
মো. কামাল উদ্দিন
বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে সাধারণত হিন্দু সমাজের শিক্ষা ও সংস্কার আন্দোলনের কথাই বেশি উচ্চারিত হয়। অথচ একই সময়ে বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যেও এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী জাগরণ গড়ে উঠেছিল। শিক্ষা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, সমাজসংস্কার এবং রাজনৈতিক সচেতনতার ক্ষেত্রে মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার অনেক অধ্যায় আজও বিস্মৃত রয়ে গেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন ছিল মুসলমান সমাজের আত্মপরিচয় অনুসন্ধান ও আধুনিক শিক্ষার পথে অগ্রযাত্রার যুগ। দীর্ঘদিনের পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে উঠে মুসলমান সমাজ যখন নতুনভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়, তখন সংবাদপত্র হয়ে ওঠে তাদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো ছিল মুসলমান সমাজের চিন্তা, দাবি ও আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরার এক শক্তিশালী মাধ্যম। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসন, আইন, উচ্চশিক্ষা ও নীতিনির্ধারণের ভাষা ছিল ইংরেজি। ফলে ইংরেজি সংবাদপত্র প্রকাশের মাধ্যমে মুসলমান নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষিত সমাজ সরাসরি ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে নিজেদের বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পান। একই সঙ্গে শিক্ষিত ভারতীয় সমাজের কাছেও মুসলমানদের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে সক্ষম হন। এই ধারার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন চট্টগ্রামের কৃতীসন্তান, বিশিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সাহিত্যপ্রেমী এবং সাংবাদিক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম (১৮৫৬–১৯৩১)। তিনি ছিলেন সেই সময়ের মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেও তিনি সমাজজাগরণ ও সাংবাদিকতার কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। ১৮৯০ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি সাপ্তাহিক Mohammedan Observer ছিল বাঙালি মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র। এই পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি মুসলমান সমাজের শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক সংস্কার, নারীশিক্ষা, রাজনৈতিক অধিকার এবং সমসাময়িক জাতীয় প্রশ্ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা প্রকাশ করত। শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়, মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা, আত্মমর্যাদাবোধের বিকাশ এবং সামাজিক সংস্কারের চেতনা জাগিয়ে তুলত Mohammedan Observer। পরবর্তীকালে এটি দৈনিক পত্রিকায় উন্নীত হয় এবং মুসলমান সমাজের অন্যতম মুখপত্রে পরিণত হয়। একই সময়ে Muslim Chronicle এবং Muslim Standard নামের ইংরেজি সংবাদপত্রও প্রকাশিত হতে থাকে। এসব পত্রিকা মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার, শিক্ষার প্রসার, সাহিত্যচর্চা এবং সমাজ সংস্কারের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হওয়ায় এসব পত্রিকার প্রভাব শুধু মুসলমান সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্রিটিশ প্রশাসন ও বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজের মধ্যেও তা আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। বাংলার মুসলিম সাংবাদিকতার ইতিহাসে আরেকটি উজ্জ্বল নাম ব্যারিস্টার আবদুর রসুল (১৮৭২–১৯১৭)। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গুনিয়াউক গ্রামের এই কৃতীসন্তান ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম প্রগতিশীল মুসলিম নেতা, আইনজীবী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। ১৯০৬ সালে তাঁর উদ্যোগে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ইংরেজি সাপ্তাহিক The Mussalman। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন মৌলভী মুজিবুর রহমান। সে সময় বঙ্গভঙ্গ, শিক্ষা আন্দোলন, মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং জাতীয় রাজনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে The Mussalman সাহসী ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে। ব্যারিস্টার আবদুর রসুল ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের প্রবক্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা ছাড়া মুসলমান সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁর পত্রিকা সেই চিন্তাধারারই প্রতিফলন ঘটায় এবং মুসলমান সমাজকে আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে পরিচিত করে। উল্লেখ্য, তখনকার সময়ে মুসলমান সমাজ শিক্ষায়, অর্থনীতিতে এবং সরকারি চাকরিতে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল। এই অবস্থায় ইংরেজি সংবাদপত্রগুলো কেবল সংবাদপত্রের ভূমিকা পালন করেনি; বরং এগুলো ছিল একেকটি সামাজিক আন্দোলন। এসব পত্রিকার মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং আধুনিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের প্রজন্মের অনেকেই শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম কিংবা ব্যারিস্টার আবদুর রসুলের নাম জানেন না। অথচ তাঁদের হাত ধরেই বাঙালি মুসলমানদের ইংরেজি সাংবাদিকতার একটি শক্তিশালী ধারা গড়ে উঠেছিল। তাঁদের অবদান শুধু সাংবাদিকতার ইতিহাসেই নয়, বাংলার মুসলিম নবজাগরণ, শিক্ষা আন্দোলন এবং জাতীয় চেতনার বিকাশেও গভীরভাবে প্রোথিত। বাংলার ইতিহাসে Mohammedan Observer, Muslim Chronicle, Muslim Standard এবং The Mussalman কেবল সংবাদপত্রের নাম নয়; এগুলো এক জাগ্রত জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশের দলিল। এগুলোর পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে বাঙালি মুসলমানদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, আধুনিকতার পথে যাত্রা এবং জাতীয় জীবনে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জনের ইতিহাস। আজ সময় এসেছে এই বিস্মৃত ইতিহাসকে নতুন করে গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রচারের। কারণ যে জাতি তার পথিকৃৎদের ভুলে যায়, সে জাতি নিজের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও হারিয়ে ফেলে। শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম ও ব্যারিস্টার আবদুর রসুলের মতো অগ্রদূতদের স্মরণ করা মানে শুধু দুই ব্যক্তিকে স্মরণ করা নয়; বরং বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণ, শিক্ষা আন্দোলন এবং সাংবাদিকতার গৌরবময় উত্তরাধিকারকে সম্মান জানানো।