
মো. কামাল উদ্দিন
সাংবাদিক, গবেষক ও লেখক ‘সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা’ গ্রন্থের রচয়িতা কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন সাংবাদিক একজন সিভিল সার্জনকে বারবার “ভাই” বলে সম্বোধন করছেন। ঘটনাটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কেউ এটিকে সাধারণ সৌজন্য হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ বলেছেন—এ ধরনের সম্বোধন একজন সাংবাদিকের পেশাগত নিরপেক্ষতা ও মর্যাদার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সেই ঘটনাটি দেখেই আজ এই লেখাটি লিখতে বসেছি। আমার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করা নয়; বরং সাংবাদিকতার নীতি, পেশাগত আচরণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। আমি দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। গণমাধ্যম নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার ফল হিসেবে লিখেছি “সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা” গ্রন্থ। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে চাই, একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর নিরপেক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। সাংবাদিক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন, আবার রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষও নন। তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তথ্য সংগ্রহ করেন, প্রশ্ন করেন এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনেন। তাই একজন সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী, সচিব, সিভিল সার্জন, পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক বা বিচার বিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে সাংবাদিকের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও পেশাগত দূরত্বের। প্রশ্ন হলো—সরকারি কর্মকর্তাকে সাংবাদিক কীভাবে সম্বোধন করবেন? বাংলাদেশের কোনো আইন, বিধিমালা বা সরকারি আচরণবিধিতে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে একজন সাংবাদিককে অবশ্যই “স্যার” বলতে হবে। আবার কোথাও বলা নেই যে “ভাই”, “চাচা”, “বাবা” কিংবা অন্য কোনো পারিবারিক সম্বোধন ব্যবহার করতে হবে। এগুলো মূলত সামাজিক ও ব্যক্তিগত সৌজন্যের বিষয়। কিন্তু সাংবাদিকতা একটি পেশা, আর প্রতিটি পেশার নিজস্ব ভাষা ও নৈতিকতা রয়েছে। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকরা সাধারণত ব্যক্তির নাম ও সরকারি পদবি ব্যবহার করেন। সংবাদে লেখা হয়—”সিভিল সার্জন বলেন”, “জেলা প্রশাসক জানান”, “পুলিশ সুপার বলেন”, “সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী”। কারণ সংবাদ ব্যক্তি নয়, তথ্যের ভাষায় কথা বলে। আমি বিশ্বাস করি, একজন সাংবাদিক সাক্ষাৎকারের শুরুতে সৌজন্যবশত “স্যার” বলতে পারেন। এটি ভদ্রতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সংবাদ পরিবেশন, টেলিভিশন উপস্থাপনা বা আনুষ্ঠানিক প্রশ্নোত্তরে বারবার “ভাই”, “বড় ভাই”, “প্রিয় ভাই” কিংবা এ ধরনের ব্যক্তিগত সম্বোধন ব্যবহার করলে সাধারণ মানুষের মনে সাংবাদিক ও কর্মকর্তার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। সাংবাদিকের প্রতি জনআস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে তাঁর দৃশ্যমান নিরপেক্ষতার ওপর। মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকের ভাষা যেমন নিরপেক্ষ হওয়া উচিত, তেমনি তাঁর সম্বোধনও পেশাদার হওয়া উচিত। কারণ একটি মাত্র শব্দও কখনো কখনো হাজার শব্দের চেয়ে বেশি বার্তা বহন করে। সাংবাদিকের কাজ কাউকে ছোট করা নয়, আবার অযথা বড় করাও নয়। তিনি সম্মান দেবেন, কিন্তু তোষামোদ করবেন না। তিনি প্রশ্ন করবেন, কিন্তু শিষ্টাচার হারাবেন না। তিনি দৃঢ় থাকবেন, কিন্তু ঔদ্ধত্য দেখাবেন না। এটাই প্রকৃত সাংবাদিকতার সৌন্দর্য। আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন একটি ছোট ভিডিও মুহূর্তেই লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাই একজন সাংবাদিকের প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি সম্বোধন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় বহন করে না; তা পুরো সাংবাদিক সমাজের ভাবমূর্তিকেও প্রভাবিত করে। আমি মনে করি, এখন সময় এসেছে সাংবাদিক সংগঠন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সাংবাদিকতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে একটি অভিন্ন পেশাগত নির্দেশনা তৈরি করবে। কীভাবে সাক্ষাৎকার নিতে হবে, কীভাবে সরকারি কর্মকর্তাকে সম্বোধন করতে হবে, কোথায় ব্যক্তিগত সৌজন্য শেষ হবে এবং কোথা থেকে পেশাগত নিরপেক্ষতা শুরু হবে—এসব বিষয়ে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। সাংবাদিকের কলমের শক্তি তাঁর সাহসে, তাঁর সততায় এবং তাঁর স্বাধীনতায়। তিনি কারও “ভাই” হয়ে নয়, জনগণের প্রতিনিধি হয়ে প্রশ্ন করবেন। তিনি কারও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার পরিচয়ে নয়, তথ্যের শক্তিতে সম্মান অর্জন করবেন। আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, গবেষণা এবং “সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা” গ্রন্থ রচনার আলোকে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর সম্বোধনে নয়; তাঁর নীতি, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার সাহস এবং সত্যের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারেই নিহিত। আর এই মূল্যবোধ যত শক্তিশালী হবে, ততই শক্তিশালী হবে সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম এবং গণতন্ত্র।