
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
একজন মানুষের শরীর যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন অনেকেই নীরব হতে চান। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন—যাঁদের শরীর অসুস্থ হলেও বিবেক কখনো বিশ্রাম নেয় না। মিজানুর রহমান চৌধুরী ঠিক সেই মানুষদের একজন। সময়ের সাহসী সাংবাদিক, একাধিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক—আজ তিনি দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ওষুধের গন্ধ, নীরব রাত—সবকিছুর মাঝেও তাঁর চিন্তা এক জায়গাতেই আটকে আছে—এই বাংলায়। যে বাংলাদেশে তাঁর জন্ম। যে বাংলাদেশে কেটেছে শৈশব ও কৈশোর। যে বাংলাদেশে হাতে কলম তুলে নিয়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। শরীর আজ ভিনদেশে, কিন্তু মন পড়ে আছে এখানেই এই মাটিতে, এই মানুষের মাঝে। কলম দিয়ে যে লড়াই, তা কখনো থামে না মিজানুর রহমান চৌধুরী আরাম এই প্রিয় সাংবাদিক তার প্রমসন। তিনি জানতেন সত্য বলার মূল্য আছে, প্রতিবাদের মূল্য আছে। তবু তিনি পিছু হটেননি। ক্ষমতার চোখরাঙানি, সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। কারণ তাঁর কাছে সাংবাদিকতা ছিল পেশা নয়, ছিল দায়িত্ব। একটি সময় ছিল, যখন তাঁর কলাম পড়েই মানুষ বুঝত—কোথায় ভুল হচ্ছে, কারা লুট করছে, কারা ইতিহাস বিকৃত করছে। তিনি নাম ধরে প্রশ্ন তুলেছেন, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাই তিনি জনপ্রিয়ও হয়েছেন, আবার অপ্রিয়ও হয়েছেন। কিন্তু কখনো আপস করেননি। আজও তিনি আপসহীন। দূরে থেকেও যাঁর চোখে দেশের প্রতিটি ক্ষত স্পষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি আজ দেশের বাইরে। কিন্তু দূরত্ব তাঁকে অন্ধ করেনি। বরং দূর থেকে তিনি আরো স্পষ্ট দেখছেন এই দেশের ক্ষতগুলো কত গভীর। তিনি দেখছেন, কীভাবে তিলে তিলে গড়ে ওঠা জনমত ভেঙে পড়ছে। তিনি দেখছেন, কীভাবে স্বপ্ন দেখানো তরুণদের আকাঙ্ক্ষা আজ অনিশ্চয়তায় আটকে যাচ্ছে। তিনি দেখছেন, কীভাবে লুটেরা শ্রেণি আবারও ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে ধেয়ে আসছে। দুর্নীতি থামেনি। স্বজনপ্রীতি কমেনি। আইনশৃঙ্খলার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। রাষ্ট্রযন্ত্র এখনো দুর্বল, বিচার এখনো ধীর, জবাবদিহি এখনো অনুপস্থিত। পাচার হওয়া অর্থ, ফিরে না আসা ন্যায় বিচার মিজানুর রহমান চৌধুরীর সবচেয়ে বড় আক্ষেপ—লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে গেল, কিন্তু সেই অর্থ ফেরত আনার দৃশ্যমান সাফল্য নেই। যারা এই রাষ্ট্রকে নিঃস্ব করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। বড় অপরাধীরা আজও প্রভাবশালী, আর সাধারণ মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে আশা হারাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন রাষ্ট্র যদি লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর না হয়, রাষ্ট্র যদি জনগণের পক্ষে দৃঢ় না দাঁড়ায়, তাহলে আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়তে চাই? এই প্রশ্নই তাঁকে প্রতিদিন কুরে কুরে খাচ্ছে। পৃথিবীর চোখে বাংলাদেশ, বিবেকের কাঠগড়ায় আমরা আজ শুধু দেশের মানুষ নয় সারা পৃথিবী বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা জানতে চায় এই দেশ কোন পথে হাঁটবে? গণতন্ত্র কি শক্ত হবে, নাকি আরও দুর্বল? দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই হবে, নাকি তা কেবল স্লোগানে আটকে থাকবে? এই আন্তর্জাতিক দৃষ্টিও মিজানুর রহমান চৌধুরীকে বিচলিত করে। কারণ তিনি জানেন—একটি দেশের ভাবমূর্তি কেবল উন্নয়ন দিয়ে নয়, ন্যায়বিচার ও সততার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। প্রতিবাদই শেষ ভরসা এই বাস্তবতা থেকেই তিনি মনে করেন—সময় এসেছে আবারও প্রতিবাদ গড়ে তোলার। নীরবতা আর নিরাপদ নয়। নির্লিপ্ত থাকা এখন অপরাধের শামিল। তিনি বিশ্বাস করেন— কলমকে আবার শান দিতে হবে। মননে ঐক্য গড়তে হবে।
জীবনে সাহস ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশের সকল অপকর্মের ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে লিখতে হবে। কে কখন কী করেছে—তা দলিল আকারে রেখে যেতে হবে। কারণ ইতিহাস না লিখলে অপরাধীরা মুক্তি পায়, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়। চিকিৎসার শয্যায় থেকেও যে কণ্ঠ নীরব নয় অসুস্থ শরীর নিয়ে অনেকেই বিশ্রাম নেন। কিন্তু মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রতিদিন লিখছেন। একেকটি পোস্ট, একেকটি লেখা ছোট আকারে, কিন্তু গভীর বার্তায় ভরা। সেগুলো কেবল মতামত নয়, সেগুলো সময়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য। প্রতিটি লেখায় স্পষ্ট তাঁর বুকে এখনো প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। সেই আগুন তিনি নিভতে দিতে চান না। তিনি চান—এই আগুন ছড়িয়ে পড়ুক, বিবেক জাগুক, মানুষ আবার প্রশ্ন করতে শিখুক। সুস্বাস্থ্যের কামনায়, প্রত্যাশার প্রহর গোনা আমরা তাঁর দ্রুত আরোগ্য ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি। আমরা চাই তিনি আবার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝেই থাকুন। তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর সাহস, তাঁর কলম এই সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এমন সময়ে, যখন সত্য বলার মানুষ কমে যায়, যখন আপসই হয়ে ওঠে নিরাপদ পথ, তখন মিজানুর রহমান চৌধুরীর মতো মানুষই সমাজকে আয়না দেখায়। শেষ কথাএই লেখা কেবল একজন সাংবাদিকের প্রতি শ্রদ্ধা নয়। এটি একটি সময়ের দলিল। একটি সতর্কবার্তা। একটি আহ্বান। আমরা যদি আজও একসাথে না দাঁড়াই, আজও যদি কলমকে শক্ত না করি, আজও যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট না হই তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। দেশ বাঁচে প্রতিবাদে। গণতন্ত্র বাঁচে প্রশ্নে। আর ভবিষ্যৎ বাঁচে মিজানুর রহমান চৌধুরীদের মতো অবিচল মানুষের হাত ধরে