যতে কতটা মূল্যবান হয়ে উঠবে।
ফটোগ্রাফারদের প্রতি শ্রদ্ধা
বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবসে তাই বিশ্বের সকল ফটোগ্রাফার বন্ধুর প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা। আপনারা আলোকে ভাষা দেন, মুহূর্তকে স্মৃতিতে পরিণত করেন, স্মৃতিকে ইতিহাসে রূপ দেন। আপনারা মানুষের হাসি যেমন ধারণ করেন, তেমনি কান্নাও ধারণ করেন। আপনারা প্রকৃতির সৌন্দর্য যেমন দেখান, তেমনি সমাজের অন্ধকার বাস্তবতাও মানুষের সামনে তুলে ধরেন। আপনাদের ক্যামেরার প্রতিটি ক্লিক হয়তো ক্ষণিকের শব্দ কিন্তু তার প্রতিধ্বনি অনেক বছর বেঁচে থাকতে পারে।
একটি ক্লিক—একটি মুহূর্ত।
একটি মুহূর্ত—একটি স্মৃতি।
একটি স্মৃতি—একটি গল্প।
আর একটি গল্প—কখনো কখনো হয়ে ওঠে ইতিহাস। আজ বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবসে আমার সেই শৈশবের ক্যামেরাপ্রেমকে নতুন করে স্মরণ করছি। স্মরণ করছি ২০০১ সালের সেই বেসিক ফটোগ্রাফি কোর্স, আমার প্রিয় রাশিয়ান জেনিথ ক্যামেরা এবং ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কারের সেই দিনগুলো। ফটোগ্রাফি পেশা হিসেবে আমার জীবনের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠেনি; কিন্তু ভালোবাসা হিসেবে এটি আজও আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে। আমি লেখক, সাংবাদিক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক—কিন্তু তার পাশাপাশি আমি একজন ক্যামেরাপ্রেমী মানুষও।
আর তাই আজ নির্দ্বিধায় বলতে পারি “আমিও জানি ফটোগ্রাফি—কারণ আমি জানি, একটি ছবির ভেতর শুধু একটি দৃশ্য নয়; সেখানে লুকিয়ে থাকে একটি মানুষের জীবন, একটি সময়ের গল্প এবং কখনো কখনো একটি জাতির ইতিহাস।”
বিশ্বের সকল আলোকচিত্রী বন্ধুকে জানাই বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
আলো থাকুক আপনাদের লেন্সে,
অনুভূতি থাকুক আপনাদের চোখে,
মানবিকতা থাকুক আপনাদের ছবিতে,
আর আপনাদের প্রতিটি ক্লিক হয়ে উঠুক আগামী দিনের ইতিহাস।

“হাসিব আজিজের নেতৃত্বে শক্তিশালী এপিবিএনের প্রত্যাশা-

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
কিছু নেতৃত্ব শুধু দায়িত্ব পালন করে না, দায়িত্বের ভেতর নতুন স্বপ্নের জন্ম দেয়। কিছু মানুষ শুধু একটি বাহিনীকে পরিচালনা করেন না, বরং সহকর্মীদের হৃদয়ে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও পেশাদারিত্বের আলো জ্বালিয়ে দেন। এপিবিএনের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ তেমনই এক নেতৃত্বের প্রত্যাশার নাম। পুলিশের ইউনিফর্ম শুধু একটি পোশাক নয়—এটি মানুষের নিরাপত্তার অঙ্গীকার, রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব এবং বিপদের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহসের প্রতীক। সেই ইউনিফর্ম পরা প্রতিটি সদস্যের মনোবল যত দৃঢ় হবে, জনগণের নিরাপত্তার প্রাচীরও তত শক্ত হবে। হাসিব আজিজের নেতৃত্বে এপিবিএনের প্রতিটি সদস্যের মনে জাগুক এই বিশ্বাস—আমরা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী নই; আমরা মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা ও আশার প্রহরী। ঝড় আসবে, সংকট আসবে, কঠিন দায়িত্বও আসবে; কিন্তু প্রশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ পুলিশ সদস্য কখনো দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যায় না। কারণ তার শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়—তার শক্তি সাহসে, শৃঙ্খলায়, সততায়, মানবিকতায় এবং আইনের প্রতি অবিচল আনুগত্যে। এপিবিএনের প্রতিটি সদস্যের প্রতি তাই শ্রদ্ধা—আপনারা রাত জেগে যে নিরাপত্তার প্রহরা দেন, তার মূল্য হয়তো সবসময় দৃশ্যমান নয়; কিন্তু একটি নিরাপদ সকাল, একটি শান্ত নগরী এবং একটি নিশ্চিন্ত পরিবারে আপনাদের সেই নীরব ত্যাগেরই প্রতিচ্ছবি থাকে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন—এপিবিএন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত বাহিনী। সাধারণ পুলিশিংয়ের বাইরে যখন সশস্ত্র অপরাধী, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, ভিআইপি নিরাপত্তা, শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা, বড় ধরনের জনসমাবেশ কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সংগঠিতভাবে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজন হয়, তখন এপিবিএনের গুরুত্ব বিশেষভাবে সামনে আসে। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপিবিএনের যাত্রা শুরু ১৯৭৫ সালে এবং The Armed Police Battalions Ordinance, 1979 ও Armed Police Battalion Rules, 1991-এর অধীনে এর আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। বাহিনীর মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, সশস্ত্র অপরাধী চক্র দমন, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা। বর্তমানে APBn-এর ১১টি ব্যাটালিয়ন এবং Special Security and Protection Battalion-এর দুটি ব্যাটালিয়ন রয়েছে বলে বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। Bangladesh Police এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে এপিবিএনের সক্ষমতা, আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা। আর এই সময়েই এপিবিএনের নেতৃত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ, বিপিএম। তাঁর নেতৃত্বে এপিবিএনকে আরও দক্ষ, আধুনিক ও পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তরের প্রত্যাশা তাই অমূলক নয়। হাসিব আজিজের সামনে বড় দায়িত্ব একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রধান হওয়া কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি একই সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দর্শন বাস্তবায়নের সুযোগ। হাসিব আজিজের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু—এপিবিএন কীভাবে আজকের দায়িত্ব পালন করবে—তা নয়। প্রশ্ন আরও বড়— আগামী ১০ বছর পর বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতায় এপিবিএনকে আমরা কোথায় দেখতে চাই? কারণ অপরাধের ধরন বদলেছে। অপরাধী এখন শুধু অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নামে না। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি, অনলাইন যোগাযোগ, ডিজিটাল অর্থ লেনদেন, সাইবার অপরাধ, আধুনিক চোরাচালান, আন্তঃজেলা অপরাধচক্র এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। অতএব, ১৯৭৯ সালে যে বাস্তবতার জন্য এপিবিএনের আইনগত কাঠামো তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। আইন একই ভিত্তি দিতে পারে; কিন্তু সক্ষমতাকে সময়ের সঙ্গে আধুনিক করতেই হবে। আইনের ভিত শক্ত—এখন প্রয়োজন সক্ষমতার বিস্তার এপিবিএনের আইনগত ভিত্তি দুর্বল নয়। ১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশে বাহিনীর উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এপিবিএনের দায়িত্বের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার, সশস্ত্র অপরাধী গ্রেপ্তার এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তার বিষয় রয়েছে। Bangladesh Police এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এপিবিএনের শক্তি শুধু তার অস্ত্রে নয়—তার সংগঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা, দ্রুত মোতায়েনযোগ্যতা এবং বিশেষায়িত দায়িত্ব পালনের সক্ষমতায়। তাই বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার অর্থ শুধু অস্ত্র কেনা নয়। এর অর্থ— মানুষ প্রশিক্ষণ প্রযুক্তি গোয়েন্দা সক্ষমতা যোগাযোগ আধুনিক সরঞ্জাম আইনগত স্পষ্টতা জবাবদিহি। এই আটটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়াতে হবে ভবিষ্যতের এপিবিএনকে। সরকারের কাছে প্রথম প্রস্তাব: এপিবিএনের জন্য ১০ বছর মেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা আমার প্রস্তাব, সরকার এপিবিএনের জন্য একটি ১০ বছর মেয়াদি Master Modernisation Plan গ্রহণ করতে পারে। এই পরিকল্পনার আওতায় পর্যায়ক্রমে নতুন ও আধুনিক সরঞ্জাম; উন্নত সুরক্ষা পোশাক ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম; আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা; দ্রুতগামী ও বিশেষায়িত যানবাহন; উন্নত কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থা; ড্রোন ও বৈধ নজরদারি প্রযুক্তি; ডিজিটাল ম্যাপিং; আধুনিক প্রশিক্ষণ অবকাঠামো; দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতির সরঞ্জাম; ডিজিটাল ফরেনসিক সহায়তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। এতে একদিকে বাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনাহীনভাবে বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার প্রবণতা কমবে। দ্বিতীয় প্রস্তাব: আধুনিক APBn Training & Research Institute এপিবিএনের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের Training, Research & Doctrine Centre প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। সেখানে প্রশিক্ষণের বিষয় হতে পারে আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি, মানবাধিকার, জনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাস ও সশস্ত্র অপরাধ মোকাবিলা, জিম্মি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগকালীন নিরাপত্তা, সাইবার সচেতনতা, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ, আধুনিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং নেতৃত্বের দক্ষতা। প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে Use of Force Doctrine—কখন, কী পরিস্থিতিতে এবং কতটুকু আইনসম্মত শক্তি প্রয়োগ করা যাবে তার স্পষ্ট ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ। এতে বাহিনীর শক্তি যেমন বাড়বে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের ঝুঁকিও কমবে। তৃতীয় প্রস্তাব: প্রযুক্তিনির্ভর এপিবিএন আজকের অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তি কোনো বিলাসিতা নয়—প্রয়োজন। এপিবিএনের মধ্যে একটি বিশেষায়িত Technology & Intelligence Support Wing গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এর কাজ হতে পারে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অপরাধের প্রবণতা বিশ্লেষণ; ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ; অপরাধের ডেটা বিশ্লেষণে সহায়তা; ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা; অপরাধী নেটওয়ার্কের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ; অন্যান্য পুলিশ ইউনিটের সঙ্গে তথ্য বিনিময়। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই সংবিধান, প্রচলিত আইন, আদালতের নির্দেশনা ও নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সীমারেখায় হতে হবে। কারণ আধুনিক পুলিশিং মানে শুধু বেশি নজরদারি নয়; আরও বুদ্ধিমান, লক্ষ্যভিত্তিক ও আইনসম্মত পুলিশিং। চতুর্থ প্রস্তাব: দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বিশেষায়িত ইউনিট বড় ধরনের সশস্ত্র অপরাধ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা সংকট কিংবা হঠাৎ বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য ইউনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এপিবিএনের বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও প্রশিক্ষিত Rapid Response Teams তৈরি করা যেতে পারে। তাদের নিয়মিত মহড়া, সমন্বিত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে তাদের কার্যক্রমের ক্ষেত্র ও ক্ষমতা স্পষ্টভাবে আইন ও সরকারি নির্দেশনার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। চট্টগ্রামের জন্য এপিবিএনের বিশেষ গুরুত্ব একজন চট্টগ্রামবাসী হিসেবে আমার কাছে এপিবিএনের ৯ এপিবিএন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৯ এপিবিএন চট্টগ্রামে অবস্থান করে এবং তাদের দায়িত্বের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা দায়িত্বের পাশাপাশি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও অন্যান্য ইউনিটকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা এবং চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সহায়তার বিষয় রয়েছে। Bangladesh Police চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী নয়; এটি সমুদ্রবন্দর, শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন, পাহাড় ও সমুদ্রের মিলিত একটি কৌশলগত অঞ্চল। চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব, শিল্পাঞ্চল, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, পর্যটন কেন্দ্র এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় এ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখানে এপিবিএনের সক্ষমতা বৃদ্ধি শুধু চট্টগ্রামের নিরাপত্তা নয়—জাতীয় অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। শিল্পাঞ্চলে এপিবিএনের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন এপিবিএনের ৭ নম্বর ব্যাটালিয়নের দায়িত্বের উদাহরণটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রয়োজন থেকে এই ইউনিটকে শিল্পাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।  Bangladesh Police বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ শিল্প ও রপ্তানিনির্ভর। তাই শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হলে তার প্রভাব শুধু একটি কারখানায় পড়ে না—উৎপাদন, রপ্তানি, শ্রমিকের জীবন, বিনিয়োগ ও দেশের অর্থনীতির ওপরও পড়ে। এ কারণে শিল্পাঞ্চলে এপিবিএনের দায়িত্বকে আরও আধুনিক প্রশিক্ষণ, সংঘাত নিরসন দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে শক্তিশালী করা যেতে পারে। এপিবিএনের জনবল বাড়ানো প্রয়োজন—কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে বর্তমান সময়ের নিরাপত্তা চাহিদা বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ব্যাটালিয়ন এবং জনবল বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু শুধু সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রতিটি নতুন সদস্যকে হতে হবে— প্রশিক্ষিত, শারীরিকভাবে সক্ষম, প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন, আইনজ্ঞানসম্পন্ন এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন। একজন দক্ষ এপিবিএন সদস্যকে জানতে হবে— কখন অভিযান পরিচালনা করতে হয়, কখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কখন আলোচনা করতে হয় এবং কখন অন্য ইউনিটের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হয়। এটাই আধুনিক বিশেষায়িত পুলিশিং। সদস্যদের কল্যাণকে আধুনিকায়নের অংশ করতে হবে
একটি বাহিনীর সদস্য যদি দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত আবাসন, অনিয়মিত বিশ্রাম বা পারিবারিক সংকটের মধ্যে থাকেন, তাহলে তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব আশা করা কঠিন। তাই এপিবিএনের আধুনিকায়ন পরিকল্পনায় থাকতে পারে উন্নত ব্যারাক, আধুনিক চিকিৎসা, পরিবার কল্যাণ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী পুনর্বাসন এবং সদস্যদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ। সদস্যের পরিবার নিরাপদ থাকলে সদস্যও দায়িত্ব পালনে আরও মনোযোগী হতে পারেন। হাসিব আজিজের নেতৃত্বে ‘People-Centred APBn’ এপিবিএনের আধুনিকায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে জনসম্পৃক্ততা। এপিবিএনকে জনগণ যেন শুধু অস্ত্রধারী বাহিনী হিসেবে না দেখে; বরং নিরাপত্তার অংশীদার হিসেবে দেখে—এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে কমিউনিটি সচেতনতা; স্কুল-কলেজে নিরাপত্তা সচেতনতা; মাদকবিরোধী প্রচারণা; দুর্যোগে মানবিক সহায়তা; নারী ও শিশু নিরাপত্তা সচেতনতা; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে। এতে এপিবিএনের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব কমবে। আইনগত ক্ষমতা বাড়াতে হলে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে এখানে আমি বিশেষভাবে একটি কথা বলতে চাই। এপিবিএনকে শক্তিশালী করার দাবি মানে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়ার দাবি নয়। বরং প্রয়োজন আইনগতভাবে স্পষ্ট ক্ষমতা। কোন ক্ষেত্রে এপিবিএন নিজে ব্যবস্থা নেবে, কোন ক্ষেত্রে জেলা পুলিশকে সহায়তা করবে, কোন ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করবে এবং কোন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা ও তদন্তের প্রক্রিয়া চলবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা দরকার। এতে মাঠপর্যায়ের সদস্যদেরও আইনি বিভ্রান্তি কমবে। এবং জনগণের কাছেও বাহিনীর দায়িত্ব ও ক্ষমতা পরিষ্কার থাকবে। জবাবদিহিই হবে শক্তির দ্বিতীয় নাম এপিবিএনের ক্ষমতা ও সক্ষমতা যত বাড়বে, জবাবদিহিও তত বাড়াতে হবে। আমি মনে করি, একটি আধুনিক এপিবিএনের পাঁচটি নীতি থাকা উচিত আইন প্রতিটি অভিযান আইনের ভিত্তিতে। শৃঙ্খলা প্রতিটি সদস্য কমান্ড কাঠামোর মধ্যে। পেশাদারিত্ব ব্যক্তিগত আবেগ নয়, প্রশিক্ষণ ও প্রটোকল। মানবিকতা অপরাধী দমন করা হবে, কিন্তু নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি নয়। জবাবদিহি প্রতিটি ক্ষমতা প্রয়োগের যুক্তিসংগত নথি ও তদারকি থাকবে। এটাই হতে পারে আধুনিক এপিবিএনের আদর্শ। হাসিব আজিজের কাছে প্রত্যাশা এপিবিএনের প্রধান হিসেবে হাসিব আজিজের কাছে আমার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা—তিনি যেন বাহিনীকে শুধু প্রচলিত দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আগামী দিনের বাংলাদেশকে সামনে রেখে একটি আধুনিক বিশেষায়িত পুলিশ বাহিনীর রূপরেখা তৈরি করেন। তার নেতৃত্বে একটি “APBn Vision 2035” প্রণয়ন করা যেতে পারে। যেখানে থাকবে কেমন হবে এপিবিএন ২০৩০ সালে? কেমন হবে ২০৩৫ সালে? কতজন জনবল প্রয়োজন? কতটি নতুন ব্যাটালিয়ন প্রয়োজন? কোন কোন অঞ্চলে নতুন ইউনিট প্রয়োজন? কোন প্রযুক্তি প্রয়োজন? কোন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন? কোন ধরনের আইনগত সংস্কার প্রয়োজন? কীভাবে মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে? এসবের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা দরকার। সরকারের কাছে একটি সমন্বিত প্রস্তাব সরকার চাইলে এপিবিএনের জন্য একটি বিশেষ “APBn Modernisation and Capacity Development Programme” গ্রহণ করতে পারে। এর পাঁচটি প্রধান স্তম্ভ হতে পারে, জনবল ও নতুন ব্যাটালিয়ন,আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমত প্রশিক্ষণ ও সদস্য কল্যাণআইন, মানবাধিকার ও জবাবদিহি এই পাঁচটি বিষয় বাস্তবায়ন করা গেলে এপিবিএনকে আগামী দশকের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য অনেক বেশি প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। এপিবিএন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কোনো অতিরিক্ত অলংকার নয়; এটি প্রয়োজনের সময়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত সক্ষমতা। ১৯৭৯ সালের আইন থেকে আজকের বাস্তবতা পর্যন্ত এপিবিএনের দায়িত্বের পরিধি ও প্রয়োজনীয়তা পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্যও দেখায় যে বাহিনীটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সশস্ত্র অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও স্থাপনার নিরাপত্তা এবং অন্যান্য পুলিশ ইউনিটকে সহায়তার মতো বহুমুখী দায়িত্ব পালন করছে। Bangladesh Police তাই এখন সময় এসেছে এপিবিএনকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আরও আধুনিক, আরও পেশাদার এবং আরও জবাবদিহিমূলক করে গড়ে তোলার। এখানে অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজের নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক নেতৃত্ব এবং বিশেষায়িত বাহিনীর দায়িত্ব—এই তিনটি অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি যদি সরকারের কাছে একটি সুসংগঠিত আধুনিকায়ন প্রস্তাব তুলে ধরতে পারেন, তাহলে এপিবিএনের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমার বিশ্বাস “শক্তিশালী এপিবিএন মানে শুধু শক্তিশালী অস্ত্র নয়; শক্তিশালী প্রশিক্ষণ, শক্তিশালী প্রযুক্তি, শক্তিশালী নৈতিকতা, শক্তিশালী আইনজ্ঞান এবং শক্তিশালী জবাবদিহি।” আর সেই শক্তির কেন্দ্রে থাকবে জনগণের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা। হাসিব আজিজের নেতৃত্বে এপিবিএন হয়ে উঠুক—আধুনিক বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর, মানবিক ও আস্থাভাজন বিশেষায়িত পুলিশ বাহিনী।

নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ পোস্টের অভিযোগ, জাকির হোসেন ইমনকে বহিষ্কারের দাবিতে মানববন্ধন

0

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ, আপত্তিকর ও মানহানিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে জাকির হোসেন ইমনকে সাংবাদিকদের সব সংগঠন থেকে বহিষ্কারের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের নিয়ে অশালীন ও মানহানিকর মন্তব্যের মাধ্যমে তাদের সামাজিক ও পেশাগতভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাংবাদিক সমাজের মর্যাদা ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেন তারা। বক্তারা বলেন, সাংবাদিকতা পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে এ ধরনের হয়রানি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। মানববন্ধন থেকে ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলসহ সাংবাদিকদের সব সংগঠন থেকে জাকির হোসেন ইমনকে বহিষ্কার এবং অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। বক্তারা আরও বলেন, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা নিয়মতান্ত্রিক ও আইনসম্মতভাবে সমাধান করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও মানহানিকর প্রচারণা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হাত ছেড়ে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর নিহত

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে মোটরসাইকেল চালিয়ে ভিডিও তৈরির সময় গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে শাওন মিয়া নামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর নিহত হয়েছেন। রোববার (১৭ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে গোবিন্দগঞ্জ-রাজা বিরাট সড়কের ইসলামপুর কারেন্টের মোড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শাওন মিয়া (৩০) মোকামতলা উপজেলার দাড়িদহ সরদার পাড়া গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোবিন্দগঞ্জ-রাজা বিরাট সড়কের ইসলামপুর কারেন্টের মোড় এলাকায় সকালে শাওন মিয়া দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে ভিডিও বানাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি হ্যান্ডেল থেকে দুই হাত ছেড়ে মোটরসাইকেল চালানোর চেষ্টা করলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে থাকা একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত উদ্ধার করে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। প্রত্যক্ষদর্শী জুয়েল বলেন, আমি নিজে দেখেছি, তিনি দুই হাত ছেড়ে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন এবং ভিডিও করছেন। তারপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেলটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ওমর ফারিক রনি বলেন, নিহত শাওন ভাই চলন্ত মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেল ছেড়ে দিয়ে ভিডিও বানাতেন। আজ একই ভিডিও করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। শাওন দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। সম্প্রতি বাড়িতে এসে ভিডিও বানানো শুরু করেন। তিনি পাঁচ মাস আগে বিয়ে করেছেন। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাসুদুর রহমান বলেন, ১১টার দিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) স্বপন কুমার সরকার বলেন, মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এক যুবক নিহত হয়েছেন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ এখন পর্যন্ত দেয়নি।

বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ট্যাক্সিচালক নেবে দুবাই, সরাসরি সাক্ষাৎকার ২৯-৩০ আগস্ট

0

বাংলাদেশ থেকে এক হাজার ট্যাক্সিচালক নিয়োগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই। এ লক্ষ্যে আগামী ২৯ ও ৩০ আগস্ট রাজধানীর বাংলাদেশ-কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সরাসরি সাক্ষাৎকার ও বাছাই অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি আল আনাস ওভারসিজ (আরএল-২৭৩৫) নিয়োগ কার্যক্রমের স্থানীয় আয়োজন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে। প্রার্থীদের সরাসরি সাক্ষাৎকার নিতে দুবাইয়ের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসবে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ মে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানির প্রতিনিধিরা বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের আগ্রহের কথা জানান। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে বিশ্বের ২৭টি দেশ থেকে প্রায় ১৫ হাজার কর্মী তাদের প্রতিষ্ঠানে ট্যাক্সি ও লিমোজিন চালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজারই বাংলাদেশি। বাংলাদেশি কর্মীদের পরিশ্রমী হিসেবে উল্লেখ করে তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগের কথাও জানানো হয়। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রার্থীদের কমপক্ষে এসএসসি পাস হতে হবে এবং বয়স হতে হবে ২৩ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। চাকরির মেয়াদ দুই বছর, যা নবায়নযোগ্য। নির্বাচিত কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুযায়ী কমিশনভিত্তিক আয় করার সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ড্রাইভিং লাইসেন্স, মেডিকেল পরীক্ষা ও এমিরেটস আইডি সংক্রান্ত ব্যয় কোম্পানি বহন করবে। কর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থাও করা হবে। তবে গাড়ি পাওয়ার তিন মাস পর আবাসন বাবদ নির্ধারিত অর্থ মাসিক বেতন থেকে কর্তন করা হবে। সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে আগ্রহী প্রার্থীদের সঙ্গে মূল পাসপোর্ট, পাসপোর্টের রঙিন ফটোকপি, সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের পাসপোর্ট সাইজ ছবি, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও এর রঙিন কপি, জীবনবৃত্তান্ত এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের রঙিন কপি রাখতে বলা হয়েছে।