কালুরঘাট সেতু: ছয় বছর আগের সেই স্মারকলিপি থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রামের নতুন অঙ্গীকার

By admin
13 Min Read

১৯৮৮ থেকে ২০২৬, একটি সেতুর দাবি, দীর্ঘ নাগরিক আন্দোলন এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের ভবিষ্যৎ কিছু দাবি সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না, বরং সময় যত এগিয়ে যায় মানুষের জীবন, বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের প্রয়োজনের সঙ্গে সেই দাবির গুরুত্ব আরও গভীর ও অনিবার্য হয়ে ওঠে। কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাটে একটি আধুনিক নতুন রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণের দাবি তেমনই একটি দীর্ঘদিনের জনদাবি। আজ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ঠিক ছয় বছর আগে, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে আমার নেতৃত্বে কালুরঘাটে নতুন রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণের দাবিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছিল। ছয় বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সেই স্মারকলিপিতে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো আজও প্রাসঙ্গিক। বরং চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেল যোগাযোগের সম্প্রসারণ, দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, পর্যটন, ব্যবসা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের কারণে কালুরঘাটে নতুন সেতুর প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরের সেই কর্মসূচি আমার কাছে শুধু একটি স্মারকলিপি প্রদান অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের নাগরিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের উদ্যোগে আমার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিতে কালুরঘাটে নতুন রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো সেতুর দুরবস্থা, সেতুটির ওপর ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ, দীর্ঘ যানজট, মানুষের দুর্ভোগ, নিরাপদ যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছিল। স্মারকলিপি গ্রহণকালে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার শংকর রঞ্জন সাহা চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দকে স্বাগত জানিয়ে স্মারকলিপিটি যথাযথভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি দেশের উন্নয়নে সরকারের আন্তরিকতার কথাও উল্লেখ করেছিলেন এবং কালুরঘাটে দ্বিতীয় সেতু নির্মাণে ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন। সেদিনের কর্মসূচিতে এডভোকেট মাসুদুল আলম বাবলু, এডভোকেট সেলিম চৌধুরী, আকরাম হোসেন, জসিম উদ্দিন, লাভলী দিও, মো. আলী, মো. রাকিব, মুরাদ হোসেন বিপ্লবসহ নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
তবে কালুরঘাট সেতু নিয়ে আমার সম্পৃক্ততা ২০২০ সালে শুরু হয়নি। বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ১৯৮৮ সাল থেকেই বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়ন আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে আমি উপলব্ধি করেছি যে চট্টগ্রামের উন্নয়নকে শুধু মহানগরের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ের বিশাল জনগোষ্ঠীকে চট্টগ্রাম মহানগর এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হলে উন্নত ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা অপরিহার্য। বোয়ালখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরীর যোগাযোগের ক্ষেত্রে কালুরঘাট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে বৃহত্তর যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও কালুরঘাটের গুরুত্ব রয়েছে। সেই উপলব্ধি থেকেই দীর্ঘ বছর ধরে বিভিন্ন সভা, সেমিনার, মানববন্ধন, স্মারকলিপি, গণসংযোগ এবং জনমত গঠনের মাধ্যমে কালুরঘাটে নতুন সেতুর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেছি।
কালুরঘাটের পুরোনো সেতু দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও রেল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে চট্টগ্রামের জনসংখ্যা বেড়েছে, যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে, মানুষের চলাচল বেড়েছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামে নতুন নতুন বসতি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে এবং চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেল যোগাযোগের পরিধিও সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে পুরোনো সেতুটির ওপর চাপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেতুটি একমুখী হওয়ায় সামান্য যানজটও দ্রুত দীর্ঘ যানজটে পরিণত হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষকে সেতু পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়। এই দুর্ভোগ শুধু সময়ের অপচয় নয়, এর সঙ্গে মানুষের কর্মঘণ্টা, ব্যবসায়িক ক্ষতি, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম, রোগীদের চিকিৎসা গ্রহণ এবং জরুরি সেবার বিষয়ও জড়িয়ে আছে। একজন মুমূর্ষু রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সময় যদি যানজটে আটকে থাকতে হয়, তখন একটি সেতুর সীমাবদ্ধতা আর কেবল যোগাযোগের সমস্যা থাকে না, সেটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়।
কালুরঘাট সেতু নিয়ে আমাদের দাবি তাই কেবল যানজট নিরসনের দাবি নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার দাবি। একটি আধুনিক নতুন রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণ হলে চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মধ্যে যোগাযোগ আরও দ্রুত, নিরাপদ ও কার্যকর হবে। পণ্য পরিবহন সহজ হবে, ব্যবসা বাণিজ্যের গতি বাড়বে, শিল্পায়নের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে, কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে এবং মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগরের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের পর্যটন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্প বাণিজ্য এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেল যোগাযোগ চালু ও সম্প্রসারণের ফলে দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারের পর্যটন, ব্যবসা বাণিজ্য এবং মানুষের চলাচলের সঙ্গে চট্টগ্রামের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। এই নতুন বাস্তবতায় পুরোনো কালুরঘাট সেতুর ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের যোগাযোগব্যবস্থা পরিচালনা করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেটিও এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমরা মনে করি, আধুনিক রেল যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কালুরঘাটে একটি নতুন রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণ করা অপরিহার্য। শুধু বর্তমানের কথা চিন্তা করলে হবে না, আগামী কয়েক দশকের চাহিদা বিবেচনা করে সেতুটির পরিকল্পনা করতে হবে।
কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করেও দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ও আবাসিক সম্ভাবনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। কর্ণফুলীর দুই পাড়ের যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প, ব্যবসা, আবাসন ও পর্যটনকেন্দ্রিক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আগামী দিনে এই অঞ্চলে মানুষের বসতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বাড়বে বলেই প্রত্যাশা করা যায়। ফলে এখন থেকেই একটি সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থার পরিকল্পনা করা জরুরি। কালুরঘাটে নতুন সেতু সেই পরিকল্পনার একটি অপরিহার্য অংশ হতে পারে। এটি শুধু একটি সেতু হবে না, বরং চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মধ্যে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি করবে।
কালুরঘাটে দ্বিতীয় সেতু নির্মাণের দাবির সঙ্গে প্রয়াত সংসদ সদস্য মঈন উদ্দিন খান বাদলের স্বপ্ন ও ভূমিকার কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এবং কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। তার সেই স্বপ্ন আজ দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে মিশে আছে। বর্তমানে এই দাবি কোনো একক ব্যক্তি বা সংগঠনের দাবি নয়; এটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ছয় বছর আগে যে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের ব্যানারে আমরা কালুরঘাট সেতুর দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করেছিলাম, আজ সেই নাগরিক আন্দোলন সাংগঠনিকভাবে আরও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে আমরা বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামকে বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষের নাগরিক অধিকার, উন্নয়ন, যোগাযোগ ও জনস্বার্থের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করছি। চট্টগ্রাম মহানগর, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার পাশাপাশি কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার মানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে বৃহত্তর সাংগঠনিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ আজকের নাগরিক আন্দোলন শুধু একটি শহর বা একটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের সমন্বিত উন্নয়ন ভাবনার অংশ হয়ে উঠছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের বর্তমান নেতৃত্বে রয়েছেন চেয়ারম্যান আবু সৈয়দ, কার্যকরী সভাপতি সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহাফুজুর রহমান, সিনিয়র সহসভাপতি লায়ন সানাউল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব লায়ন জিল্লুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ সেলিম এবং মহাসচিব হিসেবে আমি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে দলমত ও সংকীর্ণ আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে রেখে জনস্বার্থের ভিত্তিতে সামনে তুলে ধরা এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করা।
আমরা মনে করি, বৃহত্তর চট্টগ্রামের সমস্যাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন। চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা, যানজট ও নাগরিক সমস্যা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলার যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজারের পর্যটন ও যোগাযোগ, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পর্যটন, যোগাযোগ ও উন্নয়ন সম্ভাবনা এবং পুরো অঞ্চলের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিকাশ একই বৃহত্তর উন্নয়ন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। তাই বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের লক্ষ্য হচ্ছে এই অঞ্চলকে একটি সমন্বিত উন্নয়ন ভাবনার আওতায় নিয়ে আসা এবং মানুষের ন্যায্য দাবিগুলোকে সংগঠিতভাবে উপস্থাপন করা।
এই বৃহত্তর কর্মসূচির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে কালুরঘাটে নতুন রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণ। এ দাবিকে সামনে রেখে আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী সভা, সেমিনার, মতবিনিময়, স্মারকলিপি, মানববন্ধন, গণসংযোগ, জনমত গঠন এবং অন্যান্য নিয়মতান্ত্রিক নাগরিক কর্মসূচি গ্রহণ করব। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, রেলওয়ে, সড়ক ও যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, প্রকৌশলী, বিশেষজ্ঞ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে কালুরঘাট সেতুর প্রয়োজনীয়তা আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা হবে। আমরা চাই, প্রকল্পের পরিকল্পনা, নকশা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে যাক এবং জনগণকে একটি সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা জানানো হোক।
আমাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য সরকারের বিরোধিতা করা নয়। বরং সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নাগরিক সমাজের যৌক্তিক দাবি ও পরামর্শকে যুক্ত করে উন্নয়নের সুফল আরও ব্যাপক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যে দাবি জনস্বার্থে প্রয়োজনীয়, যে দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যে দাবি একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য, সেই দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরা নাগরিক সমাজের দায়িত্ব। আমরা সেই দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ করে যেতে চাই।
আজ ছয় বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, ২০২০ সালের সেই স্মারকলিপি ছিল একটি দীর্ঘ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তখন আমাদের হাতে ছিল একটি স্মারকলিপি, সঙ্গে ছিল কিছু মানুষ এবং একটি নির্দিষ্ট দাবি। আজ আমাদের হাতে রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, আরও বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলার মানুষের প্রত্যাশা। সময় আমাদের থামাতে পারেনি। বরং সময় আমাদের আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
১৯৮৮ সাল থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নের দাবিতে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে কালুরঘাট সেতুর দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান ছিল সেই পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর আজ ২০২৬ সালে এসে সেই নাগরিক আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের সাংগঠনিক কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ জেলা ও মহানগরের মানুষের বিভিন্ন সমস্যা ও উন্নয়ন দাবিকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
আমরা বিশ্বাস করি, কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণ শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান, চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা, চট্টগ্রাম কক্সবাজার যোগাযোগব্যবস্থাকে আধুনিক করা এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাই এই দাবিকে আর বিলম্বিত না করে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া সময়ের দাবি।
ছয় বছর আগে যে স্মারকলিপি হাতে নিয়ে আমরা প্রশাসনের কাছে গিয়েছিলাম, আজ ছয় বছর পর সেই স্মারকলিপির স্মৃতি আমাদের নতুন করে দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন আমরা বলেছিলাম কালুরঘাটে নতুন সেতু প্রয়োজন। আজ আমরা আরও দৃঢ়ভাবে বলছি, কালুরঘাটে আধুনিক নতুন রেল কাম সড়ক সেতু এখন সময়ের দাবি, জননিরাপত্তার দাবি, দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দাবি এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের ভবিষ্যতের দাবি।
আমরা চাই কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে যাক। আমরা চাই দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ পাক। আমরা চাই কোনো রোগী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ মানুষ আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেতুর ওপর যানজটে আটকে না থাকুক। আমরা চাই চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেল যোগাযোগের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগেরও আধুনিক সমন্বয় তৈরি হোক। আমরা চাই বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রতিটি জেলা উন্নয়নের সমান সুযোগ পাক।
কালুরঘাট সেতু তাই আমাদের কাছে শুধু একটি সেতু নয়। এটি মানুষের নিরাপত্তার সেতু, এটি অর্থনীতির সেতু, এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের উন্নয়নের সেতু, এটি চট্টগ্রাম কক্সবাজার যোগাযোগের সেতু এবং সর্বোপরি এটি বৃহত্তর চট্টগ্রামের ভবিষ্যতের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ স্থাপনের সেতু।
১৯৮৮ থেকে যে পথচলা, ২০২০ সালের যে স্মারকলিপি, আজ ২০২৬ সালের যে বৃহত্তর সাংগঠনিক শক্তি, সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে একটি অঙ্গীকার, বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের ন্যায্য দাবি ও উন্নয়নের প্রশ্নে আমরা পিছিয়ে যাব না। কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের নিয়মতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও জনস্বার্থভিত্তিক আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
মো. কামাল উদ্দিন
মহাসচিব
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম

Share This Article
Leave a Comment