সনদের বাইরে জ্ঞানের দীপ্তি: ছড়ার সম্রাট সুকুমার বড়ুয়া

By admin
5 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
মানুষকে চেনার দুটি পথ আছে। একটি পথ কাগজের—সেখানে সনদ, ডিগ্রি, সার্টিফিকেট ঝুলে থাকে দেয়ালে।
আরেকটি পথ জীবনের—সেখানে অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, মনন আর মানবিকতার দীর্ঘ যাত্রা। সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন দ্বিতীয় পথের মানুষ। তিনি প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন—শ্রেণীকক্ষের শিক্ষা আসল শিক্ষা নয়, বিদ্যালয় মানুষকে সনদ দিতে পারে, কিন্তু জ্ঞান দিতে পারে না। জ্ঞান অর্জিত হয় জীবন থেকে, মানুষের সঙ্গে মিশে, সময়ের সঙ্গে লড়াই করে। আজ যখন আমরা তাঁকে হারিয়েছি, তখন শুধু একজন ছড়াকার নয়—আমরা হারিয়েছি এক বিকল্প শিক্ষাদর্শন, এক জীবন্ত প্রতিবাদ, এক নিঃশব্দ বিপ্লবকে। আমাদের সমাজে একটি গভীর ভুল ধারণা বহুদিন ধরে বদ্ধমূল—যাঁদের ডিগ্রি আছে, তাঁরাই শিক্ষিত। যাঁদের সনদ নেই, তাঁরা যেন অশিক্ষিত। এই ধারণার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উদাহরণ ছিলেন সুকুমার বড়ুয়া।
তিনি বিদ্যালয়ে পড়তে পেরেছিলেন মাত্র দুই ক্লাস। এরপর আর এগোতে পারেননি।  দারিদ্র্য, জীবনসংগ্রাম, বাস্তবতার কঠিন দেয়াল—সব মিলিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দরজাটা তাঁর জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শিক্ষা কি তাতেই শেষ হয়ে যায়? সুকুমার বড়ুয়ার জীবন জোর গলায় বলে—না। যেখানে বিদ্যালয় থেমে গিয়েছিল, সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর প্রকৃত শিক্ষা।
রাস্তা ছিল তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়, মানুষ ছিল তাঁর পাঠ্যপুস্তক, আর জীবন ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষক। তিনি শিখেছিলেন চোখ দিয়ে, কান দিয়ে, হৃদয় দিয়ে। চারপাশের সমাজকে গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করতেন। মানুষের হাসি-কান্না, শিশুর কৌতুক, দরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই—সবকিছুই তিনি গ্রহণ করতেন এক অদ্ভুত সংবেদনশীলতায়। এই সংবেদনশীলতাই একসময় ছন্দে পরিণত হয়েছে, শব্দে রূপ নিয়েছে, হয়ে উঠেছে অমর ছড়া। বাংলা সাহিত্যে আমরা গর্ব করে দুইজন সুকুমারকে উচ্চারণ করি।  একজন সুকুমার রায়—  আরেকজন সুকুমার বড়ুয়া। এই দুটি নাম উচ্চারণ করলেই বোঝা যায়, ছড়ার জগতে “সুকুমার” নিজেই একটি মানদণ্ড। তবে এই দুই সুকুমারের পথ এক ছিল না। সুকুমার রায় ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আলোকিত—বিদেশে পড়াশোনা করেছেন, বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন, আধুনিক জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য আমরা সহজেই তুলে ধরতে পারি। কিন্তু সুকুমার বড়ুয়া? তাঁর যোগ্যতার তালিকা কোথায়? কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সক্রিপ্টে নয়, কোনো বোর্ডের ফলাফলে নয়, কোনো সনদের পাতায় নয়— তাঁর যোগ্যতা লেখা আছে তাঁর ছড়ায়, তাঁর শব্দে, তাঁর চিন্তায়।
তিনি যেন প্রমাণ করে গেছেন—শিক্ষা দুটি পথে আসে। একটি পথ প্রাতিষ্ঠানিক, অন্যটি আত্মিক। দ্বিতীয় পথটি অনেক বেশি কঠিন, অনেক বেশি গভীর, এবং অনেক বেশি সত্য। যাঁরা ডিগ্রিধারীদেরই শিক্ষিত মনে করেন, যাঁরা সনদ ছাড়া কাউকে মূল্য দিতে জানেন না—তাঁদের জন্য সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন এক চলমান প্রশ্নচিহ্ন। তিনি যেন নীরবে জিজ্ঞেস করে যান—
“তোমার সনদ আছে,  কিন্তু তোমার উপলব্ধি কোথায়?” ছড়া তাঁর কাছে ছিল শুধু শিশুতোষ বিনোদন নয়। ছড়া ছিল তাঁর দর্শন। শিশুদের জন্য লিখলেও তিনি কখনো শিশুদের অবমূল্যায়ন করেননি। তিনি জানতেন, শিশুর মন সবচেয়ে সূক্ষ্ম, সবচেয়ে সংবেদনশীল। তাই তাঁদের হাতে যে ভাষা তুলে দেওয়া হয়, তা হতে হবে মানবিক, সত্যনিষ্ঠ ও সৃজনশীল। তাঁর ছড়ায় হাসি আছে, কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও থাকে শিক্ষা। তাঁর শব্দ সহজ, কিন্তু সেই সহজতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে গভীর বোধ। সমাজের অসঙ্গতি, কৃত্রিমতা, ভণ্ডামি—এসব তিনি ছড়ার ছন্দেই তুলে ধরেছেন, কোনো উচ্চকণ্ঠ বক্তৃতা ছাড়াই। সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন সনদবিহীন এক মহাজ্ঞানী। তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল আকাশছোঁয়া। এমন কোনো প্রতিষ্ঠান পৃথিবীতে নেই, যারা তাঁর জ্ঞানের সনদ দিতে পারবে। কারণ সনদ দেওয়া হয় সীমিত জ্ঞানের জন্য, আর তাঁর জ্ঞান ছিল সীমাহীন। তিনি কখনো নিজেকে বড় করে দেখাননি। প্রচার, পদক, পুরস্কারের পেছনে ছোটেননি। তাঁর শক্তি ছিল লেখায়, তাঁর অস্তিত্ব ছিল ছড়ায়। তিনি জানতেন—সময় একদিন সব হিসাব ঠিক করে দেবে। আজ সময় সেই হিসাবই দিচ্ছে। আজ আমরা যখন তাঁকে হারিয়ে শোকাহত, তখন উপলব্ধি করছি—আমরা কাকে হারালাম। হারালাম এমন একজন মানুষকে, যিনি শিক্ষা সনদের বাইরে দাঁড়িয়ে বাংলা সাহিত্যের ভেতর স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের আরও একটি নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমরা জীবিত অবস্থায় সনদহীন প্রতিভাদের কতটা অবহেলা করি। তাঁদের অবদান বুঝতে আমাদের প্রায়ই তাঁদের মৃত্যুর অপেক্ষা করতে হয়। সুকুমার বড়ুয়ার জীবন আমাদের শেখায়—  শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় পাশ করা নয়, শিক্ষা মানে মানুষ হওয়া।
তিনি ছিলেন মানুষের শিক্ষক। কোনো শ্রেণীকক্ষ ছাড়াই, কোনো পাঠ্যসূচি ছাড়াই। তাঁর ছাত্র ছিল পুরো সমাজ, পুরো প্রজন্ম।
আজ তাঁর ছড়াগুলো আমাদের হাতে রয়ে গেছে—সেগুলোই তাঁর প্রকৃত সনদ। সেগুলোই তাঁর উত্তরাধিকার। সেগুলোই প্রমাণ, কাগজে না লিখলেও ইতিহাসে লেখা যায়। সনদহীন এই জ্ঞানী মানুষটিকে হারিয়ে বাংলা সাহিত্য শূন্য হয়নি—বরং আরও ঋণী হয়েছে। কারণ এমন মানুষরা চলে যান, কিন্তু রেখে যান এক ধরনের দায়—তাঁদের মতো করে সত্যের পাশে দাঁড়ানোর দায়।
ছড়ার সম্রাট সুকুমার বড়ুয়া—  আপনি আমাদের দেখিয়ে গেছেন, শিক্ষা কোনো কাগজ নয়, শিক্ষা এক ধরনের আলোকবর্তিকা,
যা মানুষকে মানুষ করে তোলে। আপনি নেই,  কিন্তু আপনার ছড়া আছে।  আপনার সনদ নেই, কিন্তু আপনার জ্ঞান অমর।

Share This Article
Leave a Comment