সাতক্ষীরায় সাংবাদিক হাবিবুরের ওপর হামলার অভিযোগ: রাষ্ট্র কি নীরব থাকবে? সাতক্ষীরায় সাংবাদিক হাবিবুরের ওপর হামলার অভিযোগ সংবাদ প্রকাশের জেরে পথরোধ, মারধর ও হত্যার হুমকি–রাষ্ট্র কি এবার টনক নড়াবে?

By admin
7 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন; ‘কলম থামাতে’ পেশিশক্তির অভিযোগে উদ্বেগ
সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সাতনদীর সম্পাদক ও প্রকাশক সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের ওপর হামলা, মারধর, হত্যার হুমকি এবং অপহরণ-গুমের ভয় দেখানোর অভিযোগে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সাংবাদিক মহলে। সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে একজন সম্পাদককে প্রকাশ্য স্থানে পথরোধ এবং পরবর্তীতে তার কর্মস্থলের বাইরে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কক্ষে গিয়ে মারধরের অভিযোগ সত্য হলে, তা শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা নয়—এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, তার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট একজনের আত্মীয় হাফিজসহ কয়েকজন ব্যক্তি তাকে বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুপুরে সাতক্ষীরা পৌরসভা এলাকায় তার পথরোধ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে পৌরসভার ১১৪ নম্বর কক্ষে অবস্থানকালে অভিযুক্তরা সেখানে প্রবেশ করে তাকে গালিগালাজ ও মারধর করেন। এ সময় তাকে ঘুষি মেরে আহত করা, ঘাড়ে আঘাত করা, গলা চেপে শ্বাসরোধের চেষ্টা এবং বুকে আঘাত করার অভিযোগও করেছেন তিনি। আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে কিল-ঘুষি ও লাথি মেরে আহত করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনার সময় পৌরসভার কর্মচারীসহ কয়েকজন ব্যক্তি এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। পরে আহত অবস্থায় তিনি সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অভিযোগে ভবিষ্যতে মামলা বা সংবাদ প্রকাশ করলে তাকে খুন, জখম, অপহরণ ও গুম করার হুমকি দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন এখন একটাই—সাংবাদিক কি সংবাদ প্রকাশ করবেন, নাকি জীবন বাঁচাবেন?
এটি কোনো সাধারণ বিরোধের প্রশ্ন নয়।
একজন সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশ করলেন। সংবাদটি কারও পছন্দ হলো না। তার জবাব কী হবে?
প্রতিবাদলিপি।
তথ্য-প্রমাণ।
আইনি নোটিশ।
আদালতের আশ্রয়।
এগুলোই সভ্য রাষ্ট্রের পথ।
কিন্তু যদি সংবাদ প্রকাশের জবাব হয় পথরোধ, হামলা, রক্তাক্ত করা, শ্বাসরোধের চেষ্টা কিংবা হত্যার হুমকি, তাহলে রাষ্ট্রের আইন কোথায়?
সাংবাদিক যদি প্রতিটি সংবাদ প্রকাশের আগে ভাবতে বাধ্য হন—‘এই সংবাদ ছাপলে আমাকে কে মারবে?’, ‘আমাকে অপহরণ করবে কি না?’, ‘আমার পরিবার নিরাপদ থাকবে তো?’—তাহলে সেটি শুধু একজন সাংবাদিকের ভয় নয়; সেটি পুরো গণমাধ্যমের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
রাষ্ট্রের নীরবতা কি হামলাকারীদের সাহসী করে তুলবে?
রাষ্ট্রের কাছে আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই।
একজন সাংবাদিকের অভিযোগ যদি তদন্তের আগেই গুরুত্বহীন হয়ে যায়, তাহলে আগামী দিনে সাংবাদিকরা নিরাপত্তার জন্য কার কাছে যাবেন?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দুর্বৃত্তদের কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছে যায়—হুমকি দাও, ভয় দেখাও, হামলা করো; হয়তো শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না।
এই সংস্কৃতি কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া যায় না।
আমরা কাউকে তদন্তের আগে অপরাধী বলছি না। কিন্তু একই সঙ্গে অভিযোগের গুরুত্ব কমিয়ে দেখারও সুযোগ নেই।
কারণ অভিযোগটি একজন সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে নয়; একজন কর্মরত সম্পাদক ও প্রকাশকের বিরুদ্ধে নয়—বরং একজন সাংবাদিক তার পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
সাংবাদিকের কলম থামানোর চেষ্টা হলে প্রতিটি কলম জেগে উঠবে
দি টুরিস্ট মনে করে, সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার দিন শেষ হওয়া উচিত।
কোনো সংবাদ ভুল হলে সংশোধন হবে।
তথ্য ভুল হলে সংশোধন হবে।
অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল হলে তা খণ্ডন হবে।
কিন্তু হামলা কখনো সাংবাদিকতার জবাব হতে পারে না।
আজ হাবিবুর রহমান। কাল অন্য কেউ। এরপর হয়তো আরও অনেক সাংবাদিক।
একটি সমাজে সাংবাদিকের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে প্রথমে সংবাদ কমে যায়, পরে প্রশ্ন কমে যায়, তারপর জবাবদিহি কমে যায়—আর শেষ পর্যন্ত অন্ধকারে বেড়ে ওঠে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধ।
প্রশাসনের কাছে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
আমরা সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অবিলম্বে দাবি জানাচ্ছি—
1. অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত করতে হবে।
2. ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও যাচাই করতে হবে।
3. প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ করতে হবে।
4. আহত সাংবাদিকের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করতে হবে।
5. অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করতে হবে।
6. হুমকির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সাংবাদিক ও তার পরিবারের নিরাপত্তা মূল্যায়ন করতে হবে।
7. অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা প্রভাবশালী পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
এটি কারও প্রতি অনুগ্রহ নয়।
এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রধান রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রশ্ন
আজ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছেও আমাদের প্রশ্ন রাখতে হয়—
একজন সাংবাদিক যদি পৌরসভার মতো একটি প্রকাশ্য সরকারি স্থানে নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদ?
একজন সম্পাদক যদি প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে আপত্তির কারণে হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন, তাহলে আগামী দিনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কীভাবে টিকে থাকবে?
আর সাংবাদিক যদি নিজের নিরাপত্তার জন্য কলম থামিয়ে দেন, তাহলে জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরবে কে?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটনের পর মামলা করা নয়। হুমকিকে গুরুত্ব দিয়ে সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধ করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
দি টুরিস্টের অবস্থান স্পষ্ট
দি টুরিস্ট কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা পক্ষের অন্ধ সমর্থনে নয়; আমরা দাঁড়াই সত্য, ন্যায়, আইনের শাসন ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে।
সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। তিনি যদি আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তার ন্যায়বিচার চাই। আর অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হোক।
আমরা বিচার চাই—প্রতিশোধ নয়।
আমরা আইন চাই—পেশিশক্তি নয়।
আমরা তথ্য চাই—গুজব নয়।
আমরা জবাবদিহি চাই—নীরবতা নয়।
সাংবাদিক সমাজের প্রতি আহ্বান
একজন সাংবাদিক আক্রান্ত হলে সেটিকে শুধু তার নিজের সংবাদপত্রের সমস্যা হিসেবে দেখার সময় শেষ।
আজ যদি একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগে আমরা নীরব থাকি, কাল সেই নীরবতা আমাদের নিজেদের দরজায় ফিরে আসতে পারে।
তাই সাংবাদিক সমাজকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধভাবে বলতে হবে—
সংবাদ নিয়ে বিতর্ক হোক, কিন্তু সাংবাদিকের ওপর হামলা নয়।
প্রতিবাদ হোক, কিন্তু হুমকি নয়।
আইনি লড়াই হোক, কিন্তু সন্ত্রাস নয়।
শেষ কথা
সাতক্ষীরার এই অভিযোগের তদন্ত এখন শুধু একটি মামলার বিষয় নয়—এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, আইনশৃঙ্খলার নিরপেক্ষতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার পরীক্ষাও।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং নাগরিকের অধিকারকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে এই অভিযোগের তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি জনগণকে দেখতে হবে।
কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি তখনই প্রমাণিত হয়, যখন সে দুর্বলকে নিরাপত্তা দিতে পারে এবং ক্ষমতাবানকেও আইনের সামনে দাঁড় করাতে পারে।
আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—
সাংবাদিকের কলমে আঘাত মানে গণতন্ত্রের দরজায় আঘাত।
হুমকির কাছে সাংবাদিকতা মাথা নত করবে না।
রাষ্ট্রকে নীরব দর্শক নয়—আইনের নিরপেক্ষ অভিভাবকের ভূমিকায় দেখতে চায় গণমাধ্যম।
সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রমাণ সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে দি টুরিস্ট।

Share This Article
Leave a Comment