“আলোকের অভিভাবক: চট্টগ্রামের স্মৃতিতে এক সাহসী ও জনবান্ধব পুলিশ নেতৃত্বের নাম — হাসিব আজিজ-

By admin
7 Min Read

 মো. কামাল উদ্দিনঃ  কিছু মানুষ ইতিহাসে স্থান পান পদমর্যাদার কারণে, আর কিছু মানুষ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন তাঁদের কর্ম, সততা ও মানবিকতার কারণে। সময়ের স্রোতে পদ বদলে যায়, অফিসের নামফলক বদলে যায়, ক্ষমতার আসন বদলে যায়; কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বদলে যায় না। কারণ মানুষের হৃদয়ে লেখা ইতিহাস কোনো সরকারি গেজেটের ইতিহাস নয়, সেটি অনুভূতির ইতিহাস, বিশ্বাসের ইতিহাস। চট্টগ্রামের মানুষের কাছে হাসিব আজিজ তেমনই এক নাম। আজ তিনি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার নন। রাষ্ট্র তাঁকে আরও বৃহত্তর দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি অতিরিক্ত আইজিপি ও এপিবিএনের প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তিনি চট্টগ্রাম ছেড়ে গেলেও চট্টগ্রাম যেন তাঁকে ছাড়তে পারেনি। নগরীর অলিগলি, ব্যবসায়ীদের আড্ডা, সাংবাদিকদের আলোচনায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যে এবং সাধারণ মানুষের কথোপকথনে এখনও তাঁর নাম ফিরে আসে বারবার। সম্প্রতি নগরীতে সংঘটিত কিছু আলোচিত অপরাধ, প্রকাশ্য হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যখন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তখন অনেকের মুখে একটি কথাই শুনেছি—“হাসিব আজিজ সাহেব থাকলে হয়তো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও দ্রুত দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যেত।”  এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—একজন কর্মকর্তাকে মানুষ কতটা মনে রেখেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এই স্মরণেই লুকিয়ে আছে। সংকটের সময়ে আগমন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি ছিল এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রমমান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর মানুষের প্রত্যাশা যেমন ছিল, তেমনি ছিল নানা প্রশ্নও। এমন এক সময়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন হাসিব আজিজ।
চট্টগ্রাম কোনো সাধারণ শহর নয়। এটি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। এটি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এটি শিল্প, সংস্কৃতি, পর্যটন ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতিদিন লাখো মানুষের জীবনযাত্রা, কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এই শহরের আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত।  এই শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া মানে শুধু একটি প্রশাসনিক পদ গ্রহণ করা নয়; এটি এক বিশাল আস্থার দায়িত্ব গ্রহণ করা। উত্তরাধিকারের আলো হাসিব আজিজের নাম উচ্চারিত হলে অনেকেই স্মরণ করেন তাঁর পিতা মরহুম আজিজুল হকের নাম। বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু উত্তরাধিকার কখনও সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। উত্তরাধিকার কেবল পথ দেখায়। সেই পথে হেঁটে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে হয় নিজের সততা, মেধা ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে। হাসিব আজিজ সেই পথেই হেঁটেছেন। তিনি তাঁর পিতার পরিচয়ের ছায়ায় অবস্থান না করে নিজস্ব কর্ম ও নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজের পরিচয় নির্মাণ করেছেন। পুলিশ মানেই মানুষের আস্থা একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রকৃত পরিচয় কোথায়? অস্ত্রে? ক্ষমতায়? গাড়িবহরে? নাকি মানুষের বিশ্বাসে? আমার কাছে উত্তরটি খুব স্পষ্ট—পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের আস্থা। একজন সাধারণ মানুষ যখন থানায় যায়, তখন সে শুধু একটি অভিযোগ নিয়ে যায় না। সে নিয়ে যায় তার কষ্ট, তার ভয়, তার অসহায়ত্ব এবং তার শেষ আশ্রয়ের বিশ্বাস। যদি সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।  হাসিব আজিজের নেতৃত্ব সম্পর্কে যারা কথা বলেন, তাদের অনেকেই একটি বিষয় উল্লেখ করেন—তিনি পুলিশ ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পুলিশের শক্তি ভয়ের মধ্যে নয়; মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে। মাঠমুখী নেতৃত্ব অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা ফাইলের ভেতরে কাজ করেন। আবার কিছু কর্মকর্তা আছেন যারা বাস্তবতাকে কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেন। হাসিব আজিজকে নিয়ে যারা কাজ করেছেন, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি মাঠের পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিতেন। তিনি জানতে চাইতেন কী ঘটছে, কোথায় সমস্যা, কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে। একজন নেতার সবচেয়ে বড় গুণ হলো বাস্তবতাকে জানা। কারণ বাস্তবতা না জেনে সমস্যার সমাধান করা যায় না। চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত মহানগরে প্রতিদিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। যানজট, অপরাধ, মাদক, কিশোর অপরাধ, সামাজিক অস্থিরতা—সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল পরিবেশ। এই বাস্তবতার মধ্যেই একজন কর্মকর্তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মনোবল ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা কোনো বাহিনীর শক্তি শুধু তার সরঞ্জামে নয়; তার শক্তি তার মনোবলে।
একজন পুলিশ সদস্য যদি নিজের দায়িত্ব নিয়ে গর্ব অনুভব করেন, যদি তিনি মনে করেন তাঁর কাজের মূল্য আছে, তাহলে তিনি আরও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। অনেকেই মনে করেন, হাসিব আজিজ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে পেশাদারিত্ব, দায়িত্ববোধ এবং জনসেবার মানসিকতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ভালো কাজের প্রশংসা করতেন। আবার ভুলত্রুটি হলে তা সংশোধনের কথাও বলতেন। কারণ নেতৃত্ব মানে শুধু নির্দেশনা দেওয়া নয়; মানুষকে অনুপ্রাণিত করাও নেতৃত্বের অংশ।  বিনয়ী অথচ দৃঢ় আজকের পৃথিবীতে ক্ষমতা প্রদর্শন করা সহজ। কিন্তু ক্ষমতার মাঝেও বিনয় ধরে রাখা কঠিন। হাসিব আজিজ সম্পর্কে যারা কথা বলেন, তারা প্রায়ই তাঁর বিনয়ী আচরণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, কিন্তু রূঢ় নন। তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু অহংকারী নন। তিনি ছিলেন প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী, কিন্তু মানুষের কথা শুনতে আগ্রহী। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই একজন কর্মকর্তাকে সাধারণের কাছ থেকে আলাদা করে।
চট্টগ্রামের মানুষের স্মৃতিতে একজন কর্মকর্তার সাফল্য শুধু পদোন্নতিতে মাপা যায় না। প্রকৃত সাফল্য মাপা যায় মানুষের স্মৃতিতে। আজও যখন চট্টগ্রামের মানুষ তাঁর নাম উচ্চারণ করেন, তখন তারা শুধু একজন সাবেক পুলিশ কমিশনারকে স্মরণ করেন না। তারা স্মরণ করেন একটি সময়কে, একটি নেতৃত্বকে, একটি আস্থাকে, একটি প্রত্যাশাকে। মানুষ সবসময় নিখুঁত কাউকে খোঁজে না। মানুষ খোঁজে এমন কাউকে, যিনি আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন। এই কারণেই কিছু মানুষ স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন।  সময়ের সীমানা পেরিয়ে সময় বদলাবে। নতুন কর্মকর্তা আসবেন। নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে। নতুন ইতিহাস লেখা হবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু নাম ইতিহাসের পাতার চেয়েও গভীরে লেখা থাকে। সেগুলো লেখা থাকে মানুষের হৃদয়ে।  কর্ণফুলীর ঢেউ যেমন থেমে থাকে না, তেমনি থেমে থাকে না সময়ও। কিন্তু কর্ণফুলীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ যেমন অতীতের স্মৃতি মনে রাখে, তেমনি একটি শহরও তার প্রিয় মানুষদের মনে রাখে। চট্টগ্রাম আজও মনে রেখেছে অনেক মানুষকে। মনে রেখেছে মুক্তিযোদ্ধাদের। মনে রেখেছে সংস্কৃতিসেবীদের। মনে রেখেছে সমাজের জন্য কাজ করা মানুষদের। আর সেই স্মৃতির তালিকায় একজন পুলিশ কর্মকর্তার নামও উচ্চারিত হয়—হাসিব আজিজ। জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন পদ নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষের শ্রদ্ধা। সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষের ভালোবাসা। সবচেয়ে বড় অর্জন এমন একটি স্মৃতি রেখে যাওয়া, যা সময় মুছে ফেলতে পারে না। হাসিব আজিজ হয়তো নিজেকে কোনোদিন নায়ক ভাবেননি। তিনি হয়তো কেবল তাঁর দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে তিনি একটি ইতিবাচক উপস্থিতি রেখে গেছেন। আজ তিনি অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু চট্টগ্রামের অসংখ্য মানুষের মনে তিনি এখনও একজন দায়িত্বশীল, সাহসী এবং মানবিক পুলিশ নেতৃত্বের প্রতীক।  সময়ের পাতা উল্টে যাবে। নতুন গল্প লেখা হবে। নতুন মানুষ আসবে। কিন্তু কিছু নাম থেকে যাবে—শ্রদ্ধার সঙ্গে, ভালোবাসার সঙ্গে, স্মৃতির গভীরে। আর সেই নামগুলোর একটি—হাসিব আজিজ।

Share This Article
Leave a Comment