মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে নমুনা আনতে জাপানের ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযান

0
5

মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযান শুরু করেছে জাপান। ‘মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন’ (এমএমএক্স) নামের এই অভিযানের মাধ্যমে সৌরজগতের সৃষ্টি, মঙ্গলের উপগ্রহগুলোর উৎপত্তি এবং পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।

জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সা জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে এইচ-৩ রকেটের সাহায্যে মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়। স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৪১ মিনিটে রকেটটি অন্ধকার আকাশে উড়ে যায়। উৎক্ষেপণের প্রায় এক ঘণ্টা পর মহাকাশযানটি রকেটের ওপরের ধাপ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে অভিযান শুরুর সাফল্য নিশ্চিত করেন জাক্সার বিজ্ঞানীরা। এ সময় নিয়ন্ত্রণকক্ষে উদ্‌যাপন করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশযানটি ২০২৭ সালের আগস্টে মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এরপর মঙ্গলের দুটি প্রাকৃতিক উপগ্রহের একটি ফোবোসের পৃষ্ঠ থেকে অন্তত ১০ গ্রাম মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করবে এটি। সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে ২০৩১ সালে নমুনাসহ পৃথিবীতে ফিরবে মহাকাশযানটি।

প্রায় ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার ব্যাসের ফোবোস মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় থেকে গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করে। মঙ্গলের আরেকটি উপগ্রহের নাম ডেইমোস। আকারে ছোট ও অনিয়মিত আকৃতির এই দুটি উপগ্রহের উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

মঙ্গলে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত কয়েক দশকে নাসা মঙ্গলের পৃষ্ঠে একাধিক মহাকাশযান অবতরণ করিয়েছে। ২০২১ সালে চীনও গ্রহটিতে মহাকাশযান অবতরণে সফল হয়। তবে ফোবোস কিংবা ডেইমোসের পৃষ্ঠে অবতরণ করে নমুনা সংগ্রহের এই প্রচেষ্টা মহাকাশ গবেষণায় নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জাপানের নেতৃত্বাধীন এ প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানিসহ একাধিক দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা অংশ নিচ্ছে। প্রায় ৫৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ের এই অভিযানে ব্যবহৃত মহাকাশযানটির ওজন প্রায় পাঁচ টন। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত নাসার জ্যোতির্পদার্থবিদ টম স্ট্যাটলার বলেন, এ অভিযান ঘিরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ও বিস্ময় কাজ করছে।

মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানটি ফোবোসের কক্ষপথের সঙ্গে নিজের অবস্থান সমন্বয় করবে। এরপর সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে ফরাসি-জার্মান যৌথভাবে তৈরি ছোট রোভার ‘ইডেফিক্স’। ‘অ্যাস্টেরিক্স’ কমিকসের সাদা টেরিয়ার চরিত্রের নামে রোভারটির নামকরণ করা হয়েছে।

ফোবোসের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর তুলনায় প্রায় এক হাজার ভাগের এক ভাগ হওয়ায় রোভারটির চলাচল হবে বেশ ব্যতিক্রমী। চার চাকার এই যানটি উপগ্রহটির পৃষ্ঠে লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাবে এবং পরে নির্দিষ্ট স্থানে থামবে। প্রায় ১০০ দিন ধরে ফোবোসের পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য অবতরণস্থল ও নমুনা সংগ্রহের উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করবে এটি।

এরপর মূল মহাকাশযানের সঙ্গে থাকা চার পা-যুক্ত অবতরণযানটি ফোবোসের পৃষ্ঠে নামবে। সেখানে মাত্র দুই ঘণ্টা অবস্থান করে খননযন্ত্র ও শোষণপ্রযুক্তির সাহায্যে মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করবে। কাজ শেষে নমুনা নিয়ে আবার মহাকাশে ফিরে যাবে যানটি।

মঙ্গলের কক্ষপথ ত্যাগের আগে মহাকাশযানটি একাধিকবার ডেইমোসের কাছ দিয়ে উড়ে উপগ্রহটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের নভেম্বরে মঙ্গলের কক্ষপথ ছেড়ে পৃথিবীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার কথা রয়েছে। জার্মান মহাকাশ সংস্থার রোভারবিষয়ক প্রধান মার্কুস গ্রেবেনস্টাইন এ অভিযানকে জীবনে একবার পাওয়ার মতো সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, মঙ্গলব্যবস্থা থেকে প্রথমবারের মতো নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হতে পারা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বিজ্ঞানীদের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো ফোবোস ও ডেইমোসের উৎপত্তির রহস্য উন্মোচন করা। এ বিষয়ে বর্তমানে দুটি প্রধান তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। প্রথমটি ‘বৃহৎ সংঘর্ষ’ তত্ত্ব। এ ধারণা অনুযায়ী, কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলে আঘাত হানার পর ছিটকে বেরিয়ে আসা পদার্থ থেকেই উপগ্রহ দুটি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

অন্য তত্ত্ব অনুযায়ী, ফোবোস ও ডেইমোস মূলত গ্রহাণু। মঙ্গলের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে এগুলো গ্রহটির কক্ষপথে আটকা পড়ে উপগ্রহে পরিণত হয়েছে। সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করে এ দুটি ধারণার মধ্যে কোনটি বেশি গ্রহণযোগ্য, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।

জাক্সার প্রত্যাশা, অভিযানের ফলাফল শুধু মঙ্গলের উপগ্রহগুলোর ইতিহাস জানতেই সাহায্য করবে না, বরং সূর্যের কাছাকাছি অবস্থিত পাথুরে গ্রহগুলোতে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ কীভাবে গড়ে উঠেছে, সে সম্পর্কেও ধারণা দেবে। ভবিষ্যতে মঙ্গলে আরও জটিল অনুসন্ধান এবং মানুষবাহী মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনা তৈরিতেও এ গবেষণা কাজে আসতে পারে।

এদিকে মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে সরাসরি নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও কাজ করছে। নাসার ‘পারসিভিয়ারেন্স’ রোভার ২০২১ সাল থেকে মঙ্গলে অনুসন্ধান চালিয়ে নমুনা সংগ্রহ করছে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে কংগ্রেসের ভোটের পর ট্রাম্প প্রশাসন নমুনাগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা স্থগিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, চীনের ‘তিয়ানওয়েন-৩’ অভিযান ২০২৮ সালের দিকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। ফলে জাপানের এমএমএক্স অভিযান শেষ হওয়ার আগেই চীনের মঙ্গল অভিযান নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে। তবে দুটি প্রকল্পের লক্ষ্য আলাদা—চীন মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে চায়, আর জাপানের লক্ষ্য মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে নমুনা নিয়ে আসা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here