আলোকিত কলম, অন্ধকার মনঃ লেখকদের দ্বিমুখী মানসিকতার মনস্তত্ত্ব

By admin
8 Min Read

মো. কামাল উদ্দিনঃ
আমি একজন সাধারণ লেখক-সাংবাদিক। পাঠক হিসেবেই নিজেকে বড় করে দেখি, তবে আমার সৌভাগ্য যে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংস্থা পেন ইন্টারন্যাশনাল-এর একজন সদস্য হিসেবে এবং সাংবাদিকতার সুবাদে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাতায়াতের সুযোগ পেয়েছি। বিশ্বের বহু লেখক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছি, অন্তত দশজন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক এবং কয়েক হাজার বিশ্ববরেণ্য লেখক-সাংবাদিকের সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা হয়েছে। তাঁদের কলম, কথা ও অন্তরঙ্গতায় স্পর্শ পেয়েছি। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি—সত্যিকারের মহান লেখকদের মধ্যে আত্মঅহংকার কম, সংকীর্ণতা কম বা প্রায় নেই; তাঁদের লেখনীতে, কথায়, ভঙ্গিতে ও আচরণে প্রকাশ পায় মানবতার মমতা, শ্রদ্ধা ও বিনয়। আমার অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিতে তুলনামূলকভাবে দেশীয় লেখক সমাজে একটি বিপরীত চিত্র দৃশ্যমান হয়—বাহ্যিকভাবে আলোকিত, উদার ও প্রগতিশীল দেখালেও, ভেতর থেকে তারা কখনো-কখনো সংকীর্ণ, হিংসুক ও আত্মআড়ালপ্রবণ। এই দ্বিমুখিতা কেবল ব্যক্তি স্তরের নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর ফলও। নিচে বিশ্লেষণ, উদাহরণ, এবং কিছু বিশ্বমানের লেখকের উক্তি যুক্ত করবো যা আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়। লেখকরা সাধারণত নিজের কাজের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হন। তাদের লেখনী, ভাবনা ও অভিব্যক্তি তাদের অভ্যন্তরীণ জগৎকে প্রতিফলিত করে। যখন পাঠক ও সমালোচকের প্রতিক্রিয়া আসে, তা ভালো লাগলেও—প্রশংসা পেলে আনন্দ হয়, কিন্তু অন্যের প্রশংসা পেলে হিংসা বা অপর্যাপ্ততার অনুভূতি কাজ করতে পারে। বিশেষ করে যদি লেখা কম মূল্যায়িত হয়, অথবা যদি অন্য কেউ বেশি শ্রদ্ধা পায়, তখন “আমি কেন ততটা গুরুত্বপূর্ণ নই”-মত্যবোধ একজন লেখকের মনে অচেনা নয়। মনোবিজ্ঞান বলছে, মানুষের মধ্যে আছে ইড (instinctual desires), ইগো (self, awareness), সুপার ইগো (নৈতিক মান, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ)। লেখকের ক্ষেত্রে ইগো অনেক সময় অতিমাত্রায় সক্রিয় হয় – “আমি বড় লেখক”, “আমার কাজই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ” ইত্যাদিতে মরিচিকা দেখা দিতে পারে।
নার্সিসিজম বা স্বীয় কাজকে সন্তান মত মনে করার প্রবণতা থাকলে, অন্যের সাফল্য মেনে নেওয়া কঠিন হয়। দেশে দেশে সমালোচনার ধরন ভিন্ন। কিছু দেশে সামাজিক প্রতিষ্ঠা বেশি গুরুত্ব পায়, পুরস্কার, জনপ্রিয়তা, নাম, ঐতিহ্য—এসব লেখক মানসিকতার উপর প্রচুর প্রভাব ফেলে। আমাদের দেশে, লেখক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, চিহ্নিত দৃষ্টিভঙ্গা, পার্ট-ভুক্তি, সমর্থন কৃষ্ণাচ্ছন্ন সম্পর্ক—এসব বিষয় লেখকের মনকে প্রভাবিত করে। নিচে কয়েকজন বিশ্ববরেণ্য লেখক ও তাদের উক্তি দিয়েছি, যাঁরা মানবিকতার প্রেমে সচেতন ছিলেন, যারা অহংকার ও দ্বিমুখিতার ঊর্ধ্বে থেকেছেন, এবং যাঁরা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা:আলবার্ট শ্বেইৎজার Albert Schweitzer— “Reverence for Life”-এর বাণী তাঁর কাজের মূল ভিত্তি ছিল। জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা ও মানুষের প্রতি দয়া তাঁর নৈতিক দর্শন ও কাজকে আলোকিত করেছে। জন বুকান John Buchan — “Without humility there can be no humanity.” এই সংক্ষিপ্ত উক্তি মহান সত্যকে স্পর্শ করে; একে আলোকিত লেখক যারা মানবিক অনুভূতির ভিত্তিতে কাজ করেন, তাঁরা এই ধরনের বিনয়ের গুণকে সামনে রাখেন। কনফুসিয়াস Confucius — “Humility is the solid foundation of all virtues.” মানবীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ভিত্তি হিসাবে বিনয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। টিএস এলিয়ট T. S. Eliot— “The only wisdom we can hope to acquire is the wisdom of humility.” বিনয়ের জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞানের পথ এই ধরনের উপলব্ধি বহু লেখকের মধ্যে গভীরভাবে প্রয়োজনে পরিণত হয়। এইসব লেখকদের জীবন ও কলম আমাদের শিক্ষা দেয়—বিনয় হতে পারে বহুবিধ, কিন্তু সত্যিকারের ভেতরের শক্তির উৎস। নিচে কিছু কারণ বিশ্লেষণ:কারণব্যাখ্যাস্বীকৃতি ও প্রচারমূলক শিঙাঅনেক লেখক সমাজে জনপ্রিয় লেখা বা প্রচার বেশি হতে চান। যখন লেখক মিডিয়া, পুরস্কার বা অন্যান্য বাহ্যিক সাফল্য লক্ষ্য করেন, তখন লেখকের অভ্যন্তরীণ স্বীকৃতি (দৃষ্টিভঙ্গা, সাহিত্যিক মূল্য) পিছনে পড়ে যেতে পারে।অপর্যাপ্ত সাহিত্য পরম্পরা সহযোগিতা যেখানে লেখকেরা পরস্পরের কাজকে ভালোভাবে পড়েনা, সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, বা অন্য লেখককে উৎসাহ দেয় না—সেখানেই সমবেদনা ও সহমর্মিতার জায়গা কম থাকে।রাজনীতি ও ব্যক্তিগত গোষ্ঠীবদ্ধতালেখক সমাজ অনেক সময় রাজনৈতিক মতবিনিময়, ধারার আনুগত্য, সামাজিক যোগাযোগের ভিত্তিতে বিভক্ত। এই বিভাজন অনুভূতির অন্ধকার বাড়ায়।শিক্ষার ও সাহিত্য-আলোচনার অভাবলেখনশৈলী, নৈতিক দিক, সাহিত্যবিচার ও নৈতিক ও মূল্যবোধের আলোচনায় প্রতিষ্ঠানগতভাবে কম গুরুত্ব থাকলে লেখকের ব্যক্তিগত মানসিক প্রশিক্ষণ কম হয়।সমালোচনা গ্রহণ-ব্যবহার অদক্ষতাসমালোচনার মাধ্যমেই লেখার উন্নতি হয়, কিন্তু অনেক লেখক সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ভাবেন, অন্যের কাজকে হঠাৎ প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। লেখকের যেসব গুণ থাকলে উল্টো স্বভাব কাটিয়ে ওঠা যায়, তা নিচে: আত্মসমালোচনা ও আত্মপরীক্ষা নিজের মধ্যে কি দ্বিমুখিতা আছে—পাঠকের সামনে কি ভদ্র মুখে কথা বলি, কিন্তু অন্তর থেকে কি হিংসা অনুভব করি? জানতে হবে। নিয়মিত লেখালেখির বিষয়বস্তু, প্রতিক্রিয়া ও মনের ভাব খোলাখুলি পরীক্ষা করলে অনেক অন্ধকার আলোকিত হয়।অন্যের কাজ পড়া ও প্রশংসা করা শুধু নিজের লেখা নিয়েই ব্যস্ত হওয়া নয়, অন্য লেখকদের কাজ পড়া ও মূল্যায়ণ করা—যে কাজ ভালো, সেটা প্রশংসা করা—এই অভ্যাস তৈরি করলে মন থেকে হিংসুকতা কমে। সহকর্মী-বন্ধুত্ব ও সাহিত্য সংলাপের বিকাশ সম্মেলন, পাঠচক্র, লেখক-সাংক্রান্তি আলোচনা—এসব জায়গায় সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য মানুষের অনুভূতি, সত্য ও মানবতার কথা উঠে আসে। সহযোগিতা বাড়লে গণ্ডি কমে। মানবিক গুণাবলীর বিকাশ দয়া, শ্রদ্ধা, বিনয়, সহানুভূতি—এই গুণগুলোর চর্চা শুধু লেখকের জন্য নয়, মানুষের জন্যও প্রয়োজন। নিজের পরিচিত ও অপ্রচিত পাঠকদের দিক থেকে ভাবা—মহান শক্তি গড়ে দেয়। নৈতিক দায়িত্বের তত্ত্ব বোধ অনেক আন্তর্জাতিক মহান লেখক মনে করেছেন, সাহিত্য শুধু শিল্প নয়, একটি নৈতিক ব্যাঙ্কিং যেখানে মানবতার ঋণ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের দায়িত্ব যুক্ত থাকে। যারা এই দায়িত্বকে মেনেছেন, তাঁরা কলম ও মন উভয়ই উজ্জ্বল ছিলেন। নিচে কিছু উদ্ধৃতি ও উদাহরণ দিচ্ছি যা আপনার লেখা আরও সূক্ষ্ম এবং সুললিত করতে সাহায্য করবে:“Humility is not thinking less of yourself, it’s thinking of yourself less.” — এই উক্তিটি খুব জনপ্রিয়, যদিও কোথাও কোথাও ঘটেছে যে মানুষ এটিকে অন্য কথোপকথন থেকে সংশ্লিষ্ট করেছেন। তবে মানে স্পষ্ট: আত্মচিন্তার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে অন্যান্য মানুষের প্রতি দৃষ্টিপাত করা। “Without humility there can be no humanity.” — জন বুকান। মানবতার সঙ্গে বিনয়ের এমন গাঢ় সংযোগ যে, বিনয় নেই, মানবভাবে আচরন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। “The only wisdom we can hope to acquire is the wisdom of humility.” — T. S. Eliot। জ্ঞান ও সাহিত্য দুটোই বিনয়ের ভিত্তিতে প্রকট হয়। “Humility is the solid foundation of all virtues.” — কনফুসিয়াস। সমস্ত নৈতিক গুণাবলীর ভিত্তিতে বিনয় থাকা অত্যাবশ্যক।
আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনা স্মরণ করতে পারি— একবার নরওয়ের সাহিত্য সম্মেলনে, একটি সেমিনারে একজন স্থানীয় লেখক তাঁর কাজের সমালোচনা শুনে একটু খেই হারিয়েছিলেন। তখন একই সম্মেলনে এক নোবেলজয়ী লেখক সম্মানসূচকভাবে তাঁর কাছে গিয়েছিলেন, তাঁর লেখা-আলোচনা করেছেন, এবং বলেছিলেন—“তোমার এই অংশ ভালো হয়েছে, ভালো দিকটি এখানে, আর এইখানে উন্নতির সম্ভাবনা আছে।” এই পরিমিত ও সহানুভূতিশীল আচরণ, যা অহংকারে ভরা হলে দুর্লভ হয়ে পড়ত, উপস্থিত সবাইকে স্পর্শ করেছিল। অন্য একটি সময়, এশিয়ার একটি সাহিত্য উৎসবে দুই-তিনটি ভাষার লেখকদের মিলন হয়। একজন লেখক বললেন, “আপনার ভাষায় তিনি যা করেছেন, আমার ভাষায় তাঁর সমান কাজ পাওয়া কঠিন।” তখন আরেকজন লেখক বললেন, “ভাষা শুধু মাধ্যম, বিষয়বস্তু মানুষের অনুভূতি। এছাড়া আমাদের লেখা যা মানুষের ভেতর প্রবেশ করতে পারে, সেটাই সবচেয়ে বড়।” তাদের কথায় মিশে ছিল পরস্পরের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, কোনো গরিমা দাবি নয়, বরং একে অপরের আলোর উৎস দেখার মূল্যবোধ।  লেখক সমাজকে আমি দেখেছি হীরার মতো সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ, তবে কখনো কখনো আদি কয়লোর মতো আরও গভীর থেকে আলোর অভাব বোধ করে। স্বপ্ন করি, আমাদের সৃজনশীল সমাজ হবে এমন—যেখানে কলম শুধু প্রতিযোগিতার হাতিয়ার নয়, মানুষের হৃদয়ে স্পর্শ, অনুভূতির শুদ্ধতা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

Share This Article
Leave a Comment