
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে সাহস, মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আজাদ ২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় পুলিশ পদক পাওয়ার স্বীকৃতি অর্জন করছেন। পাহাড়তলী থানায় দায়িত্ব পালনকালে সর্বোচ্চ পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেন ওসি বাবুল আজাদ। সেই সফলতার স্বীকৃতিতে গত বছর পেয়েছেন আইজিপি ব্যাজ।
দীর্ঘদিনের দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার আসামিদের গ্রেফতারে তার ভূমিকা তাকে পুলিশের মাঠপর্যায়ের একজন আলোচিত কর্মকর্তায় পরিণত করেছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এই স্বীকৃতি শুধু একটি পদক নয়, বরং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার সাহস, পেশাদারিত্ব ও অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন।
বাবুল আজাদের কর্মজীবনের সাম্প্রতিক অধ্যায় আরও তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি কঠিন সময়ে তিনি পাহাড়তলী থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় পুলিশের জন্য মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে না গিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যান তিনি।
এরপর দায়িত্ব পান ডবলমুরিং থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে। চট্টগ্রাম নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ এই থানায় দায়িত্ব পালনকালে অপরাধ দমন, আসামি গ্রেফতার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন।
পরবর্তীতে চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাবুল আজাদ। নগরীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই থানায় দায়িত্ব পালনকালে তার নেতৃত্বে একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়। বিশেষ করে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার এবং অস্ত্র উদ্ধারের কয়েকটি ঘটনায় তার নেতৃত্বাধীন টিমের ভূমিকা আলোচনায় আসে।
হাসিব আজিজের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে বাবুল আজাদ
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ, বিপিএম-এর নেতৃত্বে অপরাধ দমনে নেওয়া কঠোর অবস্থানের সময় মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন বাবুল আজাদ।
কমিশনারের কৌশলগত নির্দেশনা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তদারকি এবং মাঠপর্যায়ের চৌকস পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে নগরীতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালিত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় চকবাজার এলাকায় পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও পেশাদার কিলার হিসেবে পুলিশের তালিকায় থাকা আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে রিমন ওরফে ইমন গ্রেফতার হয়। পরবর্তী অভিযানে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও আসামি গ্রেফতার এবং অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
এই অভিযানের মাধ্যমে শুধু কয়েকজন অপরাধীকে গ্রেফতার নয়, একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী নেটওয়ার্কের বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মাঠপর্যায়ের এই ধরনের অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বাবুল আজাদের সাহস, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং টিম পরিচালনার দক্ষতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কঠিন দায়িত্বে দৃঢ়তা
পুলিশের দায়িত্ব কখনোই শুধু থানার চেয়ারে বসে প্রশাসনিক কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে একজন অফিসার ইনচার্জকে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ দমন, মামলা তদন্তের তদারকি, অপরাধীদের গ্রেফতার, জননিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ মোকাবিলা করতে হয়।
বাবুল আজাদের দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিটি থানার পরিবেশ ও অপরাধের ধরন ছিল ভিন্ন। পাহাড়তলী থেকে ডবলমুরিং, ডবলমুরিং থেকে চকবাজার এবং সর্বশেষ নগর গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বে যাওয়া তার কর্মজীবনে দায়িত্বের পরিধি বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত বহন করে।
অপপ্রচারের জবাব কাজেই
একজন সক্রিয় পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে নানা ধরনের আলোচনা, সমালোচনা কিংবা অভিযোগ থাকতেই পারে। বাবুল আজাদকে নিয়েও বিভিন্ন মহলে নানা বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। কিন্তু একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার দায়িত্ব পালনের রেকর্ড, আইনানুগ কার্যক্রম, অভিযান, গ্রেফতার, উদ্ধার এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে।
অপপ্রচার দিয়ে একজন কর্মকর্তার দীর্ঘ কর্মজীবনের মূল্যায়ন করা যায় না। একইভাবে প্রশংসাও যেন অন্ধ সমর্থনে পরিণত না হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার কাজ।
বাবুল আজাদের ক্ষেত্রে তার ধারাবাহিক দায়িত্ব পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পাওয়া তার পেশাগত যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
থানার ওসি থেকে গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বে
চকবাজার থানার দায়িত্ব পালনের পর বাবুল আজাদ বর্তমানে নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। থানার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এখন তিনি গোয়েন্দা কার্যক্রমে কাজে লাগাচ্ছেন।
ডিবির দায়িত্ব আরও বিস্তৃত ও তথ্যনির্ভর। সংঘবদ্ধ অপরাধ, অস্ত্রের উৎস, অপরাধী চক্রের যোগাযোগ, পলাতক আসামিদের অবস্থান এবং অপরাধের নেপথ্যের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে থানায় দীর্ঘদিনের মাঠঅভিজ্ঞতা বাবুল আজাদের বর্তমান দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাষ্ট্রীয় পুলিশ পদক: দায়িত্বের স্বীকৃতি
২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় পুলিশ পদকের স্বীকৃতি বাবুল আজাদের পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একজন পুলিশ কর্মকর্তার জন্য এই ধরনের স্বীকৃতি দায়িত্ব পালনে আরও জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতার প্রত্যাশাও তৈরি করে।
পদক অর্জনের পাশাপাশি একজন কর্মকর্তার সামনে থাকে আরও বড় দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি যেমন সম্মানের, তেমনি তা ভবিষ্যতে আরও দক্ষতা, সততা, পেশাদারিত্ব এবং জনগণের নিরাপত্তায় কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যাশাও বাড়িয়ে দেয়।
চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সংঘবদ্ধ অপরাধ, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাবুল আজাদের কর্মজীবনের সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতা তাই বলছে, পাহাড়তলীর কঠিন সময় থেকে শুরু করে ডবলমুরিং, চকবাজার এবং বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্ব—প্রতিটি ধাপই তার পেশাগত জীবনের নতুন পরীক্ষা।
রাষ্ট্রীয় পুলিশ পদকের স্বীকৃতি সেই পথচলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখন নতুন দায়িত্বে তার সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ, আরও বড় প্রত্যাশা এবং আরও বড় দায়িত্ব।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার আসল পরিচয় তার পদ নয়, তার কাজ। আর সেই কাজের স্বীকৃতিই শেষ পর্যন্ত তাকে মানুষের কাছে পরিচিত করে। বাবুল আজাদের সামনে এখন সেই কাজকে আরও এগিয়ে নেওয়ার নতুন অধ্যায়।