চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি-পশ্চিম) বিভাগের বিশেষ অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিসহ নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে (৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে খুলশী থানার আমবাগান এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ডিবি (পশ্চিম) পুলিশের একটি আভিযানিক দল। অভিযানে মো. শাহীন (৩৪) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার শাহীনের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার সাতগাঁও (অজি বাড়ী) এলাকায়। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানার আমবাগান এলাকার সিরাজ মিয়ার বাড়িতে বসবাস করতেন। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া বিদেশি পিস্তল ব্যবহার করে শাহীন বিভিন্ন সময়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। এছাড়া তিনি নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় খুলশী থানায় অস্ত্র আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না, অস্ত্রটির উৎস এবং এটি কোনো অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে কি না—সেসব বিষয়েও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ।
চট্টগ্রামে বিশেষ অভিযানে ১০ হাজার ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার, জব্দ পিকআপ
চট্টগ্রাম থেকে রাজীব দাশ :
চট্টগ্রাম মহানগরের কোতোয়ালী থানার বিশেষ অভিযানে ১০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ এক পেশাদার মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময় ইয়াবা বহনে ব্যবহৃত একটি পিকআপ গাড়িও জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, বুধবার পাঁচ আগস্ট, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোতোয়ালী থানার পাথরঘাটা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কাজী মনিরুল করিমের নেতৃত্বে একটি দল লইট্টাঘাটা চার নম্বর ঘাটের প্রবেশমুখে মেরিনার্স রোডে বিশেষ চেকপোস্ট পরিচালনা করে। অভিযান চলাকালে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজারের উদ্দেশ্যে আসা একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন নীল রঙের খোলা পিকআপকে থামার সংকেত দেওয়া হয়। পরে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে পিকআপটি তল্লাশি করে উদ্ধার করা হয় ১০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট। একই সঙ্গে মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত পিকআপটিও জব্দ করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তি হলেন কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার উত্তর পুকুরিয়া এলাকার মো. আবুল কালাম, বয়স ৩৮ বছর। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ইয়াবার উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, নগরীতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
পর্যটন শিল্পে নতুন দিগন্তের নির্মাতা: বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বিশ্বমানের বাংলাদেশের স্বপ্ন-
ভারত থেকে আসছে কাঁচামরিচ, কমবে দাম
দেশের বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে হিলি স্থলবন্দরের ১০ আমদানিকারককে মোট ২ হাজার ৯০০ টন কাঁচামরিচ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আমদানির অনুমতি পাওয়ায় এরই মধ্যে ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানির জন্য এলসি খোলাসহ অন্যান্য কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন আমদানিকারকরা। প্রক্রিয়া শেষে সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেল থেকে ভারত থেকে আমদানি শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকরা। এতে বাজারে দাম কমে আসবে। হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক শাহাবুল ইসলাম বলেন, বৈরী আবহাওয়া ও ঝড়বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মরিচের ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী মরিচ না পাওয়ায় দাম প্রতি কেজি ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। যেহেতু ভারতে দাম কম রয়েছে তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে আমরা ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানির অনুমতি চেয়ে আসছিলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। তিনি জানান, হিলি স্থলবন্দরের বেশ কয়েকজন আমদানিকারক আমদানির অনুমতি পেয়েছেন। এরপর তারা এলসি খোলা থেকে অন্য যেসব প্রক্রিয়া আছে সেগুলো করছেন। আজ বিকেল নাগাদ ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানি শুরু হবে। এতে করে দেশের বাজারে দাম কমবে। হিলি স্থলবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক আনোয়ার হোসেন জানান, দেশের বাজারে কাঁচামরিচের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এরই মধ্যে হিলি স্থলবন্দরের ১০ জন আমদানিকারক ২ হাজার ৯০০ টন আমদানির অনুমতি পেয়েছেন। এখন তারা আমদানি করতে পারবেন। হিলি স্থলবন্দর দিয়ে সর্বশেষ গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানি হয়েছিল।
প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব মেলাচ্ছে মানুষ
হাজারো প্রাণের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি আজ বুধবার। ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে একটি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতা রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল। নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েও ক্ষমতায় টিকতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগস্টের ৫ তারিখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। বিজয় অর্জিত হয় জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। শুরু হয় নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে পথচলা। আজ দুই বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এদিকে দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। সরকার, বিরোধীদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা কর্মসূচি নিয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজনৈতিক ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট। নিপীড়ন-বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের বিভিন্ন অংশের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে যেভাবে সবাই সজাগ হয়ে উঠেছিল; তাতে জনগণের মাঝে একটি আকাঙ্ক্ষার তৈরি হয়েছিল—স্বৈরতন্ত্রকে রক্ষা না করে রাষ্ট্র হবে গণতান্ত্রিক, গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা; নিপীড়ন ও আধিপত্য থেকে মুক্ত হবে, যার ফলে একটি মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে বাংলাদেশ। এই প্রত্যাশাগুলো রাজধানীর দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আকারে প্রকাশ পেয়েছিল তখন। তবে দুই বছর পরে এসে সেই প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষা কোনো জমাটবাঁধা রূপ নেয়নি। তারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পরের ঘটনাগুলো প্রত্যাশা থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। শুরু থেকেই গণঅভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করে সহিংসতা, নৈরাজ্য, লুটপাট, আক্রমণ, ভাঙচুর, মব সন্ত্রাস দেখা যায়। ধীরে ধীরে একটি জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে ফের গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে। নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। জুলাই হত্যা ও হামলার ঘটনার বিচার হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এরই মধ্যে ৬টি মামলার বিচার হয়েছে। এতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৪৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন এসেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দুর্নীতি প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি পূরণ হওয়া বাকি। নাগরিক সমাজের মতে, দীর্ঘদিনের চেপে বসা অব্যবস্থাপনা রাতারাতি উপড়ে ফেলা সম্ভব না হলেও মৌলিক অধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাষ্ট্রকে আরও দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। যেভাবে ভাঙল দীর্ঘ অচলায়তন: পরপর তিনটি জাল-জালিয়াতির নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার হরণ, বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে গুম-খুন, ভিন্নমতকে নিষ্ঠুরভাবে দমন, দুর্নীতি, ব্যাংক খাতে অনাচার, অর্থ পাচার, সর্বোপরি ক্ষমতার দম্ভে কার্যত একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল ভোট ও ভাতের অধিকারের অঙ্গীকার করে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনা। তার শাসনামলে অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও ক্ষমতার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিকে জেল-জুলুমের মাধ্যমে বারবার দমন করা হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে যাবে, জঙ্গিবাদের উত্থান হবে—এ বয়ান তৈরিতে ব্যবহৃত হয় সাহিত্য, সাংবাদিকতা, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাও। সরকারকে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় রাখতে তৎপর পুলিশ, প্রশাসন হয়ে উঠেছিল নিপীড়নের হাতিয়ার। সরকারের মদদে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিল গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর হাতে। এক পর্যায়ে শেখ হাসিনাকে স্বাভাবিক পন্থায় ক্ষমতা থেকে সরানো অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছিল। ডামি ভোটখ্যাত ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো অনেকটা হাল ছেড়ে দেওয়ায় এ ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয়। এর মধ্যেই ২০২৪ সালের ১ জুলাই ছোট্ট স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। হাইকোর্টের রায়ে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সূত্রপাত হয় এই আন্দোলনের। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্রকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে। ফলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা আবার বহাল হয়। এর প্রতিবাদে ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন ছাত্ররা। ১ জুলাই সামনে আসে যে নাম—বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এই ব্যানারে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে জড়ো হন। সেখান থেকে ২০১৮ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন পুনর্বহাল করার দাবি জানান। দাবি না মানা হলে ৪ জুলাই পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের মুখপাত্র নাহিদ ইসলাম। শুরুতে সামান্য ও নিরীহ আন্দোলনই ছিল। অতীতে রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থীদের আরও বড় ও ব্যাপক আন্দোলন দমনের অভিজ্ঞতা থাকায় কোটা সংস্কারের দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি সরকার। ১১ জুলাই পর্যন্ত সিদ্ধান্ত না আসায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন জোরদার হয়। এদিন হাইকোর্ট জানান, সরকার চাইলে কোটা পদ্ধতি পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারে। এরপরও আন্দোলন-অবরোধের তীব্রতা বাড়তে থাকে। সরকারের আহ্বান উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা দেশজুড়ে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি শুরু করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ হয়। রক্তাক্ত হয় অনেক শিক্ষার্থী। এতে গোটা দেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই উত্তাপে ঘি ঢালেন তৎকালীন সড়কমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি লেলিয়ে দেন ছাত্রলীগকে। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা হামলা চালায়। এতে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। এরপরও সরকার চাইলে আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে পারত। তা না করে সরকারি বাহিনী দিয়ে ঘটানো হয় হত্যাকাণ্ড। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ ‘বুকের ভেতর বইছে ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’ স্লোগানে পুলিশের বন্দুকের সামনে প্রসারিত দুই হাতে সিনা টান করে দাঁড়ান। পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। একই দিন পুলিশের গুলিতে চট্টগ্রামে নিহত হন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। ছাত্রলীগের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধে জীবন দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা ফয়সাল আহমেদ শান্ত। ভয়ের সংস্কৃতিকে পরাস্ত করতে ছাত্রদের পাশাপাশি রাজপথে নামতে থাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ১৭ জুলাই শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণে সব হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তা আর গ্রহণ করেনি ছাত্র-জনতা। সেদিন রাতে প্রথমে রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা এবং পরে যাত্রাবাড়ীতে লাখো মানুষ নেমে আসে সড়কে। সন্তানকে নিয়ে মা নামেন রাজপথে। কিশোরী কন্যার হাত ধরে বাবা নামেন। নারী ও শিশুদের নজিরবিহীন অংশগ্রহণ দেখা যায় তাতে। পরদিন রাজধানীর উত্তরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুরে ছড়ায় বিক্ষোভের আগুন। ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। ওই দিন অন্তত ৭৭ জনকে হত্যা করা হয়। হেলিকপ্টার থেকে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর গুলির অভিযোগও ওঠে ওই দিন। ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর শুধু রাজধানী নয়, সারাদেশের মানুষ নেমে আসে রাজপথে। তাদের দাবি একটাই– শেখ হাসিনাকে বিদায় নিতে হবে। ২১ জুলাই পর্যন্ত চার দিনে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়। নির্বিচার হত্যা ও গ্রেপ্তারে ২২ জুলাই থেকে ছাত্র-জনতা পিছু হটলেও ক্ষোভে আগুন আরও তীব্র হয়। শহর থেকে গ্রামেগঞ্জে ছড়ায় তা। ২৫ জুলাই ইন্টারনেট চালুর পর আগের হত্যা ও বর্বরতার ভিডিও-ছবি সামনে আসে। মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়ে। ২৬ জুলাই ফেনী থেকে আবার আন্দোলন শুরু হয়। ছাত্র-জনতা গুছিয়ে উঠে রাজধানীর উত্তরা থেকে ২ আগস্ট ফের রাজপথে নামে। সেদিন কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, নোয়াখালীসহ প্রায় সব জেলায় বিক্ষোভ হয় সর্বস্তরের জনতার। নারী, নানা ধর্মের মানুষ, সব পেশার মানুষ সরকারের পতনের দাবি তোলে। পরদিন ৩ জুলাই জাতীয় শহীদ মিনার থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয় সরকার পতনের এক দফা। আওয়ামী লীগ আবারও দমনের পথ বেছে নেয়। ৪ আগস্ট ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১৫০ জনকে হত্যা করা হয়। জনতাও রুখে দাঁড়ায়। নরসিংদীতে জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করা ছয় আওয়ামী লীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। রংপুরে গুলি করতে এসে নিহত হয় আওয়ামী লীগ নেতা। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে থানায় হামলা করে ১৫ পুলিশকে হত্যা করা হয়। ৪ আগস্ট রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষণা দেয়, পরদিনই হবে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। সেদিন রাতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, জনতার মুখোমুখি হয়ে বিধ্বস্ত আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা আর ক্ষমতায় থাকতে পারছেন না। তার আত্মীয় এবং আওয়ামী লীগ নেতারা সেই রাতে দেশ ছাড়তে শুরু করেন। ৫ আগস্ট বেলা ১১টায় শহীদ মিনারে জমায়েত কর্মসূচি ছিল ছাত্র-জনতার। ভোর থেকেই শহীদ মিনারের দখল নেয় পুলিশ। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে নির্বিচার গুলি শুরু করে। সেদিন অন্তত ২৩ জন নিহত হয় চানখাঁর পুল ও শহীদ মিনার এলাকায়। ততক্ষণে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মোহাম্মদপুরে লাখ লাখ মানুষ জমায়েত হয়েছে। তাদের লক্ষ্য গণভবন থেকে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করে বিচারের মুখোমুখি করা। দুপুর দেড়টার দিকে খবর আসে শেখ হাসিনা আর ক্ষমতায় থাকছেন না। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও দাঁড়ান জনতার পাশে। উল্লসিত জনতা গণভবনের দিকে এগোতে থাকে। যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন থানা ঘেরাও করা জনতাকে সেই সময়েও নির্বিচার গুলি করে পুলিশ। জনতা বাধা পেরিয়ে ৩টার দিকে গণভবন পৌঁছায়। তবে তার আগে ২টা ৩৫ মিনিটে হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ক্রমান্বয়ে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি আসে ৫ আগস্ট তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্র সংস্কার, আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণই ছিল এই সর্বাত্মক আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলার এই স্বপ্ন সফল করতে জীবন দিতে হয়েছে হাজারো তরুণ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে। আহত হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অনেকে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন মতে, জুলাই অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন। সরকারি গেজেট অনুযায়ী শহীদের সংখ্যা ৮৩৬ জন। এ ছাড়া সরকারি হিসাবেই আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১১ হাজার আন্দোলনকারী। হাসিনা সরকারের পতন ঘটার পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসে নির্বাচিত সরকার। মানবজাতির ইতিহাসে এমন গণজাগরণ বিরল—বাণীতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি: গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। বাণীতে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী হাজারো বীর শহীদ এবং পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি গভীর সম্মান ও সহমর্মিতা জানান তিনি। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসন, বৈষম্য, সীমাহীন দুর্নীতি, শোষণ, গুম-খুন, দলীয়করণ; গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণ এবং জেল-জুলুমের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের অপ্রতিরোধ্য বহিঃপ্রকাশ। ফলে কোটা সংস্কারের আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও নিরস্ত্র শিক্ষার্থী-জনতার ওপর নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে এই ঘনীভূত ক্ষোভ ও জনরোষ দ্রুত রূপ নেয় সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে। এই গণঅভ্যুত্থানে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষক, তরুণ-যুব সমাজ, রাজনৈতিক কর্মী; শ্রমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবী মানুষ, অভিভাবক, ভ্রাতা-ভগ্নি, কন্যা-জায়া-জননী—সর্বস্তরের মানুষ অসীম সাহস ও ত্যাগের প্রতিজ্ঞা নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ও সমবেত শক্তিতে রাজপথে নেমে আসেন। মানবজাতির ইতিহাসে এমন গণজাগরণ বিরল। বাণীতে তিনি আরও বলেন, জনগণই সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস—গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই চিরন্তন সত্য ফের সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় আমাদের এমন একটি মানবিক ও গণমানুষের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আর কখনো ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার এবং উগ্রপন্থার ঠাঁই হবে না। বৈষম্য, দুর্নীতি, দুঃশাসন ও অন্যায়ের অবসান ঘটবে। যেখানে ভোটাধিকার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও মৌলিক অধিকার সমুন্নত থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন, জনস্বার্থ, জবাবদিহি ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত হবে। হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি—বাণীতে প্রধানমন্ত্রী: ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে তিনি বলেছেন, স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য ৫ আগস্ট আনন্দের দিন, বিজয়ের দিন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিন। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, এই দিনে দেশের বীর ছাত্র-জনতা এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। গণতন্ত্রকামী জনগণের সম্মিলিত আন্দোলনে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট গণভবন ছেড়ে পালিয়েছে। জাতীয় সংসদ ছেড়ে কথিত সংসদ সদস্যরা পালিয়েছে। আদালত ছেড়ে প্রধান বিচারপতি পালিয়েছে। বায়তুল মোকাররম ছেড়ে প্রধান খতিব পালিয়েছে। মন্ত্রিসভা ছেড়ে মন্ত্রীরা পালিয়েছে। ফ্যাসিবাদের দোসররা আত্মগোপনে চলে গেছে। ৫ আগস্ট বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও এক নজিরবিহীন ঘটনা। তিনি বলেন, এ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে এবং বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের উত্থান হতে দেওয়া যাবে না। লক্ষ্য অর্জনে শঙ্কার কথা জানালেন এনসিপি নেতা আখতার: জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি কালবেলাকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা কিছু জিনিস অর্জন করতে পেরেছি। ১৭ বছরের দুঃশাসন থেকে মুক্তি লাভ করেছি। বাকস্বাধীনতা, ভোটাধিকার ফিরে আসছে। একটা স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের একটা সুযোগ আমরা পেয়েছি। এই গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের জন্যই আমরা রাষ্ট্রকাঠামোতে একটা ব্যাপক সংস্কার প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু সেই সংস্কারের বেশিরভাগ বিষয়ই বর্তমান সরকারি দল তারা এটাকে আমলে নিচ্ছে না। বরং সে বিষয়গুলো যখন সংসদে উপস্থাপন (প্লেস) করা হলো, তার অনেক কিছুই সংসদের বাইরে চলে গেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি যে কাঠামো, যেটা জনগণকে একটা অবিশ্বাসের মধ্যে ফেলে; সেই কাঠামোতে আমরা এখনো বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করিনি। আখতার আরও বলেন, সচরাচর পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই দেখি যে, বড় বড় লক্ষ্য নিয়েই বড় ধরনের যুদ্ধ বা বিপ্লব-অভ্যুত্থানগুলো সংঘটিত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলোকে আমরা অর্জন করতে পারি না। একাত্তরেও আমাদের একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেক্ষেত্রে জুলাইয়ের যতদূর পর্যন্ত আমাদের প্রত্যাশা, তার কতটুকু আমরা অর্জন করতে পারব, সে ব্যাপারে আশঙ্কা আছে। শঙ্কার মধ্যেও বহু অর্জন দেখছেন জামায়াত নেতা আযাদ: জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ কালবেলাকে বলেন, জুলাইয়ের চেতনা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছুটা এগোলেও বিএনপি সরকারের সময় পিছিয়ে গেছে। অনেক রক্ত ও জীবন দেওয়ার মধ্য দিয়ে জুলাই অর্জন। প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি। তবে মৌলিক কোনো অর্জন নেই। তিনি বলেন, জনগণের যে ঐক্য হয়েছে এটা একটা অর্জন। মানুষ কথা বলার অধিকার পাচ্ছে, এটাও অর্জন। রাজনৈতিক দলগুলো এক সঙ্গে এক মঞ্চে বসে যে ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে এটা একটা অর্জন। তা ছাড়া জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে জুলাই সনদ তৈরি করতে পেরেছে, সেটার ওপর গণভোটও হয়েছে। এই যে বিষয়গুলো এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কিছু পরিবর্তনের প্রাথমিক পর্ব সূচিত হয়েছে। হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, আসলে এই অর্জনগুলোর কোনোটাই আমরা ধরে রাখতে পারব না এবং জাতি হিসেবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন-অগ্রগতিও আমরা অর্জন করতে পারব না, যদি না সংস্কারের মাধ্যমে সিস্টেমের পরিবর্তন আসে। এটা জুলাই গণভোটে বলা হয়েছে। সংস্কার না হলে বিগত দিনের কালিমামুক্ত যেমন করা যাবে না, তেমনই জুলাইকেও স্থায়ীভাবে টেকসই করা যাবে না। সরকার যদি সংবিধান সংশোধনের পথে না গিয়ে সংস্কারের পথে যেত, তা হলে এটা আমরা অর্জন করতে পারতাম। দেয়ালের গ্রাফিতিতে গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা—আনু মুহাম্মদ: লেখক ও গবেষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের বিভিন্ন অংশের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে যেভাবে সবাই সজাগ হয়ে উঠলেন–তার মধ্য দিয়ে একটি আকাঙ্ক্ষা দেখা দেয়। সেটি হলো এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করা, যা স্বৈরতন্ত্রকে রক্ষা করবে না; বরং গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, নিপীড়নমুক্ত ও আধিপত্য থেকে মুক্ত হবে। যার ফলে একটি মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। এই প্রত্যাশাগুলো কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা আকারে না থাকলেও দেয়ালের গ্রাফিতির মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল। দেয়ালের গ্রাফিতি আমাদের এই গণঅভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষা যেগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলো তো কোনো জমাটবাঁধা রূপ নেয়নি। শেখ হাসিনা যেভাবে দেশ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালিয়েছেন, যেভাবে নিপীড়ন বা দমন-পীড়ন চলেছে, সেভাবে যেন আর না চলে–তা খুব বড় কোনো প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরের ঘটনাগুলো প্রত্যাশা থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। শুরু থেকেই গণঅভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করে সহিংসতা, নৈরাজ্য, লুটপাট, আক্রমণ, ভাঙচুর, মব সন্ত্রাস দেখা যায়। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক জগতের ওপর আক্রমণ বেড়ে যায়। গান, বাউল, মাজার, ছবি আঁকা, নাচ, নাটক, ভাস্কর্য, থিয়েটার, চলচ্চিত্র–বাংলাদেশের মানুষের যত সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি রয়েছে, তার প্রতিটি আক্রান্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নের ওপরও আক্রমণ হয়েছে। এই ঘটনাগুলো তো নিশ্চিতভাবে গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল না। আশার কথা শোনালেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক শামছুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম কালবেলাকে বলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে আমি মনে করি, বিগত ১৭ বছর তো একটা ফ্যাসিস্ট, তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসনের মধ্যে ছিলাম। এটাতে গণতন্ত্রের লেশমাত্র ছিল না। গণবিস্ফোরণেরর মাধ্যমে মূলত গণসম্পৃক্ততা ছিল এই আন্দোলনে। আসলে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অন্যায় অবিচার এগুলোর প্রতি বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই কিন্তু ৫ আগস্ট ঘটেছে। তারপর সেটার মূল চেতনা ছিল আমরা একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ— যেমন যেখানে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারব, মিছিল-মিটিং করতে পারব; শাসকগোষ্ঠী জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে; সংসদ প্রাণবন্ত হবে। তিনি বলেন, জুলাই চেতনার মূল যে স্পিরিটটা— আমরা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে থাকব; সরকারের জবাবদিহি করতে হবে, সেটাতে আশাবাদী। ইতোমধ্যে সংবিধানের যে সংস্কার করার জন্য কমিশন, সেখানে বিরোধী দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এটার কার্যক্রম তো শুরু হতে যাচ্ছে। যে বিষয়গুলো নিয়ে মতপার্থক্য আছে, আমরা আশাবাদী এগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে আগামী দিনে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবে।
জুলাইয়ের চেতনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর
রাজধানীর শাহবাগে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামীর বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তার ভাষায়, ৫ আগস্ট শুধু শোকের দিন নয়, এটি বিজয়, আত্মত্যাগের স্মরণ এবং নতুন প্রত্যয়েরও দিন। দীর্ঘ ১৮ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে এদিন দেশে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আহমেদ আযম খান আরও বলেন, দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করা বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের ঐক্য বজায় রাখা জরুরি। শোকের পাশাপাশি এ দিনটি আনন্দ ও বিজয়েরও প্রতীক উল্লেখ করে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিভক্ত না হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের নেতৃত্বে দেশে পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এ সময় জুলাইয়ের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন তিনি। এদিকে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, জুলাইয়ের শহীদ ও আন্দোলনের যোদ্ধাদের সরকার কখনো ভুলে যাবে না। দেশের স্থিতিশীলতা নষ্টের যেকোনো ষড়যন্ত্র জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করা হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
ফটিকছড়িতে ‘ইউসুফ’ নামকে ঘিরে বিভ্রান্তি: প্রকৃত অভিযুক্ত শনাক্তে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি, নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানি না করার আহ্বান
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে “ইউসুফ” নামকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক বিভ্রান্তি। একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং কিছু সংবাদ প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত অভিযুক্তকে চিহ্নিত করার পরিবর্তে একই নামের একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিতর্কে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যার ফলে তার ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচিত ডেভিড ইমনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ওমানে বসবাস করতেন তার আপন খালার জামাই ইউসুফ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা দেশে ফিরে আসেন। এরপর ডেভিড ইমন একটি প্রভাবশালী গ্রুপের সঙ্গে সক্রিয় হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন মহলে প্রচারিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের কোনো চূড়ান্ত রায় বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পর তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে দেওয়া তথ্যে ওই ইউসুফের নাম উঠে এসেছে। আরও দাবি করা হচ্ছে, তিনি চক্রটির আর্থিক লেনদেন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে খুঁজছে এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর নজরদারিতে রয়েছে—এমন কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচারিত হচ্ছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। এদিকে, স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, অভিযুক্ত হিসেবে যাকে উল্লেখ করা হচ্ছে তিনি জিসির মোড় এলাকার বনজোর রেস্টুরেন্টের একজন অংশীদার। বিষয়টি নিয়েও নানা আলোচনা থাকলেও এ সংক্রান্ত স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, একই নামের কারণে ফটিকছড়ির আরেক বাসিন্দা ইউসুফ মুহাম্মদকে ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি সংবাদে তার ছবি ব্যবহার করা হলে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত অভিযুক্তের পরিবর্তে ভুল ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করায় একজন নির্দোষ মানুষ ও তার পরিবার সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সংশ্লিষ্ট সংবাদ থেকে ওই ছবি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। ভুক্তভোগী ইউসুফ মুহাম্মদ পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রতিবাদ দাখিল করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যথাযথভাবে প্রতিবাদ প্রকাশ না হলে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরবেন এবং প্রয়োজনে আইনি প্রতিকার চাইবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে ফটিকছড়ির ওই ইউসুফকে ১৯৮৮ সাল থেকে চিনি। দীর্ঘদিনের পরিচয়ের ভিত্তিতে আমার জানা মতে, তার বিরুদ্ধে আলোচিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য আমার কাছে নেই। রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত পরিচয় কখনোই কাউকে অপরাধী প্রমাণ করে না। একই নামের কারণে কাউকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ—সবার জন্যই ক্ষতিকর।
সচেতন মহল মনে করেন, প্রকৃত অপরাধী যেই হোক না কেন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি, একই নামের নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি, মানহানি বা সামাজিকভাবে হেয় করার যেকোনো প্রচেষ্টা বন্ধ হওয়া উচিত। সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং নির্দোষ মানুষের সম্মান রক্ষা—এই তিনটি বিষয় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এলিটের প্রথম সভায় ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন লায়ন মোঃ জাহাঙ্গীর আলম
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এলিটের ২০২৬-২০২৭ সেবা বর্ষের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১ আগস্ট (শনিবার) সন্ধ্যায় নগরীর লালখান বাজারের অভিজাত হোটেল পিটস্টপে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ক্লাবের পক্ষ থেকে লায়ন মোঃ জাহাঙ্গীর আলমকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা দেওয়া হয়। লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল জেলা ৩১৫-বি৪ বাংলাদেশের জেলা গভর্নর লায়ন মোঃ কামরুজ্জামান লিটন এমজেএফ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিডিজি লায়ন এস এম শামসুদ্দিন এমজেএফ। এছাড়াও সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কেবিনেট ট্রেজারার লায়ন মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান এমজেএফ এবং জিএলটি কো-অর্ডিনেটর লায়ন মোহাম্মদ মুছা এমজেএফ। সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন লায়ন রোকেয়া হক, লায়ন আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, লায়ন লোকপ্রিয় বড়ুয়া এমজেএফ, লায়ন মোহাম্মদ ছাফা পিএমজেএফ, লায়ন নাজমুল হুদা এমজেএফ, লায়ন মো. হাবিবুর রহমান, লায়ন মো. মেজবাহ উদ্দিন, লায়ন ডা. দীবাকর বড়ুয়া, লায়ন শোভিত বিকাশ বড়ুয়া এফসিএমএ, লায়ন প্রফেসর রেজাউল করিম, লায়ন সুমন বড়ুয়া এবং লায়ন কুনাল কান্তি বড়ুয়া। সভায় ক্লাবের বিদায়ী ২০২৫-২৬ সেবাবর্ষের প্রেসিডেন্ট লায়ন মোহাম্মদ নুরুল আকবর কাজল ও সেক্রেটারি লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া এবং নবনির্বাচিত ২০২৬-২৭ সেবাবর্ষের প্রেসিডেন্ট লায়ন মোহাম্মদ জাহেদ হোসেন ও সেক্রেটারি লায়ন অজয় কুমার বড়ুয়া উপস্থিত থেকে নতুন সেবা বর্ষের বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রমের রূপরেখা তুলে ধরেন। শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনার জবাবে লায়ন মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মানুষ তার কর্মের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। মানবিকতা ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এলিটের সাথে যুক্ত থাকতে পেরে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করছি। এ সময় তিনি তাকে ক্লাবে যুক্ত করার পেছনে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য বিশিষ্ট লেখক, কলামিস্ট ও ক্লাবের সাবেক সেক্রেটারি লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়ার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বাঁশখালীর শিশু ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি রমিজ উদ্দীন র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার
সাইফুল ইসলাম চট্টগ্রাম :
চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানায় দায়ের করা শিশু ধর্ষণ (বলাৎকার) মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি মুহাম্মদ রমিজ উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৭, চট্টগ্রাম। র্যাব-৭ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত রমিজ উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বাঁশখালী থানায় দায়ের করা শিশু ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি হিসেবে এজাহারভুক্ত ছিলেন এবং ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হবে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত কেউ যেন আইনের হাত থেকে রেহাই না পায়, সে লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
ঢাকায় ৩২ বাস রুটের প্রাথমিক অনুমোদন
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পে নতুন গতি এসেছে। প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে ৩২টি বাস রুটের বিন্যাস (এলাইনমেন্ট) নির্ধারণ করা হয়েছে, যা এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব রুটকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার জন্য সমন্বিত বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বাস মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বৈঠকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। বৈঠকে প্রথম ধাপে কোনো দুই বা তিনটি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা শুরু হবে, সে বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ডিটিসিএর জারি করা ‘সভার নোটিশ’ অনুযায়ী, আজ দুপুর ১২টায় ডিটিসিএ ভবনে ‘ঢাকা মহানগরীর মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান’ বিষয়ক এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, পরিবহন মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারাও অংশ নেবেন। রুট রেশনালাইজেশন বিষয়ে জানা গেছে, নতুন রুটগুলো এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে একই করিডোরে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা কমে আসে এবং যাত্রীরা নির্ধারিত রুটভিত্তিক সেবা পান। এর মাধ্যমে যানজট, বিশৃঙ্খলা ও যাত্রী ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হবে। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ৩২টি রুটের মধ্যে রয়েছে নন্দন পার্ক–ডেমরা, নন্দন পার্ক–কাঁচপুর, দিয়াবাড়ী–সদরঘাট, শ্রীপুর–ঢাকেশ্বরী মন্দির, কোনাবাড়ী–কেরানীগঞ্জ, গাবতলী–শিমুলতলী, ঘাটারচর–সালনা, নবীনগর–বাবুবাজার, সাভার–কাঁচপুর, গাবতলী–ডেমরা, গাবতলী–কুড়াতলী, কাঁচপুর–গাজীপুর, সাভার–আড়াইহাজার ইত্যাদি। এসব রুটের মাধ্যমে বিমানবন্দর, গাবতলী, মহাখালী, কুড়িল, গুলিস্তান, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, কাঁচপুর, সদরঘাট, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জসহ রাজধানীর প্রধান পরিবহন কেন্দ্রগুলোকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ৩২টি রুট নির্ধারণ করেছি এবং এটি নিয়ে মঙ্গলবার বাস মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার প্রাথমিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হবে। প্রথম পর্যায়ে দুই বা তিনটি রুটে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোনো রুট কর্তৃপক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মালিক ও শ্রমিকরা যে রুটগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও বাস্তবায়নযোগ্য মনে করবেন, সেগুলোই অগ্রাধিকার পাবে। বৈঠকেই প্রথম ধাপের রুট চূড়ান্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।’ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ৩২টি বাস রুট এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এগুলো খসড়া বা প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি হবে। এরপর ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি, কোন ধরনের বাস চলবে এবং কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হবে; সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘রুট চূড়ান্ত করার আগে প্রতিটি করিডোরে যাত্রীর চাপ, সড়কের প্রশস্ততা ও পরিচালনার সক্ষমতা বিবেচনায় সমীক্ষা করা হবে। সেই সমীক্ষার ভিত্তিতে কোন রুটে কী ধরনের বাস প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা হবে।’ তার মতে, ঢাকা-গাজীপুর বা ঢাকা-সাভারের মতো ব্যস্ত করিডোরে পরীক্ষামূলকভাবে আধুনিক বাস পরিচালনা শুরু করা যেতে পারে। সাইফুল আলম বলেন, ‘বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্দেশ্য শুধু নতুন রুট নির্ধারণ নয়; বরং পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা। এজন্য ডিজিটাল ভাড়া আদায়, নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা, প্রতিটি স্টপেজে বাসের আগমনের সময় জানাতে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড এবং যাত্রী ও চালকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান মালিক ও শ্রমিকদের সম্পৃক্ত রেখেই ধাপে ধাপে নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রয়োজনীয় নীতিগত ও অবকাঠামোগত সহায়তা পেলে বেসরকারি মালিকরা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনার জন্য চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির একটি সূত্র কালবেলাকে জানায়, বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে সরকারের সঙ্গে মালিকদের কোনো মতপার্থক্য নেই। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে তারাও আগ্রহী। প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে দুটি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০০টি বাস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। আংশিক ডাউন পেমেন্টের ভিত্তিতে বাসগুলো সরবরাহের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক বাসের জন্য প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামোও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে তারা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশন অনেক আগেই বাস্তবায়ন হওয়া উচিত ছিল। স্মার্ট সিগন্যাল বা ইলেকট্রিক বাসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সুশৃঙ্খল বাস ব্যবস্থা, যা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতির মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে একই করিডোরে একাধিক বাসের প্রতিযোগিতার কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা চালু হলে বাসের নেটওয়ার্ক আরও কার্যকর হবে, মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার করবে, যানজট কমবে এবং মেট্রোরেলের ওপর চাপও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।’ ড. শামসুল হক বলেন, ‘এই সংস্কারের জন্য সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। সরকার সফল হলে রাজধানীর গণপরিবহনে দীর্ঘদিনের অরাজকতা দূর করে একটি আধুনিক, যাত্রীবান্ধব ও টেকসই বাস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। তবে বর্তমানে যেসব মালিক বাস খাতে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের বাদ দিয়ে নতুন ব্যবস্থা চালু করা উচিত হবে না। বরং কোম্পানিভিত্তিক ব্যবস্থায় তাদের ইক্যুইটি বা অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।