
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশে সদ্য যোগদানকৃত পুলিশ সুপার মাসুদ আলম-এর সঙ্গে চট্টগ্রামে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের মতবিনিময় সভা কেবল একটি প্রথাগত সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না; বরং এটি ছিল প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও গণমাধ্যমের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন প্রত্যাশার এক সূচনা। এমন একটি সময়ে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ভূমিদস্যুতা, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে নতুন পুলিশ সুপারের বক্তব্য এবং তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের কাছেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্য দায়িত্ব গ্রহণকারী পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। সভায় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের উপস্থিতি প্রশাসন ও গণমাধ্যমের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্বকেই সামনে এনেছে। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, বরং জনগণের কল্যাণে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত প্রয়াস। মতবিনিময় সভায় পুলিশ সুপার মাসুদ আলম যেভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বিশেষ করে জঙ্গল সলিমপুর ও রাউজানে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তিনি যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়েছেন, তা জনমনে আশার সঞ্চার করে। “অপরাধী যেই হোক, কোনো ছাড় নয়”—এ বক্তব্য নিছক প্রশাসনিক ভাষণ নয়; এটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন পর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নতুন বার্তা পেতে পারে। চট্টগ্রাম বহু সম্ভাবনার নগরী, আবার একইসঙ্গে বহু চ্যালেঞ্জেরও শহর। শিল্প, বন্দর, ব্যবসা-বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে এই অঞ্চলে অপরাধচক্রও প্রায়ই সক্রিয় থাকে। পাহাড়ি এলাকা, শহরতলি, উপকূলীয় অঞ্চল এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন সামাজিক বৈষম্য অপরাধের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। জঙ্গল সলিমপুরের মতো এলাকায় ভূমিদখল, সন্ত্রাস ও আধিপত্য বিস্তার কিংবা রাউজানে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে সহিংসতা নতুন কিছু নয়। ফলে এসব বিষয়ে জেলা পুলিশের কঠোর অবস্থান সময়োপযোগী বলেই মনে করেন অনেকেই। তবে বাস্তবতার প্রশ্নও রয়েছে। বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেন, কিন্তু মাঠপর্যায়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি, প্রভাবশালী চক্র, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত নেটওয়ার্কের কারণে সেই উদ্যোগ অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—তার ঘোষিত নীতিকে বাস্তবায়ন করা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করা। সভায় তিনি আরও বলেছেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, পশুর হাটকেন্দ্রিক অপরাধ, পরিবহন চাঁদাবাজি ও জনসমাগম এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের টহল বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধের প্রবণতা বাড়ে—বিশেষ করে পশুর হাট, মহাসড়ক, নগদ অর্থ লেনদেন ও মানুষের যাতায়াতকে কেন্দ্র করে অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই আগাম প্রস্তুতি একটি ইতিবাচক প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। তবে পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি জনসচেতনতা ও গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে কম নয়। গণমাধ্যম যদি অপরাধ প্রবণতা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, জনগণের সতর্কতা ও প্রশাসনের ঘাটতি নিয়ে দায়িত্বশীল প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাহলে অপরাধ প্রতিরোধে সেটিও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সম্মানের প্রশ্ন। পুলিশ সুপার মাসুদ আলম সাংবাদিকদের সমাজের দর্পণ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিক যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে জেলা পুলিশ সতর্ক থাকবে। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর কোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত আচরণ সহ্য করা হবে না—এ বক্তব্য সাংবাদিক সমাজের জন্য স্বস্তির। কারণ বাস্তবতা হলো, মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা প্রায়ই হয়রানি, হুমকি, হামলা, মামলা কিংবা প্রশাসনিক অসহযোগিতার মুখোমুখি হন। বিশেষ করে অপরাধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অবৈধ দখল কিংবা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করতে গেলে নানা বাধা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। দ্য টুরিস্ট পত্রিকা ও মাল্টিমিডিয়া নিউজ-এর পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি পুলিশকে গণমুখী করার কথা বলেছেন, জনসেবা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সকল ধরনের অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে কোনো আপস করা হবে না বলে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে এখানেই আমাদের দায়িত্ব শুরু হয়। কারণ একটি প্রতিশ্রুতি তখনই সফল হয়, যখন তার বাস্তব অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়। সাংবাদিকদের কাজ কেবল প্রশংসা করা নয়, আবার অকারণ সমালোচনাও নয়; বরং সত্য তুলে ধরা। যদি পুলিশ প্রশাসন ভালো কাজ করে, সেটি জনগণের সামনে তুলে ধরা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোথাও গাফিলতি, দুর্নীতি, হয়রানি বা ব্যর্থতা থাকলে তা সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করাও গণমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্ব। সাংবাদিকদের নির্ভীক লেখনি অনেক সময় প্রশাসনের জন্য আয়নার মতো কাজ করে। যেখানে অনিয়ম দেখা যায়, সেখানে প্রশ্ন তুলতে হয়; যেখানে সফলতা থাকে, সেখানে প্রশংসাও জানাতে হয়। সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রশাসনকে শক্তিশালী করে, দুর্বল নয়। কারণ একটি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। চট্টগ্রামবাসী আজ একটি নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও অপরাধমুক্ত পরিবেশ চায়। তারা চায় এমন একটি পুলিশ প্রশাসন, যারা জনগণের বন্ধু হবে, ভয় নয়; যারা দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াবে, প্রভাবশালীদের নয়; যারা অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধকে দেখবে। যদি পুলিশ সুপার মাসুদ আলম তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সফল হন, তাহলে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই পথ সহজ নয়। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সততা, পুলিশের আন্তরিকতা, জনসম্পৃক্ততা এবং সর্বোপরি নির্ভীক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। আমরা প্রত্যাশা করি, চট্টগ্রামের নতুন পুলিশ সুপারের ঘোষিত অঙ্গীকার কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা বাস্তবতায় রূপ নেবে। আর সেই যাত্রায় গণমাধ্যমের সাহসী কলম, তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন এবং জনস্বার্থে আপসহীন অবস্থান হবে তার অন্যতম শক্তি। কারণ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সংগ্রামে দায়িত্বশীল পুলিশ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা—দু’টিই একটি সভ্য, নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অপরিহার্য স্তম্ভ।