
–মো. কামাল উদ্দিনঃ
আমার ভাই আকতারের হত্যাকারীরা আজও আমার পিছনে লেগে আছে আমাকে হত্যার চেষ্টায়। তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। সময় কখনো কখনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কিছু সময় আছে, যা কখনো পুরোনো হয় না। কিছু ক্ষত আছে, যা বছরের পর বছর পেরিয়েও শুকায় না। আমার জীবনে ১৯৯৭ সালের ১১ আগস্ট তেমনই এক কালো দিন—এক বিভীষিকাময় দিন, যা আমার পরিবারকে আজও তাড়া করে ফেরে। আজ প্রায় ২৯ বছর হতে চললো। কিন্তু সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত আজও আমার চোখের সামনে স্পষ্ট। চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার কামাল বাজার এলাকা থেকে আমার ছোট ভাই আকতারকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তারপর সে আর কখনো ফিরে আসেনি। না ছিল কোনো মামলা, না কোনো তদন্ত, না কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। শুধু ছিল এক পরিবারের বুকফাটা কান্না, অপেক্ষা আর অন্তহীন শূন্যতা। আমার মা প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন—হয়তো আকতার ফিরে আসবে। আমাদের ঘরের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি স্মৃতি আজও তার নাম ধরে কাঁদে। একজন ভাই হারানোর যন্ত্রণা শুধু একজন মানুষ হারানো নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া, একটি মায়ের বুক খালি হয়ে যাওয়া, একটি জীবনের ভিত নড়ে যাওয়া।
দীর্ঘ এই ২৯ বছরে আমি অসংখ্যবার নিজেকে প্রশ্ন করেছি—
কেন আকতারকে হত্যা করা হলো?
কেন তার লাশ পর্যন্ত আমাদের দেখতে দেওয়া হয়নি?
কেন রাষ্ট্র, সমাজ, প্রশাসন—কেউ আমাদের কান্না শুনলো না?
আজ আমি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছি।
আমি জেনেছি কারা ছিল সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। তারা কেউ দূরের মানুষ নয়। তারা আমাদের সমাজের পরিচিত মুখ, এলাকায় প্রভাব বিস্তারকারী কিছু ব্যক্তি, যারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশের সহযোগিতায় মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
যারা একসময় আমার ভাইকে গুম করেছিল, আজ তারাই আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। তারা মনে করে ভয় দেখিয়ে সত্যকে চাপা দেওয়া যাবে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে—একজন ভাইয়ের রক্ত কখনো মিথ্যা বলে না।
আমি ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে মামলার ফাইল প্রস্তুত করেছি।
প্রয়োজনে আমি আইনের শেষ দরজায় গিয়ে দাঁড়াবো।
কারণ এটি শুধু ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বিষয় নয়—এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, মানবতার প্রশ্ন।
আমার ভাই আকতার শুধু আমার ভাই ছিল না।
সে ছিল আমার শৈশবের সাথী, আমার জীবনের আনন্দের অংশ, আমার পরিবারের প্রাণ।
তার অনুপস্থিতি আমাদের জীবনকে নিঃশব্দ কবরস্থানে পরিণত করেছে।
আজও তার কথা মনে হলে বুকের ভেতর এক অদৃশ্য আগুন জ্বলে ওঠে।
আমি জানি, এই পথে বিপদ আছে।
আমাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, নজরদারিতে রাখা হচ্ছে, মানসিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে।
তবুও আমি থামবো না।
কারণ নীরবতা কখনো ন্যায়বিচার আনে না।
সত্যকে উচ্চারণ করতেই হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হয়।
এই দেশে কত “আকতার” হারিয়ে গেছে—
কেউ খোঁজ নেয়নি, কেউ বিচার চায়নি, কেউ প্রতিবাদ করেনি।
অনেক পরিবার আজও অপেক্ষা করছে—কখন তাদের সন্তানের খোঁজ মিলবে।
আমি চাই, আমার এই লেখাটি শুধু একজন ভাইয়ের স্মৃতিচারণ না হয়ে, গুম, হত্যা ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদের দলিল হয়ে উঠুক।
আমি রাষ্ট্রের কাছে, প্রশাসনের কাছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে এবং বিবেকবান মানুষের কাছে আহ্বান জানাই—
আমার ভাই আকতারের গুম ও হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত হোক।
দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হোক।
কারণ বিচারহীনতা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
আকতার,
তুই আজও আমার প্রতিটি লেখায় বেঁচে আছিস।
আমার চোখের জলে, আমার প্রতিবাদে, আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে তুই জীবন্ত।
তোর হত্যাকারীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমার এই লড়াই থামবে না।
ইনশাআল্লাহ, সত্য একদিন প্রকাশ হবেই।
সবাই আমার ও আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন—
যেন আমি সাহস ও শক্তি নিয়ে সত্যের পথে অবিচল থাকতে পারি এবং আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম