প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন ঘিরে উৎসবমুখর চট্টগ্রাম জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন, সম্প্রীতির বার্তা ও নগরজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি

0
39

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ, মহানবমীর ধর্মীয় আবহ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম আগমনকে ঘিরে বন্দরনগরীতে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। একদিকে পূজামণ্ডপে পূজারি ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা, অন্যদিকে সরকারপ্রধানকে স্বাগত জানাতে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা তৎপরতা, নগর পরিচ্ছন্নতা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রস্তুত করার কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ ও উদ্দীপনা।
আজ মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রাম সফরে আসছেন। সফরের প্রধান আকর্ষণ নগরীর রহমতগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জে এম সেন হলের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়। প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে তাঁর পূজামণ্ডপে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে যাত্রা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে। [সূত্র: বিএসএস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও জাগো নিউজ]
সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা
চট্টগ্রাম বহুকাল ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহাবস্থান ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। পাহাড়, সমুদ্র ও কর্ণফুলীর এই নগরীতে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। শারদীয় দুর্গোৎসব সেই সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অন্যতম প্রকাশ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহের কথা জানিয়েছেন পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা। তাঁদের প্রত্যাশা, সরকারপ্রধানের উপস্থিতি উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তুলবে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নিরাপদে ধর্ম পালনের অধিকার প্রতিষ্ঠার বার্তাকে আরও জোরালো করবে।
মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথের বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের চট্টগ্রামে এসে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনের ঘটনা এবারই প্রথম। এ কারণে এবারের সফরকে ঘিরে পূজারি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। [সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, ১৯ অক্টোবর ২০২৬]
জে এম সেন হলে বিশেষ প্রস্তুতি
নগরীর রহমতগঞ্জে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী জে এম সেন হল চট্টগ্রামের দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রতিবছর এখানে বিপুলসংখ্যক ভক্ত, দর্শনার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমাগম ঘটে। এবার দুর্গোৎসবের আয়োজনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে সামনে রেখে মণ্ডপের প্রস্তুতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদার, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে মণ্ডপ এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দর্শনার্থীদের চলাচল সহজ করা এবং অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কাজ করছেন।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করবেন। পাশাপাশি পূজামণ্ডপের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।
নিরাপত্তা ও নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ, প্রশাসন, নিরাপত্তা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জে এম সেন হল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিশেষ নিরাপত্তা প্রস্তুতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও জনসমাগমস্থলেও নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে দুর্গাপূজার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পূজামণ্ডপগুলোতে যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষ নির্বিঘ্নে উৎসবে অংশ নিতে পারেন, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
নগরীর পরিচ্ছন্নতা, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও দর্শনার্থীদের চলাচল সহজ করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বিমানবন্দর থেকে জে এম সেন হল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।
পূজামণ্ডপে আর্থিক সহায়তা ও সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ
দুর্গোৎসবের আয়োজন নির্বিঘ্ন রাখতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বিভিন্ন পূজামণ্ডপে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহানগরীর ১৬টি থানার আওতাধীন ২৯৪টি পূজামণ্ডপে ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে ৫ লাখ টাকা এবং জামালখানের কুসুমকুমারী পূজামণ্ডপে ১৫ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। হরিজন সম্প্রদায়ের চারটি সেবাকলোনিতেও মোট ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব উদ্যোগে মোট আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ৩৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি নগর পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও জনসেবামূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
সফরসূচিতে রয়েছে সাংগঠনিক বৈঠক
প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফর কেবল পূজামণ্ডপ পরিদর্শনেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর জেলা ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের নিয়ে হোটেল র‍্যাডিসন ব্লুতে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এতে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি সংসদ সদস্য এবং দলীয় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বৈঠকে সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এক দিনের সফরে তিন বিভাগে প্রধানমন্ত্রী
আজকের সফরসূচিতে রয়েছে দেশের তিনটি বিভাগে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সকালে রংপুরের রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। এরপর রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সেখানে আয়োজিত জনসভায় অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। বিকেলে রাজশাহী থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা তাঁর।
প্রকাশিত সরকারি সফরসূচিতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংক্ষিপ্ত বিরতির কথাও রয়েছে। এরপর রাতে ঢাকায় ফেরার কর্মসূচি নির্ধারিত হয়েছে। তবে সফরের প্রতিটি পর্বের প্রকৃত সময় যাত্রা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে।
চট্টগ্রামের মানুষের প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে নগরবাসীর প্রত্যাশা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেকের কাছে এটি ধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক সহাবস্থান ও সব সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, বন্দরনগরীর দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির ঐতিহ্য আরও সুদৃঢ় হবে এবং প্রত্যেক নাগরিক নিজ নিজ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব নিরাপদে পালনের পরিবেশ পাবেন।
একই সঙ্গে নগরবাসী চান, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর চট্টগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা, যানজট নিরসন, পরিচ্ছন্নতা ও জননিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোর প্রতিও নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করুক।
উৎসবের আনন্দে সম্প্রীতির প্রত্যাশা
দুর্গোৎসব কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আনন্দ, সংস্কৃতি, মানবিকতা ও সামাজিক বন্ধনেরও উৎসব। এই উৎসবের মহানবমীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম আগমন ঘিরে যে প্রস্তুতি ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হোক—এটাই সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।
ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও নাগরিক অধিকার সবার—এই চেতনাকে ধারণ করে চট্টগ্রাম আবারও সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত তুলে ধরুক। প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নগরীতে তৈরি হওয়া উৎসবমুখর পরিবেশ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও ঐক্যের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করুক।
চট্টগ্রামের আকাশে আজ দুর্গোৎসবের আনন্দ, নগরজুড়ে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে প্রস্তুতি, আর মানুষের প্রত্যাশা—সম্প্রীতি, নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বাংলাদেশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here