রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজায় জনসমুদ্র, শোকের আবহে রাজনৈতিক স্লোগান ঘিরে নতুন বিতর্ক

By admin
8 Min Read

—মো. কামাল উদ্দিন
চট্টগ্রাম আজ যেন নিজের এক অভিভাবককে হারানোর বেদনায় স্তব্ধ। রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় বহু ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রজন্মের আস্থার প্রতীক, সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী, প্রবীণ রাজনীতিক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে শেষ বিদায় জানাতে মানুষের ঢল নেমেছিল নগরীর প্রাণকেন্দ্রে। তাঁর জানাজা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার শেষ বিদায় ছিল না—এ যেন ছিল ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি, এক সংগ্রামী সময়ের স্মৃতিচারণ, এক যুগের নীরব প্রস্থান।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই নগরীর আকাশে ছিল অদ্ভুত এক বিষণ্নতা। জামিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ মাঠের দিকে যেতে যেতে মানুষের চোখেমুখে ফুটে উঠছিল শোক, স্মৃতি আর অবিশ্বাসের মিশ্র অনুভূতি। যেন সবাই মনে মনে ভাবছিল—যে মানুষটি এত বছর ধরে চট্টগ্রামের রাজনীতি, উন্নয়ন আর আন্দোলনের সঙ্গে মিশে ছিলেন, তিনি কি সত্যিই আর নেই?
সকাল ১১টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগেই মসজিদ প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী থেকে শুরু করে তরুণ রাজনৈতিক কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। অনেকের চোখে জল, অনেকের কণ্ঠ ভারী। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন, কেউ স্মৃতিচারণ করছিলেন, কেউবা শেষবারের মতো প্রিয় নেতার মুখটি দেখার আকাঙ্ক্ষায় ভিড়ের মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন ছিলেন পুরো এলাকায়। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, জনসমাগম ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নগর পুলিশ কমিশনার নিজেই সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। কারণ প্রশাসনও বুঝতে পেরেছিল—এটি শুধুই একটি জানাজা নয়, বরং চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের উদ্যোগ ছিল প্রশংসার দাবিদার। কারণ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও ছিল ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও মানবিক সুনাম। ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পরিবার ছিল ঐতিহ্য, শিক্ষা, ব্যবসা ও জনসেবার এক অনন্য সংমিশ্রণ। পিতা এস. রহমান ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং দূরদর্শী উদ্যোক্তা। দেশভাগের পর তিনি কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসে “ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন” প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তখনই বুঝতে পেরেছিলেন—কক্সবাজার একদিন বিশ্বমানের পর্যটন নগরী হবে। সেই স্বপ্ন থেকেই ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহাসিক “হোটেল সায়মন”। শুধু তাই নয়, তিনি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মার্সিডিজ বাস চালু করে আধুনিক পর্যটন পরিবহনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। এই পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যেই বেড়ে ওঠেন মোশাররফ হোসেন। কিন্তু তিনি শুধু ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরসূরি হয়ে থাকতে চাননি। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর মধ্যে জন্ম নেয় রাজনীতি ও দেশপ্রেমের গভীর বোধ। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিক, স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরে লাহোরের ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। লাহোরে অধ্যয়নকালেই তিনি ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সেই সময় লাহোরে ছয় দফার পক্ষে যে সাহসী অবস্থান তিনি নিয়েছিলেন, তা তাঁকে ছাত্রনেতা হিসেবে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। দেশে ফিরে তিনি চট্টল শার্দুল এম এ আজিজের হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজেকে একজন ত্যাগী ও আদর্শিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৭০ সালে তিনি প্রথমবার প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে স্বাধীনতার পর একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘদিন জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় নিঃসন্দেহে মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে তিনি সেক্টর-১ এর সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার সাহসী অভিযানে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি যে সাহস ও কৌশলের পরিচয় দেন, তা আজও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। স্বাধীনতার পরও তাঁর সংগ্রাম থেমে থাকেনি। রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় বহুবার তিনি হামলা, নির্যাতন ও মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৮০ সালে নিউমার্কেট এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় তাঁর পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারির হত্যাযজ্ঞে তিনি গুরুতর আহত হন। ১৯৯২ সালে ফটিকছড়িতে সশস্ত্র হামলায় মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসেন। কিন্তু এসব কিছুই তাঁকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। অনেকেই বলেন, তিনি ছিলেন এমন একজন রাজনীতিক, যিনি ক্ষমতার রাজনীতির চেয়ে আদর্শের রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। ’৭৫ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে। এ কারণেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও তিনি সম্মানিত ছিলেন।
মন্ত্রী হিসেবেও তাঁর সুনাম ছিল। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে তিনি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পর্যটন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। চট্টগ্রামের উন্নয়নেও তাঁর ছিল বিশেষ ভূমিকা। অসংখ্য রাস্তা, ভবন, আবাসন ও অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর অবদান এখনো দৃশ্যমান। জানাজায় বক্তারা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন একজন সৎ, মার্জিত, স্পষ্টবাদী ও উদার মনের মানুষ। তিনি কখনও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেননি। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ খুব কমই শোনা গেছে। অনেকেই তাঁকে “চট্টগ্রামের ভদ্র রাজনীতির শেষ প্রতীক” বলেও উল্লেখ করেন। কিন্তু শোকের এই পরিবেশের মধ্যেই নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় কিছু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। জানাজা শেষে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মিছিল নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে ওয়াসা মোড় থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত বড় মিছিল নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেক সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন—একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা কি শুধুই শোক, শ্রদ্ধা ও দোয়ার পরিবেশে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত ছিল না? কেউ কেউ মনে করছেন, দলীয় শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা পুরো আয়োজনের গাম্ভীর্যকে আংশিকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। সচেতন মহলের মতে, সরকার ও প্রশাসন যেখানে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছিল, সেখানে কিছু অতিউৎসাহী নেতাকর্মীর আচরণ পুরো পরিবেশকে বিতর্কিত করে তুলেছে। এতে পুলিশ প্রশাসনও সমালোচনার মুখে পড়েছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে—বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবুও সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি সত্য স্পষ্ট—ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন চট্টগ্রামের রাজনীতির এক প্রভাবশালী অধ্যায়। তাঁর জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে, তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক সময়ের প্রতীক, এক সংগ্রামী প্রজন্মের প্রতিনিধি। জানাজায় উপস্থিত হয়ে মরহুমের প্রতি শ্রদ্ধা জানান চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সাবেক সিটি মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। বিপুল সংখ্যক বীর মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষের উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে আবেগঘন করে তোলে। মিরসরাইয়ে দ্বিতীয় দফা জানাজার নামাজ শেষে তাঁকে তাঁর জন্মস্থান ধুমগ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। শেষ বিদায়ের এই দিনে তাই একসঙ্গে দেখা গেল শোক, স্মৃতি, শ্রদ্ধা, রাজনীতি, বিতর্ক এবং ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া। যেন চট্টগ্রাম নিজের অতীতের একটি বড় অধ্যায়কে চোখের জলে বিদায় জানালো। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চলে গেলেন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, উন্নয়ন ও সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তাঁর দীর্ঘ জীবনের গল্প চট্টগ্রামের মানুষের স্মৃতিতে বহুদিন বেঁচে থাকবে।

Share This Article
Leave a Comment