
কিছু সাক্ষাৎ হয় নির্ধারিত সময়ের ঘেরাটোপে, কিছু সাক্ষাৎ সময়কে অতিক্রম করে মনে থেকে যায়। কিছু মানুষকে প্রথম দেখাতেই মনে হয়—এই পরিচয়টি হয়তো একদিন কোনো গল্পের অংশ হবে। আর কোনো কোনো কর্মস্থল কেবল ইট-পাথরের ভবন থাকে না; তার ভেতরে জমে থাকে ইতিহাস, দায়িত্ব, সাহস, মানুষের কান্না, স্বস্তি আর অসংখ্য অদৃশ্য গল্প। ঢাকার এপিবিএন সদর দপ্তরে আমার সাম্প্রতিক সফরটি তেমনই এক বিকেলের গল্প। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক বিকেল ৩টা। সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথচলায় সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান, বহু কর্মকর্তা, বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। পুলিশ নিয়ে লিখেছি, পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান করেছি, এপিবিএনের ওপর লিখেছি, এমনকি এ বাহিনীকে নিয়ে ডকুমেন্টারিও নির্মাণ করেছি। ফলে এপিবিএন আমার কাছে কেবল একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের পেশাগত আগ্রহ, গবেষণা ও পরিচয়ের এক আলাদা অধ্যায়। সেদিন সেই পরিচিত প্রতিষ্ঠানেরই নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করলাম। আর সেখানে আমার অপেক্ষায় ছিলেন একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা—পুলিশ সুপার আসমা বেগম রিটা। প্রথম সাক্ষাৎ। অথচ কথার শুরুতেই মনে হলো, আনুষ্ঠানিকতার বরফটা যেন কোথাও জমতে দিলেন না তিনি। ইউনিফর্ম মানুষকে দায়িত্বের পরিচয় দেয়, কিন্তু আচরণ মানুষটিকে আলাদা করে চেনায়। রিটাকে প্রথম দেখায় আমার মনে হলো—এই নারী কর্মকর্তা তাঁর পোশাকের কঠোরতার আড়ালে খুবই স্বাভাবিক, অমায়িক ও সংবেদনশীল একজন মানুষ। চোখে চশমা, পরিপাটি ব্যক্তিত্ব, সংযত হাসি, কথায় স্বচ্ছতা—সবকিছুর মধ্যে ছিল আধুনিকতার ছাপ। তাঁর কথার বাচনভঙ্গি ছিল মৃদু, কিন্তু বক্তব্যে ছিল আত্মবিশ্বাস। তিনি এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেন সাংবাদিকের সঙ্গে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করছেন না; বরং একটি বিষয়কে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করছেন। একাধিকবার তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের আন্তরিকতাও সেই সৌজন্যেরই বহিঃপ্রকাশ। মিডিয়ার মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে দ্রুততা, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক আস্থা প্রয়োজন, তাঁর আচরণে সেটি স্পষ্ট। আমার কাছে এটিই ছিল তাঁর প্রথম বড় পরিচয়—তিনি একজন পুলিশ সুপার, কিন্তু তার আগে তিনি একজন মানুষ। এপিবিএনের মিডিয়া উইংয়ের দায়িত্বে তিনি নতুন। দায়িত্বটি সহজ নয়। কারণ পুলিশের কাজের অনেকটাই মাঠে দৃশ্যমান হলেও একটি বাহিনীর প্রকৃত কর্মদক্ষতা, অভিযান, উদ্ধার, অপরাধ দমন, জনসেবা ও মানবিক উদ্যোগকে মানুষের সামনে তুলে ধরার কাজটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আজকের পৃথিবীতে তথ্যই শক্তি। আর ভুল তথ্য, গুজব কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের যুগে একটি বাহিনীর প্রকৃত কাজ মানুষের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরাও এক ধরনের দায়িত্ব। রিটা সেই জায়গাতেই নতুনভাবে কাজ করছেন। তিনি জানেন, সাংবাদিক শুধু খবরের বাহক নন; সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, তথ্য চান, সত্যতা যাচাই করেন এবং সমাজের সামনে একটি প্রতিষ্ঠানের কাজকে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেন। সেদিনের আলাপচারিতায় তাঁর মধ্যে সাংবাদিকবান্ধব সেই মানসিকতাটিই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। রিটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রসঙ্গও উঠে এলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসেবে রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইন ও সমাজের সম্পর্ক সম্পর্কে তাঁর একাডেমিক ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠেই তিনি আটকে নেই; ইতিহাসের প্রতিও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। এখানেই আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের বর্তমানকে বুঝতে হলে তার অতীতটিকেও জানতে হয়। আর এপিবিএনের ইতিহাস বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এপিবিএনকে নিয়ে আমাদের সমাজে নানা ধরনের তথ্য প্রচলিত আছে। কিন্তু ইতিহাসের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, দলিলই শেষ কথা। বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপিবিএনের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে এবং ১৯৭৯ সালের Armed Police Battalions Ordinance-এর মাধ্যমে এর আইনগত কাঠামো সুসংহত হয়। স্বাধীনতার পর পরিবর্তিত বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতায় একটি বিশেষায়িত সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা থেকেই এর বিকাশ। সময়ের সঙ্গে সেই বাহিনীর দায়িত্বও বদলেছে, বিস্তৃত হয়েছে। আজকের এপিবিএন শুধু অস্ত্রধারী একটি বিশেষ বাহিনী নয়। সন্ত্রাস ও সশস্ত্র অপরাধ দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান প্রতিরোধ, বিশেষ নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং সাধারণ মানুষের হারানো সম্পদ উদ্ধারের মতো নানা ক্ষেত্রেই তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত। একটি বাহিনীর বিবর্তন আসলে একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-চাহিদার বিবর্তনেরও গল্প। রিটা যখন জুলাই মাসের এপিবিএনের কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল—এ যেন কোনো অফিসিয়াল রিপোর্ট নয়, বরং এক মাসের কর্মজীবনের শত শত মানুষের গল্প। বিভিন্ন ইউনিটের অভিযানে জুলাই মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ৮৪৪টি মোবাইল ফোন। বিকাশ ও নগদ প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া ৯ লাখ ৫৮ হাজার ১৪৮ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে প্রতারণায় ব্যবহৃত ১৩টি সিম, একটি ফেসবুক আইডি, তিনটি হোয়াটসঅ্যাপ এবং একটি ই-মেইল অ্যাকাউন্ট। নিষ্পত্তি হয়েছে চারটি ফেসবুক আইডি-সংক্রান্ত অভিযোগ এবং সমাধান হয়েছে দুটি সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে জুলাই মাসে ৫০৮ জনকে সহায়তা দিয়েছে এপিবিএন। সংখ্যাগুলো নিছক সংখ্যা নয়। ৮৪৪টি মোবাইলের পেছনে হয়তো ৮৪৪টি পরিবারের উদ্বেগ ছিল। ৯ লাখ ৫৮ হাজার ১৪৮ টাকার পেছনে হয়তো ছিল কারও সঞ্চয়, কারও ব্যবসার টাকা, কারও সংসারের প্রয়োজন। একজন মানুষের হারানো ফোন ফিরে পাওয়া কখনো কখনো তার কাছে কয়েক হাজার টাকার চেয়েও বেশি মূল্যবান। কারণ ফোনের সঙ্গে হারিয়ে যায় ব্যক্তিগত ছবি, যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় নথি, স্মৃতি এবং অনেক অদৃশ্য সম্পর্ক। তাই পুলিশের এই কাজের মধ্যে শুধু অপরাধ দমন নেই—আছে হারিয়ে যাওয়া স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়ার মানবিকতা। মাদক একটি সমাজকে ভিতর থেকে ধ্বংস করে। জুলাই মাসে এপিবিএনের বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১২ হাজার ৪২১টি ইয়াবা, ১ দশমিক ১৮ কেজি গাঁজা, ৩২ লিটার মদ, ২৮৫ কার্টন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট, ৭২টি বিদেশি সিগারেট এবং ৭২টি বিয়ার। এসব ঘটনায় ১০টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১১ জনকে। মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধু পুলিশের অভিযান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি প্রজন্মকে রক্ষার যুদ্ধ। কারণ একজন মাদক ব্যবসায়ী শুধু মাদক বিক্রি করে না—সে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, একটি তরুণের স্বপ্নকে হত্যা করে, কখনো একটি পরিবারের শান্তি ছিনিয়ে নেয়। তাই মাদকবিরোধী প্রতিটি অভিযান সামাজিক অর্থেও গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রেও জুলাইয়ে সাফল্য এসেছে। উদ্ধার হয়েছে দুটি ওয়ানশুটার গান ও ১৬ রাউন্ড গুলি, দেশীয় ধারালো অস্ত্রসহ অন্যান্য সামগ্রী। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চোরাচালানবিরোধী অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ৭৪৪ গ্রাম স্বর্ণ। এসব ঘটনায় ১১টি মামলা হয়েছে এবং পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া উদ্ধার হয়েছে ৯১০ কেজি কসমেটিকস, ১৮৭টি শাড়ি ও বিভিন্ন পণ্য, দুটি মোবাইল/ল্যাপটপ, ৩২২ কেজি সামুদ্রিক কাঁকড়া, দুটি এফডিএমএন কার্ড এবং বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য মালামাল। সীমান্ত ও চোরাচালানের পথ শুধু অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর সঙ্গে কখনো কখনো যুক্ত থাকে মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অন্ধকার জগত। সেই অন্ধকার পথ বন্ধ করার দায়িত্বে এপিবিএনের ভূমিকা তাই গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ের সাফল্যের মধ্যে কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১২ এপিবিএনের অভিযানে বিভিন্ন ব্যাচের জিডির ভিত্তিতে উদ্ধার হয়েছে ১৮৫টি হারানো মোবাইল ফোন। ভুলক্রমে চলে যাওয়া বিকাশ ও নগদের ৭৩ হাজার ১৯৮ টাকাও উদ্ধার করা হয়েছে। পরে প্রকৃত মালিকদের কাছে তা হস্তান্তর করা হয়েছে। ১৩ এপিবিএনের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৩০০ দশমিক ৭ গ্রাম স্বর্ণ, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৭ লাখ ২০ হাজার ৯৯০ টাকা। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৮ এপিবিএনের অভিযানে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার মূল আসামিসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে নয়জনকে। ১৪ এপিবিএনের অভিযানে ৫ হাজার ৮০০ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে একজনকে। আর ১৬ এপিবিএনের অভিযানে একটি ওয়ানশুটার বন্দুক ও ১৬ রাউন্ড তাজা গুলিসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে একজনকে। এই চারটি ঘটনা যেন চারটি আলাদা আয়না—যেখানে এপিবিএনের চার ধরনের সক্ষমতা প্রতিফলিত হয়েছে। দীর্ঘ আলাপচারিতায় এপিবিএন প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজের প্রসঙ্গও বারবার এসেছে। হাসিব আজিজ আমার কাছে অপরিচিত নন। দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্কের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের জায়গা থেকেও তাঁকে দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার মূল্যায়ন শুধু তাঁর পদ দিয়ে করা যায় না। মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত, পেশাগত জ্ঞান এবং অধীনস্থদের ওপর আস্থা—সব মিলিয়েই একজন নেতৃত্বের প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয়। আমার চোখে হাসিব আজিজ সেই অর্থে একজন সাহসী ও চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা। রিটার কথাতেও তাঁর নেতৃত্বের প্রতি সেই আস্থার প্রতিফলন ছিল। একজন অধীনস্থ কর্মকর্তা যখন তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাজের কথা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেন, তখন সেটি কেবল আনুষ্ঠানিক প্রশংসা থাকে না; তার মধ্যে সাংগঠনিক আস্থার একটি বার্তাও থাকে। আজকের অপরাধী আর আগের দিনের অপরাধী এক নয়। অপরাধের ধরন বদলেছে। অপরাধের মাধ্যম বদলেছে। অপরাধী মোবাইল ব্যবহার করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, ডিজিটাল লেনদেন ব্যবহার করে। তাই পুলিশিংও বদলাতে বাধ্য। আগে পুলিশের হাতে ছিল লাঠি, অস্ত্র, ওয়্যারলেস আর নথি। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল ফরেনসিকস, সাইবার ট্র্যাকিং, তথ্য বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা। এপিবিএনের জুলাই মাসের কার্যক্রমে সেই পরিবর্তনেরই ছাপ দেখা যায়। সাইবার প্রতারণা থেকে হারানো মোবাইল উদ্ধার—দুটিই এখন আধুনিক পুলিশিংয়ের অংশ। আমি সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক। দীর্ঘদিন ধরে সংবাদ, ইতিহাস ও নাগরিক সমস্যার নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছি। পুলিশ নিয়ে লেখার সময় আমার কলম যেমন প্রশংসা করতে জানে, তেমনি প্রশ্ন করতেও জানে। কারণ সাংবাদিকের কাজ কোনো প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হওয়া নয়; সাংবাদিকের কাজ সত্যকে সামনে আনা। সেদিন রিটার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা তাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে যাননি। তথ্য দিয়েছেন। ব্যাখ্যা করেছেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। একজন মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তার কাছে আমি ঠিক এই বিষয়টিই প্রত্যাশা করি—দরজা খোলা রাখা, প্রশ্নকে স্বাগত জানানো এবং তথ্যের জায়গায় আস্থা তৈরি করা। সেদিন আমাদের জন্য নাশতার আয়োজনও করেছিলেন তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ছিলেন সাংবাদিক মুজিবুর রহমান চৌধুরী, কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডের সভাপতি আবু সৈয়দ, আরিফুল ইসলাম চৌধুরী। অন্যদিকে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর, বাসসের মোহাম্মদ ইসমাইলসহ আরও অনেকে ছিলেন। কথার মধ্যে কখনো খবর, কখনো অপরাধ, কখনো পুলিশিং, কখনো সমাজ—বিষয় বদলেছে, কিন্তু আলোচনার প্রাণ ছিল মানুষের নিরাপত্তা। ফেরার আগে অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তাঁর সঙ্গেও বিভিন্ন অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলো। একটি বিকেল যেন অনেকগুলো পেশাগত অভিজ্ঞতাকে এক জায়গায় এনে দিল। সেদিন রিটার একটি ছবি আমি নিজেই তুলেছি। ছবিতে তিনি তাঁর কর্মস্থলে বসে আছেন। সামনে কাগজপত্র, পরনে এপিবিএনের ইউনিফর্ম, চোখে চশমা, মুখে সংযত অভিব্যক্তি। কিন্তু ছবিটি আমার কাছে শুধু একজন পুলিশ সুপারের প্রতিকৃতি নয়। এটি একজন কর্মজীবী নারীর আত্মবিশ্বাসের ছবি। একজন নারী, যিনি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন কর্মকর্তা, যিনি অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর, কিন্তু মানুষের সঙ্গে আচরণে কোমল। একজন পুলিশ সুপার, যার হাতে দায়িত্বের ভার, কিন্তু কথায় নেই অহংকার। একজন আধুনিক পেশাজীবী, যিনি বোঝেন—আজকের দিনে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের আস্থাও অর্জন করতে হয়। ছবির মানুষটি তাই আমার কাছে শুধু এসপি রিটা নন—তিনি একটি পরিবর্তনশীল পুলিশিং ব্যবস্থারও প্রতিচ্ছবি। সেদিন এপিবিএন সদর দপ্তর থেকে বের হওয়ার সময় মনে হলো—একটি প্রতিষ্ঠানকে বুঝতে হলে শুধু তার ভবনের দিকে তাকালে হয় না। তার মানুষগুলোর দিকে তাকাতে হয়। কেউ মাঠে অভিযান চালাচ্ছেন। কেউ অপরাধী ধরছেন। কেউ হারানো মোবাইল খুঁজে দিচ্ছেন। কেউ সাইবার প্রতারণার টাকা উদ্ধার করছেন। কেউ সীমান্ত ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে লড়ছেন। কেউ আবার সেই সমস্ত কর্মকাণ্ডের তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরছেন। সবাই মিলে একটি বাহিনী। আর সেই বাহিনীর নেতৃত্বে যদি থাকে সাহস, মেধা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা; আর মাঠের কর্মকর্তাদের মধ্যে থাকে মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব—তাহলে একটি প্রতিষ্ঠান কেবল শক্তিশালী হয় না, মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। আসমা বেগম রিটার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ তাই শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না। এটি ছিল একজন সাংবাদিকের চোখে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে নতুন করে দেখার সুযোগ। ইউনিফর্মের ভেতরে মানুষটিকে দেখার সুযোগ। আর সেই মানুষটির কথায়, আচরণে ও দায়িত্ববোধে যে অনুভূতিটি সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ল, সেটি হলো—কর্তব্যের কঠোরতার সঙ্গে মানবিকতার কোমলতা মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। সময়ের সঙ্গে পুলিশের অস্ত্র বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, অপরাধের ধরন বদলাবে। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটি বদলাবে না। সেই নিরাপত্তার জন্য যারা দিনরাত কাজ করেন, তাঁদের সাফল্যের গল্প লেখা দরকার—সমালোচনার জন্য যেমন কলম প্রয়োজন, তেমনি ভালো কাজের স্বীকৃতির জন্যও কলমের দায় আছে। সেদিনের বিকেলে তাই আমার নোটবুকে শুধু কিছু সংখ্যা জমা হয়নি। জমা হয়েছে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি, একটি বাহিনীর কর্মব্যস্ত জুলাই মাসের গল্প, নেতৃত্বের কিছু কথা এবং সবচেয়ে বড় কথা—ইউনিফর্মের আড়ালে থাকা একজন মানুষের উষ্ণতার স্মৃতি।